
পূর্ণহীন পূর্ণতা
লেখিকা সুমি চৌধুরী
পর্ব ৫
সারা চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মেঝেতে দামী ফুলদানির কাঁচের টুকরোগুলো চুরমার হয়ে পড়ে আছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে চায়ের কাপটা রায়ান চৌধুরীর সামনে রাখতে রাখতে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“আব্বু, এসব কী করে হলো। রাফসান ভাইয়াকে তুমি কিছু বলেছো নাকি।”
রায়ান চৌধুরী চায়ের কাপে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে নিরাসক্ত গলায় বললেন।”তেমন কিছু না মা। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা গরম করেছিল। ওইসব নিয়ে তোর ভাবতে হবে না।”
সারা আর কথা বলার সাহস পেল না। সে ভালো করেই জানে রাফসান যেমন জেদি, রায়ান চৌধুরীও তেমনি রাগী। রায়ান চৌধুরী সারাকে যতোই নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসুক না কেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি পাহাড়ের মতো কঠোর। ভুল করলে নিজের ছেলেকে যেমন ছাড়েন না, সারাকেও যে ছাড়বেন না সেটা সে জানে।
বিকাল বেলা। আসরের নামাজ শেষ করে সারা ছাদে চলে এলো। ছাদের এক কোণে ছোট একটা বাগান করেছে সে। এই ফুল গাছগুলোই সারার একমাত্র সঙ্গী। প্রতিদিন বিকেলে সে নিয়ম করে গাছে পানি দেয়। আজকেও পানির মগ নিয়ে সে গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছিল।
হঠাৎ ছাদের দরজা দিয়ে বাঘের মতো প্রবেশ করল রাফসান। সারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাফসান ঝড়ের বেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল। মুহূর্তের মধ্যে রাফসান সারা গালটা বাঘের মতো থাবা দিয়ে চেপে ধরল। ব্যথায় সারার মুখটা কুঁকড়ে গেল। রাফসান দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল।
“হাউ ডেয়ার ইউ। তোর সাহস কী করে হয় আমার নামে আব্বুর কাছে নালিশ করার। এখন আবার বাবাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে আমাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করার ধান্দাও করছিস তুই। সস্তা জংলি মেয়ে হয়ে তুই মাটিতে দাঁড়িয়ে চাঁদে হাত দিতে চাস। তাই না।”
রাফসানের আঙুলের চাপে সারার চোখে পানি চলে এল। সারা অস্ফুট স্বরে বলল।”কি কি বলছেন এসব ভাইয়া আমি আপনার নামে কেন নালিশ করবো। আর কিসের বিয়ে?।”
রাফসান সারার গালটা আরও জোরে চেপে ধরল। সারার ফর্সা গালে রাফসানের আঙুলের ছাপ বসে লাল হয়ে গেছে। রাফসান ক্রূর হেসে বলল।”এখন খুব ইনোসেন্ট সাজার নাটক করছিস, তাই না। শোন, তোর এই ন্যাকামো আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। এখন যদি নিজের ভালো চাস, তবে সোজা আব্বুর কাছে যাবি। গিয়ে বলবি, আমি রাফসান ভাইকে বিয়ে করব না। যদি আমার কথা না শুনিস, তবে মনে রাখিস আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”
বলেই রাফসান সারাকে সজোরে একটা ধাক্কা মারল। সারা সামলাতে না পেরে টাল খেয়ে টবগুলোর ওপর গিয়ে পড়ল। রাফসান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ছাদ থেকে নিচে নেমে চলে গেল।
সারা নিজের গালটা হাত দিয়ে চেপে ধরে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। কিছুক্ষণের জন্য ওর মনে হয়েছিল ওর দম আটকে যাবে। মনে হচ্ছে এই বুঝি মৃত্যুর মুখ থেকে কোনোমতে বেঁচে ফিরল।
সারা কিছুই বুঝতে পারল না। কিসের বিয়ে? রাফসান এসব কী আবোল-তাবোল বলে গেল। সারা ব্যথায় নিজের লাল হয়ে থাকা গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বিরবির করে বলল।
“এই হিটলার কি আদেও মানুষ নাকি কোনো জানোয়ার। আমার গালটারে একদম টিপে চেপ্টা করে দিল। এই হিটলাররে যদি শিক্ষা দেওয়ার মতো একটু সুযোগ আমি পাইতাম, তাহলে এই হিটলারকে আগে আমি কলা গাছের সাথে উল্টো করে ঝুলাইয়া রাখতাম। থুক্কু। কলা গাছের সাথে দিলেও তো এই নব্বই কেজির আলুর বস্তা হিটলারকে ধরে রাখতে পারবে না। একে বাঁধতে হবে ইলেকট্রিক খুঁটির সাথে।”
রাফসান ড্রয়িং রুমে এসে তার বাবার সামনের সোফায় ধপ করে বসল। সে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে সরাসরি রায়ান চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।”আব্বু, আমি সারাকে বিয়ে করব। তবে শর্ত একটাই সারাকেও এই বিয়েতে রাজি থাকতে হবে। কারণ একটা সম্পর্কের তো দুই পক্ষের মত থাকতে হয়। এইটা তুমি জানোই, আমার মনে হয় না এটা আর ক্লিয়ার করে বলার প্রয়োজন আছে।”
রায়ান চৌধুরীর মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটল। তিনি ছেলের মনের গূঢ় রহস্য বুঝতে না পেরে বললেন।”ঠিক আছে যা, সারা না চাইলে এই বিয়ে আমি দেব না।”
রাফসানের ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত আর বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কারণ সে মনে মনে নিশ্চিত যে সারা এক্ষুনি এসে সরাসরি ‘না’ করে দেবে। কারণ কিছুক্ষণ আগেই তো সে ছাদে গিয়ে সারার গাল টিপে ধরে কলিজা কাঁপানো হুমকি দিয়ে এসেছে। রায়ান চৌধুরী কাজের মহিলাকে দিয়ে সারাকে ডেকে পাঠালেন। কিছুক্ষণ পর কাজের মহিলাটি সারাকে সাথে নিয়ে নিচে নামলেন। সারা ড্রয়িং রুমে এসে রায়ান চৌধুরীর সামনে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। সে বেশ অবাক মনে নিচু স্বরে বলল।
“আসসালামু আলাইকুম আব্বু। ডেকেছো আমাকে।”
রায়ান চৌধুরী স্নেহের সাথে বললেন।”ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ মা, তোর সাথে খুব জরুরি কিছু কথা ছিল।”
সারা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল।”হ্যাঁ বলো আব্বু, কী কথা।”
রায়ান চৌধুরী এবার বেশ গম্ভীর গলায় বললেন।
চলবে…!
অনেক রাতে এসে চুরি করে গল্প পোস্ট করলাম। হয়তো এখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকালে পইড়েন সবাই। ছোট হলো কিন্তু আমিও আছি বিপদে তাই তো রাত ১:১৪ এ গল্প পোস্ট করলাম।