আবিরের স্প্যারো পর্ব-৩ | Abir-er Sparrow part-3

রহস্যের জালে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে আবির, আর স্প্যারোকে ঘিরে বাড়ছে অজানা প্রশ্ন।

আবিরের স্প্যারো 

লেখনীতে সালমা চৌধুরী 

পর্ব -৩

মেঘ ঘন ঘন এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে জবাব দিল,

‘না, একদম না। আমার ভাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাই। তাই না বন্যা?

মেঘের কথা শুনে তানভীর মৃদু হাসল, মেঘ বন্যার দিকে তাকাতে বন্যা ভেঙচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মেঘ এগিয়ে এসে বন্যার হাত ঝাঁকিয়ে আবারও শুধাল,

‘এই বন্যা, আমার ভাই ভালো না?

বন্যা না পেরে কোন মতে জবাব দিল,

‘হ্যাঁ, খুব ভালো। এখন চল, যেতে হবে।

তানভীর পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে মেঘকে দিয়ে বলল,

‘তোর বান্ধবীকে নিয়ে কিছু খেয়ে নিস।

বেচারী না খেয়ে বেরিয়েছে। আর তুইও কিছু খাস নি মনে হয়।

ইসস.. আদিখ্যেতা। তানভীর রাগি স্বরে আওড়াল, এই মেয়ে.. কি বললে?’

বন্যার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুখ চেপে ধরে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,, কিছু বলি নি!

তানভীর ধমুকের স্বরে ফের বলল, বলবেও না কিছু। আমার সামনে উল্টাপাল্টা আচরণ করলে এর ফল খুব খারাপ হবে,,

মেঘ রিক্সা উঠতে উঠতে বলল,

‘ভাইয়া, তুমি ইদানীং খুব মেজাজ দেখাচ্ছো।

আব্বুকে বলে তোমার ডাক্তার দেখাতে হবে খুব দ্রুত।

‘কিসের ডাক্তার?’

‘পাগলের ডাক্তার।’

তানভীর নিরেট কন্ঠে আওড়াল,

‘আমি কি পাগল?

আরো পড়ুন

মেঘ খানিক হেসে বলল, মনে হয় আমার আঁচড় পড়েছে। না হয় তুমি তো পাগল হওয়ার কথা না। তাছাড়া তুমি পাগল হলে আব্বু-আম্মুর কি হবে? তাদের একটাই ছেলে। বংশের বাতি বলে কথা!’

তানভীর কপালের ভাঁজ ফেলে রাগী চোখে তাকিয়েছে কেবল। ওমনি তানভীরের ফোন বাজতে শুরু করেছে। তানভীর ফোন বের করে মুচকি হাসল। মেঘকে ধমক দেওয়ার বদলে শান্ত গলায় বলল,, ‘সাবধানে যাস।’

তানভীরের হাবভাব দেখে মেঘের মনের খটকা লাগছে। কিন্তু রিক্সাওয়ালা মামা রিক্সা চালাতে শুরু করেছেন বলে মেঘ আর কিছু বলতে পারিনি। মিনিট দুয়েক মেঘ চুপ করে বসে ভাবছিল। হঠাৎ বন্যার ডাকে ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো। বন্যা জিজ্ঞাসা করল,

‘কথা নেই বার্তা নেই তুই হঠাৎ শাড়ি পড়তে গেলি কেন?’

মেঘের ওষ্ঠযুগল আপনাআপনি দুপাশে সরে গেল। নিভু নিভু চোখে বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,, ‘প্রিয়জনের সঙ্গে প্রথমবার দেখা করতে গেলে মেয়েরা শাড়ি পড়ে। তুই কি এই কথাটাও জানিস না?’

মেঘের কথা শুনে বন্যা চমকে ওঠল। কণ্ঠরোধ হওয়ার অবস্থা মেয়েটার। মেঘের সাথে বন্যার বন্ধুত্বের কতগুলো বছর পেরিয়েছে। প্রাইমারি স্কুল থেকে তাদের পথ চলা শুরু। সৌভাগ্যক্রমে দুজন এখন একই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী। এত বছর পথ চলায় মেঘ কে কখনও কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে দেখেনি বন্যা।

পড়াশোনার সুবাদে মেঘের আব্বু আম্মুর, তানভীর আর মেঘকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। বিজ্ঞান বিভাগের পড়াশোনা করায় মেঘের পড়াশোনা চাপটাও একটু বেশি ছিল। তাই আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে যাওয়াও খুব একটা হয়ে ওঠেনি।

তানভির ছাড়া মেঘের জীবনে আর কোনো ছেলের অস্তিত্ব আছে বলে বন্যা মানতে পারছে না।

ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হলো মাত্র দুই মাস হবে। এর মধ্যে দুই একজন ছেলে বন্ধুর সাথে পরিচয় হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ যে মেঘের প্রিয়জন হতে পারে এর সম্ভাবনাও নেই।

সবচেয়ে বড় বিষয়, যে মেঘ বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তানভীর ভাইয়ের কানে খবর পৌঁছে যায়। টিউশন থেকে বের হতে ৫ মিনিট দেরি হলে উপস্থিত হয়ে পড়েন। সেখানে মেঘ তার প্রিয়জনের সঙ্গে শাড়ি পড়ি দেখা করতে যাচ্ছে অথচ তানভীর ভাইয়া কিছু বলল না,, এটা অসম্ভব বিষয়।

বন্যা ভাবতে ভাবতে আচমকা চ্যাচাল,

‘এ হতে পারে না…

কি হতে পারে না?

বন্যার অস্থিরতা বাড়ছে শরীর ঘামতে শুরু করছে।অবিশ্বাস চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল

‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

বন্যার ফ্যাকাশে চোখ-মুখ দেখে মেঘ মৃদ স্বরে বলল, ‘ভার্সিটিতে…

‘কিন্তু তুই যে বললি, প্রিয়জনের সাথে দেখা করতে যাবি!’

মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,

‘সামান্য একটা কথাতে তুই এত সিরিয়াস হয়ে গেলি। দেখ তোর শরীর কিভাবে ঘামছে।

বন্যা জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল, ‘তোর কাছে বিষয়টা মজা বা ফাজলামো হতে পারে, মেঘ। কিন্তু আমি তোর ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। আমার সিরিয়াস হওয়ার কারণটাও আশা করি তোর অজানা নয়।’

‘কি কারন?’

আরো পড়ুন

একদিন তুই রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলি। তোর ভাই ভেবেছিল তুই আমার সাথে বেরিয়েছিস না হয় তুই কোথাও আছিস আমি জানি। তার জন্য আমার বাসায় গিয়ে আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে আব্বু আম্মুর সামনে ধমক দিয়ে বলেছিল, তোকে বের করে দিতে না হয় আমাকে পুলিশে দিবে।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়া আমি তখন পুলিশ, জেল সম্পর্কে কিছুই বুঝতাম না। আমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম,

‘মেঘ কোথায় আছে আমি জানি না!’

কিন্তু তোর ভাই আমার কথা বিশ্বাস করা তো দূর, আব্বু আম্মুর সামনে চিৎকার করেছিলেন, ‘আমার বোনকে না পেলে তোমার খবর আছে।’

আমার জন্য নাকি তোর সাহস বেড়ে গেছে। তুই বদ-মেজাজি হয়ে যাচ্ছিস। তোকে বাসা থেকে বের করার পেছনে নাকি আমার হাত আছে, আরও কত কথা।

“সেদিন আব্বু আম্মুর সামনে কান ধরে বলেছিলাম’তোর সঙ্গে আমি আর মিশবো না, তোদের বাসায়ও আসবো না!

মেঘ কৌতুহলী কন্ঠে প্রশ্ন করল, ‘তারপর? মিশলে কেন? আমার জন্য কানে ধরেছিলি অথচ এখনো আমার গা ঘেঁষে বসে আছিস।

‘লজ্জা লাগে না তোর?’

বন্যার আগে কটকট করতে বলল, তোর ভাইয়ের জন্যই মিশতে বাধ্য হয়েছি। তোকে খুঁজে পাওয়ার পর মিষ্টি নিয়ে আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন।

আব্বুকে সরি বলে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলেছিলেন,

আমি আমার বোনকে অনেক ভালোবাসি। আমার বোনের কিছু হলে আমি বেঁচে থেকেও মরে যাব, আঙ্কেল। বনুকে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। বনু রাস্তাঘাট ও ঠিকমতো চিনে না। একা কোথায় বের হয় না। বন্যা ছাড়া কারো সাথে কোথাও চায় না।তাই ভেবেছিলাম বন্যা জেনে শুনে এমন করছে। আপনারা প্লিজ কিছু মনে করবেন না।

এমন ভাবে বলেছিল যেন উনি নিষ্পাপ। ওনার কথা শুনে আমার আব্বুর মন নরম হয়ে গিয়েছিল। আব্বু ওনাকে পাশে বসিয়ে মিষ্টি খাইয়েছেন। আরো কত কি বলে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তারপর বাসার সামনে এসে আমাকে বলেছিলেন,

‘আগামীকাল আমাদের বাসায় বেড়াতে যেও!

আমিও রাগে বলে ফেলেছিলাম,

‘আজকের পর মেঘের সাথে মিশবোও না আর আপনাদের বাসায় যাবো না।’

বলেছি না সর্বনাশ করেছি। ওনি চোখ রাঙিয়ে বলেছিলেন,

‘তোমাকে আমার বোন বেস্ট ফ্রেন্ড মনে করে। এখন তুমি যদি ওর সাথে না মিশো তাহলে বনু ভাববে আমি নিষেধ করেছি মিশতে। তারপর এ নিয়ে মন খারাপ করবে, কান্না করবে এমনকি জ্বরও আসতে পারে। তোমার জন্য যদি আমার বোনের চোখে পানি কিংবা গায়ে জ্বর আসে তাহলে তোমার কি হতে পারে এটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

তখন থেকে ভয়ে আর আতঙ্ক নিয়ে তোর সাথে চলাফেরা করি। আর কিছুই না।’

মেঘ বন্যার কথা শুনে প্রথম দিকে হাসলেও এবার মুখ গোমড়া করে প্রশ্ন করল,

তারমানে তুই আমাকে ভালোবাসিস না? আমাকে বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবিস না?

আমি কখন বললাম তোকে বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবি না।

আমি বলেছি, ছোটবেলা তোর ভাইয়ের ভয়ে তোর সঙ্গে মিশতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন তো বড়ো হয়ে গেছি।

তারমানে এখন আর আমার ভাইকে ভয় পাস না?’

বন্যা কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে আস্তে করে বলল, ‘জানি না।

মেঘ মৃদু হেসে বলল,

‘মন খারাপ করিস না। সত্যি বলতে ভাইয়া আমাকে অনেক ভালোবাসে। যেমন শাসন করে তেমন আদরও করে। ভাইয়ার জন্য বাসায় আমার সব শাস্তি মাফ হয়ে যায়। যদিও আমার করার অন্যায়ের শাস্তি প্রতিনিয়ত ভাইয়াকে পেতে হয়।

বন্যা শীতল কন্ঠে বলল,

‘আমার জীবনে বড় একটা আফসোস্য আমার কোনো বড় ভাই নেই! শাসন করা কিংবা ভালোবাসার মতো একটা মানুষ নেই! সব বিপদ-আপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর জন্য বড়ো ভাই নামক বটবৃক্ষটা আমার নেই। তাই এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য করা সাজে না…

বন্যাকে স্বাভাবিক করার জন্য মেঘ বলল, ‘আমার জীবনেও তো বড়ো কোনো বোন নেই। একটা ছোট বোন যাও আছে কিন্তু কত বছর যাবৎ দেখা-সাক্ষাৎ নেই। তোর বাসায় বড়ো আপু আছে, একটা ছোট ভাই আছে, গল্প করার মত সঙ্গী আছে।

কিন্তু আমার! রাগ, অভিমান শেষে ভাইয়া ছাড়া কেউই নেই আমার।

মেঘ একটু থেমে ফের বলল, ‘তাছাড়া আমার ভাই মানে তোরও ভাই!’

থাক বোন, তোর ভাইয়ের মতো ভাই আমার না হলেও চলবে। এতো ভালোবাসা আমার সহ্য হবে না।’

মেঘ মুচকি হাসল। এর মধ্যে রিক্সা ভার্সিটির গেট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ভার্সিটিতে এত এত মানুষের আনাগোনা দেখে মেঘের বুক কাঁপছে। প্রথমবার শাড়ি পড়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। কিন্তু মনের ভেতর বিন্দুমাত্র সাহস নেই। বন্যা ডাকল, এই মেঘ, নেমে আয়।’

‘আমার লজ্জা লাগছে!’

‘প্রিয়জনের সাথে দেখা করতেও এত লজ্জা?

‘কোথায় প্রিয়জন?

বন্যা মজার ছলে বলল,

তোর অপেক্ষায় বসে আছে, কোন এক বৃক্ষ তলায়।

মেঘ রিকশা থেকে নেমে শাড়ি ঠিক করতে ব্যস্ত হলো। বন্যার কথায় উত্তর দেয়নি বলে বন্যা কিঞ্চিত কোমল গলায় আওড়াল,

‘কাউকে মিস করছিস?

মেঘ আলগোছে প্রশ্ন করল,

‘কাকে মিস করব?’

এই যে শাড়ির কচি ঠিক করে দেওয়ার মানুষটাকে।

মেঘ ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল, ‘আমার শাড়ি ঠিক করে দেওয়ার মানুষ এই জীবনে আর আসবে বলে মনে হয় না।

কেন? একটু আগে না বললি, প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

‘দুষ্টামি করেছি তোর সাথে।’

বন্যা নিচু হয়ে মেঘের শাড়ি ঠিক করে দিল। তারপর বসা থেকে উঠে মেঘের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমি থাকতে তোর কোনো কিছুর অভাব হবে না।সত্যিকারের প্রিয়জন আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি না হয় তোর প্রিয়জন হয়ে রইলাম!’

মেঘ বন্যার হাতে হাত রেখে মোলায়েম কণ্ঠে বলল, আমার জীবনে প্রিয়জন আসলেও তোর অবস্থান সর্বদা একই থাকবে। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলি, আসিস আর সর্বদা থাকবি।’

ভাসিটির আনাচে কানাচে বসন্তের আমেজ। বাসন্তী শাড়িতে অগণিত মেয়ের অপরূপা সেজেছে। হিমুর মতো হলুদ পাঞ্জাবিতে সেজে শ খানেক যুবক। দূর থেকে তাদের একসঙ্গে দেখে মনে হচ্ছে কপোত-কপোতীর মেলা বসেছে। তাদের মাঝখানে মেঘ আর বন্যাকে অসহায়, অবলা লাগছে। মেঘরা ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বসন্ত বরণের প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। হলরুমের পেছনের দিক কোথাও বসার মত জায়গা নেই। এমনকি দাঁড়ানোর জায়গাও সংকট।

সাউন্ড বক্সে গান বাজছে, 

বাতাসে বহিছে প্রেম, 

নয়নে লাগিলো নেশা, 

কারা যে ডাকিলো পিছে, 

বসন্ত এসে গেছে, 

মধুর আমৃতবানী বেলা গেলো সহজেই, 

মরনে উঠিল বাজি বসন্ত এসে গেছে, 

থাক তব ভুবনের ধুলি মাখা চরণে, 

মাথা নত করে রব..

বসন্ত এসে গেছে, 

বসন্ত এসে গেছে…!

এই গল্প প্রকাশের জন্য লেখকের অনুমতি আছে। অননুমোদিত কপি বা পুনঃপ্রকাশ নিষিদ্ধ।  

Published with the author’s permission. Unauthorized copying or republication is prohibited.

           আবিরের স্প্যারো পর্ব-৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *