
”ডিভোর্সের এক মাস পার আমি জানতে পারলাম আমি মা হতে চলেছি, তার মানে আমার ডিভোর্সটা কার্যকরী হবে না৷ কিন্তু আমি আর ঐ নরকে ফিরে যেতে চাই না, একটি সুন্দর জীবন গড়তে চাই আমার সন্তানের জন্য। এ অবস্থায় আমার করণীয় কি?”
বিশিষ্ট আইনজীবী আহসান চৌধুরীর সামনে এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলল প্রিয়া ইসলাম৷ আহসান চৌধুরী প্রিয়ার সব কথা মনযোগ দিয়ে শুনল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি সরাসরি প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
”ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইন অনুসারে এখন আপনার এই ডিভোর্স আর কার্যকরী নয়, যদি আপনি ডিভোর্স নিতে চান তাহলে সন্তান জন্মদানের পর আবার ডিভোর্স কেস ফাইল করতে পারেন।”
আরো পড়ুন
প্রিয়া শিউরে উঠল। মনে পড়ে গেলো বিগত এক বছরের বিতৃষ্ণাময় জীবন। হাজারো নির্যাতন, আহাজারি এবং গগণ ফাটানো চিৎকার গুলো আজো তার কানে ভাসে। অতীতের দোলাচল থেকে বেরিয়ে এসে প্রিয়া দৃঢ় চিত্তে বলল,
”যেকোন মূল্যেই আমি এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চাই৷ তার জন্য যা করা লাগে, যতদূর যাওয়া লাগে আমি যাব। আপনি দয়া করে কোন উপায় বলে দিন।”
”এখন আর কোন উপায় নেই। আইন অনুযায়ী এখন কোন অবস্থাতেই ডিভোর্সটা আর কার্যকরী নয়।”
প্রিয়ার চোখে অশ্রু টইটুম্বুর। এত প্রচেষ্টার পর ঐ নরককুণ্ড থেকে মুক্তি পেল সে। আবার কি সেই নরকেই তাকে ফিরতে হবে। প্রিয়া কিছু সময় নিজের ভাবনাতেই মত্ত রইল। আহসান চৌধুরী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
”আপনার যদি আর কোন কিছু জানার না থাকেন তাহলে আসতে পারেন, আমার আরো ক্লায়েন্টের সাথে এপোয়েনমেন্ট রয়েছে।”
প্রিয়া উঠে দাঁড়ালো,তাকে এখন বাড়িতে ফিরতে হবে। বাড়ি বলতে তার নিজস্ব ফ্লাট। ডিভোর্সের পর শুধু শ্বশুর বাড়ি না বাবার বাড়িতে থাকার অধিকারও হারিয়েছে প্রিয়া। কারণ তার স্বামী ছিল তারই আপন চাচাতো ভাই। শুধু তাই নয়, তার বাবা পুরোপুরি তার চাচার উপর নির্ভরশীল। তাই তো প্রিয়াকে এত দিন যাবত মুখ বুজে সব সইতে হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যগুণে উচ্চতর ডিগ্রি পড়াশোনা টুকু শেষ করেছিল সে। আজ তাই একটা ভালো কোম্পানিতে জব করতে পারছে। কিন্তু এখানেও তো সমস্যা। আর কয়েক মাস পর তাকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে হবে বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য। তারপর কি করবে? এত ভালো কর্পোরেট জবটা ছেড়ে দিয়ে নতুন জব পাওয়া কঠিন। প্রিয়ার মাথা আর কাজ করছে না। মাঝে মাঝে তার মন বলছে এই বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে না আনাই শ্রেয় কিন্তু তার মাতৃ হৃদয় যে তা মানতে চাইছে না।
★★
ফ্লাটে ফিরেই এসে চালিয়ে বসে পড়লো প্রিয়া। কাল অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল জমা দিতে হবে। তাই সব চিন্তা ঠেলে ফেলে ফাইল নিয়ে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ কাজ করার পরই হঠাৎ তার গা গুলিয়ে উঠল। দ্রুত সে উঠে গিয়ে বেসিনের কাছে গিয়ে বমি উগলে দিলো। যা খেয়েছিল সবই যেন বেরিয়ে এলো।
প্রিয়ার শরীরটাও অনেক দূর্বল লাগছে। দূর্বল শরীর নিয়ে সে আর কাজ করার এনার্জি পেল না। বিছানায় শুয়ে পড়ল গা এলিয়ে। অত:পর নিয়ে ফেললো জীবনের চরম কঠিন একটি সিদ্ধান্ত।
আরো পড়ুন
রায়হান ইসলাম, ঢাকার এক শীর্ষস্থানীয় বিজনেসম্যান। অল্প বয়সেই বিজনেসে এসে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। বাপ দাদার সামান্য ব্যবসাকে পেশাদারিত্বের সাথে সামলে আজ এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে সে।
আজ দ্রুত অফিস থেকে বাসায় ফিরলো সে৷ বাসায় এসেই দেখতে পেল ড্রয়িংরুমে তার মা ও খালা বসে গল্প করছে৷ রায়হানকে দেখেই তার মা রোকসানা বেগম বলে উঠলেন,
”কি রে বাবু! এতক্ষণে তোর ফেরার সময় হলো? কই ছিলি এত সময় ধরে। আমি তোর জন্য সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি, দেখ তোর খালাও এসেছে।”
রায়হানের খালা রোকেয়া বেগম রায়হানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
”কেমন আছ রায়হান?”
”জি, আছি।”
বলেই সে চলে যেতে নিচ্ছিল। কথা বলার আগ্রহ তার নেই৷ কিন্তু রোকসানা বেগম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
”এত তাড়া কিসের? খালা এতদিন পর এসেছে একটু গল্প কর বসে।”
”আমি অনেক টায়ার্ড আম্মু।”
”বিশ্রাম নেয়ার আরো অনেক সময় পাবি। আগে তোর খালা কি বলছে শুনে যা। অনেক ভালো প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তোর খালা।”
”কি প্রস্তাব?”
”তোর বিয়ের প্রস্তাব।”
”বিয়ের প্রস্তাব?!”
”হ্যাঁ, রোকেয়ার ছোট মেয়ে রুপার সাথে তোর বিয়ের প্রস্তাব। আমি ভেবে দেখলাম, প্রস্তাব মন্দ নয়।”
”রূপা রাজি এই বিয়েতে?”
রোকেয়া বেগম বললেন,
”রাজি মানে..ও তো এক পায়ে খাড়া।”
রায়হান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
”রূপা কেবল এসএসসি দিল, মাত্র ১৬ বছর বয়স আমার এখন ২৯ বছর চলছে! এজ গ্যাপটা কিন্তু অনেক। আর তাছাড়া আমার… “
রোকসানা বেগম অপ্রসন্ন সুরে বললেন,
”থাক, আর কথা বাড়িয়ো না।”
এবার সে রেগে বলল,
”বাট ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট আম্মু। আমার ডিভোর্সের এখনো এক মাসই হয়নি আর তার মাঝেই তুমি আমার বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছ।”
”তো কি করব? তোর বাবার মতো হাত গুটিয়ে বসে থাকব?”
রায়হান কিছু না বলে গটগট পায়ে উপরে চলে গেলো৷ রোকেয়া বেগম বললেন,
”কি ব্যাপার আপা? রায়হান বিয়ের কথা শুনে এত রেগে গেল কেন? ও কি তাহলে বিয়ে করবে না আর।”
”ছাড় তো ওর কথা। ওকে বিয়ে করতেই হবে। কত সাধনার পর আমি ঐ আপদটাকে বিদায় করেছি৷ আর আমি ওকে ফিরতে দেব না আমার ছেলের জীবনে।”
”ও হ্যাঁ, ভালো কথা। শুনলাম ঐ প্রিয়া নাকি এখন একটা বড় কোম্পানিতে জব নিয়েছে।”
”তুই কিভাবে শুনলি?”
”আমার বড় মেয়ের দেবর তো ঐ কোম্পানিতেই জব করে। রায়হানের বিয়েতে এসেছিল ও। দেখেই চিনতে পেরেছে। বলল, বেশ মোটা বেতনের চাকরি।”
”ভালোই হয়েছে, তাহলে আর এমুখো হবে না। এই সুযোগে তোর মেয়ের সাথে যদি আমার ছেলেটার বিয়ে দিতে পারি তাহলেই শান্তি। আমি চাই না, ঐ উশৃংখল মেয়ে আর আমার ছেলের জীবনে ফিরুক। বিয়ের পর থেকে তো আমাদের সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছিল। আমার ছেলের এত বড় বিজনেস থাকার পরেও কিনা ও বলে, চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, নিজের ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াবে। আরে সবকিছুই তো পাচ্ছিস তাহলে এত স্বাধীনতার দরকার কি? হঠাৎ করে বেশি পেয়ে গেলে যা হয় আরকি। “
”সেই আপা সেই।”
★★
রায়হান নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে আলমারি খুলল। এখানেই সেই ডিভোর্সের ফাইল গুলো রাখা৷ রায়হান ফাইলগুলোর দিকে তাকালো। এর কোনটাই রিয়াল ডকুমেন্টস না। সব বানানো কাগজ। প্রিয়া ভালো করে না পড়েই সেদিন সাইন করে বেরিয়ে গেছিল। রায়হান ফাইলগুলো ভালো ভাবে চেক করে বলে,
”স্বাধীনতা চেয়েছিলে না তুমি? নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছিলে, চাকরি করতে চেয়েছিলে। যাও দিলাম তোমায় স্বাধীনতা। কিন্তু মনে রেখো, তোমার ঘুড়ির লাটাই এখনো আমার হাতে। তোমাকে আমার কাছে ফিরতেই হবে। একদিন না একদিন তুমি বুঝবেই নারীরা শুধু পুরুষের ছায়াতেই সুরক্ষিত সেদিন তোমায় ফিরতে হবেই।”
চলবে ইনশাআল্লাহ….✨
আবার আসিব ফিরে
সূচনা_পর্ব
লেখিকাঃদিশা_মনি
আবার আসিব ফিরে পর্ব-১