
পূর্ণহীন পূর্ণতা
লেখিকা সুমি চৌধুরী
পর্ব ৮
রাস্তার মাঝখানে রাফসান এসে হুট করে বাইক থামাল। আচমকা এমন ঝটকায় বাইক থামানোতে সারা নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। সে পড়ে যাওয়ার ভয়ে দুহাতে রাফসানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রাফসান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাইক থেকে নামতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সারার ওই নরম স্পর্শে রাফসান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। না চাইতেও অদ্ভুতভাবে সেদিন রাতের মতো ওর হার্টবিট ধুকপুক করতে লাগল। তবুও কোনো রকম নিজেকে সামলিয়ে রাফসান সারাকে রুক্ষ স্বরে বলল।
“নাম বাইক থেকে।”
সারার হুঁশ ফিরল। সে তাড়াতাড়ি রাফসানকে ছেড়ে দিয়ে আমতা আমতা করে বলল।
“কে কেন?”
“নামতে বলছি নাম।”
সারা ভয়ে আর অপমানে ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে পড়ল। সারা নামার সাথে সাথে রাফসান বাইক স্টার্ট দিয়ে গর্জে উঠে বলল।
“বাকিটুক হেঁটে আয়। তোর মতো আনকালচার্ড মেয়েকে নিয়ে আমি কলেজে ঢুকব? ইম্পসিবল!”
বলেই রাফসান বাইক নিয়ে ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল। সারা একা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাগে দুই হাত কোমরে দিল। রাফসানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“শালা ইঁদুর একটা! সবসময় চিক চিক করতেই থাকে। আমাকে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিলি? দেখিস তোর মাথার চুল সব ঝরে একদম পড়ে টাক হয়ে যাবে।”
সারা গাল ফুলিয়ে হাঁটা শুরু করল। রোদের মধ্যে স্কুল ড্রেস পরে একা হেঁটে যাওয়া যে কতটা কষ্টের সেটা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। রাগের চোটে সে মনে মনে রাফসানকে আরও শ’খানেক গালি দিয়ে ফেলল।
সারা স্কুলে আসতেই দেখল তার তিন বান্ধবী ইতি, মীম আর লিমা তিনজনে একটা ছেলের সাথে বেশ হেসে হেসে কথা বলছে। সারা কিছুটা অবাক হলো। কারণ ওদের গ্রুপের মেয়েরা সচরাচর কোনো ছেলের সাথে এভাবে মেলামেশা করে না। হঠাৎ মীমের নজর গেল সারার দিকে। সে সারাকে দেখেই দৌড়ে এসে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ছেলেটার সামনে। ছেলেটির উদ্দেশ্যে মীম বলল।
“আকাশ ভাইয়া, ও আমার ফ্রেন্ড সারা।”
বলেই আবার সারার দিকে তাকিয়ে বলল।
“সারা, ও আকাশ আমার চাচাতো ভাই। এই কলেজেই এবার ভর্তি হয়েছে।”
আকাশ হাসিমুখে সারার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
“হাই।”
সারা কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। সে নিজের হাত এগিয়ে দিল না। তা দেখে আকাশ হালকা হেসে বলল।
“তুমি মনে হয় আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছো।এনিওয়ে আই এম নট দ্যাট কাইন্ড অফ গায়।”
সারা এবার না চাইতেও ধীরে ধীরে হাতটা বাড়িয়ে দিল আকাশের হাতে। অল্প সময়ের মধ্যেই সবার সাথে আকাশের একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। আকাশ সবার কাছে জাস্ট ফ্রেন্ড আর বড় ভাইয়ের মতো হয়ে উঠল।কিছুক্ষণ পর আকাশ তার নিজের কলেজের দিকে চলে গেল। সারা আর ওর বান্ধবীরাও আড্ডা শেষ করে যার যার ক্লাসে চলে আসলো।
স্কুল টিফিনের সময় সারা, ইতি, মীম আর লিমা ক্লাস থেকে গল্প করতে করতে বের হলো। বের হতেই আকাশ সবার সামনে এসে হাসিমুখে বলল।
“তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। চলো, আমাদের ক্যান্টিনে যাই?”
লিমা একটু মশকরা করে বলল।
“কেন ভাই, ট্রিট দিবেন নাকি?”
আকাশ উত্তরে বলল। “ক্যান্টিনে মানুষ কিসের জন্য যায়। খাওয়ার জন্যই তো যায়। তাহলে যেহেতু নিয়ে যাচ্ছি তাহলে অবশ্যই খাওয়াবো।”
ইতি একটু লজ্জা পেয়ে বলল। “আরে না ভাই, ও এমনি মজা করছে।”
আকাশ নাছোড়বান্দা হয়ে বলল। “উহু!এখন আমি ওসব শুনব না। যেতে হবে মানে যেতেই হবে।”
অবশেষে সবাই রাজি হলো। সারা যেতে রাজি না হলেও তার তিন ভন্ড বন্ধু তাকে ছাড়ল না। অবশেষে আকাশ সবাইকে নিয়ে ক্যান্টিনে আসল। সবাই চেয়ারে বসতেই হঠাৎ সারার ঠিক পাশের চেয়ারটায় আকাশ বসে পড়ে। সারা সেদিকে কোনো খেয়াল করল না, সে তার মতো চুপচাপ বসে রইল। সবাই যার যার পছন্দ মতো অর্ডার করল, সারাও হালকা-পাতলা কিছু একটা অর্ডার করল।
ঠিক সেই সময় রাফসান, রোহান আর মাশরাফি—তিনজনে কোক খেতে খেতে ক্যান্টিনে ঢুকল। ঢুকতেই রোহানের চোখ পড়ল সারার দিকে। সারার পাশে একটা অচেনা ছেলেকে দেখে সে বেশ অবাক হলো। কারণ তার জানামতে সারা কখনো কোনো ছেলের সাথে এভাবে বসে কথা বলে না। তাহলে এই ছেলেটা কে যে সারার একদম গা ঘেঁষে বসে আছে।
রাফসান তখনো সারাকে খেয়াল করেনি। সে পা দিয়ে একটা চেয়ার ফাঁক করে আয়েশ করে বসে পড়ল। রোহান রাফসানের কাঁধে হাত দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“রাফসান, সারা।”
রাফসান বিরক্ত হয়ে বলল। “তো কী হয়েছে?”
রোহান এবার ইশারায় দেখিয়ে বলল। “আরে ওইদিকে তাকা।”
রাফসান রোহানের কথায় ঘাড় বাঁকিয়ে ওই টেবিলের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই রাফসানের চোখ যেন কপালে ওঠার উপক্রম।সারা একটা ছেলের সাথে বসে আছে। ছেলেটা হাসতে হাসতে কী যেন বলছে আর সবাই তাতে তাল মেলাচ্ছে। সারাও সব ভুলে গিয়ে খিলখিল করে হাসছে। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথেই রাফসানের অজান্তেই শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। বিষম রাগে ওর কপাল আর ঘাড়ের রগগুলো ফুলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল।
“কুল ডাউন রাফসান! ওই মেয়ে যা ইচ্ছে করুক তাতে তোর কী। তুই একদম রাগবি না। এখানে জাস্ট চুপচাপ বসে থাক। ওইখানে কিছুই হয়নি।”
বলেই রাফসান শান্ত হয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু ওর অবাধ্য চোখ দুটো চুম্বকের মতো বারবার ওই সারার দিকেই চলে যাচ্ছে। যতো দেখছে ততোই রাগে ওর সারা শরীর রি রি করে উঠছে। ঠিক তখনই আকাশ হাসতে হাসতে যেন একদম সারার গায়ের ওপর ঢলে পড়ল। এই দৃশ্য দেখা মাত্রই রাফসানের ধৈর্যের বাঁধ চুরমার হয়ে গেল। সে মুহূর্তের মধ্যে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল এবং নিজের সামনের টেবিলটায় সজোরে এক লাথি মারল। টেবিলের ওপর থাকা গ্লাসগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। রাফসান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হনহন করে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল। রোহান আর মাশরাফি একে অপরের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দ্রুত ওর পিছু নিল। সারা নিজের আড্ডায় এতটাই মশগুল ছিল যে সে তখনো রাফসানকে খেয়াল করেনি। এদিকে আকাশ এত ফানি আর আজগুবি সব কথা বলছিল যে সবাই হাসতে বাধ্য হচ্ছিল।
রাফসান বড় বড় পা ফেলে সোজা নিজের বাইকের কাছে এসে থামল। ওর ভেতরের রাগটা তখন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছে। পকেট থেকে কাঁপাকাঁপা হাতে সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে ধরাল সে। একের পর এক গভীর টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে আর ওর চোখের কোণগুলো রাগে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠছে। মাশরাফি আর রোহান হন্তদন্ত হয়ে ওর পিছু পিছু এসে পাশে দাঁড়াল। মাশরাফি রাফসানের কাঁধে একটা জোরালো চাপড় দিয়ে টিটকারির সুরে বলল।
“কিরে শালা। তুই হুট করে ওমন পাগলামি করলি কেন সারাকে দেখে। তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুই চরম জেলাসি!”
রাফসান সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা সজোরে মাশরাফির মুখের ওপর ছেড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“আই এম নট জেলাসি!”
রোহান এবার একটু বাঁকা হেসে খোঁচা দিয়ে বলল।
“নট জেলাসি। তাহলে ডাইনিং টেবিলটা কি তোর সাথে বেয়াদবি করেছিল যে ওভাবে লাথি মারলি। আর এখন তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কাউকে কাঁচা চিবিয়ে খাবি। স্বীকার কর না যে সারার পাশে অন্য কোনো ছেলেকে ওভাবে ঢলে পড়তে দেখে তোর পিত্তি জ্বলে গেছে।”
রাফসান রাগী চোখে রোহানের দিকে তাকাল। রোহানের বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল। রাফসানের এই চাহনি মানেই মৃত্যুবাণ, সে আর কথা বলার সাহস পেল না। রাফসান চুপচাপ একের পর এক সিগারেট টানতে লাগল। একটা শেষ হতেই আরেকটা ধরাল। এইভাবে গুনে গুনে ৫ টা সিগারেট শেষ করে ফেলল সে। তার পায়ের কাছে সিগারেটের ফিল্টারগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
স্কুল ছুটির পর সারা, ইতি, মীম, লিমা আর আকাশ স্কুল গেট দিয়ে বের হলো। ইতি আর লিমা বিদায় নিয়ে চলে গেল। সারা, মীম আর আকাশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগল। গল্পের মাঝে আকাশ কিছুটা ইতস্তত করে সারার দিকে তাকিয়ে বলল।
“ইয়ে, আসলে সারা তোমার কি ফোন আছে যদি থাকে ফোন নাম্বারটা কি দেওয়া যাবে। যদি দিতে আরকি, তবে একটু আধটু গল্প করা যেত।”
সারা আলতো করে না সূচক মাথা নাড়াল। আকাশ আর দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল না। তারা তিনজনে মিলে আবারও গল্পে মেতে উঠল। গল্পের মাঝেই হঠাৎ তাদের একদম গা ঘেঁষে বাইকের বিকট গর্জন শোনা গেল। সেই শব্দে সবাই চমকে ওঠে তাকাল। সারাও তাকাল এবং দেখল রাফসান বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরে আছে আর রাগে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। রাফসানের চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে সরাসরি সারার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল।
“সারা, বাইকে ওঠ।”
সারার তখনই সকালে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার অপমানটার কথা মনে পড়ে গেল। তার মনে জেদ চেপে বসল। সে শক্ত গলায় বলল।
“আমি যেতে পারব, আপনি যান।”
রাফসান আর একটি কথাও বাড়াল না। সে এক ঝটকায় বাইক ঘুরিয়ে চোখের পলকে সেখান থেকে চলে গেল। আকাশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“সারা, প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলে তোমার কী হয়?”
মীম চট করে বলে উঠল। “আরে, সারার ভাই!”
আকাশ অবাক হয়ে বলল। “ওহ আচ্ছা। তার মানে সারা, তুমি আমাদের স্যারের মেয়ে?”
সারা কোনো উপায় না দেখে মিথ্যাতেই হ্যাঁ সূচক মাথা দুলাল। আকাশ এবার সুযোগ বুঝে বলল।
“সারা, তুমি কিছু মনে না করলে আমি কি তোমাকে নামিয়ে দিতে পারি?”
সারা তড়িঘড়ি করে বলল। “না না ভাইয়া, আমি যেতে পারব। আমার সমস্যা নেই।”
মীম এবার ফোঁড়ন কাটল। “যেতে পারিস আর যাই পারিস, ভাইয়া যখন দিয়ে আসবে বলছে তখন ভাইয়ার সাথেই যা।”
সারা তবুও আপত্তি জানাল। “না না, আমি যেতে পারব।”
আকাশ নাছোড়বান্দার মতো বলল। “একা যেতে হবে না তোমাকে। তুমি এখানে দাড়াও, আমার বাইক আমি নিয়ে আসছি।”
বলেই আকাশ দৌড়ে গিয়ে বাইক নিয়ে এসে সরাসরি সারার সামনে দাঁড় করাল। সারা বারবার না করছিল, কিন্তু মীম এক প্রকার জোর করেই সারাকে টেনে হিঁচড়ে আকাশের বাইকে তুলে দিল। আকাশ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিয়ে দিল। বাইকটা যখন চলতে শুরু করল, সারা নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে আকাশের একটা কাঁধ আলতো করে ধরল।
চলবে…!
পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-৯