
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
ইশরাত জাহান জেরিন
পর্ব-১০
বড় একটা হলরুম। সামনে লম্বা টেবিল, তার ওপর মাইক সারি সারি সাজানো। পেছনে বিভিন্ন দলের ব্যানার, পতাকা। চারদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। মিডিয়ার লোকজন ব্যস্ত, লাইভ চলছে। কনফারেন্সের ভেতর চাপা উত্তেজনা। সব দলের এমপি প্রার্থীরা বসে আছে নিজেদের জায়গায়। একপাশে বসে আছে আব্রাজ। সাদা পাঞ্জাবি আর কালো চাদরে তাকে পুরোই দেশের, দশের নেতা লাগছে। নেতাকে যদিও নেতাই লাগবে। মোড়ের দোকানদারের চা বিক্রেতা নয়! তার ঠিক বিপরীত পাশে রাত্রিকা নৈশি। আব্রাজ একবার তার দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দিলো। এই মহিলা মিটিং এ এসেছে নাকি বিয়ের দাওয়াতে। এত জমকালো সাঁঝ দিয়ে নিজেকে কি প্রমাণ করতে চাইছে কে জানে? সাংবাদিকরা তাদের সবাইকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। মাঝ থেকে একজন বলল, “দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন? নতুন প্রজন্ম আপনাদের কাছ থেকে কী আশা করতে পারে?”
আব্রাজ মাইকের দিকে ঝুঁকে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “নতুন প্রজন্ম আশা করে কাজ। আর আমরা কাজ দেখাই। আবার আশেপাশে কেউ কেউ আছে তারা কাজ নয়, কেবল মুখের বুলি বিতরণ করতে পারদর্শী।”
তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ে নৈশির দিকে। নেৈশি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, “কাজ? নাকি কাজের গল্প? দেশের মানুষ এখন গল্পে আর বিশ্বাস করে না, আব্রাজ সাহেব।”
“গল্প অন্তত সত্যি বানাতে জানি। আপনারা তো প্রতিশ্রুতিটাও বানাতে পারেন না ঠিকমতো।”
পরিবেশ গরম হয়ে ওঠে। মিডিয়ার লোকজন হইচই শুরু করে। ক্যামেরা জুম করে দুজনের মুখে। সাংবাদিক আবারও প্রশ্ন করে, “আপনারা কি ব্যক্তিগত আক্রমণে চলে যাচ্ছেন?”
রাত্রিকার কড়া উত্তর, “ব্যক্তিগত না, বাস্তব। জনগণ জানে কে কাজ করে আর কে শুধু মাইক ধরে নাটক করে।”
আব্রাজ নিজেকে সামলে হেসে বলল, “নাটক করতে হলে স্ক্রিপ্ট লাগে। আপনারা তো সেই স্ক্রিপ্টও অন্যের থেকে ধার নেন।”
রাত্রিকার পাল্টা জবাব, “স্ক্রিপ্ট ধার নেওয়া ভালো, কিন্তু দেশের টাকা ধার করে গায়েব করে দেওয়া ভালো না। কি বলেন আব্রাজ সাহেব?”
চারদিকে চাপা গুঞ্জন। কিছু এমপি প্রার্থী নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। পরিস্থিতি টানটান।
আব্রাজ একটু সামনে ঝুঁকে “দেখুন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে হলে প্রমাণ লাগবে। আপনারা অভিযোগ করেন, আমরা কাজ করি।”
রাত্রিকা চোখ সরু করে বলল, “প্রমাণ সময়ই দেবে। আর সেই সময় খুব দূরে না।”
“আপনারা কি একে অপরকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন, নাকি ব্যক্তিগত শত্রু?” সাংবাদিকের মুখে চিন্তার ছাপ।
আব্রাজ একটু থেমে, হালকা হেসে বলল, “রাজনীতিতে শত্রু না, থাকে প্রতিপক্ষ। তবে কিছু প্রতিপক্ষ নিজেরাই শত্রু হয়ে ওঠে।”
রাত্রিকা সোজা তাকিয়ে বলল, “আর কিছু মানুষ ক্ষমতায় থাকতে থাকতে নিজেদের রাজা ভাবে… তারপর একদিন জনগণ তাদের নামিয়ে দেয়। তখন তারা হয়ে যায় ভিকারি।”
“ছি ছি আপনারা দেখছেন তো? জননেত্রী এই দেশের ভিকারিদের কত নিচু চোখে দেখে। ভিকারিদের কি কোনো মূল্য নেই? তারা কি মানুষ না? এই আপনারা সবাই শুনেছেন তো?” আব্রাজ একেবারে ভালো মতো রাত্রিকাকে তার কথায় জব্দ করে বেশ খুশি হয়। বেচারি রাত্রিকার মুখ তখন বন্ধ হয়ে যায়।
মিডিয়ার ক্যামেরা তখন একের পর এক ফ্ল্যাশ করছে। চারদিক গমগম করছে প্রশ্নে, কোলাহলে। রাত্রিকার কথার পর মুহূর্তের জন্য একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আব্রাজ সেই সুযোগটা একদম হাতছাড়া করল না। একজন সাংবাদিক মাইক্রোফোন বাড়িয়ে বলল, “জামাতের পক্ষ থেকে আপনারা কী বলবেন এই পরিস্থিতিতে?”
জামাতের প্রতিনিধি একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “দেখুন, দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা বরাবরই উদ্বিগ্ন। ক্ষমতাসীন দল—” তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আব্রাজ হালকা হেসে সামনে এগিয়ে এল।
“উদ্বিগ্ন? আপনারা? আপনারা যখন সুযোগ পান, তখন দেশের মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করেন। আর যখন সুযোগ পান না, তখন উদ্বিগ্ন হয়ে যান! বাহ, সুন্দর কৌশল!”
চারদিকে চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিকরাও একে অপরের দিকে তাকায়। জামাতের লোকটা একটু থমকে যায়। কিছু বলার চেষ্টা করলেও কথাগুলো জড়িয়ে যায়। “না, আমরা তো আসলে—”
আব্রাজ থামতে দেয় না। “আসলে কী? জনগণ এখন আগের মতো বোকা নেই৷ সাংবাদিক এবার আরেক প্রার্থীর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। “আপনি কী বলবেন? দুই বড় দলের এই তর্কে আপনার অবস্থান কী?” স্বতন্ত্র প্রার্থী একটু আত্মবিশ্বাস জোগাড় করে বলে, “আমরা চাই পরিবর্তন। এই দুই দলের বাইরে” আবারও আব্রাজ হেসে ওঠে, এবার একটু ধীরে বলে, “পরিবর্তন? না ভিত্তি, না পরিকল্পনা শুধু ‘পরিবর্তন’ শব্দটা মুখে নিলেই কি নেতা হওয়া যায়?” সে চোখ তুলে সোজা ক্যামেরার দিকে তাকায়, “দেশ চালানো ফেসবুক পোস্ট না, যে আজ যা খুশি লিখে দিলাম আর কাল মানুষ বিশ্বাস করে ফেলবে।” এই কথায় চারপাশে আবারও চাপা গুঞ্জন। কেউ কেউ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী এবার চুপ। তার ঠোঁট নড়লেও শব্দ বের হয় না। আব্রাজ মাইক্রোফোনটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“রাজনীতি খেলনা না। এখানে দায়িত্ব লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে, আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণের জন্য কাজ করার ইচ্ছা লাগে। শুধু স্লোগান দিয়ে দেশ চলে না।”
মিটিং শেষ। চারদিকে সাংবাদিকদের ভিড় ধীরে ধীরে কমে আসছে। আলো, ক্যামেরা, কোলাহল সব যেন একটু একটু করে স্তিমিত হচ্ছে। বাইরে করিডোরে বের হতেই রাত্রিকা হঠাৎ থেমে যায়। পেছন থেকে আব্রাজের পায়ের শব্দ কাছে আসে। রাত্রিকা ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। “খুব ভালো খেললেন আপনি। মানুষকে কথার ফাঁদে ফেলে দিতে ওস্তাদ।”
আব্রাজ বাঁকা হাসল। “রাজনীতিতে ঢুকতে হলে ওস্তাদ হওয়া লাগে। যা সবাই পারে না।”
“না, সবাই পারে না, দুনিয়ার সব আপনি একাই পারেন। কারণ কি জানেন? আপনি নিচে নামতেও দ্বিধা করেন না।”
আব্রাজ একটু কাছে এগিয়ে আসে, কণ্ঠ নিচু করে বলে,
“নিচে নামা? না… আমি শুধু মানুষের ভাষায় কথা বলি। আর আপনি এখনও মঞ্চের ভাষায় আটকে আছেন।”
রাত্রিকা তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়। “মানুষের ভাষা? না, আপনি ভয় দেখাতে জানেন, অপমান করতে জানেন। আজকের মতো নাটক করে মানুষকে হাসানো এইটাই আপনার রাজনীতি।”
আব্রাজ এবার একটু থামে। চোখ দুটো সরু করে তাকায় তার দিকে। “আপনি একটা ভুল করেন বারবার… আপনি ভাবেন আবেগ দিয়ে মানুষকে জেতানো যায়। কিন্তু বাস্তবটা একটু কঠিন।”
“আর আপনি ভাবেন চালাকি দিয়েই সব জেতা যায়,” রাত্রিকা তীক্ষ্ণভাবে বলে ওঠে, “কিন্তু একদিন না একদিন মানুষ বুঝে যাবে কে আসল, কে নকল।”
আব্রাজ হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলে, “সেই দিনটার জন্যই তো খেলাটা খেলছি।”
রাত্রিকার চোখে মুহূর্তের জন্য দ্বিধা ঝলকে ওঠে, তারপর আবার কঠিন হয়ে যায়। “খেলা? দেশের ভবিষ্যৎ আপনার কাছে খেলা?”
“যে জিততে জানে না, তার কাছে সবই সিরিয়াস লাগে,” আব্রাজ ঠান্ডা গলায় বলে, “আর যে জিততে জানে, সে জানে কখন কীভাবে চাল দিতে হয়।”
এইবার রাত্রিকা আর কিছু বলে না। তার মুঠো শক্ত হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড আব্রাজের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়। “এই খেলা একদিন আপনাকেই শেষ করে দেবে, আব্রাজ,” বলে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করে।
আব্রাজ দাঁড়িয়ে থাকে, ধীরে বলে ওঠে, “দেখা যাবে জননেত্রী রাত্রিকা নৈশি সরকার।”
নৈশি যেতেই সামির ভ্রু কুঁচকে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ভাই স্ক্রিপ্টে তো এইসব লিখি নাই, আপনি এত এত ডায়লগ কই পাইলেন? আর বাথরুমের মধ্যে গোলাপ জন্মালো কেমনে?”
“মানে?”
“মানে আপনার অপবিত্র মুখে এত মধু ঝরল কেমনে?”
“ওরে বাল, তোমার দেখি ভালো মুখ চলে। আসো কাছে, একেবারে ঘোষে মুখের জবান বন্ধ করে দেই। “
“এইতো আমার ভাই ঠিক হয়ে গেছে। আমি আরো ভাবলাম অসুখ হলো নাকি। যাক বাবা একটু শান্তি লাগছে এখন।”
আব্রাজ ভ্রু কুঁচকে সামিরের দিকে তাকালো। এই ছেলেও না! সুযোগ বুঝে এর জায়গা মতো যদি বোম্বাই মরিচ থেতলে না দিয়েছে! আব্রাজ সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই জামাতের নেতার সাথে দেখা হয়। হুজুর মানুষ তো, ওনাদের সালাম না দিলে বিরাট পাপ লাগবে। তাই আব্রাজ বড় করে একটা সালাম দিতেই শেখ আলী শিরাজী সালামের জবাব দিয়ে বললেন, “আর ২ দিন পর নির্বাচন। খোদা চায়ে তো এইবার জিত ন্যায়ের হবে। এবার ভোট চোর জিততে পারবে না।”
“বাসায় গিয়ে বাটি চালানের প্রস্তুতি নিয়েন হুজুর সাহেব। দেখা যেতে পারে আপনার ভোট গুলে যদি আবার চোরে চুরি করে নিয়ে যায়।”
“চোরের মুখে চুরি?”
“এটা তো সাধারণ বিষয়, খোদার দুনিয়ায় তো শয়তানও তার নাম নেয়। নাম কেন নেয়, তা দেখার বিষয় না। নাম যে নেয় এটাই বড় বিষয়। যাই বাবা আমার অনেক কাজ। আমি কি মানুষের পুটকিতে আঙুল দেওয়ার জন্য ওই বালের সস্তা সময় জাঙ্গিয়ার তলানিতে রেখে ঘুরে বেড়াই।”
“নাউজুবিল্লাহ! তোমার মিয়া জবানের ঠিক নাই। বড় লোক মানো না।”
“ওমা কি বলেন? আপনি বড়? চুলগুলো তো এখনো কাঁচা। আমি আরো ভাবলাম সেইম এইজ আমরা। তো কবল কি সপ্তাহে লাগান নাকি মাসে? এত মারহাবা পোড়া রুটির মতো সুন্দর আপনার চেহেরা, আমি সত্যি বুঝতে পারিনি আপনি যে আমার বড় হবে। এখনো কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। ইশ সবজায়গার চুলই তো কাঁচা। বিশ্বাস কেমনে করব? সব জায়গায় কলব লাগিয়েছেন।”
পাশ থেকে সামির বলল, “বিশেষ জায়গায় হুজুরে বোধহয় কলব লাগায় নাই ভাই। এতই যদি সন্দেহ তাহলে হজুররে কন না, পায়জামা খুলে প্রমাণ সহ দেখাইতে।”
হুজুর লজ্জায় পরে গেল। এখান থেকে কেটে পড়াই ভালো। আল্লাহ ভালো জানে, তার এই বান্দা আব্রাজাকে তিনি কোন মাটি দিয়ে বানিয়েছেন! লোকটা যেতেই আব্রাজ সামিরকে ফিসফিস করে বলল, “নৈশির বাসার সামনে আজকে রাতে সাউন্ড বক্স আর ডিজে দিয়ে যাব। আর কিছু চকলেট বোমও কিনে নিয়ে আসবি। বিয়ে মানুষ তো বালের সেই রকম নরম হয়। তাই চাইলেই আমরা ওদের পেছনে মিসাইল, কিংবা অন্য বোম মারতে পারিনা। যেহেতু মেয়ে মানুষ চকলেটের মতো। তাই ওদের পেছনে চকলেট বোম মারব। বুঝতেই তো পারছিস সামির, আমি মেয়ে মানুষকে কতখানি ভালোবাসি, যেই মেয়েকে দেখি তাকেই ভালোবাসা দেই। এমন নেতা যুগের পর যুগ চলে যাবে তারপরও কেউ যাবে না দেখিস।”
“হ ভাই এত ভালোবাসেন দেখেই তো আপনি এখনো সিঙ্গেল।”
আব্রাজ তার দিকে তাকালো। তাতেই সামির চুপসে গেল। হঠাৎ গেটের কাছে যেতেই সতন্ত্র পার্থী জলিল উদ্দীনের সাথে দেখা হয়ে গেল। আব্রাজ মনে মনে সুধিয়ে উঠল, “এইযে আরেক ম্যাংগোর নাতি হাজির। এইটারে তো দেখলেই হেরোনচি লাগে। আর এই বুইড়ার তো ডেইট এক্সেল হয়ে গেছে। এক পা তো কবরে চলে গেছে, এই বয়সে কই একটু ইবাদত করবে। কিন্তু তা না, কেমনে আরেকজনের পাছায় আঙুল দিয়ে গুঁতানো যায় সেই ধান্দা। মানুষ যেমন কৎবেলের ফুটোয় লবণ, মরিচ ঢুকিয়ে কাঠি দিয়ে গুঁতায় এই কিছু রাজনীতিবিধরাও সেইম। আরেকজনকে গুঁতানো তাদের কাছে ফরজ কাছের সমান। যতক্ষণ না গুঁতাবে ততক্ষণ শান্তি পাবে না। হালাপোগুলোর পেছনে যদি টমেটোর সস লাগিয়ে, পেছনে শিক ঢুকিয়ে কাবাব বানানো যেত তাহলে কলিজা শান্তি হতো বাল।”
গেটের সামনে দাঁড়াতেই জলিল উদ্দীন চোখ কুঁচকে তাকাল, “এই যে আব্রাজ সাহেব! বড়ই ব্যস্ত দেখতেছি আজকাল!”
আব্রাজ হালকা হাসল, “ব্যস্ত তো হতেই হয়। মানুষজন ডাকে, সময় দিতে হয়। আপনার মতো বসে বসে শুধু কথা বললে তো চলবে না।”
জলিল ঠোঁট উল্টে বলল, “কথা বলারও একটা দাম আছে। অভিজ্ঞতা লাগে। আপনার তো এখনও সেই জায়গায় পৌঁছানো বাকি।”
“হ, ঠিকই। কিন্তু মানুষ এখন অভিজ্ঞতার চেয়ে কাজ দেখে। পুরান গল্পে আর ভোট পড়ে না,” আব্রাজ গলায় কাঁটা মিশিয়ে বলল।
জলিল একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “রাজনীতি এত সহজ না, আব্রাজ সাহেব। এখানে টিকে থাকতে গেলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।”
আব্রাজ চোখ সরু করে তাকাল, “সহ্য করতে জানি। এ-ই যেমন বুড়া হিরোনচি আইমিন বাঁশের কনচিকে সহ্য করছি। আর শুনে রাখেন, সময় আসলে সহ্য করাতে আরও ভালো জানি আমি।”
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সামিরের দিকে আব্রাজ একবার তাকিয়ে চোখের ইশারা করল। জলিল আবার শুরু করল, “দেখেন, শেষমেশ কিন্তু মাঠে কে থাকে, সেইটাই আসল কথা।”
“থাকবই তো,” আব্রাজ হেসে বলল, “তবে কেউ কেউ থাকলেও দাঁড়ায় থাকতে পারে না। এইটা সমস্যা।”
ঠিক তখনই জলিল হঠাৎ একটু থেমে গেল। মুখের ভাব পাল্টে গেল। “এইটা… এইটা আবার কি!” সে একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। তারপর আবার থামল। “আরে… কেমন যেন লাগতেছে…”
আব্রাজ ভান করে জিজ্ঞেস করল, “কি হইছে? শরীর খারাপ নাকি?”
জলিল অস্বস্তিতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, “না মানে… একটু… চুলকানি ধরছে মনে হয়…” কথা বলতে বলতে সে অস্থির হয়ে উঠল। একবার পা বদলায়, একবার কোমর নড়ায়। কিন্তু কিছুতেই আরাম পাচ্ছে না। পাশের দু-একজন লোক ইতিমধ্যে খেয়াল করে ফেলেছে। চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়ছে। আব্রাজ ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকিয়ে বলল, “এই বয়সে এসব সমস্যা হতেই পারে। একটু সাবধানে থাকা দরকার ছিল কিন্তু… আচ্ছা দেখি কই চুলকাচ্ছে? পাছায় নাকি? ওমা আপনার কর্মি আছে নাকি? ওমা ছিঃ ছিঃ তাই তো বলি বুড়া বয়সে আপনি এত তিরিং-বিড়িং করেন কেন শয়তানের মতো।”
“মুখ সামলে আমি কিন্তু বয়সে তোমার অনেক বড়।”
“আমি না হয় মুখ সামলে নিতে পারব কিন্তু আপনি আপনার কর্মি কেমন করে সামলাবেন আর চুলকানি কেমনে বন্ধ করবেন? এই সামির, জলিল চাচার পাছাটা একটু চুলকে দিয়ে আয় তো। নেকি হবে। দেশের কল্যাণ চুলকানি রোধ থেকেই শুরু হোক।”
সামির ভ্রু কুঁচকে আব্রাজের দিকে তাকাতেই আব্রাজ হেসে চোখ মারল তাকে। সামির বুঝতে পারল আজকের মতো অনেক হয়েছে। এই ব্যাটা অবিবাহিতকে এবার ঘরে নিয়ে যেতে হবে। নইলে কেয়ামতের আলামত হয়ে দাঁড়াবে এই লোক। আব্রাজ জলিলকে উদ্দেশ্য করে বলল, “চলেন চা-বিড়ি খাই একসাথে।”
জলিল এবার পুরো অস্থির, “না না, আমি যাই… একটু দরকার আছে!” বলেই প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল। জলিল চোখের আড়াল হতেই সামির হেসে কুটিকুটি, “ওস্তাদ! একদম জম্পেশ কাজ হইছে!”
সামির হেসে বলল,
“বিলাই চিমটি কিন্তু মারাত্মক জিনিস!”
আব্রাজ মুচকি হেসে বলল,
“এইটা ট্রেলার… মেইন পিকচার এখনও বাকি!” সে ধীরেসুস্থে হাত পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “রাজনীতিতে মাঝে মাঝে কথা না, কাজই করতে হয়। এবার বল, পরশু নির্বাচন ভোট চুরির ব্যবস্থা হয়েছে?”
আরো পড়ুন
“আর বলতে ভাই? এইবারও সংসদে আপনিই ঢুকবেন। আর তারচেয়ে বড় কথা, আপনার মন্ত্রীত্ব আপনারই থাকবে।”
“থাকলেই হলো। তবে খালি দেশ সামলালেই হবে? আমিও তো চাই কেউ ঘরের মধ্যে আমায় সামলাক। কবে যে গ্রামের নানি জরিনা আমার হবেরে। কষ্টে আমার কইলজা পুড়ে বাল।”
চলবে?