
ঈদ বোনাস পাঠ
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজ ও রুশা
পাঠ ২২
__কাজল খান কথাটা বলতে চোখ পড়ে জাওয়াদ খানের দিকে।
জাওয়াদ খান আর কাজল দাঁড়িয়ে নিজেদের রাগ প্রকাশ করছে। দুজনের মনে ভালোবাসা থাকলেও এই মুহূর্তে তা কেউ প্রকাশ করছে না। এত বছরের রাগ কি এত সহজে মিটে? এক সত্য সামনে এসেছে তো কী হয়েছে, আসল সত্যি তো দুজনের অজানা। নাভান চুপচাপ, হেরা নীরব। হঠাৎ কাজল খান বলে উঠল—
“জাস্ট ৫ মিনিটের ভিতর এখান থেকে বের হও।”
নিজের কোমল সহধর্মিণীর এমন কঠিন রূপ দেখে জাওয়াদ খান রীতিমতো টাসকি খাইছে। যে কাজল তার মুখের উপর কথা তো দূর, আল্লাদি করে কথা বলতো সারাক্ষণ, সেই কাজল খানের এমন রূপ! এতক্ষণ এত চিন্তায় খেয়াল করেননি তার রণচণ্ডী রূপ, জাওয়াদ খান। জাওয়াদ খানও নিজের দাম্ভিকতা বজায় রেখে বলল—
“বাসায় চলো, বাকি কথা বাসায় গিয়ে বলব। আর এই আমার কার্ড, বাবার বাসায় আসবে শেহতাজ।”
নাভানের হাতে কার্ড দিয়ে বলল জাওয়াদ খান।
এবার হেরার দিকে এগিয়ে যায়। মাথা নিচু তার, তাও কাঁপা স্বরে বলে—
“যখন আমার কেউ ছিল না, নিজেকে মৃত্যুর হাত থেকে শুধু তোর জন্য বাঁচিয়ে এনেছি। আমি তোর জন্মদাতা না হতে পারি, কিন্তু তার থেকেও বেশি কিছু তুই আমার জন্য। তাই অযথা কষ্ট পেয়ে লাভ নেই, আম্মাজান। এখন বাসায় চলেন, বাকি কথা বাসায় হবে। আর এই দুনিয়ার কাছে তোর একটা পরিচয় হলো—আপনি জাওয়াদ খানের একমাত্র মেয়ে।”
এই বলে জাওয়াদ খান মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে চলে যায়। হেরা আর নাভান একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। নাভান দেখছে, আজ হেরার চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ। আর হেরা দেখছে নাভানের মুখে তৃপ্তির ছাপ। হেরা নাভানের প্রতি যেন আরো ক্ষিপ্ত হলো।
অধীর ধীরে ধীরে সরে এসে নিজের ফ্রেন্ড সার্কেলের কাছে জড়ো হলো। ঝিনুক, রোজ, সৃজন আর রুশা সবাই শুধু তাকিয়ে ছিল—কী বলবে, কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। রুশা গালে হাত দিয়ে সেই যে বসে আছে, তার চিন্তা হচ্ছে চুইংগাম হিরোর কী হবে। সে এখন অন্য দুনিয়ায় আছে। অধীর চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“তোরা কেউ খেয়াল করছিস? আমি এখনো বেঁচে আছি?”
ঝিনুক ভ্রু তুলে তাকায়। নাটকবাজ আবার নাটক করতে এসেছে। থাপ্পড় খেয়ে শিক্ষা হয়নি ছেলেটার। চোখ ছোট ছোট করে বলে ঝিনুক—
“কেন? তুই মরার প্ল্যান করেছিলি নাকি?”
অধীর বুক চেপে বলল—
“আরে! একটু আগে যে পরিবেশ ছিল, আমার হার্ট তিনবার রিস্টার্ট নিয়েছে! মাদার বাংলাদেশ যখন ফাদার ইন্দোনেশিয়াকে থাপ্পড় মারছিলেন, আমি পেছনে সরে গিয়েছিলাম। যদি হাওয়া হয়ে একটা এসে আমার গালে লাগে! এক থাপ্পড় খেয়ে গাল আমার লাল গোলাপির মতো হয়ে গিয়েছে! আর খেতে চাই না!”
রোজ দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে বলল—
“আরে ছোট ভাই, আপনি না সাহসিকতার পরিচয় দিবেন বলছেন তখন?”
অধীর গম্ভীর মুখ করে বলল—
“ওটা ছিল বাহ্যিক সাহস। তাদের ঝামেলা ভিতরে, আমি তখন সূরা ইয়াসিন পড়ছিলাম।”
সৃজন না চাইতেও ফিক করে হেসে দেয়। এই সিরিয়াস মুহূর্তে কই নাভান আর হেরাকে শান্তনা দেবে, তা না এরা মজা লুটছে। একেই মনে হয় বন্ধুমহল বলে। অধীর আবার বলল—
“আর শুন, ফাদার ইন্দোনেশিয়া যখন হাঁটু গেড়ে বসলেন, আমি ভেবেছিলাম এখনই হয়তো চেয়ার ছুড়ে ফেলবে, মারামারি শুরু হবে। আমি আগেই বের হওয়ার রাস্তা দেখে রেখেছিলাম। “উনিশ-বিশ হলেই উধাও হয়ে যেতাম!!”
ঝিনুক অবাক হয়ে বলল—
“তুই পালাতি আমাদের রেখে!!”
অধীর ফিসফিস করে বলল—
“বন্ধুত্ব ঠিক আছে, কিন্তু জীবনটা আরো বেশি, তুষার পাতের বউ, বাসর, বিয়ে—কিচ্ছু হয় নি আমার এখনো!!”
রোজ হেসে বলল—
“ভাই, তুমি না থাকলে এত টেনশনেও আমরা হাসতে পারতাম না।”
অধীর বুক ফুলিয়ে বলল—
“আমি না থাকলে তোরা সবাই এখন আইসিইউতে ভর্তি হইতি। অতিরিক্ত আবেগে!”
তারপর আবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল—
“কিন্তু একটা কথা বলি, আমি ভিতু হতে পারি, কিন্তু তোদের কাউকে কাঁদতে দেখলে আমার ভয়টা গায়েব হয়ে যায়। তখন মনে হয়, আরে যা হয় হবে, একটু দাঁড়াই।”
সবাই একসাথে হেসে উঠল।
দূরে নাভান একটু তাকাল তাদের দিকে। বন্ধুদের হাসির শব্দ তার কানে এলো। তার বুকের ভার যেন আরেকটু হালকা হলো। অধীর আবার ফিসফিস করে বলল—
“কিন্তু প্লিজ, পরেরবার যদি আবার এমন ফ্যামিলি ড্রামা হয়, আমাকে আগে জানাস। আমি আগে থেকে গ্লুকোজ খেয়ে আসবো।”
রোজ বলল—
“কেনো ভাই, আবার পালাবেন, কই দিয়ে তা দেখে রাখবেন নাকি?”
অধীর গম্ভীর মুখে বলল—
“পালাবো না। তবে দরজার কাছে দাঁড়াবো। এবার থেকে!!”
চারজনের হাসির মাঝে টেনশনের ভারী বাতাসটা একটু একটু করে হালকা হতে লাগলো। কারণ সত্যি কথা হলো—প্রতিটা গ্রুপেই একটা ভিতু থাকে, যে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়… কিন্তু দরকার হলে সবার আগে দাঁড়ায়। আর তাদের গ্রুপে সেই মানুষটার নাম—অধীর।
এদিকে রুশা চুপচাপ, আর হেরা তো একেবারে চুপ হয়ে গেছে। মূলত হেরাকে হাসানোর জন্য এগুলো করছে অধীর, কিন্তু হেরা তো অন্য জগতে আছে। তার পরিচয় নিয়ে। নাভান হেরার সামনে যায়। নরম কিন্তু আদেশ সুরে বলে—
“শোনো মেয়ে, এতো ভাবার কিছু হয় নি, তোমার সম্পর্ক ঠিকই আছে। আগে আব্বু ছিলো, আর এখন সাথে আরেকটা এড হলো শশুর আব্বু। তাই তোমার মন খারাপ হবার কিছু নেই। আরো খুশি হবার কথা এখন। প্রোমোশন পেয়েছো তুমি!”
নাভানের কথায় অধীর গান ধরলো। রুশা নিজের কিউট ভণ্ড প্রেমিকের মুখে গান শুনে নিজের থাপ্পড় খাওয়ার কথা ভুলে ফিক করে হেসে দিলো। সে এতক্ষণ কি হচ্ছিল তা শুধু গালে হাত দিয়ে ড্যাব ড্যাব করে দেখছিলো। যে ছোট আব্বু তাকে একটা ধমকও দেয় নি, আজ গালে থাপ্পড়—সে তো কিছুই জানতো না, তাও ফাও একটা থাপ্পড় খেলো। গান শুনে এবার মনটা একটু হালকা হয় রুশার।
“সম্পর্ক বললে গেলো একটি পলকে,
কে জামাই, কে শশুড় হলো রেএএ,
কিউটি পাই যখন ভাইয়ের বউ হলো রেএএ,
যেন সিডর আয়লা আমার আর লাল গোলাপির গালে বয়ে গেলো রেএএ,,,,,”
গান নাভান বা হেরার কানে ঢুকছে কি না সন্দেহ। হেরা ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে, আর নাভান দেখছে তার বউকে কেঁদে কুটে চোখ লাল টকটকে করে ফেলেছে। ঘেমে-নেয়ে একাকার, পরনের হালকা ওয়াটার কালার থ্রিপিসের উপর পানির দাগ স্পষ্ট। দেখতে পুরাই আগুনের রানী লাগছে। কিন্তু হেরার সাথে নাভানের যা সম্পর্ক—সাপে বেজি। এখন যদি নাভান তাকে শান্তনা দিতে যায়, তখন আবার এই মেয়ে বলবে—
“ভুতের মুখে রাম নাম, অহংকারী গিটার ওয়ালা।”
“না,” মিসাইল গার্লের মুখে এটোম বোমের কথা আপাতত শুনতে চায় না, তাই স্কিপ করে যায় নাভান। এদিকে নাভানের কথাগুলো যেন আগুনের মতো গিয়ে লাগল হেরার মনে। মুহূর্তেই তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ আর অপমান একসাথে বিস্ফোরিত হলো। দাঁত চেপে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল—
“মিঃ শেহতাজ খান নাভান, কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, আমি কিন্তু সব বুঝেছি। এগুলো সব আপনার সাজানো প্ল্যান। আপনি মানুষের মন ভাঙতে খুব ভালো পারেন, কিন্তু গড়তে পারেন না। আর বিয়ের কথা সামনে এনেছেন বলে ভাববেন না, আমি সেই বিয়ে মেনে নিয়েছি। তখন সবার মুখ বন্ধ করতে চুপ ছিলাম, কিন্তু এখন আর না। বিয়ে নামের ওই দুই অক্ষরটা আপনার মাথা থেকে একেবারে মুছে ফেলুন।”
নাভান কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে হেরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ধীর গলায় বলল—
“উফফ… মিসাইল গার্ল! তোমার মতো স্মৃতিশক্তি আমার দুর্বল না। যে শব্দ আমার কানে ঢোকে, সেটা মাথায় সারাজীবনের জন্য জায়গা করে নেয়। আর সেখানে এত কিছু হয়ে গেল, তুমি কীভাবে ভাবলে আমি সব ভুলে যাব?”
হেরা বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নাভানকে উপেক্ষা করে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু এক ঝটকায় নাভান তার পথ আটকে দিল।
হেরা রাগে ফুঁসতে লাগল। নাভান মুচকি হেসে বলল—
“এই মিসাইল গার্ল, উউউফফফ, এখন তো তুমি আমার বউ, হ্যাঁ মিসাইল বউ… এই মিসাইল বউ!! চিংড়ি মাছের মতো তিরিং-বিরিং করছো কেন?”
হেরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। যেন এই কথার জন্য নাভানকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে সে। তার জীবন পুরাই উলোট-পালোট করে দিয়েছে এই অসভ্য অহংকারী গিটার ওয়ালা। নাভান বুঝে মিসাইল বউ তার বোমের মতো হয়ে আছে, কখন জানি ব্রাস্ট হয়। কিন্তু তাতে কি? সে তো কারো মুখাপেক্ষী নয়। শেহতাজ খান নাভান মানে একটা ব্রেন্ড, তার মতো দুইটা অয়াওয়া যাবে না। এই রুড, তো এই মোমের মতো নরম—গিরগিটি ও হার মানবে শেহতাজ খান নাভানের কাছে!! নাভান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল—
“যা ছক পাকাচ্ছো মাথায়, তা ডিলেট করে ফেলো। নয়তো আমি এমন বাড়ি দিবো মাথায়—বাংলা সিনেমার মতো সব স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলবে!”
নাভানের গলা নিচু, কিন্তু তাতে এমন এক ভয়ংকর স্থিরতা—যেটা চিৎকারের থেকেও বেশি বিপজ্জনক। হেরা সঙ্গে সঙ্গে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় তার দিকে। চোখ দুটো জ্বলছে আগুনের মতো। এক মুহূর্ত দেরি না করে আঙুল তুলে নাভানের দিকে তাক করে বলে ওঠে—
“আপনি যেমন ছক পাকিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন সব জায়গায়… আপনার মতো না পারলেও কিছু তো পারবোই। কথায় আছে না—ইট মারলে পাটকেল তো খেতেই হবে, মিঃ শেহতাজ খান নাভান!”
নাভান এক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে গলায় হাত বুলিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। যেন নিজের ভেতরের ঝড়টা সামলাচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
“তুমি জানো, তোমার সমস্যা কী?”
হেরা ভ্রু কুঁচকে তাকায়—
“কি?”
নাভান ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে আসে। তাদের মাঝের দূরত্বটা অস্বস্তিকরভাবে কমে যায়।
“তুমি দেখতে পিচ্চি… কিন্তু কথা বলো এমন, যেন পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে জন্মেছো।”
হেরা একচুলও পিছোয় না। বরং বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“আর আপনি নিজেকে কি ভাবেন, আপনি যা বলবেন সবাই মাথা নত করে শুনবে? ভুল ভেবেছেন। সবাই শুনলে ও এই হেরা শুনবে না!”
নাভান এবার হালকা ঝুঁকে আসে হেরার দিকে, এতটাই কাছে যে হেরার শ্বাস আটকে যায় এক মুহূর্তের জন্য। নাভান ফিসফিস করে বলে উঠে, খুব কাছে গিয়ে। হেরা নাভান এর গায়ের সেই সুপরিচিত শরীরের ঘ্রাণে চোখ বন্ধ করে ফেলে। নাভান সবাইকে হাতের ইশারা করতে সবাই চলে যায়, কয়েক মিনিট আগেই। হেরা চোখ বন্ধ করে সেই পরিচিত গ্রাণটা নেয়, না চাইতেই ও কেমন কাঠের ও ফুলের মিশ্রিত মাতাল করা গ্রাণ আসে তার নাকে। শেহতাজ খান নাভান যখন যেই রাস্তা দিয়ে যায়, তখন হেরা অনায়েসে ধরতে পারে নাভান গিয়েছে এই রাস্তায়। গ্রাণটা তীব্র না, হালকা কিন্তু মাতাল করা গ্রাণ। শুরুতে হালকা ফ্রেশ সিট্রাস, পরে ফুলের নরম গন্ধ (রোজ + জ্যাসমিন), শেষে উষ্ণ মিষ্টি, মশলাদার ও কাঠের মতো গন্ধ—Roja Parfums Haute Luxe। নাভান হেরার চোখ বন্ধ দেখে মুচকি হাসে। কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিস করে বলে—
“সবাইকে বলি না, মিসাইল বউ…!! এই শেহতাজ খান নাভান এর নিজের খেয়ে কারো উপর হুমকি দেয়ার সময় নেই।”
নাভানের গলা নরম হয়ে আসে—
“কিন্তু তুমি যদি একটু ভুজতে—আমি আদেশ দিই না সবাইকে, কেবল যাদের উপর আমার অধীকার আছে তাদের উপর হুকুম করি।” আর আমার হুকুম মানে করতেই হবে, নয় তো হাতে কাটা মন্ডু নিয়ে ঘুরতে ও আমার আপত্তি নেই!! আর তুমি তো আমার অভ্যাস, আর এখন তো বউ, তোমাকে তো আদেশ হুকুম সব করাই যায়!!
হেরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটা কখন হুমকি দেয়, কখন কি কথা বলে—বোঝা দায়।
“অভ্যাস?” লাইক আমি, ??
ঠোঁট বাঁকায় হেরা—
“আমি কারো অভ্যাস হতে আসিনি।”
নাভান হালকা হেসে মাথা নাড়ে।
“হ্যাঁ, তুমি আসোনি… কিন্তু হয়ে গেছো তো?”
কথাটা বলে সে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে সেই চেনা দাপট, কিন্তু কোথাও যেন একফোঁটা মায়া লুকানো।
“আর একটা কথা…”
নাভান নিচু গলায় বলে—
“তুমি যতই প্ল্যান করো আমাকে নিচে নামানোর… শেষ পর্যন্ত তুমি নিজেই জড়িয়ে পড়বে আমার নামের সাথে।”
হেরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে—
“স্বপ্ন দেখছেন!”
নাভান মুচকি হেসে জবাব দেয়—
“হ্যাঁ… আর মজার ব্যাপার কী জানো? এই স্বপ্নে তুমি আছো।”
এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই চুপ। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কিন্তু তাদের চোখের ভেতর যুদ্ধ চলছে। হেরা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিন্তু তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়।
“বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে চাও না? তাহলে আমার কথামতো চলো। সব জানতে পারবে। এমনিতে আপনার শশুড় আব্বু কিছুতেই বলবে না, এটা আমি নিশ্চিত।”
হেরা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল—
“আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে?”
নাভানের চোখে তখন এক অদ্ভুত কঠিন ছায়া। সে ধীরে ধীরে বলল—
“কারণ তার রক্তই তো বইছে আমার শরীরে। আমার মা-বাবা কেমন জেদি আর একরোখা মানুষ, আমার থেকে ভালো আর কে জানবে?”
হেরা যেন হঠাৎ জমে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে উঠল।
“তাহলে… আপনি আগে থেকেই জানতেন? আমার আব্বুই আপনার আব্বু?”
নাভান এক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
“ওটা তোমার এখন না জানলেও চলবে। আপাতত আমি যা বলছি, সেটাই করবে।”
হেরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বুকের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“আচ্ছা… তার আগে একটা কথা বলুন। তারা আলাদা হলো কীভাবে?”
নাভান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের কোণে যেন বহু বছরের না বলা কষ্ট জমে আছে।
“আমি জানি না। তাদের মধ্যে ঠিক কী হয়েছিল, আজও জানি না। এত বছর ধরে জানার জন্য কত চেষ্টা করেছি, কিন্তু আম্মু কিছুতেই বলেনি। এই রহস্যটাই বের করতে হবে। আর তাহলে বের হবে তোমার আসল বাবা-মা কে?”
হেরা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল নাভান এর দিকে। তার কণ্ঠ এবার নরম হয়ে এল।
“আর যদি সেটা বের করতে পারেন… তাহলে কি আমি আমার বাবা-মায়ের আসল পরিচয় জানতে পারব?”
নাভান গভীর দৃষ্টিতে হেরার চোখে চোখ রেখে ধীরে বলল—
“হ্যাঁ… তখন শুধু তোমার না, অনেক লুকানো সত্য সামনে চলে আসবে।”
তাদের বের হতে লেট হচ্ছে দেখে বন্ধুমহল আবার আসে তাদের কাছে। সবাই নিজের মতো করে মত দিচ্ছে, কেউ বোঝাচ্ছে, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু সেই কথাগুলো যেন হেরার কানে ঠিকমতো ঢুকছেই না। নাভানও অনেকক্ষণ ধরে ধৈর্য ধরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। তার কণ্ঠে কঠোরতা নেই, আছে এক ধরনের নীরব মমতা আর দায়িত্ববোধ। কিন্তু হেরা যেন কিছুই শুনতে চাইছে না। তবুও না চাইতেও শেষ পর্যন্ত তাকে নাভানের কথাগুলো শুনতেই হলো।
ভাঙা মন আর ভারী বুক নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে হেরা। তার চোখে তখন অবিশ্বাস, কষ্ট আর এক অদ্ভুত শূন্যতা।
সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না এই নিষ্ঠুর সত্যটা। এতদিন যাকে সে নিজের বাবা বলে জেনে এসেছে, যার পরিচয় বুকে আগলে বড় হয়েছে, সে আসলে তার রক্তের কেউ না।
আর যার নাম শুনলেই তার ভিতরটা আগুন হয়ে উঠত, যাকে সে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করত—সেই মানুষেরই জন্মদাতা পিতা নাকি তার আসল বাবা!
এই সত্যটা যেন হেরার বুকের ভিতর ঝড় তুলেছে। মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
সে ভাবতেই পারছে না। এতদিনের বিশ্বাস, এতদিনের সম্পর্ক, এতদিনের পরিচয়… সব কি তবে মিথ্যে ছিল?
হেরা অনুভব করে যেন তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু সে অনেক কষ্টে আটকে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু বুকের ভিতরের ভাঙচুরটা আর থামাতে পারে না।
এই সময় ঝিনুক ধীরে ধীরে হেরার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হেরার মুখটা এতটাই ভেঙে পড়া যে, ঝিনুকের বুকটাও কেঁপে ওঠে।
নরমভাবে হেরার কাঁধে হাত রাখে সে।
মমতাভরা কণ্ঠে বলে—
“হেরা, এভাবে ভেঙে পড়ো না। তুমি শক্ত হও। হয়তো এই ঘটনার মধ্যেই তোমার জীবনের অনেক বড় একটা সত্যি লুকিয়ে আছে, যা সময় হলে একদিন নিজেই উন্মোচিত হবে।
আর একটা কথা মনে রাখো। শুধু জন্ম দিলেই কেউ বাবা হয়ে যায় না।
বাবা সেই মানুষ, যে সন্তানের হাত ধরে তাকে হাঁটতে শেখায়, তার চোখের জল মুছে দেয়, তার ভয় দূর করে, তাকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলে। রক্তের সম্পর্ক সব সময় সবচেয়ে বড় সম্পর্ক হয় না, হেরা। অনেক সময় ভালোবাসা আর যত্নই একটা সম্পর্ককে সত্যিকারের শক্ত করে তোলে। তুমি এখন অনেক কষ্ট পাচ্ছো, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ধৈর্য ধরো। সময়ের সাথে সাথে হয়তো তুমি এমন কিছু সত্য জানতে পারবে, যা আজ তোমার কাছে অন্ধকার মনে হচ্ছে। একটা সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাসে, ভালোবাসায় আর একে অপরকে আগলে রাখার মধ্যে। তাই নিজেকে ভেঙে ফেলো না। তুমি শক্ত থাকো… কারণ তোমার সামনে এখনো অনেক সত্য উন্মোচিত হওয়ার বাকি আছে।”
ঝিনুকের কথাগুলো শুনে হেরা কিছু বলে না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ে, আর তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে ওঠে।
নাভান হেরার হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের কারে উঠায়। নাভান এর কর্মকান্ডে সবাই হতভম্ব। হেরাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সৃজন তো ভয় পাচ্ছে নাভান এর রাগের স্বীকার না হয় ছোট বনুটা তার। কিন্তু ঝিনুক আশ্বাস দিলো, কিছু হবে না। হেরা হাত ছুটাতে না পেরে গাড়ির ভিতর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। রাগে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে মুখে তার। কান্নার ফলে এমনিই মুখটা লাল টুকটুকে হয়ে আছে। নাভান গাড়ীতে ফেলে দিয়ে সেও উঠে পড়ে ড্রাইভিং সিটে।
“এই অহংকারী লোক, এখন কি অসভ্যতার লিস্টে নাম লিখাতে চাচ্ছেন? মেয়েদের সাথে এমন টানাটানি করেন, ছি!”
নাভান এর নিরলেশ জবাব—
“অন্য মেয়েদের সাথে করি না, বউ এর সাথে করছি !আরো অনেক কিছু করতে পারি কিন্তু এখন করছি না!
“কি করেন না?”
“কেনো, তুমি কি বাসর এর কথা বলেছো নাকি, যে বলবো সেটার কথা! আমিও টানাটানির কথা বলছি।”
“আমায় যেতে দিন, অসভ্য অহংকারী লোক।”
বলেই টানাটানি করতে শুরু করল।
হেরা আর নাভান এর জোড়াজুড়িতে গাড়ি হেলেদুলে উঠে। পাশ থেকে একটা লোক গাড়ির কাচে ধাক্কা দেয়। জানালা খুলতেই পুলিশ কে দেখে হেরা চমকে যায়। নাভান মাক্স পরে ফেলে।পুলিশ গম্ভির মুখে বলে।
“গাড়ীর পিছনে কে, দেখি তো!”
নাভান খুলে দেখায়, কেউ না। পুলিশ বেচারা ভেবেছিলো কট টট খাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকা হবে। তিনি কতো এদের থেকে মাল কামিয়েছিলো, বিশেষ করে স্লিপাস বাস গুলুতে। এখন গাড়ীর পিছনে থাকায় হেলেদুলে যাওয়ায় মনে করে কিছু গরবর। কিছু না পেয়ে হতাশ হন পুলিশ লোকটা।
“গাড়ী এমন হেলেদুলে উঠেছিলো কেনো?”
নাভান এর সরাসরি উত্তর,,,
“স্যার, আপনি যা ভাবছে তা কিছুই হয় নি। পাশে বসে থাকা মিসাইল বউ থাকলে রুমান্টিক সিন তো দূর, বাসর ঘরে ও খাট ভাঙার শব্দ হবে ঠিকি কিন্তু অন্য কারনে!!যা সবার অজানাই থাকবে,,।
পুলিশ আর নাভান এর কথার আগা-মাথা কিছু বুঝতে পারছে না হেরা। পুলিশ থাকায় চুপ মেরে বসে আছে। পুলিশটা আবার বললো—
“তাহলে এমন হেলে দুলে উঠেছিলো কেন গাড়ী?”
“আমরা টি-টুয়েন্টি মেচ খেলছিলাম। কিন্তু আপনি যেটা ভাবছেন, সেটা না। রুবেল এর কেরাতির কিছু মেচ ট্রাই করছিলাম,, তাই একটু হেলে দুলে উঠেছিলো।”
এবার হয়তো পুলিশ লোক কিছু বুঝলো,,
“এ বউ কিভাবে সামাল দাও কিভাবে ?”
“খাজা বাবার দোয়ায়।”সামলাতে তো হবেই সবে তো শুরু।
পুলিশ কি ভুজলো কে জানে, মুড খারাপ করে পকেট হাতড়ে চলে যায়। পুলিশ চলে যেতে হেরা আবার ক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
“এই আপনি কি খেলার কথা বলছেন, আর পুলিশ এসব বলছে কেনো?”
“আগেই একদিন বলেছি, গাড়ীর বেক সিট থাকতে ফ্রন্ট সিটে এসব খেলা উচিত না।”
“কি বলছেন আপনি?”
“ও তুমি বুঝবে না।”ছোট মানুষ তো!!
“আপনি আমায় যেতে দিন।”সবার সামনে থেকে এমন ভাবে নিয়ে এসেছেন কেনো? স্বামীর অধীকার দেখাচ্ছেন নাকি!
নাভান এর সাথে টানাটানি করাতে, হেরা নাভান এর বুকে পরে কথা বলছে,নাভান এবার কটাক্ষ করে বলে।
“যেতে দিতে বলছো, আমার তুমি আমার বুকের ভিতর ঢুকে যাচ্ছো। কি রুপ দেখাইলা, মাওলা! দূরে যাবে বলে শার্ট এর বোতাম খুলে বুকের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।”
হেরাকে মূলত স্বাভাবিক করার জন্য নাভান এমন করছে,,আর বন্ধুদের সামনে এসব করলে সবকটা অক্কা পেতো তাতে তার সন্দেহ নেই,, কিছুক্ষন এর জন্য নাভান এর সাথে ঝামেলা করে অইসব কথা ভুলেই যায় হেরা,,,,
চলবে…?
আসসালামুআলাইকুম।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা,
গল্পের প্রতিটি পর্বে আপনাদের ভালোবাসা, অপেক্ষা, উৎসাহ আর অনুভূতি আমাদের বারবার নতুন করে লিখতে সাহস জুগিয়েছে। আপনাদের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া, প্রতিটি মায়া আর আন্তরিকতা আমাদের লেখার পথটাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।
পবিত্র ঈদ আপনাদের জীবনে বয়ে আনুক অফুরন্ত শান্তি, সুখ, ভালোবাসা আর বরকত। আপনাদের ও আপনাদের পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত ভরে উঠুক হাসি, আনন্দ আর হৃদয়ের প্রশান্তিতে। জীবনের সব কষ্ট, দুঃখ আর ক্লান্তি দূর হয়ে নতুন আলোয় ভরে উঠুক চারপাশ।
এই ঈদে আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে রইল আপনাদের জন্য অনেক অনেক দোয়া আর ভালোবাসা। সবসময় এভাবেই পাশে থাকবেন, গল্পের মানুষগুলোর সঙ্গে হেসে-কেঁদে পথ চলবেন—এই কামনাই রইল।
ঈদ মোবারক।
ভালোবাসা ও শুভকামনায়,
রোজ_রুশা 🥰