
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজও রুশা
পাঠ-২৩
হেরা নাভানের সঙ্গে ঝামেলা করতে করতে কখন যে তার শক্ত বুকের উপর আছড়ে পড়ে গেছে—তা যেন সে নিজেই বুঝতে পারে নি । মুহূর্তটা এমন দুজন অপ্রস্তুত ছিলো … সময়টা যেন থেমে গেছে তাদের দুজনের মাঝখানে। নাভানের বুকের সাথে লেগে আছে হেরার শরীর। তার ছোট ছোট মুঠো দিয়ে সে যেন অজান্তেই নাভানের বুকে হাতুড়ি পেটাচ্ছে—রাগে, অভিমানে, না কি অন্য কোনো অদ্ভুত অনুভূতিতে… সে নিজেও জানে না। নাভান স্থির। একদম স্থির। কিন্তু তার চোখ… সেই চোখে আজ অন্য কিছু। মাতাল করা এক চাহনি—যেখানে রাগ নেই, অহংকার নেই… আছে শুধু একরাশ নরম মায়া। সে চেয়ে আছে তার ‘মিসাইল বউ’-এর দিকে, হ্যা তার বউ তো আজ সবার সামনে সে স্বীকার করেছে হেরা তার বউ।
হেরার চোখদুটো ভেজা… কান্নার ফলে তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে—টসটসে আপেলের মতো। কিন্তু সেই কান্নাই যেন তার সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। অদ্ভুত এক নিষ্পাপতা ফুটে উঠেছে তার মুখে… যা দেখে নাভান এক মুহূর্তের জন্য নিজের সব হিসাব-নিকাশ ভুলে গিয়ে মারা ভরা চাহনি দিয়ে দেখছে তার নেশাময়ীকে,,নাভানের তো এই মেয়েকে নেশাময়ীর মতো লাগে,এই যে একবার তাকালে বেহাইয়া চোখ না চাইতেও আবার দেখতে মরিয়া হয়ে উঠে । হেরার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে। হেরা হঠাৎই টের পায়—নাভান কতটা কাছে তা । খুব… খুব কাছাকাছি।
তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে যেন ছড়িয়ে পড়ছে সেই পরিচিত পারফিউমের গন্ধ। আগেও দুইবার এমনভাবে কাছে এসেছিলো নাভান… কিন্তু আজকের মতো এতটা তীব্র কখনো লাগেনি। হেরা মনে মনে ভাবে—
“এই পারফিউমে এমন কী আছে…? কাছে এলেই কেন মাথা ঘুরে যায়… কেন মনে হয় সব ভুলে যাই…?”
আরো পড়ুন
তার বুকের ভিতরটা কাঁপছে। নাভানও চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তার চোখে যেন হাজারটা কথা… কিন্তু ঠোঁট নড়ছে না মুখ থেকে একটাও শব্দ বের করতে পারছে না। সে শুধু তাকিয়ে আছে—হেরার চোখে, গালে, কাঁপতে থাকা ঠোঁটে…
গাড়ির ভেতরটা যেন হঠাৎই অন্য এক জগতে পরিণত হয়েছে ইতিমধ্যে ।
শুরুতে যেখানে ছিলো ঝামেলা, তর্ক, রাগ—এখন সেখানে এক অদ্ভুত নীরবতা… যেখানে শুধু দুজন মানুষ একে অপরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনুভব করছে।
সময় যেন থেমে আছে। হঠাৎ—পেছন থেকে গাড়ির হর্নের তীব্র শব্দ। দুজনেই চমকে ওঠে। যেন হঠাৎ করেই বাস্তবে ফিরে আসে তারা। নাভান দ্রুত স্টিয়ারিংয়ের দিকে তাকায়, আর হেরা সরে যেতে গিয়েও থমকে যায় এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর চোখ নামিয়ে নেয়।
সামনে তাকাতেই তারা দেখে—তিন টা বাইকের উপর তিন জোড়া কপোত-কপোতি দাঁড়িয়ে আছে। তুষার যোগ দেয় তাদের সাথে।তুষার ইচ্ছে করেই গাড়ির হর্ন বাজায়,, শব্দে নাভান ও হেরার যেন হুঁশ ফিরে । দুজনেই তড়িঘড়ি করে একে অপর থেকে সরে যায়।
নাভানের ভেবেছিলো হেরাকে সে নিজে পৌঁছে দিবে কিন্তু পুলিশ আর এখন বন্ধুমহল এর জন্য বোধয় আর হবে না, সে কিছু বলার আগেই—হেরা দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে নেমে যায়।
বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুশা আর রোজ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাদের চোখে স্পষ্ট কৌতূহল—কিছু একটা তারা বুঝেছে, কিন্তু পুরোটা না।
হেরা তাদের পাশ কাটিয়ে… একবারও পেছনে না তাকিয়ে, চোখের পলকে আরেকটা গাড়িতে উঠে বসে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। সবাই স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। নাভানও। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা… আর ঠোঁটের কোণে চাপা এক হাসি—যেন কিছু একটা শুরু হয়ে গেছে, যেটা সে থামাতে পারবে না। আর রুশা, রোজ… তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকায়—কারণ তারা দুজনই স্পষ্ট দেখেছে…কিছুক্ষণ আগেও, এই দুই মানুষ এর মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিলো না—তারা ছিলো একদম… একে অপরের ভেতরে জড়িয়ে।
কাজল খান সবার সামনে সবসময় কঠোর। যেন পাথরের মতো শক্ত একজন মানুষ। কিন্তু এই মুহূর্তে কেবিনে একা । মন থেকে ভেঙে পড়েছে।
প্রিয় মানুষটাকে এত কাছে দেখে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এত বছর পেরিয়ে গেছে, তবু ভালোবাসাটা এক বিন্দুও কমেনি। কিন্তু অভিমানও কম নয়। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা তাড়াতাড়ি মুছে ফেলে কাজল। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে কেবিনে ঢোকে শামসুল। শামসুল ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি টেনে বলে।
“সুন্দরী, শুনলাম তোমার এক্স স্বামী নাকি এসেছে?
কাজল মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসে। চোখ দুটো রক্তলাল হয়ে ওঠে শামসুল এর কথায়। রাগী কর্কশ গলায় বলল।
“চুপ! একদম চুপ। কিসের এক্স?
না আমি তাকে ডিভোর্স দিয়েছি, না সে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে।
এখনো আইনত আমি তার স্ত্রী।
কিন্তু তাই বলে সেই মানুষকে আমি মানি,তাও কিন্তু না। বাট বাহিরের লোকের মুখে আমি এসব শুনতে চাই না সো স্টপ।
শামসুল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে কটাক্ষ করে বললো।
“তাহলে সে বিয়ে করল কেন?
কাজল ঠান্ডা কিন্তু বিষাক্ত কণ্ঠে বলে।
“সে দশটা বিয়ে করুক, তবুও আমি তাকে ডিভোর্স দেব না।
আমার জীবনে বিয়ে একবারই হয়েছে… ব্যাস।
দ্বিতীয়বারের জন্য আমার জীবন খালি নেই।
শামসুল কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে!
তুমি ভুল করছো সুন্দরী । আমি তোমার জন্য কী না করেছি!তুমি তাও অই লোকের পিছনে পরে আছো কেন?
কাজল ঠোঁট বাঁকায়। চোখে তাচ্ছিল্যের আগুন।
“ভদ্র শয়তান কাকে বলে কেউ যদি দেখতে চায়,
আমি তাকে তোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেব।
তোকে তো জাদুঘরে রাখা উচিত, মানুষ দেখে শিখবে,
ভদ্রতার মুখোশ পরা শয়তান কাকে বলে।”
শামসুল মৃদু হেসে বলে।
“সুন্দরী, তোমার অপমানও আমার কাছে সুনামের চেয়েও মধুর লাগে!
কাজল খানের রাগ তখন আকাশ ছুঁয়েছে। একটু আগেই জাওয়াদ খানের মুখোমুখি হয়েছে সে, তার উপর আবার এই লোক এসে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে। আজ প্রথম ছেলের চোখের পানি দেখেছে বুকটা যে পুড়ছে তার।
দাঁত চেপে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাজল খান বলে—
“রেডি থাক শামসুল। তোর আজরাইলের কাছে আমি চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছি। মরার আগে পাপ মোচনের একটা সুযোগ দিলাম সত্যিটা বল।কেন তুই তোর দ্বিতীয় বউকে মেরেছিস?আর কেন জিহান আমার নামে সেই মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে?”
শামসুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলে।
“সুন্দরী… তুমি আমার হয়ে যাও।
সব সত্যি আমি নিজেই পরিষ্কার করে দেব।”
কাজল যেন আগুন হয়ে ওঠে।
“ইহকালে না, পরকালে না,কোনো কালেই আমি তোর হব না। এই কথাটা মনে রাখিস।”
শামসুল ধীরে বলে।
“তোমার কি একটুও মায়া হয় না সুন্দরী?”
কাজল তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়।
“শয়তানের জন্য মায়া?
আমার অভিধানে সেই শব্দ নেই।”
হঠাৎ শামসুলের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখে অদ্ভুত অন্ধকার নেমে আসে।
“হ্যাঁ, আমি শয়তান। আমি খারাপ। কিন্তু তোকে পাওয়ার জন্য আমি আরও খারাপ হতে রাজি।দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তোকে ভালোবেসেছি। প্রতিদানে কী পেয়েছি বল? কিছুই না।আমি একা থাকব, তোকেও একা রাখব। তোকে ভালোবেসে আমি আমার সংসার ছেড়েছি, মেয়ে ছেড়েছি, নেশা ছেড়েছি… আর তুই ভালো থাকবি? এটা কীভাবে মেনে নিই বল?”
শামসুল নিজের হাতের দিকে তাকায়।
“তোকে পেতে এই হাত রক্তে রাঙিয়েছি আমি। দরকার হলে আবার রাঙাব। কিন্তু তোকে আমি কোনোদিন সংসারী হতে দেব না, সুন্দরী।”
কাজল খান এবার উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে আগুন, কণ্ঠে ঘৃণা।
“তুই যদি সত্যিকারের ভালোবাসতি, তাহলে আমার চোখে তোর জন্য সামান্য সম্মান থাকত। কিন্তু তোর ভালোবাসায় আছে জিততে চাওয়ার অহংকার, না পাওয়ার আক্ষেপ। আমি তোকে কোনোদিন ভালোবাসি বলিনি। তাহলে কেন এখনো আমার পেছনে পড়ে আছিস? আর কেন তুই তোর দ্বিতীয় বউকে মেরেছিস? প্রথম বউ কে ছেড়েছিস? ”
শামসুল এবার সম্পূর্ণ নিরুত্তর।
শামসুল শেষবারের মতো তাকিয়ে বলে।
“আর একটা কথা শুনে রাখ!! জাওয়াদ খান যেন তোর আশেপাশেও না আসে। নইলে খুব খারাপ হবে। আমি একা… তুইও একা থাকবি।”
এই বলে শামসুল ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হয়ে গেলে কাজল খান চেয়ারে বসে পড়ে। মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দেয়।
নিজের সাথেই ফিসফিস করে বলে।
“এ কেমন ভালোবাসা…
যার জন্য মানুষ নিজের স্ত্রী–সন্তানকেও ছাড়তে পারে…?”
কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
“আমি কিভাবে এর থেকে মুক্তি পাবো…?”
~~~~
কাজল খানের ঠোঁট কাঁপছিল। কথাটা যেন বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো।
“কিসের মুক্তি, মা?”
পিছন থেকে ভেসে এলো কড়া কণ্ঠ।
“আর ওই লোকটা আবার কেন তোমার কেবিনে ঢুকছে? তুমি কেন তাকে এলাউ করো? কী সম্পর্ক তোমার সঙ্গে ওই লোকটার?”
কথাগুলো শুনে কাজল খান যেন হঠাৎ বিদ্যুৎ খেয়ে চমকে উঠলেন। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলেন,নাভান দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অদ্ভুত আগুন। এই মুহূর্তে নাভানকে এখানে দেখবেন,এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
নিজেকে সামলানোর জন্যই তিনি এত আয়োজন করেছিলেন, এত দেয়াল তুলে রেখেছিলেন নিজের চারপাশে। কিন্তু নিজের ছেলে যে সেই দেয়াল ভেঙে সামনে এসে দাঁড়াবে, সেটা তিনি ভাবেননি।
তার ছেলে তার থেকে ,এক কাঠি উপরে,এটা তিনি ভালো করেই জানেন।
কিন্তু আর কতদিন লুকিয়ে রাখা যায়?
একটা সত্যের মুখোমুখি হলেই তো আরেকটা সত্যি বেরিয়ে আসবে।
শামসুলকে তিনি চাইলে অনেক আগেই শেষ করে দিতে পারতেন। তবু পারছেন না… কোনো এক অদৃশ্য কারণে। নাভানের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুক, তুষার, সৃজন আর অধীর। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে কাজল খান এক মুহূর্ত চোখ সরিয়ে নিলেন।কী বলবেন তিনি?
নিজের ছেলের চোখে আজ যেন চোখ রাখতে পারছেন না। বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা।
ওই মানুষটা যেন সব রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে তার।
যদি আজ ছেলে তার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলে…?
তাহলে তিনি ভেঙে পড়বেন সত্যি ।
এই শক্ত খোলসের আড়ালে যে নরম মানুষটা লুকিয়ে আছে সেটা বেরিয়ে আসবে মুহুর্তে। কিন্তু সেটা তিনি কিছুতেই চান না।
ঠিক তখনই নাভানের কণ্ঠ আবার কানে বাজলো।
“কি হলো, মা? বলো,ওই লোকটার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? কী লুকাতে চাও? লাভ নেই… আমি জানি।”
“আমি জানি”এই কথাটা শুনেই কাজল খানের বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধকধক শুরু হলো।
মস্তিষ্কের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো ।নাভান আবার বলল!!”
“এমনি এমনি কেউ কাউকে সন্দেহ করে না। সেটা তুমি জানো। এক হাতে যেমন তালি বাজে না, তেমনি একা কাউকে দোষও দিচ্ছি না। বলো,কি এমন সম্পর্ক তোমা এই লোক এর সাথে , যার জন্য বাবা বারবার বলছে তুমি তার বিশ্বাস ভেঙেছো?”
কাজল খান হঠাৎ কঠিন হয়ে গেলেন।
চোখে আগের সেই কঠোরতা ফিরিয়ে এনে বললেন”
“নাভান, তোমার কথার কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই। আর দেবও না।”
কথাটা বলেই তিনি পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।
কাজল খান বেরিয়ে যেতেই নাভান প্রচণ্ড রাগে ডেস্কের উপর সজোরে ঘুষি মারলো। ধাম করে।
ঝিনুক দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললো। সে জানে,এখন যদি না আটকানো যায়, তাহলে নাভান পুরো কেবিনটাই ভেঙে ফেলবে। কারণ রাগ উঠলে এটাই তার স্বভাব।
“দোস্ত, ঠান্ডা হ!”
ঝিনুক বলল।
“এভাবে কিছু হবে না। আমাদের অন্য প্ল্যান করতে হবে।”
সৃজনও মাথা নেড়ে সায় দিল।
নাভান দোস্ত যে সত্য এতো বছরে বের করতে পারলি না তা আজ পারবি এটা ভাবলি কি করে?
তুষার ফোড়ন কেটে বলে।
“সালা বাবু’ গেম খেলতে হবে এখন” তোমার টাইম এখন শুরু হয়ে গেছে গেম খেলার।
ঝিনুক কিছুটা অবাক সুরে বললো?
“গেম?
” উফফফ ঝিনুক মালা’ তোমাদের গোয়েন্দা বুদ্ধি কাজে লাগাও এবার?
অন্যদিকে…
জাওয়াদ খানের গলা ভারী হয়ে উঠলো।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“দুনিয়া সমাজ কী বললো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি তোমার বাবা,মানে আমি তোমার বাবা। সমাজ না মানলে সমাজ ছাড়াই চলবো… কিন্তু সত্যিটা বদলাবে না।”আর না বদলাতে চাই আমি। হেরা থমকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে পানি জমে উঠছে।
“তুমি এতদিন বলো নি কেন, বাবা? আমাকে সত্যিটা কেন বলো নি?”
কান্নারত গলায় বলে হেরা । জাওয়াদ খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি কোনোদিনই বলতাম না… যদি আজ এমন পরিস্থিতি না আসতো।”
হেরা মাথা নাড়লো।
“আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
জাওয়াদ খান চোখ শক্ত করে বললেন।
“কোনো সত্যি নেই। তুমি আমার মেয়ে,এটাই সত্যি। এই নিয়ে আর একটা কথাও হবে না। একটা ও না।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন।
“আমি জেনে শুনে তোমাকে বিপদে ফেলতে পারবো না।”
তখন পাশ থেকে মিনতি করে উঠলো রোজ।
“ছোট বাবা, প্লিজ এমন করবেন না। সত্যিটা বলুন। হেরার বাবা–মা কে?”
হ্যাঁ ছোট বাবা বলো না প্লিজ
চারদিকে এমনিতেই সব ওলটপালট হয়ে গেছে।
নাভান ভাই আপনার ছেলে, হেরা আপনার মেয়ে,এটা আমরা কয়েকজন জানি। কিন্তু সমাজ? দুনিয়ার মানুষ? তারা যখন পরিচয় জানতে চাইবে তখনো কি চুপ থাকবেন, ছোট বাবা?”
রুশা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,রোজ রুশার প্রশ্নে, জাওয়াদ খান চোখ বন্ধ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে হেরাকে বুকে টেনে নিলেন।
“দরকার হলে আমি এই সম্পর্ক থেকেই বের করে আনবো আমার আম্মাজানকে … কিন্তু সমাজের চোখে আমি তাকে আমার মেয়ে ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় দেব না।”
আমি চাই না আমার আম্মাজানের কোনো ক্ষতি হোক।”
হেরা চুপচাপ তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। জাওয়াদ খান তার কথায় অটুট,, পরদিন ভার্সিটিতে ।
“কি শুনছি ফেরা ফুল।
হন্তদন্ত হয়ে ভার্সিটিতে ঢুকে এসব কথা শুনে পাগল প্রায় নিলয়,সিয়াম আটকাতে বের্থ। এতোদিনের পরিপাঠি ঘুছানো ছেলেটা মুহুর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যেনো। বুঝাই যাচ্ছে দৌড়ে এসেছে হেরার সামনে ঘেমে নেয়ে একাকার হাপাতে হাপাতে আবার বললো নিলয়। তা কন্ঠে ভয়।
“ওই শেহতাজ খান নাভানের সঙ্গে নাকি তোমার বিয়ে হয়েছে?”
নিলয়ের কণ্ঠটা কাঁপছিল। চোখ দুটো রক্তলাল, নিঃশ্বাস ভারী।
সে যেন নিজেকে আর সামলাতে পারছে না।
“বলো! সবাই যা বলছে,সব মিথ্যা! বলো হেরা… বলো!”
হঠাৎ সে হেরার দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে লাগলো।
“কি হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো—সব মিথ্যা!”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ, রুশা, অধীর—সবাই নিঃশব্দ। বাতাসটা পর্যন্ত ভারী হয়ে গেছে। রোজ ও রুশা জানে চুইংগাম হিরো হেরাকে কতটা ভালোবাসে হেরাও জানে কিন্তু হেরা তো কতোবার বলেছে সে এসব সম্পর্কে যেতে চায় না ভালো বন্ধু হয়ে থাকতে চায়। ছেলেটার প্রতি তার টান আছে সেটা বন্ধুত্বর বাট প্রেমিক হিসেবে নয়। তাও যেনো হেরা সজ নিজেকে অপরাধী মনে করছে,নিলয় এর চোখের সাথে চোখ মিলাতে পারছে না।
হেরা ধীরে ধীরে মাথা তুললো।তার চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা… যেন ভেতরে কোথাও ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বললো না।
তারপর হেরা খুব ধীরে বললো।
“না… সব সত্যি, নিলয়… কিন্তু আমি এই বিয়ে—”
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এলো একটা ঠান্ডা, গভীর কণ্ঠ।
“হাতটা ছাড়, নিলয়।”
কণ্ঠটা এতটাই স্থির, এতটাই ঠান্ডা,,, যেন বরফের ধারালো টুকরো। সবাই ঘুরে তাকালো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে শেহতাজ খান নাভান।
কালো শার্ট এর নিচে সাতা গেঞ্জি আর কালো পেন্ট বরাবরের মতো চকলেট হিরোর লুক , চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মুখে কোনো রাগ নেই,কিন্তু সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর। হেরা তাকায় এক পলক কি এ্যটেটিউড এই ছেলেটার মধ্যে, কথা বলা চাল চলন সব কিছুতেই দাম্ভিক একটা ভাব,মুহুর্তে হেরা চোখ সরিয়ে ফেলে গত কয়েকদিন নাভান হেরাকে ফোনের উপর ফোন দিয়েছে কিন্তু হেরা ফোন তোলে নি। সে নিজেকে একটু সময় দিয়েছিলো। নাভান কে দেখে নিলয়ের চোখ মুহূর্তে জ্বলে উঠলো। সে ঝটকা দিয়ে হেরার হাত ছেড়ে নাভানের দিকে এগিয়ে গিয়ে শার্টের কলার চেপে ধরলো।
“তোকে আমি কিছু বলেছি?”
তার গলা কাঁপছে রাগে।
তুই আমাদের মধ্যে নাক গলাচ্ছিস কেন?”
নাভান একটুও নড়লো না। শুধু ধীরে ধীরে বললো।
“কারণ… ও আমার অধিকার।”
কথাটা এমনভাবে বললো সে,,,যেন এটা কোনো দাবি নয়, বরং এতো দিনের অস্বীকার করা অসম্ভব কোনো সত্য। হেরার বুক হঠাৎ ধক করে উঠলো।
“ও আমার অধিকার…”
এই কথাটার ভেতরে যেন অদ্ভুত কিছু ছিল।
একটা অদৃশ্য শক্তি। মুহূর্তের জন্য হেরা স্থির হয়ে গেল,একটা মূর্তির মতো। কিন্তু না…
সে নিজেকে শক্ত করলো।সে কখনোই নাভানকে মানবে না। নিলয় দাঁতে দাঁত চেপে বললো।
“কলার থেকে হাত ছাড় নিলয়।”
নাভান শান্ত স্বরে বললো।
“না ছাড়বো না!”
নিলয়ের চোখে ঘৃণা।
“তুই চিটার! তুই প্রতারক!”
নাভান ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললো।
“তাই নাকি? কি চিটারি করলাম বল তো?”
নিলয় হেসে উঠলো,একটা তিক্ত হাসি।
“আমি জানি তুই এসব করেছিস বাজি জেতার জন্য!”
চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে।
নিলয় আবার চিৎকার করে উঠলো।
“নিজের বোনকে বিয়ে করেছিস? শুধু একটা বাজির জন্য?
হঠাৎ চারপাশে চাপা গুঞ্জন।নাভানের চোখে এবার সামান্য আগুন জ্বলে উঠলো। কিন্তু তার কণ্ঠ এখনও ঠান্ডা
সে আমার বোন নয় সেটার প্রমান হয়েছে “আর “বাজি থাকে খেলায়।”হেরা কোনো খেলনা নয়… যে তাকে নিয়ে খেলবো।”
নিলয় যেন এই কথার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
সে মোবাইল বের করলো।
“সেই দিনের বাজি মনে আছে?”
নাভানের চোখ সরু হয়ে এলো।নিলয় প্লে বাটন চাপলো। মোবাইল থেকে ভেসে এলো রেকর্ড করা কণ্ঠ।
“আমি জিতলে আমার যা ইচ্ছে তাই করবো… তুই কিছু বলতে বা করতে পারবি না।”
কণ্ঠটা স্পষ্ট। নাভানের কণ্ঠ। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
রোজ, রুশা, অধীর,,সবাই হতবাক।
হেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ আগেও তার মনে যে সন্দেহ, দ্বিধা ছিল—তা যেন মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠলো। সে নাভানের দিকে তাকালো। একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তারপর—
“””থু!
নাভানের সামনে মাটিতে থু থু ফেলে দিলো।
সবাই স্তব্ধ। হেরা ঠান্ডা গলায় বললো।
“মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে… তা আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না।”
তার চোখে ঘৃণা।
“প্রিয় ঠিকই বলেছিল। আপনি একটা মুখোশ পরা শয়তান।”
নাভান এবারও কিছু বললো না। হেরা আবার বললো।
“আর শুনুন, মিঃ শেহতাজ খান নাভান…”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু দৃঢ়।
“আমি এই বিয়ে মানি না।”
এটা বলে সে ঘুরে দাঁড়ালো। একবারও পিছনে তাকালো না। ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। নিলয় ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালো নাভানের দিকে।
“দেখলি? সামান্য একটা ভয়েস রেকর্ডই তোকে শেষ করে দিল।”
নাভান তখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটলো।খুব নিচু স্বরে বললো।
“সামান্য একটা ভয়েস দিয়ে… তুই ভাবছিস ওকে আমার থেকে সরিয়ে দিবি?”
তার চোখে ভয়ংকর এক জেদ।
“সো স্যাড, নিলয়।”
তারপর খুব ধীরে বললো।
“হেরা আমার মানে আমার!!
নিলয় ও সেম এমই ভাবে এক সেকেন্ড থামলো না বলে উঠে । তার কণ্ঠ আরও গভীর হয়ে উঠলো—
“মরার একদিন আগে হলেও… সে আমারই হবে।”
হেরা চলে যাওয়ার পর জায়গায়টা অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ হয়ে রইলো।
নিলয় ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে।
চারপাশে সবাই মনে করছে—
নাভান হেরে গেছে। কিন্তু নাভান? সে একদম নড়লো না। কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে নিজের শার্টের কলার ঠিক করলো। তারপর খুব আস্তে হাসলো। অদ্ভুত একটা হাসি। যেটা দেখে নিলয়ের বুকের ভেতর হালকা কাঁপন উঠলো।
“সামান্য একটা ভয়েস রেকর্ড দিয়ে ভাবছিস সব শেষ?”
নাভান নিচু গলায় বললো।
নিলয় হেসে উঠলো।
“শেষ না? সবাই শুনলো এখন। তোর মুখোশ খুলে গেছে।”
নাভান এবার মাথা একটু কাত করলো।
তার চোখে সেই ভয়ংকর শান্ত দৃষ্টি।
“মুখোশ খুলেছে?”
সে ফিসফিস করে বললো—
“না নিলয়… মুখোশ তো এখনো পরিই নি।”
কথাটা শুনে রোজ আর রুশা একে অপরের দিকে তাকালো।
নিলয় বিরক্ত হয়ে বললো—
“নাটক করিস না।”
নাভান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“একটা কথা বল তো…”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা।
“যে ভয়েসটা শুনালি… সেটা কোন দিনের?”
নিলয় একটু থেমে গেল।
“তোর মাথা গেছে নাকি? সেই দিনের বাজির।”
নাভান হালকা হাসলো।
“সত্যি?”
তারপর হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বললো—
“পুরোটা শুনিয়েছিস?”
নিলয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“মানে?”
নাভান আর কিছু বললো না।
শুধু ধীরে ধীরে মোবাইল বের করলো।
তারপর কারও দিকে না তাকিয়েই একটা নম্বরে কল দিলো।
কলটা ধরতেই সে বললো—
“হ্যাঁ… এখনই পাঠাও।”
নিলয় বিরক্ত হয়ে বললো।
“কি নাটক শুরু করলি আবার?”
নাভান তার দিকে তাকালো।
তার চোখে এবার অদ্ভুত একটা আগুন।
“তুই তো শুধু প্রথম লাইনটা শুনিয়েছিস।”
সে ধীরে ধীরে বললো।
“কিন্তু বাজির আসল কথাটা ছিল শেষে।”
মুহূর্তের মধ্যে সবার ফোনে একটা অডিও ফাইল এসে পড়লো।
রোজ, রুশা, অধীর,সবাই অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকালো। নিলয়ের ফোনেও। নিলয় কপাল কুঁচকে অডিওটা চালালো।
মোবাইল থেকে আবার সেই দিনের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আমি জিতলে আমার যা ইচ্ছে তাই করবো…”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
যেটা নিলয় শুনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না।
তারপর আবার নাভানের কণ্ঠ—
“…আর আমার প্রথম ইচ্ছে হবে হেরাকে এই নোংরা বাজি আর এসব বাজি ধরা লোকদের থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া।”
সবাই স্তব্ধ। অডিওটা শেষ হলো আরও একটা বাক্যে।
“কারণ হেরা কোনো খেলনা না… যে তাকে নিয়ে বাজি ধরা যাবে।”
নিলয়ের মুখের রঙ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বললো।
“এটা… এটা তুই বানিয়েছিস…”আমি এগুলো বলি নি “
নাভান এবার তার চোখের দিকে তাকালো। একদম স্থিরভাবে।
“ও এটা তোর ভয়েস না বাট তুই যে শুনালি অইটা আমার ভয়েস বাহ বাহ।
তার কণ্ঠ ভয়ংকর শান্ত।
“তুই শুধু অর্ধেকটা শুনিয়েছিস।”এখন আমি পুরুটা শুনালাম। আর বাজি আমি ধরি না তুই ধরিস তা এই রেকর্ডের ভিতর স্পস্ট।
তারপর খুব নিচু স্বরে বললো।
“কারণ তুই জানতিস… পুরোটা শুনলে গল্পটা অন্যরকম হয়ে যাবে।”হেরা আমায় ভুল বুঝবে। ভুল বুঝলেই বা কি সে আমার স্ত্রী এটা মনে রাখিস।
ভার্সিটির অনেকে জানে বাজি বেশির ভাগ নিলয় ধরে, আর সেটার ফয়দা লুটলো নাভান, রোজ আর রুশার সামনে নিজেকে ভালো প্রমান করার জন্য। কিন্তু অধীর সৃজন, অবাকের চড়ম পর্যায়,কিন্তু ঝিনুক যেনো নিরলিপ্ত।
রোজ ফিসফিস করে বললো।
“মানে… হেরা আবার ভুল বুঝেছে?” এই চুইংগাম হিরো দেখি বাজিখোর। আবার কি সুন্দর চকলেট হিরোর উপর দোষ চাপিয়ে দিলো।
নাভান কিছু বললো না।
সে শুধু সেই দিকে তাকালো যেদিক দিয়ে হেরা চলে গেছে। তার চোখে এবার অদ্ভুত এক জেদ। কেনো তাকে অস্বীকার করলো হেরা। নিলয় রেগে বললো।
“হেরা তোকে কখনো মানবে না!”
নাভান ধীরে বললো।
“মানবে না।”
এক সেকেন্ড থামলো।তারপর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো।
“কিন্তু সত্যিটা যখন জানবে…”
তার চোখ অন্ধকার হয়ে উঠলো।
“…তখন সে নিজেই ফিরে আসবে।”
নিলয় দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
“আমি সেটা হতে দিব না।”
নাভান এবার খুব ধীরে তার কানের কাছে ঝুঁকে বললো।
“তুই চেষ্টা কর।”
তার কণ্ঠ ফিসফিসে—
“কারণ খেলাটা এখনো শুরুই হয়নি।”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হঠাৎ বুঝতে পারলো—এই গল্পে শুধু ভালোবাসা না…
এখানে আরও গভীর রহস্য আছে।আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নাভান আসলে কি লুকাচ্ছে?
হেরা দ্রুত হাঁটছিল।চোখের পানি সে জোর করে আটকিয়ে রেখেছে। মাথার ভিতর বারবার বাজছে সেই কথাটা—
“আমি জিতলে আমার যা ইচ্ছে তাই করবো…”
তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
“নিকৃষ্ট মানুষ…”
নিজের সাথে নিজেই বললো সে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা শক্ত হাত তার কবজি চেপে ধরলো। হেরা চমকে ঘুরে দাঁড়ালো। নাভান।
তার চোখ দুটো অদ্ভুত অন্ধকার।
“হাত ছাড়ুন।”
হেরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো। নাভান ছাড়লো না।
বরং আরও কাছে টেনে নিল।
“সব টা শুনে না গিয়ে কোথায় যাচ্ছ?” আর আমার ফোন ধরো নি কেনো? মিসাইল গার্ল?
“আপনার কথা শোনার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।”তাই! ছাড়ুন হাত।
হেরা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।
“আমি আপনাকে ঘৃণা করি।”আগেও করতাম আর এখন খুব বেশি করি।
কথাটা শুনে নাভানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আগুন ঝলসে উঠলো। সে হঠাৎ হেরাকে দেয়ালের সাথে আটকে দিল। দুই হাত দেয়ালে রেখে তাকে ঘিরে ফেললো।
“ঘৃণা করো?”
তার কণ্ঠ নিচু।
“তাহলে আমার নাম শুনলেই তোমার বুক এভাবে কাঁপে কেন?”
হেরা মুহূর্তে থেমে গেল। তার বুক সত্যিই দ্রুত উঠানামা করছে। কিন্তু সে মুখ শক্ত করলো।
“নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন?”
নাভান ঠোঁট বাঁকালো।
“আমি গুরুত্বপূর্ণ না।”এটাই ভাবো নাকি।
সে ধীরে বললো—
“কিন্তু তোমার কাছে আমি কি… সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানবে। দরকার হয় আমি গভির ভাবে জানাবো।
হেরা চোখ সরিয়ে নিল।ঠিক তখনই দূর থেকে নিলয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হেরা!”
নিলয় দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালো।
সে দৃশ্যটা দেখে তার চোখ লাল হয়ে উঠলো।
নাভান আর হেরা এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
নিলয় দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
“ওর কাছ থেকে দূরে সর নাভান।
নাভান ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো।
তার ঠোঁটে হালকা হাসি।
“আমার বউ কে বলছিস আমার থেকে দূরে সরাতে। কি সাহস রে নিলয় তোর কলিজার ভরা শাহস তারিফ করতে হবে তোর।
নিলয় এগিয়ে এলো।
ও তোকে মানে না আর না বিয়ে “কারণ ও তোকে ঘৃণা করে।”
নাভান এবার সরাসরি হেরার দিকে তাকালো।
“সত্যি?”
তার কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ।
হেরা কিছু বললো না।
নিলয় রাগে ফেটে পড়লো।
সে হেরার হাত ধরে নিজের দিকে টানলো।
“চলো।”
ঠিক তখনই নাভানের হাত শক্ত হয়ে গেল।
সে হেরার অন্য হাতটা ধরে ফেললো।
এখন হেরা মাঝখানে।
এক পাশে নিলয়
অন্য পাশে নাভান।
চারপাশের বাতাস যেন থেমে গেছে। নিলয় গর্জে উঠলো—
“হাত ছাড়!”
নাভান ঠান্ডা স্বরে বললো।
“তুই ছাড়।”
“ও আমার!”
নিলয় চিৎকার করে উঠলো।
নাভানের চোখ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।
সে ধীরে বললো—
“শব্দটা আবার বল।”
“ও আমার!”
নিলয় আবার বললো।
পরের মুহূর্তে নাভান হেরাকে নিজের দিকে টেনে নিল। হঠাৎ হেরা সরাসরি নাভান এর বুকে গিয়ে পড়লো।
নাভানের হাত শক্ত হয়ে গেল তার কোমরে। তার কণ্ঠ গভীর হয়ে উঠলো—
“ভুল বলেছিস।”
নিলয় রাগে কাঁপছে।
নাভান ধীরে ধীরে বললো—
“হেরা তোর ছিলো না আর না হবে।
এক সেকেন্ড থামলো। তারপর খুব নিচু স্বরে বললো—
“…কিন্তু যদি কারো হয়—সে আমি।”না হতে চাইলে সোজা কবরে। দ্বিতীয় কোনো অপশন তার লাইফে নেই!!
হেরার বুক ধক করে উঠলো।
সে তাড়াতাড়ি সরে যেতে চাইলো। নাভান এর কথার মহোতে সে পরতে চায় না।
“ছাড়ুন আমাকে!”
নাভান এবার সত্যিই হাত ছেড়ে দিল।
কিন্তু তার চোখ হেরার উপরই স্থির। নিলয় এর দিকে তাকিয়ে বললো নাভান।
"আমার জিনিসে দিকে কারো চোখ তো দূরেরকথা!!
“”””কারো ছায়াও যেনো না লাগে আমি এতটাই সেভ!! “””সো ফাকে যা””””!!
রাগে ফুসফুস করে নিলয় চলে যায়। নাভান এবার হেরাকে উদ্দেশ্য করে বলে।
“জাস্ট আজ ফাস্ট এন্ড আজ লাস্ট নিলয় এর আশেপাশে যাতে তোমায় না দেখি মাইন্ড ইট।
থেমে আবার বলে নাভান —–
আমার জিনিসের দিকে কারো চোখ তো দূরের কথা, কারো ছায়া লাগাটাও আমার পছন্দের বাহিরে!! সো সাবধান!
অধীর, সৃজন,রোজ রুশা সবাই তাদের পিছু পিছু এসে দেখে এই কাহিনি অধীর তো শকডের উপর শকড তার গম্ভির হিরো ভাই এর মুখ থেকে এমন কথা শুনে সে রিতিমতো টাসকি। সে তো বিরাট প্রেম প্রেম জেলাসি গন্ধ পাচ্ছে, নাভান, হেরা, নিলয়, চলে যাওয়ার পর সে ভাবুক ভঙিতে বলে উঠে সৃজন এর কাধে হাত রেখে।
“”দোস্ত… আমি জীবনে অনেক কিছু দেখছি… যুদ্ধ দেখছি, ব্রেকআপ দেখছি, ফ্রি খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার ট্রাজেডি দেখছি… কিন্তু আজ যা দেখলাম—এইটা ইতিহাস!”
সৃজন ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কিসের ইতিহাস?”
অধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল অধীর ভাবুক ভাবে বললো।
“আমার গম্ভীর, বরফের মতো ঠান্ডা হিরো ভাই কি বলে গেলো, সেই দিন এর টা কি কম ছিলো,আবার … আজকে বললো— ‘আমার জিনিসের দিকে কারো চোখ তো দূরের কথা, কারো ছায়া ও যেনো না লাগে আমি এতটাই সেভ সো ফাকে যা””!!
নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো অধীর!
মানে ভাই… এইটা প্রেম না হলে আর কি! হতে পারে বল,গভীর প্রেম ইহা!!
এইটা তো পজেসিভ লাভের আন্তর্জাতিক সম্মেলন মনে হচ্ছে আমার কাছে!!
রোজ হেসে ফেললো।
রুশা দুই হাত দিয়ে মুখ চাপা দিল হাসি আটকানোর জন্য। অধীর আবার বলতে লাগলো—
“আমি শপথ করে বলতেছি, নাভান ভাই যদি আর দুইদিন এইভাবে বলে আমি
তাহলে ভার্সিটির গেটের সামনে একটা ব্যানার লাগিয়ে দিবো।
‘সতর্কীকরণ 🚫
এই এলাকায় এক বিপজ্জনক প্রেমিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
নাম: শেহতাজ খান নাভান
লক্ষণ: হেরার আশেপাশে কেউ ঘেসবেন না।
আচ্ছা দোস্ত!!
ভাই আর প্রেমে পরেছে কিন্তু একা একা হাসলো না কেনো ভাবনার বিষয়??
চিন্তিত হয়ে বললো অধীর,
“””যদি থাকে নসিবে ভাই আমার প্রেমে পরিয়া একা একা হাসিবে। তোর এই ডায়লক ভুয়ারে অধীর!!
সৃজন বললো অধীরকে!!
“না না অধীরের বানী ভুল হতে পারে না।
রুশা ফুসকা খেতে খেতে এই নিয়ে ৪ প্লেট শেষ করছে। তার খুব চিন্তা হলে খেতে ইচ্ছে করে। তাই ইচ্ছে মতো ঝাল দিয়ে খাচ্ছে সে, আর রোজ আইসক্রিম এর বক্স নিয়ে খাচ্ছে, সে এতো ঝাল খেতে পারে না তাই আইসক্রিম খাচ্ছে, মল চত্তরের সেই খানটায় এখন আপাতত কেউ নেই,রোজ আর সৃজন ব্যাতিত,রুশা ও অধীর বড় একটা গাছের আড়ালে বসে আছে বুঝাই যাচ্ছে না তারা যে এখানে আছে আপাতত সবাই ক্লাসে যার যার ডিপার্টমেন্টে। রুশা হটাৎ খেতে খেতে বুম্বাই মরিচে কামড় বসিয়ে দেয়।
“আহ আহ ঝাল ঝাল ” অই লাইভ টেলিকাস্ট আমার ঝাল লেগেছে।
অধীর রুশার অবস্থা দেখে নাজেহাল যতই ফাজলামো করুক না কেনো। নিজের ভালোবাসার মানুষ এর উপর সে বেশি সেনসেটিভ, অধীর রুশার ব্যাগ খুলে দেখে পানি নেই,রাগে বোতলটাতে একটা লাথি মারে তারা একটু ভিতরে পানির কলের কাছে যেতেও ২/৩ মিনিট লাগবে। এদিকে রুশার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। অধীর রুশার লাল ফোলা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে ফেলে, তার কেমন হাত পা কাপছে। এদিকে রুশা না পেরে অধীর এর কাছে যায়। অধীর এর পায়ের উপর পা দিয়ে শার্ট এর কলার চেপে অধীর এর ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দেয়। ব্যাস এক মুহুর্ত দুই মুহুর্ত অধীর এর ধ্যান নষ্ট হয়,কি করেছে তার লাল গোলাপি এটা!! যে কাজ সে ভয়ে করতে হাত পা কাপছিলো আর তার ভালোবাসার লাল গোলাপি তা করে দিলো,এবার রুশার ঝাল কমতে সে সরে যেতে চায়, কিন্তু অধীর আরো শক্ত করে চেপে ধরে ঠিক ৫ মিনিট পর ছাড়া পায় রুশা ! এক মুহুর্ত না দাড়িয়ে চলে যায় রুশা। অধীর ধপ করে বসে পরে বসার স্থানটিতে, কোনো সর্গে হাড়িয়ে গিয়েছিলো অধীর তার মনে হচ্ছে!! সৃজন একটানা ২ মিনিট ধরে রোজের ঠোঁটে কামড় দিয়েই যাচ্ছে। মূলত তার দোষ হলো আইসক্রিম খাওয়ার সময় রোজের ঠোঁটে লেগেছে কেনো, আগে থেকে মানা করেছে রোজ কে আইসক্রিম খেলে যাতে একটুও না লাগে কিন্তু রোজ হেরার চিন্তায় চিন্তায় আইসক্রিম খেয়ে মেখেফেলেছে। গুছানো ছেলেটা মুহুর্তে প্রেয়সির নেশায় মত্ত হয়ে যায়, রোজ না পেরে সৃজন এর ঠোটে জোরে কামর দেয়। এবার সৃজন ছাড়ে রোজ কে।
“রাক্ষস, খোক্ষস,আর জীবনে আপনার সামনে আইসক্রিম খাবো না।।
রোজ হনহনিয়ে চলে যায় ঠোঁট চেপে ধরে সৃজন ঠোঁটের কোনে রক্ত টুকু মুছে মুচকি হাসি দিয়ে সামনে ফিরতে দেখে অধীর আসছে, নিজের ফর্মে ফিরে সৃজন বলে উঠে।
” কিরে কই ছিলি।
“সর্গে।
” মানে?
” না মানে কিছু না।
আচ্ছা নাভান এই রেকর্ড কই পেলো এমন তো কথা হয় নি আর নাভান এর কথায় আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে এগুলো তার প্রি প্ল্যান, তা না হলে এই রেকর্ড কই থেকে আসলো? I have a গভীর রহস্যজনক প্রশ্ন।
“এ কখন কি করে এক উপর আল্লাহ ছাড়া কারো জানার ক্ষমতা নেই।
বলতে বলতে দেখে বাইক নিয়ে ঝিনুক ও নাভান হাজির, মূলত তারা আজ একটা দরকারে যাবে। ক্লাস করবে না। অধীর আর সৃজন এর সামনে দুই বাইকার গাড়ি ব্রেক করে।
” অই হারামিরা কই ছিলি কতোক্ষন জাবত খুজতেছি চল ফাস্ট এখন যেতে হবে।
“কই যাবো?
অধীর বললো।
” বিয়ে খেতে!
“কার বিয়ে?
” কেন তোর লাল গোলাপির।
“এই তুষার পাত এর বউ, আমার লালগোলাপিকে নিয়ে একটা কথাও নয়।
” কি ব্যাপার তোদের ঠোঁটের এই অবস্থা কেন,কিরে অধীর তোর ঠোঁট এমন লাল কেন আর সৃজন তোর ঠোঁট থেকে রক্ত বের হচ্ছে কেন।
অধীর আর সৃজন এতোক্ষণ দুজন দুজনকে দেখে অধীর তো এমনি সুন্দর গোলাপি ঠোঁট থেকে মনে হচ্ছে রক্ত পরবে এমন লাল হয়ে গেছে ঝালে।
“মা মা মানে ইয়ে পিপড়া কামড়ে দিয়েছে? তাই এমন ফুলে লাল হয়ে গেছে?
” আর সৃজন কে কি হাতিতে কামড়ে দিয়েছে নাকি?
“হ্যাঁ না মানে।
“
“পিপড়া টা মনে হচ্ছে রুশা আর হাতিটা মনে হচ্ছে রোজ তাই না রে হারামির দল।
” হ্যাঁ মানে না না কি জা তা বলছিস।
“হয়েছে আর বলতে হবে না চল টেল হলে পেন্ট খুলে আন্ডার পেন্ট পরে ঘুরাবে পরে।
অধীর এক লাফে নাভান এর বাইকের পিছনে উঠে বসে আর সৃজন ঝিনুক এর।
” এই ছেড়ি না বেডি তুই কিন্তু পাগলা ঘোড়ার মতো বাইক চালাবি না বইলা দিলাম তর তুষার পাত এর ঝাড়ি শুনতে পারমু না পরে।
“কানের নিচে না খেতে চাইলে চুপ চাপ বসে থাক তা না হলে নরক ঘুড়িয়ে দেখাবো।
” বইন তোর নরক দেখা মানে সোজা কবর।বইন আমি জীবনে একটা কিস খাইছি মাত্র। প্লিজ তোর নরক দেখতে চাই না বাসর করা বাকি আমার।
“এতো চিন্তা করলে চুপচাপ বসে থাক।
” চারিদিক বাইকে ধোয়া তুলে চলে যায় তারা কোনো এক জরুরি কাজে।
চলবে……..?