
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজও_রুশা
পাঠ_২৯
★★★★_
রাতটা যেন আজ অন্যরকম। ভার্সিটির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঠটা আলোয় ভেসে যাচ্ছে—রঙিন লাইট, স্টেজের ঝলকানি, আর চারপাশে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। একটু আগেই শেষ হয়েছে বাইক রেস প্রতিযোগিতা। সবাই এখনো উত্তেজনায় টগবগ করছে।
নাভান—আজকের হিরো। ফাস্ট হয়ে যেন পুরো ক্যাম্পাসের হৃদয়টাই জিতে নিয়েছে সে। তার পেছনেই সেকেন্ড হয়েছে নিলয়, আর থার্ড সৃজন। অধীর এইবার রেস করেনি—কারণটা কেউ জানে না ঠিক, তবে তার চোখে আজ অন্যরকম এক শান্তি, যেন সে দূর থেকে সবকিছু দেখেই তৃপ্ত।
নাভানকে ঘিরে এখন একদল বন্ধু—হাসি, চিৎকার, উল্লাসে মেতে আছে সবাই।
“এই নাভান, গান ধর!” নিলয় তো গাইছে ডান্স করেছে,, আজ তোকে গাইতেই হবে!”
—–নিলয় বরাবরের মতোই এইসব জমজমাট মুহূর্তের প্রাণ। গানের গলা খুব একটা ভালো না হলেও, নাচে সে একদম আগুন। ইতিমধ্যে সে কয়েকজনকে টেনে নিয়ে ডান্স ফ্লোর বানিয়ে ফেলেছে স্টেজের সামনে। হেরাকে নিজের বডি ফিগার দেখানোর জন্য।
—চারদিকে দুই ভাগ হয়ে গেছে যেন—একদল “নাভান গ্রুপ”, আরেকদল “নিলয় গ্রুপ”। কে কাকে ছাপিয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতাও কম না।
আরো পড়ুন
–এইসব কোলাহলের মাঝেও হেরা দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। তার চোখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। নিলয়ের নাম শুনে সে যতটা না অখুশি, নাভানের কথা উঠলেই তার ভ্রু কুঁচকে যায় আরও বেশি। পাশে রোজও চুপচাপ, এমন হৈচৈ যেন তাদের ভালো লাগছে না একদমই।
—অন্যদিকে রুশা আর অধীর—তারা যেন এই ভিড়ের মাঝেও আলাদা এক জগতে। স্টেজের আলো, মানুষের শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে তাদের ছোট্ট একটা দুনিয়া তৈরি হয়েছে।
রুশা হালকা করে অধীরের হাতটা ধরে,
—“চলো, আমরা নিজেদের মতো থাকি…”
—অধীর মুচকি হেসে মাথা নাড়ে।
তারপর তারা ধীরে ধীরে মিউজিকের তালে নড়তে থাকে। কোনো নিয়ম নেই, কোনো স্টেপ নেই—শুধু অনুভূতি।
রুশার চুলে হালকা বাতাস লাগে, আর অধীরের চোখে পড়ে সেই মুখ—যে মুখটা সে হারাতে চায় না কখনো।
হেরা হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
“আমি আর থাকবো না এখানে…”রোজ হতাশা নিয়ে বলে!কেনো আরেকটু থাক দোস্ত,,
“নিলয় এর ডান্স শেষ আর কি দেখবো,,
” আরে দাড়া চকলেট হিরো গাইবে তো,,
“ইন্টারেস্ট নই।
” তাছাড়া নিলয় জমজমাট করেছে অনুষ্ঠান, সে আর করবে না অনেক গেয়েছে আর ডান্স ও করেছে,, ,তাই আর জমজমাট হবে না। এবার চল।
,,নাভান শুনে সেই কথা,, মুচকি হেসে আড়ালে যায়। রাগে নাকি ঠিক বুঝা গেলো না। সে ঘুরে দাঁড়াতেই স্টেজে একটা হালকা নিস্তব্ধতা নামে।
সবাই তাকায় সামনে।
নাভান গিটার হাতে স্টেজে উঠেছে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে সৃজন, আর একটু পেছনে অধীর —মুখে দুষ্টু হাসি, কিন্তু চোখে বন্ধুত্বের ঝিলিক।
মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে নাভান একবার চারপাশে তাকায়। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য হেরার দিকে গিয়ে থামে… তারপর ধীরে ধীরে সে গিটারটা টোকা দেয়।
একটা সুর ভেসে ওঠে—নরম, গভীর, একটু কষ্ট মেশানো।
তারপর নাভান গাইতে শুরু করে—
★★★
“যেও না চলে বন্ধু আমায় একা রেখে…”
চারপাশের সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে যায়।
নিলয়ও এবার চুপ, সৃজন মাথা নিচু করে সুরের সাথে মিলিয়ে যায় যেনো।হেরা থেমে যায়। তার পা আর এগোয় না। সে ধীরে ধীরে পিছনে তাকায়।
নাভানের কণ্ঠে আজ অন্য কিছু আছে—শুধু গান না, যেন লুকিয়ে আছে না বলা অনেক কথা, অনেক অনুভূতি। গিটার ওলার হিরো গিটারে হাতদিতে চারিদিক কেমন জমজমে হয়ে গেছে আগের থেকে দুই গুন।
★★★
“” “যেও না চলে বন্ধু আমায় একা রেখে,,,,
“” “যেও না চলে বন্ধু আমায় একা রেখে,,,
“খানিক বাদে রঙ লাগিবে আসমানের অই বাকে,
“খানিক বাদে রঙ লাগিবে আসমানের অই বাকে।
রুশা নাচ থামিয়ে অধীরের দিকে তাকায়।
অধীর হাত নেড়ে রুশাকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে মারে,, আর ঠোঁট নেড়ে বলে।
“ভালোবাসা এমনই… কখনো বলা যায় না, শুধু অনুভব করতে হয়…”
রুশা মাথা নাড়ে যার অর্থ যে অধীর এর ঠোঁট নাড়ানোর কথা বুঝেছে সে !
স্টেজের আলো নাভানের মুখে পড়ে—তার চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা। হেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, তার বিরক্তি যেন কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এ কেমন সুর,,কেমন গান যা তাকে থমকে দিয়েছে। সৃজন অধীর সবাই স্টেজে।
” স্টেজের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে থামে নাভান। আলোটা ঠিক তার ওপরেই পড়েছে—মাথার ওপর থেকে ঝরে পড়ছে সোনালি ঝিলমিল কাগজ , যেন সে নিজেই আজকের রাতের কেন্দ্রবিন্দু। এই স্টেজটা একটু লম্বা করে বানানো হয়েছে, দর্শকদের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য। আর ঠিক সেই শেষ মাথায় বসে ছিল হেরা। উঠে চলে যাবে—এই সিদ্ধান্ত নিয়েই দাঁড়িয়েছিল সে।
কিন্তু… গিটারের প্রথম সুরটা কানে যেতেই থেমে যায় তার পা।এই সুর…এই কণ্ঠ সে খুব ভালো ভাবে চিনে …হেরা চোখ বন্ধ করে নেয়।নিজেকে সে কতবার বুঝিয়েছে—
“আজ আর তাকাবি না… একবার তাকালেই শেষ… আবার ক্রাস নামক বাশ খাবি হেরা।
” তাই সে জেদ করেই পিছন ফিরে দাঁড়ায়। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে শুধু শোনে সেই কণ্ঠ।
স্বীকার করতেই হবে। নাভানের গলার মধ্যে এক অদ্ভুত জাদু আছে। যেন প্রতিটা শব্দ হৃদয়ের ভেতরে গিয়ে নরম করে ছুঁয়ে দেয়।
হঠাৎই…তার মাথায় নরম কিছু একটা পড়ে।
চমকে উঠে চোখ খোলে হেরা।
একটা সাদা শার্ট। আর সেই শার্টে ভেসে আসছে একটা পরিচিত ঘ্রাণ,,গভীর, মাতাল করা, অদ্ভুতভাবে দুর্বল করে দেওয়া স্মেল । হেরার বুক কেঁপে ওঠে।এই ঘ্রাণ…এই অনুভূতি… এই মানুষটাকে সে খুব ভালো করেই চেনে। তার কাছে এই গন্ধটা “বিষাক্ত” কারণ এটা পেলেই তার শরীর কেঁপে ওঠে, মন দুর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে হাত দিয়ে শার্টটা নামিয়ে দেখে,,সাদা, ধবধবে শার্ট…
আর এই শার্টের মালিক,,অসভ্য গিটারওয়ালা… শেহতাজ খান নাভান।হেরা ধীরে ধীরে পিছন,ফিরে,,তাকায়, নাভান ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে।
চোখ দুটো সরাসরি হেরার দিকে—গভীর, নরম, অথচ দখল নেওয়ার মতো শক্তিশালী।
এই প্রথম—
নাভান সবার সামনে শার্ট খুলেছে।
কিন্তু সে নিলয়ের মতো উগ্র না।
তার পরনে একটা সাদা রঙের হাতাকাটা গেঞ্জি, যেটা তার বাহুর শক্ত পেশীগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।ঘামে ভেজা ত্বক, স্টেজের আলোয় ঝলমল করছে, আর তার সেই সহজ, আত্মবিশ্বাসী দাঁড়িয়ে থাকা… যেন অজান্তেই সবাইকে টেনে নিচ্ছে তার দিকে।
চারপাশে মেয়েদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে
“উফফ… হট!”
“কি ফিগার মাইরি!
” O m g
“ইস পুরাই চকলেট।
“নাভানকে আজ অন্যরকম লাগছে…”
অনেকের চোখেই বিস্ময়, আকর্ষণ।
যারা জানে–
তারা চুপচাপ তাকিয়ে আছে হেরা আর নাভানের দিকে। যারা জানে না–
তারা শুধু এই মুহূর্তটাকে উপভোগ করছে।
কিন্তু হেরার ভেতরে তখন অন্য ঝড়।
তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
হঠাৎ করেই রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কেন জানি না। নাভানের দিকে এতগুলো চোখ পড়া সে সহ্য করতে পারে না। তার বুকের ভেতর হালকা জ্বালা করে ওঠে,,এটা কি রাগ? নাকি… জেলাসি?
নাভান একটু এগিয়ে আসে।
তার কণ্ঠ এখনো মৃদু সুরে ভাসছে।
“যেও না চলে… বন্ধু,,, ****
কিন্তু এই লাইনটা সে আর মাইকে গায় না। হেরার কাছে এসে গায় খালি গলায়। শুধু হেরার জন্য।হেরার নিঃশ্বাস আটকে যায়।
হেরা ধীরে ধীরে মনে মনে বির বির করে বলে।
“এত চেষ্টা করেও… চোখ ফেরাতে পারলি না, অসভ্য মন!! অসভ্য গিটার ওয়ালার উপর যায়।
চারপাশে গান, আলো, উচ্ছ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে সেই মুহূর্তটা থেমে থাকে শুধু তাদের দুজনের জন্য।হেরা আর নাভান,, দূরে থেকেও কাছাকাছি,
রাগের আড়ালেও লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা নিয়ে
একটা অসম্পূর্ণ, অথচ গভীর ভালোবাসা তাদের মধ্যে, নাভান গিটার বাজাতে বাজাতে পা দুলাচ্ছে আবার একটু লাফাচ্ছে,,হাত উচু করতেই পেন্ট এর নিচে ব্রেন্ড এর একটা নাম দেখা যায়। হেরা চোখ বন্ধ করে ফেলে বির বির করে বলে।
“ছি ছি কি নির্লজ্জ ছেলে। পেন্ট এর নিচে ছোট পেন্ট যে দামি সেটা দেখাচ্ছেন ছি ছি ছি।
রোজ হেরার হাত ধরে টানতে থাকে,,চারিদিকে এতো আমেজ এই প্রথম নিলয় রাগে ফুসফুস করছে,কিছুতেই নাভান কে সে হাড়াতে পারছে না শেষ অব্দি বিয়েটাও করতে দেয় নি সেই নেপাল থেকে ফিরে এসেছে ভাঙা মন নিয়ে। কিন্তু এটা ভেবে শান্তি লাগছে হেরা সবার সামনে তাকে অস্বীকার করেছে। নাভান নিজের অধিকার খাটিয়ে নিয়ে এসেছে তার ফুল কে। কিন্তু কয় দিন আটকে রাখবে যেখানে হেরা চায় না এই সম্পর্ক। খুব দ্রুত এর বিহিত করতে হবে। তার আগের বুঝা উচিত ছিলো শেহতাজ খান নাভান গভির পানির মাছ। কি বুদ্ধি করে নিয়ে এসেছে হেরাকে।
ফ্ল্যাশব্যাক…
রুশা যা যা বলেছিল, একটুও লুকায়নি অধীর–সবকিছু সেই মুহূর্তেই নাভানকে জানায়। কথাগুলো শোনার পর যেন চারপাশে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। কেউ কিছু বলতে পারে না। সবাই শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাজল খান চুপচাপ বসে আছেন। তাঁর চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তবুও তিনি কিছু বলছেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন–তার ছেলে সবকিছু , জেনেই এই পথে এগোচ্ছে। তাই হয়তো থামানোর চেষ্টা করছেন না, শুধু নীরবে সবকিছু মেনে নিচ্ছেন।
“কাজল ভিলায় তখন সবাই উপস্থিত—রোজ, সৃজন, ঝিনুক, তুষার…পরিস্থিতি যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে।
রোজ যেতে পারবে না—তার ভিসা নেই। আর সৃজন নিজে থেকেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ নাভান তাকে বলেছিলো “রোজের পাশে থাকতে “
“মেয়েটা আগেই তার বান্ধবীদের হারিয়ে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে। তার উপর আবার জ্বর… সব মিলিয়ে সে যেন আরও চুপচাপ হয়ে গেছে। আগের সেই হাসিখুশি রোজ এখন কোথাও নেই।
_কাজল খানের শরীর কিছুটা ভালো থাকলেও, ঝিনুক আর তুষাকে দায়িত্ব দিয়ে অধীর আর নাভান সিদ্ধান্ত নেয়—তারা দুজনই নেপালে যাবে।
সবাই শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে সম্মতি দেয়।
রাত ৯টার ফ্লাইট।
এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময়টা যেন অদ্ভুত ভারী লাগে। রোজ আর সৃজন—দুজনেই এসেছে বিদায় জানাতে। ঝিনুক আর তুষার নাভান ভিলাতেই থেকে গেছে। ফ্লাইটের আগে, নাভান যখন দাঁড়িয়ে আছে, তখন রোজ ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় “চোখ দুটো ছলছল করছে…”
কথা বলতে গিয়েও গলা বারবার কেঁপে উঠছে।
“ভাইয়া… আপনি আমার দুই বোনকে নিয়ে আসবেন তো…?”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। তবুও কষ্ট করে কথা চালিয়ে যায়—
“বাবা-মা মারা যাওয়ার পর… আমি আর কখনো এমন করে কারো আদর পাইনি…
আমার মনের কথা বলার মানুষ দুটোকে… এনে দিবেন, ভাইয়া…? আমি এই শহরে খুব একা হয়ে গেছি…”খুব একা লাগছে কেনো জানি?
“এই কথাগুলো বলার সময় তার চোখের পানি আর আটকাতে পারে নি রোজ। এক ফোঁটা… দুই ফোঁটা… গড়িয়ে পড়ে তার নরম কোমল গালে।
রোজের সেই অসহায় চোখ দেখে নাভানের বুকটা যেন হঠাৎ করে ছিরে যায়। এই মেয়েটাকে সে সবসময় নিজের ছোট বোনের মতোই দেখেছে।
এত নরম, এত মায়াবী একটা মন… ঠিক যেন সৃজনের কার্বন কপি। দুজনকেই আল্লাহ যেন আলাদা করে কোমল হৃদয় দিয়ে বানিয়েছেন।
নাভান ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রোজের মাথায় রাখে। তার কণ্ঠে তখন এক ধরনের দৃঢ়তা, আর গভীর স্নেহ —
“তুমি ভাইয়ের উপর ভরসা রেখো …
এই ভাই তোমার চোখের প্রতিটা পানির হিসাব নেবে…আর তোমার ফ্রেন্ডদের… তোমার বোনদের… আমি ফিরিয়ে আনবই।”
–কথাগুলো শুনে রোজ আর নিজেকে সামলাতে পারে না। চোখ বন্ধ করে ফেলে… যেন সেই ভরসাটুকুই এখন তার বেঁচে থাকার শক্তি।
এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৃজন সবকিছু চুপচাপ দেখছে। তার বুকের ভেতরেও যেন চাপা কষ্টে জমে উঠছে…কিন্তু সে জানে। এই মুহূর্তে রোজকে ভেঙে পড়তে দিলে চলবে না। তাই ধীরে এগিয়ে এসে রোজের কাঁধে হাত রাখে। এয়ারপোর্টের কোলাহলের মাঝেও তাদের ছোট্ট দুনিয়াটা যেন আলাদা হয়ে যায়–বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর ভরসার এক অদ্ভুত বন্ধনে বাঁধা। আর নাভান…সে শুধু একবার পেছনে তাকায়। রোজের ভেজা চোখ আর সৃজনের নীরব ভরসাটা দেখে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায়। একটা প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়ে…!!
ঠিকানাটা হাতে নিয়ে নাভান একবার তাকালো, তারপর আর একবার। যেনো শব্দগুলোকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তবুও এগোতেই হবে—সময় খুব কম।
নেপালের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই যেনো চারপাশটা অন্য এক জগৎ। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে তারা যখন ঠিকানা অনুযায়ী ভেতরের দিকে ঢুকতে শুরু করলো, তখন প্রকৃতি নিজেই যেনো তাদের সামনে দরজা খুলে দিলো।
বিশাল এক সবুজ মাঠ…
চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো সবুজ ঘাস, যেনো কারও যত্নে আঁকা ছবি। সেই মাঠের বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ ঝর্ণার পানি—এপার থেকে ওপার অব্দি। পানির নিচে সাদা-কালো পাথরগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, যেনো প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে রেখেছে। সূর্যের আলো পড়ে সেই পানিতে ঝিকমিক করছে, একদম কাঁচের মতো পরিষ্কার।
মাঠের একপাশে সারি সারি ছোট ছোট ঘর—সাদামাটা, কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর। আর সেই ঘরগুলোর চারপাশে অসংখ্য ফুলের গাছ—লাল, হলুদ, বেগুনি, সাদা… যেনো রঙের মেলা বসেছে। বাতাসে ফুলের গন্ধ, পাখির ডাক, আর পানির শব্দ—সব মিলিয়ে জায়গাটা একেবারে কল্পনার জগৎ।
অধীর থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
মুখটা হাঁ করে আছে, চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
তার মাথায় তখনও আগের মতোই আজব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
“ভাই… দেখছিস ? বাচ্চারা এত সুন্দর ফুল গাছ দেখেও ছিঁড়ছে না! আর আমার তো ফুল দেখেই ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে!”
নাভান একটু চোখ কুঁচকে তাকালো তার দিকে।
“এইটাই বাঙালির পরিচয়?”
কথাটা হালকা ঠাট্টার সুরে বলা হলেও, অধীরের মনে যেনো একটু খচখচ করলো।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
“মানে? তুই কি আমাকে অপমান করলি?”
কিন্তু নিজের কথার মাঝেই সে থেমে গেল। কারণ সে নিজেই বুঝে—অপমান করলে তার কী এসে যায়? তার আবার কিসের মান-সম্মান!
ঠিক তখনই—তার ফোনটা কেঁপে উঠলো। মেসেজ।
অধীর ফোনটা খুলতেই তার চোখের ভাষা বদলে গেল।
মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো আতঙ্ক।
“সর্বনাশ হয়ে গেছে… লাইভ টেলিকাস্ট… ছোট বাবা হেরাকে আজকেই বিয়ে দিচ্ছে। প্লিজ, তোমরা দেরি করো না। ১ ঘন্টার ভিতর আসো!”
নাভান মেসেজটা পড়েই যেনো আগুন হয়ে উঠলো।
চোখে রাগ, বুকের ভেতর জ্বালা।
“বাবা…!” সে দাঁত চেপে বললো, “আমার সাথে এই খেলা খেলছো?”
তার মাথায় ঝড় উঠেছে।
সে নিজের বিয়ে করা বউকে কতো কষ্ট করে নিজের কাছে এনেছে—সবকিছু ছেড়ে, সব নিয়ম ভেঙে। আর এখন তার বাবা… ঠিক একইভাবে তাকে কষ্ট দিতে চাইছে!
“না… এইবার আমি ছাড়বো না,” নাভান নিজের মনে বললো। “যে কষ্ট আমি পেয়েছি, তার জবাব আমি দেবোই।”
রুশা যে ঠিকানাটা পাঠিয়েছে, সেটা আবার খুলে দেখলো তারা—
“লেকের সোজা… মাঠের শেষ প্রান্তে এসে ডান দিকে… একটা স্কুলের পিছনে একটা পাহাড়… তার পাশে একটা মাঠ… তারপর তিনটা বাড়ি… সেই তিনটা বাড়ির পিছনের তিনটা বাড়ির—ডান দিক থেকে দুই নম্বর, বাম দিক থেকে এক নম্বর, আর সামনে থেকে প্রথম বাড়িটার ভেতরে… তাড়াতাড়ি আসো!”
অধীর পুরোটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর—
ধপাস!সে সেখানেই মাটিতে বসে পড়লো।
“এইটা কি কোনো ঠিকানা? “নাকি ধাঁধা!”
মাথা চুলকে আবার বললো,
“এই লাল গোলাপি মেয়েটা আমাকে জীবনে শান্তি দেয় নাই! প্রেমে পড়ার আগে যত না কষ্ট পাইছি, প্রেমে রাজি হওয়ার পর তার থেকেও বেশি হয়রানি!”
নাভান এবার একটু হেসে ফেললো, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও চাপা টেনশন।
তারা অবশেষে সেই জায়গাটায় পৌঁছালো।
কিন্তু পৌঁছানোর পরই যেনো সবকিছু আরও জটিল হয়ে উঠলো।চারপাশে তাকালেই শুধু বাড়ি…একটা, দুইটা, তিনটা- না, এর চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো–সবগুলোই প্রায় একরকম!
একই রঙ, একই গঠন, একই উঠান, এমনকি দরজার পাশের গাছগুলোও যেনো কপি-পেস্ট করা।কোনটা সামনে, কোনটা পেছনে–বোঝার উপায় নেই।
রুশা যেভাবে ঠিকানা দিয়েছে, সেটা এখানে এসে পুরো ধাঁধার মতো লাগছে। নাভান দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে আছে, চোখে বিরক্তি আর অস্থিরতা।সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ এক পা-ও এগোতে পারছে না তারা।
অধীর মাথা চুলকাতে চুলকাতে হঠাৎ বলে উঠলো—
“ভাই… এ তো সোজা কোনো জায়গা না। এইটা রাক্ষসী রানী কটকটির পাতাল ঘর মনে হচ্ছে! এখানে ঢুকতে হলে জাদু দিয়ে রাস্তা চিহ্নিত করতে হবে। না হলে সব গোলমাল হয়ে যাবে!”
এই সিরিয়াস মুহূর্তেও তার এমন আজব কথায় নাভানের মেজাজ যেনো আগুন হয়ে উঠলো।
চোখ লাল করে তাকিয়ে বললো—
“আর একটা কথা বলবি… এক কিক মেরে তোকে ওই লেকে ফেলে দিবো, ইডিয়েট!”
কিন্তু কে শুনে কার কথা!
নাভানের গলা যতই রাগে কাঁপুক, অধীরের ভাবভঙ্গিতে তার কোনো প্রভাবই নেই।
বরং সে একটু হেসে, যেনো ইচ্ছে করেই আগুনে ঘি ঢালতে চাইলো–
“যাই হোক… হেরা কিউটি পাই বোনের বিয়ে খেতে তো পারবো গিয়ে! তুই তো শুধু ঝামেলা করতে আসছিস। তিতির তো তোর জন্য পাগল, আর হেরার সাথে তো তোর শত্রুতা। তার বিয়ে হলে কি, না হলে কি! ছেড়ে দে ভাই… শুধু শুধু পেরা নিচ্ছিস।”
কথাগুলো বাতাসে ভেসে গেলেও, তার প্রতিটা শব্দ যেনো গিয়ে আঘাত করলো নাভানের ভেতরের কোনো অদৃশ্য জায়গায়। নাভানের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তে বদলে গেল। ঠাণ্ডা… কিন্তু ভয়ংকর ঠাণ্ডা।
“ছাড়বো?“এতো সহজ?”
সে ধীরে ধীরে বললো, ঠোঁটের কোণে তীব্র হাসি ফুটে উঠলো এক পা এগিয়ে এলো সে।
“যে মাছটাকে ধরার জন্য আমি নিজে ছাই ব্যবহার করেছি… নিজের হাত ময়লা করেছি… তাকে ছেড়ে দিতে বলছিস?”
অধীর কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই
হঠাৎ নাভান তার কলার চেপে ধরলো।
এক ঝটকায় তাকে নিজের কাছে টেনে নিলো।
অধীরের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।
“তুই কি ভাবছিস? “সবকিছু এত সহজ?”
কিন্তু অধীর…
এই অবস্থাতেও যেনো থামার ছেলে না।
সে কষ্ট করে হেসে বললো–
“আরে ভাই… রাগ হচ্ছিস কেন? তুই তো তাকে আর ভালোবাসিস না। তাহলে এতো জোর কেনো?”
এই কথাটা…
এবার যেনো সত্যিই কোথাও গিয়ে লাগলো।
এক মুহূর্তের জন্য নাভান থেমে গেল।
তার চোখে এক অদ্ভুত ছায়া নেমে এলো-
রাগ, অহংকার, আর কোথাও যেনো লুকানো কিছু অনুভূতি… যেটা সে নিজেও স্বীকার করতে চায় না। তার হাতের চাপ আরও শক্ত হলো।
“ভালোবাসা?“ওটা তার জন্য না…”
তারপর একটু ঝুঁকে, একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বললো—
“কিন্তু আমি তাকে বিয়ে করেছি।”
“আর যার সাথে আমার নাম জড়িয়ে গেছে…”
“সে আমারই থাকবে।” মরার আগ অব্দি।
অধীর এবার চুপ।কারণ এই কথার ভেতরে শুধু রাগ না–আরো কিছু আছে।অন্ধকার… গভীর… আর রহস্যময় কিছু। নাভান ছারলো অধীর হাপাতে হাপাতে বললো।
বাপ রে বাপ! ঘাস-পাতা খেয়ে শরীরে এত শক্তি আসে কই থেকে! আরেকটু হলেই তো মনে হচ্ছিল,পাছা দিয়ে আত্মা বের হয়ে যেতো!
অধীর নিজের পেটটা চাপড়ে মনে মনে কসম খেল,
“আর কোনোদিন না… জীবনেও না! কিছু মুখ থেকে বের করতে চাইবো না। আসলেই এই বেটা অসভ্য গিটার ওয়ালা। হেরা যে বলে ঠিকি বলে।
একটা অদ্ভুত নীরব গলির সামনে এসে দাঁড়ালো অধীর আর নাভান। চারপাশে তিনটা বাড়ি—সবগুলো এমনভাবে বানানো, যেন একটার সাথে আরেকটার গোপন শত্রুতা আছে। কোনটা রুশার বাড়ি—তা বোঝার উপায় নেই।
অধীর মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“ভাই, এ তো একদম জাদুর কুন্ডলী ! মনে হচ্ছে ‘রাক্ষসী রানী কটকটির পাতাল ঘর’! ভুল বাড়িতে ঢুকলে সোজা অন্য জগতে চলে যাবো!”
নাভান কিছু বলার আগেই অধীর “ডিং ডং” করে কলিং বেল চেপে দিলো।
নাভান বিরক্ত নিয়ে বললো –
“এটা কি করলি?
অধীর গম্ভীর ভঙ্গিতে_
“হিরোরা কখনো ভয় পায় না, বুঝছিস আমি হিরো, তোর সময় থাকলেও আমার সময় নেই ?”
অধীর কথা বলতে বলতেই হটাৎ দরজা খুলে গেলো।
দরজা খোলার সাথে সাথেই বের হলো ১৪-১৫ বছরের একটা মেয়ে। চোখে-মুখে বিরক্তি, হাতে কিছু টাকা। সে এক নিঃশ্বাসে জাপানি ভাষায় কি যেন বললো—
“এই নিন টাকা! আর শুনুন, আর আসবেন না। দেখতে তো একদম ফিটফাট—হাত-পা সব ঠিকঠাক! তাহলে ভিক্ষা করেন কেন? যান গিয়ে কুলি গিরি করেন, অনেক টাকা পাবেন!”
বলেই—ধাপ! দরজা বন্ধ।
অধীরের মুখ এমন হয়ে গেল, যেন কেউ তার সামনে পুরো পৃথিবীটাই “লগ আউট” করে দিয়েছে।সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলো, যেন মস্তিষ্ক রিস্টার্ট নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল
“আমি… ভিক্ষুক?”
অধীর রাগে গরম হয়ে আবার বেল চাপতে যাবে—
ঠিক তখনই পাশের দরজা খুলে বের হল এক বয়স্ক মহিলা। হাতে কাপড় ভর্তি একটা গামলা।
“এই নাও বাছা!”- বলেই গামলাটা অধীরের হাতে ধরিয়ে দিলো।
“সব কাপড় যেন ঝকঝকে পরিষ্কার হয়! আগের বার কিন্তু ভালো করে ধুইতে পারো নাই। এবারও যদি ময়লা থাকে—টাকা কম দিমু!”
অধীর এবার কাশি দিয়ে উঠে।
একজন বলছে ভিক্ষুক…
আরেকজন বানিয়ে দিলো কাপড় ধোয়ার লোক!
সে গামলাটা হাতে নিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন জীবনে প্রথমবার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মনে মনে সে বলতে লাগলো—
“ঢাকা শহরের কিউট বয় আমি… কত মেয়ের ক্রাশ! আর এই নেপালের মানুষজন আমাকে কী বানইয়েছে ! ভিক্ষুক? ধোপা? আর কি বাকি আছে? একটু পর হয়তো বলবে—‘এই ভাই, বাসনগুলো মাজা লাগবে!’”
নাভান এবার আর ধরে রাখতে পারলো না—হাসতে হাসতে পেট ব্যথা।
অধীর বিরবির করে বলতে লাগলো—
“আমাদের দেশের মানুষ অন্তত বাসায় কেউ গেলে জিজ্ঞেস করে—‘আপনি কে?’
আর এরা কী করে? সোজা একেকটা ‘ক্যারেক্টার রোল’ দিয়ে দেয়! একজন বানালো ভিক্ষুক, আরেকজন বানালো লন্ড্রি সার্ভিস!
”জয় বাঙালি জাতির জয়। জয় বাংলাদেশের জয়।
চলবে….?
গল্প এতো মানুষ দেখে বাট রেসপন্স করে না,,লিখার আগ্রহ পাই না,,,রেস্পন্স ভালো হলে রেগুলার গল্প দিবো,,ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব-৩০