
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতেরোজও_রুশা
পাঠ_৩২
হেরা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে বলে উঠে-
“পেটে কিছু হয়নি, পায়ের হাঁটুর নিচে কাচ ঢুকেছে?”
-তখন অনুষ্ঠান থেকে একা ফেরার পথে নাভান হেরাকে আটকায়। কিন্তু হেরা নাকুচ করে দেয়, সে নাভানের সাথে যাবে না। দূর থেকে নিলয় সবকিছু দেখে রাগে ফুসফুস করছে। রাগে নাভানের গাড়ির দিকে এগিয়ে ধাক্কা দিতে যায়, তখন হেরা সেটা দেখে ফেলে। সাথে সাথে নাভানকে হেঁচকা টানে সরিয়ে আনে।
-৭০ কেজি শরীরের ভার সামলাতে না পেরে হেরা নিজেই কাচ ঢালা রাস্তায় পড়ে যায়। কিছুক্ষণ আগে এখানে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল, যার কারণে গাড়ির কাচ ভেঙে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। আর হেরা সেই কাচের উপর পড়ে যায়। তার হাত-পায়ের অনেক জায়গায় কেটে যায়।
-নাভান দ্রুত হেরাকে টেনে তোলে। অন্ধকার থাকায় প্রথমে নাভান কিছু বুঝতে পারেনি, আর হেরাও কিছু বলেনি। পরে হাঁটতে গেলে পায়ে খোঁচা লাগতেই সে দাঁত চেপে সহ্য করে নেয়। উপায় না পেয়ে হেরা নাভানের বাইকে করেই জাওয়াদ খান এর বাসায় আসে।
-গাড়ি থেকে নামতেই হেরা প্রায় পড়ে যেতে নেয়। তখন নাভান খেয়াল করে দেখে, হেরার পা থেকে রক্ত বের হচ্ছে। নাভান নিচু হয়ে পায়ের ভেতর আটকে থাকা কাচ বের করে দেয়। তবুও হেরা পেট চেপে ধরে বসে থাকে।
-আর কিছু না বুঝতে পেরে নাভান হেরাকে কোলে তুলে রুমে নিয়ে যায়। পরে তাকে নামিয়ে দিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স আনতে গেলে হেরা অন্য রুমে চলে যায়। এটা দেখে নাভান রাগে তার পিছু নেয়।
-মেয়েটা পেট চেপে ধরে অন্য রুমে যেতে নিতেই নাভানের রাগ বেড়ে যায়। রাগে দরজা আটকে সে হেরাকে টেনে দাঁড় করায় এবং দেখে কোথায় ব্যথা পেয়েছে। হেরা দিচ্ছে না বলে এতো কাহিনি করে নাভান হেরার সাথে । কামিজে হাত দিতেই শেষ মেশ লজ্জায় হেরা বলে উঠে।
“আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি…”
আরো পড়ুন
-নাভানকে নিয়ে পরে যাওয়ার সময়,নাভান তার উপরে পরেছে বিধায় নাভান এর কুনই হেরার পেটে লাগে,নাভান এর সম্পূর্ণ খেয়াল তখন ছিলো হেরার মাথায়,,যাতে পিচ ঢালা রাস্তায় হেরার মাথা না লাগে,নাভান হেরার মাথার নিচে এক হাত রাখে আর কোমড়ে ধরতে চায় আরেক হাত দিয়ে, কিন্তু বে* কায়দায় তার কুনই এর আঘাত লাগে হেরার পেটে। নাভান কে হেরা কোনো ভাবে বুঝতে দেয় না যে সে ব্যাথা পেয়েছে। নাভান হেরার কামিজ একটু উঠিয়ে আবার ঠিক করে দেয়, তারপর পায়ের থেকে স্কাট উঠাতেই দেখে ফর্সা পা লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে,,একটা কাচ এখনো ডুকে আছে,,রাগে হাতের আর কপালের রগ ফুলে যায় মুহুর্তে নাভান এর,,সে হাত দিতে হেরা ব্যাথায় কুকিয়ে যায়। হেরার বের্থাতুর মুখ দেখে নাভান এর কেমন মায়া হয়। নিচে বসে হেরার পা কোলে রেখে পা উচু করতে হেরা আবারো চেচিয়ে উঠে। এবার নাভান এর রাগ হয় মেয়েটার উপর, না ধরতে এমন সাউন্ড দিচ্ছে। বিরক্ত নিয়ে বলে।
"এই মিসাইল গার্ল, এমন রুমান্টিক সাউন্ড দিচ্ছো কেনো,কেউ শুনলে কি ভাববে,,?
" হেরা চোখ বড় বড় করে চায়,, রাগে কটমট চোখে তাকায় নাভান এর দিকে বলে উঠে কর্কশ ভাষায়।
" মানুষ ব্যাথা পেলে তাহলে কেমন সাউন্ড করে অসভ্য গিটার ওয়ালা।
" তোমার মতো এডাল্ট সাউন্ড করে না অন্ত্যত।
"কথা না শুনার শাস্তি এসব,চিল্লাও আরো জোরে। আমি তোমায় আরো ব্যাথা দিবো ইডিয়েট, তখন কথা শুনলে এমন হতো?
-হেরা দাতে দাত চেপে ধরে, নাভান কথার মাঝে, হেরার পা থেকে কাচ খুলে বেন্ডেজ করে দেয়। জাওয়াদ খান বাসায় আসতে হেরার রুম থেকে চেচানোর শব্দ শুনে চোখ বড় বড় করে ফেলে। দরজার বাহির থেকে ধাক্কা দিতে দিতে বলে।
" শেহতাজ দরজা খুলো? কি করছো আমার মেয়ের সাথে, তোমার অই এটিটিউড মার্কা মা এসব শিখিয়েছে তোমায় মেয়েদের সাথে এসব করতে?!
- নিজ জন্মদাতা বাপ কে আবার তাদের মধ্যে হিটলারগিরি করতে দেখে কপাল কুচকে বির বির করে বলে।
" অই যে হিটলার বাপ এসে হাজির,,!
-হেরা ভেঙচি কাটে নাভান কে বলে উঠে।
" হিটলার আমার বাবা নয়, হিটলার তো আপনি, অসভ্য গিটার ওয়ালা।
-নাভান বিরক্ত মুখে দরজা খুলতে হুরমুড় করে ভেতরে প্রবেশ করে, জাওয়াদ খান, রোজ আর রুশা। মেয়েকে ব্যাথাতুর চোখে মুখে শুয়ে থাকতে দেখে দাতে দাত চেপে বলে।
" আমার আম্মাজান যে বলে তুমি অসভ্য,সত্যি নিজ চোখে না দেখলে ভাবতাম না তুমি এমন, কি অসভ্য দিনের বেলা এসব কি শেহতাজ?
-নাভান শুধু দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ডেম কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে নিজ জন্মদাতা পিতার কথা শুনছে। ববার মুখ বন্ধ করতে একটু ঝুকে বলে উঠে।
" আমি তোমার মতো অতোটা নির্লজ্জ নই যে দিনের বেলাতেও রুমান্স করবো।
- জাওয়াদ খান কেশে উঠে। মেয়েদের সামনে এমন কথা বলাতে,,আর কিছু না বলে যেতে নিতেই নাভান আবার বলে উঠে।
" চোরের মন পুলিশ পুলিশ,
এদিকে রোজ রুশা মুখ টিপে হেসে উঠে। জাওয়াদ খান , হেরার পাশে গিয়ে বসতেই হেরা বলে উঠে, সে ব্যাতা পেয়েছে।
- আধার ধরনী তখন তখন চাদের হাট বসেছিলো,রাত ১১ টা বাজতে চলেছে এডভোকেট কাজল খান, বাসায় ফিরেছে পিছনে তার এসিস্ট্যান্ট ফাইল হাতে নিয়ে হাজির। ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতে নাভান মুখোমুখি হয়,গ্লাসে পানি ডালতে ডালতে বলে উঠে নাভান ।
" আজকাল তোমার অভিমান টা অহংকারে রুপ ধারন করছে, তোমার এমন টা মনে হচ্ছে না মা?
- কাজল খান যানে কেনো ছেলে এমন কথা বলছে
তারা নেপাল থেকে আসার পর অব্দি জাওয়াদ খান কতো ভাবে কথ বলতে চেয়েছে,,কিন্তু তিনি এড়িয়ে চলেছেন সবসময়। কাজল খান নির্লিপ্ত ভাবে বলে উঠে।
" শেষ বয়সে কি আমাকে দেখা শুনা করতে তোমার সমস্যা হবে তাই কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছো নতুন করে,এটা ভুলে যেও না আমি কাজল রেখা নই এডভোকেট এম এল এ কাজল খান। আমি একাই চলতে পারি, কাওকে লাগবে না আমার।
--বলেই গট গট পায়ে প্রস্থান করে এডভোকেট কাজল খান নাভান রাগে কাচের গ্লাস টা ফ্লোরে আছাড় মারে সজোরে। আচ্ছা এতো বছরের অভিমান কি এতো সহজে ভেঙে ফেলা যায়। নাভান বুঝে কিন্তু তাও বাবা মায়ের দুরুত্ব ঘোচাতে পাগল হয়ে আছে,কবে তাদের একসাথে দেখবে। সেই আশায় দিন গুনছে নাভান,যথেষ্ট বড় হয়েছে নাভান, আর সবারি নিজ বুঝাপরা আছে চাইলেও এখন কিছু চাপিয়ে দেয়া যায় না,
****
দাঁড়াও… বলছি, কাজল রেখা।
কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্তটা যেন হঠাৎ থমকে যায় । চারপাশে মানুষের ভিড়, কাগজপত্রের শব্দ, আইনজীবীদের ব্যস্ত চলাফেরা - সব কেমন যেন দূরে সরে যায় । সেই বহুদিন আগের পরিচিত কণ্ঠটা আবার ভেসে আসে -
“কাজল রেখা…”( জাওয়াদ খান)
-ডাকটা যেন বুকের ভেতর এসে টুক করে লাগে। কাঁপিয়ে দেয় । কত বছর পর এই নামটা এভাবে কেউ উচ্চারণ করলো ! একসময় এই ডাকেই তার দিন শুরু হতো, রাত শেষ হতো… আজ এতদিন পর সেই একই ডাকে বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে । এডভোকেট কাজল খান এর মনে হয় - আবার ডাকুক না… আর একবার বলুক “কাজল রেখা”… এতদিনের তৃষ্ণার্ত কান আর মনটা একটু জুড়িয়ে যাক… তাতে কি এমন ক্ষতি হবে ?
-এ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটা একটু সরে দাঁড়ায় । জাওয়াদ খান সামনে এগিয়ে আসে । তার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা। এই দেখা, এই মুহূর্ত - সে অনেকবার চেয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই কাজল তাকে ইগনোর করেছে। আজ আর সে থামতে পারছে না। আবার ডাকে--
“প্লিজ কাজল রেখা… আমি সবটা শুনতে চাই। প্লিজ… তুমি আমায় সবটা বলো…”
-এই কথাটা শোনার সাথে সাথে এডভোকেট কাজল খান যেন এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ায়। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। হাতে থাকা ফাইলগুলো ইশারা করে এসিস্ট্যান্টের হাতে তুলে দেয়। তারপর বুকের কাছে দুই হাত ভাঁজ করে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।
-আজ সে শুধু “কাজল রেখা” না-- সে একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। তার পরনে কালো কোর্ট, চোখে পাওয়ার চশমা, আত্মবিশ্বাসে ভরা দৃষ্টি—সবকিছু মিলিয়ে সে এখন সম্মান আর দৃঢ়তার প্রতীক।
-জাওয়াদ খান অপলক তাকিয়ে থাকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না-- এই মেয়েটাই তার সেই পিচ্চি বউ! সময় তাকে বদলে দিয়েছে… কিন্তু এভাবে? মানুষ বয়সে বুড়ো হয়,কিন্তু তার কাজল তো দিন দিন আরও সুন্দর, আরও শক্ত, আরও দূর হয়ে গেছে!
-নাভানের মুখ থেকে অনেক কিছু শুনেছে সে। কিন্তু আজ সে সত্যটা জানতে চায়,,সেই দিনের আসল ঘটনা। তাই আবার বলতে চায়, আবার জানতে চায়… কিন্তু কাজল খান ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
“ শুনতে চান আপনি ?
-তার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে।
“ আজ এত বছর পর আপনার শুনতে ইচ্ছে করছে ? আশ্চর্য…!”
সে এক পা এগিয়ে আসে। চোখে চোখ রেখে বলে
“ যে স্বামী সবার সামনে নিজের স্ত্রীকে একা রেখে চলে যেতে পারে… সে আবার কোন মুখে জবাব চায়?”
-জাওয়াদ স্তব্ধ। কাজলের কণ্ঠ আরও শক্ত হয়ে ওঠে --
“সেদিন… আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম আপনার পাশে।আপনার পায়ে অব্দি পরেছি। শুধু একটুখানি বিশ্বাস চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি? একবারও আমার দিকে ফিরে তাকাননি। একবারও জিজ্ঞেস করেননি -- সত্যি কি?
কাজল খান এর চোখে জমে থাকা কষ্ট যেন আগুন হয়ে বেরিয়ে আসে--
“আপনি চলে গিয়েছিলেন। সবার সামনে আমাকে একা রেখে। অপমান, প্রশ্ন, সন্দেহ -- সবকিছুর মুখোমুখি করে। মেয়েদের সম্মান এত সস্তা না, মি. জাওয়াদ খান। যে যখন খুশি সন্দেহ করবে, আবার যখন খুশি এসে উত্তর চাইবে, এটা হয় না।”
-জাওয়াদের বুকটা কেঁপে ওঠে। কাজল এবার স্পষ্ট, দৃঢ় কণ্ঠে বলে--
“আপনি বিশ্বাস করেননি… এটাই আপনার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর সেই এক মুহূর্তের অবিশ্বাস, আমার পুরো জীবনটা বদলে দিয়েছে।”
তার চোখে এবার জল নেই… আছে শুধু কঠিন বাস্তবতা।
“ আমার জীবনটা নষ্ট হয়নি… আমি নিজে গড়ে নিয়েছি। কিন্তু আপনি -- আপনি নিজের হাতেই সব ভেঙে ফেলেছেন।”
শেষবারের মতো তাকিয়ে বলে --
“এখন আর কিছু শোনার অধিকার আপনার নেই।
এই বলে কাজল খান ঘুরে দাঁড়ায়।
আর জাওয়াদ খান…সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে—
নিঃশব্দে, নিঃস্ব হয়ে…নিজের করা ভুলের ভার বুকে নিয়ে। নিজের করা ভুলের জন্য নিজে অনুতপ্ত হচ্ছে বার বার, কিছু সময় মানুষ কে শাস্তি দিতে হয় না,অবহেলাই সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। যা এখন করছে কাজল খান।
~~
–ভার্সিটি ক্যাম্পাসটা আজ যেন অন্যরকম লাগছে। চারপাশে হালকা বাতাস, আর সেই বাতাসে দুলছে পার্পেল রঙের অচেনা ফুলগুলো। যেন পুরো জায়গাটা কোনো নীরব কবিতায় ভরে গেছে। সেই ফুলগুলোর দিকেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হেরা। তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি—তিন দিন পর আবার এই চেনা জায়গায় ফেরা।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই হোঁচট খায় সে।সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল নিলয়। হাতে কয়েকটা খাতা। হেরাকে পড়তে দেখে তড়িঘড়ি করে তাকে সামলাতে গিয়ে নিজের সব খাতা মাটিতে ফেলে দেয় সে। মুহূর্তটা যেন থমকে যায়। নিলয়ের চোখ হেরার মুখে আটকে যায়। এত কাছ থেকে তাকে দেখার সুযোগ এখন আর হয় না। নাভানের জন্য সে দূরেই থাকে সবসময়। কিন্তু আজ… আজ হেরা ঠিক তার সামনে। হেরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। নিলয়ের সেই গভীর, মুগ্ধ দৃষ্টি তাকে কেমন যেন অস্থির করে তোলে। তবুও নিজের অস্বস্তিটাকে আড়াল করে হালকা একটা হাসি দেয় সে।
নিচু হয়ে একে একে খাতাগুলো তুলে নেয়, ধুলো ঝেড়ে আলতো করে নিলয়ের হাতে ধরিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ চুপ থাকে দু’জনই। তারপর হেরা ধীরে, শান্ত গলায় বলে —
“ভালোবাসা কি, সেটা হয়তো আমি পুরোপুরি বুঝি না…কিন্তু একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝি, নিলয়, কাউকে পাওয়ার জন্য যদি কারও জীবন নিয়ে নিতে হয়,তাহলে সেটা কখনোই ভালোবাসা হতে পারে না। ভালোবাসা মানে জোর না… ভালোবাসা মানে কষ্ট দেওয়া না… ভালোবাসা মানে হলো– কারও ভালো থাকার জন্য নিজের ইচ্ছেগুলোকে থামিয়ে দিতে পারা।
যারা সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে,তাদের মনটা খুব নরম হয়…তারা কখনো কাউকে আঘাত দিতে পারে না।আর সেই আঘাত যদি কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো হয়…তাহলে সেটা ভালোবাসা না,ওটা শুধু অন্ধ স্বার্থপরতা।ভালোবাসা কখনো মৃত্যু ডেকে আনে না, নিলয়… ভালোবাসা মানুষকে বাঁচতে শেখায়,
শান্তি দেয়… নিরাপত্তা দেয়…”
-কথাগুলো বলার সময় হেরার চোখে এক ধরনের দৃঢ়তা ছিল, আর ভেতরে লুকানো কষ্টের ছায়া, নিলয় কে ভালো না বাসলেও বন্ধু ভাবে হেরা,আর সেই বন্ধুর এমন রুপ সে দেখে রীতিমত শকড । নাভান কে সেদিন রাতে যে নিলয় বাইক দিয়ে ধাক্কা মারতে চেয়েছিলো ইচ্ছে করে সেটা হেরা ভালো করে দেখেছে। ভাবনার মাঝে নিলয় হেরাকে মায়া ভরা চোখে বলে উঠে।
“ আমি তোমায় ভালোবাসি, হেরা ফুল… তুমি তো নিজেই বলেছো তুমি নাভানকে ভালোবাসো না, এই বিয়েটা মানো না… তাহলে এখন কেনো তুমি তার থেকে ডিভোর্স নিচ্ছো না?”
- নিলয়ের গলায় ছিল আকুতি, ছিল রাগ, আর ছিল হারিয়ে ফেলার ভয়। ঠিক তখনই- পিছন থেকে ভেসে এলো ভারী, গভীর, শীতল একটা কণ্ঠ।
“শেহতাজ খান নাভানের সাথে যার নাম জড়িয়ে গেছে… সে মরার আগ অব্দি আমার। ডিভোর্স—এই তিন অক্ষরের শব্দ তার জন্য হারাম।”
–নাভানের কন্ঠে শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এলো হেরা আর নিলয় এর মাঝে। হেরা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। নাভান দাঁড়িয়ে আছে—চোখে অদ্ভুত এক দহন, ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকানো কষ্টটা চোখ এড়ায় না হেরার,আচ্ছা নাভান কেনো কষ্ট পাচ্ছে, হেরা নাভান এর দিকে তাকিয়ে রইলো,আসলে কি কষ্ট পাচ্ছে নাভান নাকি এটা তার অহংকার জেত।
নিলয় দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
“তুই কি ভাবছিস , জোর করে কাউকে নিজের করে রাখা যায়? ভালোবাসা কি তোর রাজনীতির ক্ষমতা?
-নাভান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো নিলয় এর সামনে পকেটে দুই হাত গুজা সাদা হাফ হাতা গেঞ্জির উপরে কালো শার্ট, চুল গুলো একটু বড় হয়েছে তাতেও যেন তার সুন্দর্য চোখ ধাধানোর মতো । সেন্টারফ্রুট চাবাতে চাবাতে নিলয় এর বরাবর দাড়ায়। তার প্রতিটা পদক্ষেপ যেন মাটিতে চাপ ফেলছে।
“ভালোবাসা আমি দেখাই না নিলয়… আমি রাখি। আর যাকে রাখি, তাকে কেউ নিয়ে যেতে পারে না।এটাই শেহতাজ খান নাভান এর ক্ষমতা অহংকার।
নিলয় হেসে উঠল, তাচ্ছিল্যে ভরা সেই হাসি
“রাখ তুই, বাট বন্দি করে কেনো? হেরা কি তর সম্পত্তি?
নাভান থেমে গেল ঠিক হেরার সামনে এসে।
চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে… যেন হাজারটা কথা জমে আছে, কিন্তু একটাও বের হতে চাইছে না। তারপর খুব ধীরে, নিচু স্বরে বলল
“আমি ওকে কখনো আটকে রাখিনি… আমি শুধু চাইনি ও চলে যাক।
হেরার বুক কেঁপে উঠল।
এই প্রথম—নাভানের কণ্ঠে এমন ভাঙন সে শুনছে। নিলয় এবার একটু থমকালো, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল
“তাহলে ছেড়েদে তাকে। তুই তো তাকে ভালোবাসিস না। আর যদি ভালোবাসিস , তাহলে মুক্তি দে । ভালোবাসা মানে তো জোর না, তাই না?
নাভান চোখ তুলে তাকাল নিলয়ের দিকে।
চোখ দুটো লাল, তীব্র, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অসহায়তা লুকানো। হেরা এসবের মাঝে থাকতে চায় না বলে চলে যায়। হেরা চলে যেতে নাভান বলে উঠে।
“মুক্তি? যেদিন ও নিজের মুখে বলবে‘আমি নাভানকে চাই না’ সেদিন নিজে হাতে ছেড়ে দেবো। কিন্তু তার আগে না… কারণ আমি জানি!
সে থামল, এক পা এগিয়ে নিলয় এর দিকে ঝুঁকে খুব আস্তে বলল–
“ও যতই অস্বীকার করুক… ওর নীরবতার মাঝেই আমি আছি।”
নিলয় নাভান এর শার্ট এর কলার ধরে আগুন চোখে তাকিয়ে বলে।
“তুই ভুল ভাবছিস ! হেরা তোকে ভালোবাসে না!”
নাভান ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তার ঠোঁটে আবার সেই অদ্ভুত, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফিরে এলো—
“ভালোবাসে কি না… সেটা ওর চোখ বলবে, নিলয়। আর আমি সেই চোখ পড়তে জানি।”
চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। একদিকে নিলয়ের স্পষ্ট, দাবিদার ভালোবাসা– অন্যদিকে নাভানের অপ্রকাশিত, গভীর, দখলদার অথচ কোথাও ভীষণ ভাঙা অনুভূতি। আর মাঝখানে — হেরা।যে নিজের হৃদয়ের শব্দটাই শুনতে পারছে না।
নিলয়ের চোখ লাল হয়ে উঠেছে রাগে। দাঁত চেপে হেরার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু হঠাৎ দৃষ্টি ঘুরিয়ে নাভানের দিকে ছুঁড়ে দিল–
“তুই কি ভাবিস, জোর করে কাউকে নিজের করে রাখলে সে তোর হয়ে যায়? হেরা তোকে ভালোবাসে না,এই কথাটা মাথায় ঢুকাস ওকে ”
- নাভান হালকা মাথা কাত করল। ঠোঁটের কোণে সেই ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী হাসি।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিলয়ের সামনে দাঁড়াল–
“তুই অনেক কথা বলিস, নিলয়… কিন্তু একটা জিনিস বুঝিস না।”
তার কণ্ঠ নিচু, ভারী —
“ভালোবাসা তোর মতো করে চাইতে হয় না… আমার মতো করে রাখতেও হয়।
নিলয় তাচ্ছিল্য ভরা হেসে উঠল–
“তুই জোর করে ফাসিয়েছিস, হেরা কোনো জিনিস না যে তুই দাবি করবি ‘আমার!
নাভানের চোখ হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
এক পা এগিয়ে এসে খুব কাছে ঝুঁকে বলল–
“শুন—এই পৃথিবীতে সবাই চাইতে পারে… কিন্তু সবকিছু সবার জন্য না।
তার চোখ সরাসরি নিলয়ের চোখে–
“হেরা আমার। এই সত্যিটা তুই যত তাড়াতাড়ি মেনে নিবি, তোর তত কম কষ্ট হবে।”
নিলয় এবার রাগে ফেটে পড়ল–
“তুই কে রে? তুই ঠিক করবি হেরা কার হবে? ও নিজে মানুষ-ওর নিজের ইচ্ছা আছে!”
নাভান এবার একটু চুপ করল।
তারপর ধীরে ধীরে হেরার দিকে তাকাল… সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা, যা সে লুকাতে চাইলেও পারল না।
“১৮ বার কবুল বলা বউ আমার… এতো সহজে ছেড়ে দিবো?
নাভানের কণ্ঠে চাপা গর্জন। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, যেন ভেতরে আগুন জ্বলছে।
“ও আমার ভালোবাসা না… ও আমার অধিকার। শুধু আমার। আর একটা কথা ভালো করে কানে ঢুকিয়ে রাখ। আমি নেনো সেকেন্ডের জন্যও হলেও তোকে হেরার আশেপাশে দেখতে চাই না। ওর থেকে হাজার মিটার দূরে থাকবি… গট ইট?
তার প্রতিটা শব্দে ছিল দখলদারিত্ব, রাগ, আর ভয়। জারুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে নাভান। হালকা বাতাসে ফুল ঝরছে, কিন্তু এই মুহূর্তে পরিবেশের সৌন্দর্যটুকুও যেন ভারী হয়ে গেছে।
বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা তিনটা খাতা। সামনে হেরা—চোখে বিস্ময়, রাগ, আর অপমানের ছাপ। হঠাৎ নাভান একটা খাতা নিচে ফেলে দিল।
“নাও… এক ঘণ্টা। এগুলো আমি ফেলবো, আর তুমি তুলে আমার হাতে দিবে।”
হেরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো–
“মানে? আপনি কি বলছেন?
“কেনো? শুনতে পাওনি নাকি?
নাভান আরেকটা খাতা ফেলে দিল মাটিতে।
“আমি কেনো এগুলো তুলতে যাবো?”
নাভান এবার ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, চোখ সরাসরি হেরার চোখে–
“৩০ মিনিট ২ সেকেন্ড আগে নিলয়কে তুলে দিয়েছো কিভাবে… ঠিক সেভাবেই তুলবে।”
হেরা দাঁত চেপে বললো–
“আমার জন্য নিলয়ের খাতা পড়ে গিয়েছিলো, তাই তুলেছি। কিন্তু আপনারটা কেনো তুলবো আমি?
নাভানের ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি ফুটলো, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই–
“এই কারণেই তুলবে। কেনো নিলয়েরটা তুলেছিলে? তোমার স্বামী নিজে বলে দিয়েছে,ওই চুইংগাম হিরোর থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু তুমি শোনোনি। তার খাতা তুমি যত্ন করে তুলে দিয়েছো…”
হেরা চোখ ছোট ছোট করে তাকায় নাভান এর দিকে, নাভান আবার একটা খাতা মাটিতে ছুঁড়ে ফেললো,হেরার দিকে গম্ভির চাহনি দিয়ে বললো–
“এখন শাস্তি হিসেবে… এক ঘণ্টা আমি ফেলবো, তুমি তুলবে। একটার পর একটা।”
হেরার চোখে এবার রাগ জ্বলে উঠলো–কটমট করে বলে।
“না। আমি করবো না।”
এই ‘না’ শব্দটা যেন নাভানের অহংকারে সরাসরি আঘাত করলো। নাভান ধীরে ধীরে হেরার দিকে এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝে দূরত্ব প্রায় নেই।
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ়– শাস্তি এই শব্দটা উচ্চারণ করার সময় নাভানের চোখে এমন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল, যেন সে যা বলে, তা করেই ছাড়ে। তার কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কিন্তু ভয়ংকর স্থিরতা আছে।
“শাস্তি তো পেতেই হবে, মিসাইল গার্ল,
-সে ধীরে ধীরে বলল।
“ দুইটা অপশন দিচ্ছি তোমায়! হয় এগুলো করবে… নয়তো আজ তোমাকে সরাসরি আমার বাসায় নিয়ে যাবো।”
-হেরা থমকে গেল। চারপাশে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে। রোদের তাপে গাছের ছায়াগুলোও যেন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হেরা চোখ নামালো না। তার ভেতরে ভয় আর রাগ—দুটোই সমান তালে লড়ছে। নাভান আরেকটু ঝুঁকে এলো। এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাস হেরার গালে উপচে পরছে, উষ্ণ, ভারী, অদ্ভুত মন মাতানো ঘ্রান অস্থির করে দেওয়ার মতো। নাভান থুতনিতে হাত দিয়ে ভাবুক স্বরে বললো ।
“আর বাসায় নিয়ে গেলে কি হবে… “সেটা তো তুমি জানো না, আমি বলে দিচ্ছি ১৮ বার কবুল পরার পরো বাসর করতে পারি নি,এবার সোজা বাসর করবো । বি * ক * জ, তুমি আমার বউ… আর আমি যা বলি, সেটা করে দেখাই। এটা তুমি এ কয়দিনে ভালো বুঝতে পেরেছো নিশ্চয়ই !
- হেরার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। আগের নাভান আর এখনকার নাভানের মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ দেখতে পারছে। দাতে দাত পিষে বলে হেরা।
“কি চাইছেন আপনি? “জানেন আপনার এই দাম্ভিকতা, এই অহংকারের জন্য আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আর এই অহংকার ভাঙার জন্য নেপাল থেকে বাংলাদেশে এসেছি।
নাভান হালকা হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ আছে, আবার অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসও।
“তোমার মন “যা ইচ্ছে করতে পারো । বাট আমি যা বলবো, তা পালন করতে হবে। আমি বলেছি নিলয় এর আশে পাশে যেনো তোমায় না দেখি? বাট তুমি আমার কথা শুনো নি।
“আমি কিন্তু বাবাকে বলে দিবো সব। ( হেরা)
“বাবা বলার আগে ‘শশুর’ অ্যাড করো “তাহলে শুনতে ভালো লাগে।”
হেরা যেন আর নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
“আপনি কি প্রেমিক হবার চেষ্টা করছেন?(হেরা)
নাভানের চোখ হঠাৎ একটু গাঢ় হয়ে উঠল।
“শোনো মেয়ে,তোমার প্রতি আমার কোনো কিউরিসিটি নেই। তুমি আমার পছন্দের লিস্টে নেই… কিন্তু এই শেহতাজ খান নাভানের নামের সাথে যখন জড়িয়ে গেছো, তখন তুমি আমার অধিকার। আর আমি আমার অধিকার নিয়ে কারো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করি না।
কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধল হেরার ভেতরে।
“ছি… আপনাকে দেখলেই এখন ঘৃণা লাগে আমার
” হেরা দাতে দাত চেপে বলল, তার কথা মধ্যেও বিষ ঝরছিল।
“শুধু এই জন্য বেঁচে গেছেন, যে আমার প্রিয় মানুষের রক্ত আপনার শরীরে বইছে। কিন্তু তাই বলে সবসময় চুপ থাকবো, এটা ভাববেন না। অধিকার নিয়ে বড়াই করছেন? এই নামটাই আপনার নামের পিছন থেকে কেটে দিবো… জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
নাভান একটু থামল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল–
“ওটা দেখা যাবে। বাট এখন আমি যা বলবো তাই করো। নয়তো সোজা বাসায়… নিয়ে বাসর।”
“বাসর” শব্দটা যেন হেরার কানে বারবার বাজতে লাগল।
রাগে, অপমানে, দুঃখে, সব মিলিয়ে সে যেন ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। কিন্তু শেষমেশ দাঁত চেপে নাভানের কথা মতো খাতাগুলো তুলতে শুরু করল। একটা… দুটো… তিনটা… মাটিতে ছড়িয়ে থাকা খাতাগুলো একে একে তুলে নাভানের হাতে দিচ্ছে সে। সময় যেন থেমে গেছে। প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে এই একই কাজ। আর এই পুরো সময়টা, নাভান একবারও চোখ সরায়নি।
সে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত মুগ্ধতায়। রোদের তাপে হেরার ফর্সা মুখ লাল আভা ধরেছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, থুতনি পেরিয়ে গলার দিকে নেমে যাচ্ছে। সেই ঘামের ফোঁটাগুলো গলার ছোট ছোট তিলের উপর এসে থামছে,,যেন কোনো শিল্পীর আঁকা দৃশ্য। নাভান যেন কিছুক্ষণের জন্য সব ভুলে গেল। তার দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
হেরা যখন সব খাতা তুলতে বেস্ত , তখন নাভান সামনে এসে দাঁড়াল। এত কাছাকাছি দাঁড়ানো নাভানকে দেখে হেরা একটু ভড়কে গেল।
“আপ আপনি এতো কা,,
কিছু বলার আগেই নাভান পকেট থেকে রুমাল বের করল। একটুও অনুমতি না নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে দিল,হেরার গলার কাছে। নরমভাবে।
খুব যত্ন করে। তিলের উপর জমে থাকা ঘামের ফোঁটা মুছে দিল সে। মুহূর্তটা যেন থমকে গেল।
হেরা থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। নাভানের আঙুলের স্পর্শ তার কণ্ঠদেশ ছুঁয়ে গেল,আর তার পুরো শরীর যেন অদ্ভুত এক ঠান্ডা স্রোতে ভরে উঠল।এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… তারপর হঠাৎই সে চোখ বন্ধ করে জোরে ধাক্কা দিল নাভানকে।
“আপনি আসলে অসভ্য!
কাঁপা গলায় বলে উঠল হেরা ।
“এক নম্বরের লুচু! মেয়েদের শরীর ছোঁয়ার সুযোগ খুঁজেন সবসময়! ছি!”
নাভান ভ্রু তুলল, যেন মজা পাচ্ছে।
“লুচুর কি করেছি, হুম?”
“আমার গলায় হাত দিয়েছেন কেনো?”
নাভান এবার একটু ঝুঁকে এল, কণ্ঠ নিচু করে বলল’
“তোমার ওই গলার তিলের উপর কিছু যাতে না পড়ে… মিসাইল গার্ল। ভালো হবে না কিন্তু।
হেরা হতভম্ব।
“মানে?”
নাভানের চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক দিল।
“মানে… লুচুর কিছু করি নাই। বাট তুমি আমাকে লুচু বলেছো… তাই এখন লুচুর কাজ করবো। ওয়েট।”
“কি—?!”
আর কিছু বলার আগেই–
“জি!” বলে চিৎকার করে উঠল হেরা।
তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি।দৌড়ে পালিয়ে গেল।
পিছনে দাঁড়িয়ে নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। নরম… কিন্তু গভীর। মিসাইল গার্ল… সত্যিই তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
জারুল গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল আরও তিনজন—অধীর, সৃজন আর ঝিনুক।
তিনজনের অবস্থা এমন, যেন কেউ তাদের সামনে লাইভ কোনো সিনেমা চালিয়ে দিয়েছে—আর তারা পপকর্ন ছাড়া বসে আছে!
অধীর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এতটাই বড় যে মনে হচ্ছে চোখ দুটো এখনই জারুল গাছের কোটরে ঢুকে যাবে। সৃজন মুখ চেপে ধরে আছে—হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণ বারবার কেঁপে উঠছে।
আর ঝিনুক? সে তো একেবারে স্তব্ধ! মুখ হাঁ করে তাকিয়ে আছে, যেন সামনে কোনো বিরল প্রজাতির প্রাণী দেখছে। নাভান যখন হেরার গলার ঘাম মুছলো—তিনজন একসাথে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। তারপর… নাভান যখন হাসল। একদম নরম, একটু রোমান্টিক সেই হাসি— তখন তিনজনের অবস্থা দেখে মনে হলো, তারা এখনই অজ্ঞান হয়ে পড়বে! অধীর প্রথমে সামলে উঠল। ধীরে ধীরে সৃজনের কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“আমি কি বেঁচে আছি? না কি মরে গিয়ে জান্নাতে চলে গেছি? কারণ আমার সামনে যে দৃশ্যটা হচ্ছে, এটা তো দুনিয়াতে হওয়ার কথা না!”
সৃজন কষ্ট করে হাসি চেপে বলল—
“চুপ কর! শব্দ করিস না… নইলে রোমান্স সিনটা মিস হয়ে যাবে!”
ঝিনুক নিচু গলায় বলল–
“এইটা কি সেই নাভান? যে মেয়েদের সামনে দাঁড়ালেই পাঁচ হাত দূরে থাকে? না কি নতুন কোনো ভার্সন আপডেট হয়েছে?”
অধীর মাথা নাড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“ভাই… এইটা আপডেট না। এইটা ফুল সিস্টেম হ্যাক! মিসাইল গার্ল সরাসরি হার্ডডিস্কে ঢুকে গেছে!
অধীর এবার আর পারল না—মুখ ঘুরিয়ে হালকা করে হেসে ফেলল।
“আমি বলছিলাম না? যদি থাকে নসিবে বন্ধু… আমার প্রেমে পড়িয়া একা একা হাসিবে!”
সৃজন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল–
“আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাইভ টেলিকাস্ট দেখবো! ফ্রি তে!
ঝিনুক ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল–
“তোমরা একটু সিরিয়াস হ! অহংকারী অসভ্য গিটার ওয়ালা থুরি আমাদের গিটার ওয়ালা হিরো যে সত্যি সত্যি হাসছে ভাই!
অধীর চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল–
“না, আমি এটা মানতে পারছি না। এই ছেলেটা নাভান না! এইটা ডুপ্লিকেট! আসল নাভান কোথায় লুকানো আছে, বইন চল আমাদের গিটার ওয়ালা হিরো ভাই কই আছে আগে সেটা বের করি!!
ঠিক তখনই,,হেরা দৌড়ে চলে গেল। নাভান দাঁড়িয়ে রইল… ঠোঁটে সেই অদ্ভুত হাসি নিয়ে।
এই দৃশ্য দেখে অধীর নিজের মাথায় হাত দিল।
“গেলো… বন্ধু গেলো! আমাদের বিবাহিত সিংগেল রাজা আজকে আনঅফিশিয়ালি কমিটেড হয়ে গেল!
সৃজন চাপা গলায় বলল–
“ হুশশ… একটু আস্তে! শুনে ফেললে আমাদের লাশও পাওয়া যাবে না!”
অধীর হেসে বলল–
“ কি জা তা বলছিস, এখন ট্রিট দেবার পালা আমাদের,সেখানে আমরা অক্কায় গিয়ে তাদের চল্লিসার ট্রিট দিবো কেনো।
ঝিনুক চোখ পাকালো-
“তুই চুপ করবি? সবকিছু তোর কাছে ফানি লাগে!”
অধীর গম্ভীর মুখ করে বলল
“না, আমি খুব সিরিয়াস। এখন আমার একটা দায়িত্ব আছে।”
সৃজন ভ্রু তুলল—
“কি দায়িত্ব?”
অধীর নাটকীয় ভঙ্গিতে আঙুল তুলে বলল—
“বন্ধুকে বাঁচানো! এই প্রেম নামক ভয়ংকর রোগ থেকে! আমি মরেছি মরেছি কিন্তু বন্ধু প্লাস ভাইকে মরতে দিতে পারি না।
তারপর হঠাৎ করেই চুপচাপ এগিয়ে গেল নাভানের দিকে।
সৃজন আর ঝিনুক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,ঝিনুক বললো সৃজনকে।
“এই পাগলটা আবার কি করতে যাচ্ছে!”
অধীর ধীরে ধীরে গিয়ে নাভানের পেছনে দাঁড়াল।
তারপর—
চুপিচুপি…
হঠাৎ করে নাভানের কোমরে একটা জোরে চিমটি কাটল!
“আহ্—!”
নাভান চমকে উঠল, প্রায় লাফিয়ে সামনে সরে গেল।
পেছনে ঘুরে রাগী চোখে তাকাতেই দেখল—অধীর দাঁড়িয়ে আছে, মুখে একেবারে নির্দোষ হাসি।
“কি রে? ভূত দেখলি নাকি?” অধীর মিষ্টি গলায় বলল।
নাভান চোখ সরু করে তাকাল,,মুহুতে মুখটা গম্ভির করে বললো।
এমন করার মানে কি “আমার হাতে মরতে চাইছিস?”
অধীর মাথা নাড়িয়ে বলল—
“না না! আমি তোকে বাঁচাতে আসছি!”
“আমাকে বাঁচাতে?
নাভান যেনো কিছুই বুঝলো না কি বলতে চাইছে অধীর। অধীর গম্ভীর হয়ে গেল।
“হ্যাঁ!” তুই একটু আগে হাসছিলি। রোমান্টিক মুডে ছিলি। এইসব লক্ষণ খুব খারাপ ভাই।
সৃজন আর ঝিনুকও এসে দাঁড়াল পাশে।
সৃজন ঠোঁট চেপে বলল-
“আমরা অনেকক্ষণ ধরে অবজার্ভ করছি…”
ঝিনুক মাথা নেড়ে যোগ করল-
“সিচুয়েশন খুব সিরিয়াস ভাই “
অধীর আবার বলল–
“বন্ধু… তুই প্রেমে পড়েছিস?
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলল–
“শেষ তোদের নাটক!
অধীর হাসল-
“না, এখনো শুরু!
নাভান এক পা এগিয়ে এল।
“আর একটা কথা বললে এখানেই তোকে গাছের সাথে বেঁধে রেখে দিবো ইডিয়েট।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল–
“ঠিক আছে! কিছু বলছি না… কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস — সে চোখ টিপে বলল
“মিসাইল গার্ল কিন্তু ডিরেক্ট হার্ট টার্গেট করে!”
সৃজন হেসে ফেলল। ঝিনুক মাথা নাড়িয়ে বলল
“গেম শুরু হয়েছে, বস। তুমি যতই গম্ভির মুখে থাকো না কেনো,,তুমি যে কি চাইনিজ থুরি তুমি যে কি রুমান্টিক চিজ তা আমরা দেখেফেলেছি।
নাভান কিছু বলল না। শুধু একবার তাকাল সেই দিকটায়—যেদিকে হেরা দৌড়ে চলে গেছে। তার ঠোঁটে আবার সেই অদ্ভুত, নরম হাসিটা ফুটে উঠল, নাভান কে আবার হাসতে দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন বন্ধু—একসাথে মাথায় হাত দিল।
“গেলো…
অধীর একটু জোরেই বললো
গেলো রে গেলো এইবার সত্যিই গেলো।
চলবে,,,,
( সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এতো দিন এক্টিভ ছিলাম না, ভাই,আর বাতিজির বিয়ে, রুশা ও একটু বিজি,কারো সাথে কানেক্ট ছিলাম না , সবাই গল্প পরে কমেন্ট করবা কেমন হইছে,ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন ? )
প্রেমের বাজিমাত পর্ব-৩৩