পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-৭ | Purnohin Purnota Part-7

অপূর্ণ ভালোবাসার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে, তবুও হৃদয়ের টান থেমে থাকে না।

পূর্ণহীন পূর্ণতা

লেখিকা সুমি চৌধুরী

পর্ব ৭

সারা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। রাফসান অদ্ভুতভাবে বিকৃত হাসি হাসছে। সারা কোনো রকম তোতলানো সুরে ভয়ার্ত গলায় বলল।

“ভা… ভাইয়া বিশ্বাস করুন আমি…”

বাকিটুকু বলার আগেই রাফসান এক হ্যাঁচকা টানে সারাকে খাটের নিচ থেকে বের করে আনল। সারা এক ঝটকায় এসে শক্ত মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মেঝের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়ে ওর কপালে হালকা আঁচড় লেগে রক্তবিন্দু জমে উঠল। সারা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল।

“আহহ্।”

আরো পড়ুন

সারা ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে কপালে হাত বোলাতে লাগল। ঝটকা খাওয়ার চোটে ওর বুক থেকে ওড়নাটা মেঝেতে পড়ে গেল। যন্ত্রণার চোটে সেদিকে সারার কোনো খেয়ালই নেই। সে চোখ বন্ধ করে কপাল ডলছে। রাফসান দাঁড়িয়ে দুই হাত মুঠো করে রাগে ফুঁসছে। সে উল্টো দিক থেকে ঘুরে সারার দিকে পাষাণের মতো তাকিয়ে বলল।

“তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি সারা। তোকে আমি পরিষ্কার বলে আসলাম বিয়েতে রাজি হবি না আর তুই নাচতে নাচতে রাজি হয়ে গেলি। আমার কথা অমান্য করার ফল কী হয় জানিস?”

সারার এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। শরীরের যন্ত্রণা আর মনের অপমান এক হয়ে ওকে বেপরোয়া করে তুলল। সে নিজের অবস্থার দিকে লক্ষ্য না করে এক ঝটকায় বসা অবস্থাতেই রাফসানের দিকে ঘুরে চেঁচিয়ে বলল।

“আপনি কি মানুষ নাকি কোনো জানোয়ার? আর বিয়ে তো আপনিও না করতে পারতেন। আপনি কেন না করলেন না? আপনি যেমন বাবাকে সম্মান করেন আমিও তাকে ঠিক তেমনই সম্মান করি। আমি কি আপনাকে শখে বিয়ে করেছি? আপনার মতো হিটলারকে বিয়ে করার কোনো শখ আমার নেই। আমিও পরিস্থিতির শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছি।”

সারার মুখে মুখে জবাব শুনে রাফসান রাগে ফেটে পড়ে যেই কিছু বলতে যাবে অমনি তার চোখ আটকে গেল সারার বুকের দিকে। ওড়নাটা মেঝেতে পড়ে থাকায় সারার বুকটা একদম অরক্ষিত। কামিজের গলাটা বড় হওয়ায় উজ্জল শুভ্র বুকের অনেকটা অংশই উন্মুক্ত হয়ে আছে। সারা রাগে আর অপমানে তখন জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে যার ফলে তার বুকটা অদ্ভুতভাবে ওঠানামা করছে। রাফসানের চোখের সেই বিধ্বংসী রাগ যেন মুহূর্তেই উবে গিয়ে সেখানে এক গভীর ঘোর লেগে গেল। সে অপলক দৃষ্টিতে এক ধ্যানে সেদিকে তাকিয়ে রইল।

সারা প্রথমে বুঝতে পারছিল না রাফসান এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কী দেখছে। ওর চাহনিটা বড্ড অদ্ভুত বড্ড বন্য। সারা রাফসানের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের বুকের দিকে তাকাতেই লজ্জায় আর অপমানে কুঁকড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে এক ঝটকায় উল্টো ঘুরে বসে দুই হাত দিয়ে বুক চেপে ধরল সে। ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে বলে উঠল।

“অসভ্য নির্লজ্জ পুরুষ। একটা লুইচ্চা।”

কিন্তু অবাক কাণ্ড রাফসানের কোনো সাড়াশব্দ নেই। কোনো পাল্টা গালি বা গর্জন শোনা গেল না। সারা কিছুক্ষণ এই গুমোট নীরবতা দেখে সাবধানে পাশ থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে নিল। তারপর নিজেকে ঠিকঠাক করে নিয়ে যেই সামনে ঘুরে রাফসানকে আবারও দু-কথা শোনাতে যাবে অমনি দেখল সামনে রাফসান নেই। সারা বড় বড় চোখ করে চারদিকে তাকাল। রাফসান কোথাও নেই। মানুষটা এভাবে হুট করে উদাও হয়ে গেল কোথায়। ঠিক সেই সময় বন্ধ ওয়াশরুমের ভেতর থেকে শাওয়ার ছাড়ার শব্দ এল। ঝরঝর করে পানি পড়ার আওয়াজ শুনে সারা বুঝতে পারল রাফসান ওয়াশরুমে ঢুকেছে।

সারা মেঝে থেকে উঠে রুমের মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভয় আর উত্তেজনায় ওর বুকটা এখনো অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করছে। ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে রাফসান বেরিয়ে এল। সারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ তুলে তাকাল এবং মুহূর্তেই যেন ওর পলক আটকে গেল। রাফসান কেবল একটা তোয়ালে কোমরে পেঁচিয়ে বেরিয়েছে। সে কোনোদিকে না তাকিয়ে সরাসরি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং অন্য একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো মুছতে লাগল। ওর সুঠাম দেহ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পিঠে আর বুকে শিরার মতো বেয়ে নামছে। কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলগুলো ওকে অন্য সময়ের চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয় আর পৌরুষদীপ্ত করে তুলেছে।

সারা এক প্রকার নির্লজ্জের মতোই ওর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল। মানুষটার ব্যবহার ঠিক না থাকলেও রূপের দিক দিয়ে আল্লাহ কোনো কমতি রাখেননি। খুব যত্ন নিয়েই বানিয়েছেন একে। রাফসানের চওড়া কাঁধ আর সুঠাম শরীরের গঠন দেখে যে কেউ থমকে যাবে। কিন্তু সারার মনে বড় একটা প্রশ্ন উঁকি দিল। এই মাঝরাতে হঠাৎ শাওয়ার নেওয়ার মানে কী। এটা কি ওর কোনো পুরনো অভ্যাস নাকি অন্য কিছু।

রাফসান আয়নায় সারার প্রতিফলন দেখতে পেল। সারা যে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে সেটা রাফসানের নজর এড়াল না। সে চুল মোছা থামিয়ে আয়নার মাধ্যমেই সারার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর চাহনিটা এখন আর আগের মতো হিংস্র নয় বরং কিছুটা গভীর আর রহস্যময়।

রাফসান আয়না থেকেই শীতল গলায় বলল।
“কী দেখছিস ওভাবে? শখ করে বিয়ে করলি এখন কি গিলে খাবি নাকি?”

সারার ঘোর ভাঙল। সে লজ্জা পেয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। রাফসান আয়নায় সারার বিচলিত মুখটা দেখে বাঁকা হাসল। সে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সারার দিকে ফিরে সেই অদ্ভুত আর গভীর চাহনি দিয়ে বলল।

“ভাবছিস তো আমি এত রাতে শাওয়ার কেন নিলাম। তবে ভালো করে জেনে রাখ এই শাওয়ার নেওয়ার কারণটা কিন্তু তুই নিজেই।”

রাফসানের এই দ্ব্যর্থবোধক কথা শুনে সারা চমকে উঠল। ওর মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। এসবের মানে কী। ও কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই রাফসান ওয়ারড্রোব থেকে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে পরে নিল। তারপর ধীরপায়ে গিয়ে বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে পড়ল এবং একটা কোলবালিশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সারার দিকে না তাকিয়েই সে বেশ কর্কশ গলায় বলল।

আরো পড়ুন

“লিসেন কেয়ারফুলি সারা আই উইল নট শেয়ার মাই বেড উইথ ইউ। তোর যদি এই রুমে থাকতে হয় তবে সোফায় বা মেঝেতে গিয়ে থাক। ডোন্ট ইভেন থিংক অ্যাবাউট টাচিং দিস বেড।”

বলেই রাফসান উল্টো দিকে ঘুরে কোলবালিশ দুটিকে ঢাল বানিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সারার পিত্তি জ্বলে গেল রাফসানের এমন অহংকারী কথা শুনে। সে রাগে গজগজ করতে করতে বিছানা থেকে একটা বাড়তি বালিশ টেনে নিল। বালিশটা বগলদাবা করে সোফার দিকে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল।

“শালা। ঠেকা লাগছে তোর পাশে ঘুমাতে। তোর পাশে ঘুমানোর থেকে কুত্তার সাথে ঘুমানো অনেক ভালো। হুহ। নিজেকে মনে করে কী। রাজপুত্তুর নাকি।”

সারা সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। কিন্তু শক্ত সোফায় ওর কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সারাজীবন নরম বিছানায় ঘুমিয়ে অভ্যাস এখন কি এইটুকু একচিলতে সোফায় ঘুম আসা সম্ভব। সারা অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করল কাঁচুমাচু করল কিন্তু ঘুমের কোনো নামগন্ধ নেই। শেষে বিরক্ত হয়ে আর শরীরের ব্যথায় অতিষ্ঠ হয়ে সারা বালিশটা শক্ত করে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরল। সে টিপটিপ পায়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে বেডের কাছে এগিয়ে এলো।

ততক্ষণে রাফসান ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে ওর গভীর আর ছন্দময় নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সারা অতি সাবধানে বালিশটা বিছানার একদম শেষ মাথায় রাখল। তারপর শরীরটাকে যতটা সম্ভব ছোট করে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল। মনে মনে শক্ত প্রতিজ্ঞা করল রাফসান জাগার ঠিক আগেই সে আবার সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়বে। এই ভেবে সারা চোখ বন্ধ করে কয়েকটা দোয়ার সুরা পড়ে গালে হাত দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। কিন্তু গভীর রাতে নিয়তি যেন অন্য এক খেলা শুরু করল। ঘুমের ঘোরে মানুষ তো আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সারা ঘুমের ঘোরে ডলতে ডলতে কখন যে বিছানার মাঝখানে চলে এলো ও নিজেও টের পেল না। ওদিকে রাফসানও ঘুমের ঘোরে অনেক আগেই বিছানার মাঝ বরাবর চলে এসেছিল।

অচেতন মনে সারা নিজের কোলবালিশ খুঁজতে লাগল। একসময় পাশে শক্ত কিছু একটা অনুভব করতেই সে সেটাকে নিজের কোলবালিশ ভেবে নিল। সারা আলতো করে রাফসানের গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে দুই হাত দিয়ে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ওদিকে রাফসানও অবচেতন মনে সারাকে নরম কোনো বালিশ ভেবে নিজের বলিষ্ঠ বুকের সাথে পিষে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। দুজনের নিশ্বাস এখন একদম কাছাকাছি। যে রাফসান সারাকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না সেই রাফসানই এখন সারাকে তার বুকের পাঁজরে শক্ত করে আটকে রেখেছে। আর সারাও সেই হিটলারের বুকেই খুঁজে পেয়েছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

সকালবেলা সারার আড়মোড়া ভেঙে ঘুমটা ভাঙল। সে কোলবালিশ ভেবে রাফসানের বুকের ওপর থেকে মাথাটা সরাল এবং দুই পাশে হাত ছড়িয়ে বড় একটা হাই তুলল। সারার এই নড়াচড়ায় রাফসানেরও ঘুমটা পাতলা হয়ে গেল। রাফসান আধো-বোজা চোখে পাশ ফিরতেই দেখল তার একদম নাকের ডগায় সারা। রাফসান চোখ কচলে কিছু একটা বলতে যাবে ঠিক তখনই সারার নজর পড়ল রাফসানের ওপর। নিজের ঠিক পাশেই যমের মতো রাফসানকে দেখে সারার আত্মা শুকিয়ে গেল।

“আহহহহ্।”

সারা বিকট এক চিৎকার দিয়ে দুই হাতে রাফসানকে সজোরে এক ধাক্কা মারল। ঘুমের ঘোরে থাকায় রাফসান তাল সামলাতে পারল না। সে একদম বিছানা থেকে ছিটকে গিয়ে ধপাস করে শক্ত মেঝেতে পড়ল।

“আউচ।”

ব্যথায় রাফসানের মুখটা কুঁচকে গেল। ওদিকে সারা বিছানায় বসে বুকে হাত দিয়ে হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে। মেঝে থেকে রাফসান উঠে দাঁড়াল তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক লাফে বিছানায় এসে সারার দুই গাল শক্ত করে চেপে ধরল। রাফসানের আঙুলের চাপে সারার ঠোঁট দুটো ফুলে উঠল। রাফসান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠে বলল।

“হাউ ডেয়ার ইউ। হাউ ডেয়ার ইউ টু পুশ মি। তোর সাহস কী করে হয় আমাকে ধাক্কা দেওয়ার? আর তোকে আমি সোফায় শুতে বলেছিলাম তুই কোন সাহসে আমার পারমিশন ছাড়া বিছানায় এসেছিস? হাউ ডিড ইউ কাম টু মাই বেড।”

রাফসানের গলার রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। সারা ব্যথায় ছটফট করতে করতে রাফসানের কবজি ধরার চেষ্টা করল। সারা কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে তোতলানো স্বরে বলল।

“ভা… ভাইয়া আমি আসলে… সোফায় বা মেঝেতে ঘুমানোর অভ্যাস নেই আমার আর তার জন্যই ভুল করে বিছানায় চলে এসেছি।”

রাফসান রাগে একদম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

“বিয়ে যখন করেছিস তখন তোকে সোফায় আর মেঝেতেই ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে। গেট দিস ইনটু ইয়োর হেড।নেক্সট টাইম যদি আবার এরকম ভুল হয় তবে সারা আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আই উইল মেক ইয়োর লাইফ হেল।”

বলেই রাফসান এক ঝটকায় সারার গাল ছেড়ে দিল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ধপধপ পা ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে সজোরে দরজাটা আটকে দিল। সারা দুই গালে হাত দিয়ে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগল। ওর নরম গাল দুটো এখন লাল হয়ে আছে আর আগুনের মতো জ্বালাপোড়া করছে। সে রাগে আর অভিমানে মনে মনে বলতে লাগল।

“মানুষটার মনে কি দয়া-মায়া বলতে কিচ্ছু নেই। যখন তখন গায়ে হাত তোলে গাল চেপে ধরে। কেন। তার গায়ে হাত তোলার জন্য কি আমার শরীরটা কি সস্তা কোনো খেলনা। জানোয়ার একটা।”


রাফসান রেডি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নামল। তার চোখেমুখে সকালের সেই বিরক্তির রেশ তখনো দপদপ করছে। তার পিছন পিছন সারাও স্কুল ড্রেস পরে গুটিগুটি পায়ে অত্যন্ত সাবধানে বের হলো। রায়ান চৌধুরী রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে তাদের দুজনের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। রাফসান তার বাবাকে দেখে একটা শুকনো সালাম দিয়ে ডাইনিং টেবিলে ধপ করে বসে পড়ল। সারাও কাঁপাকাঁপা স্বরে সালাম দিয়ে টেবিলের এক কোনায় মাথা নিচু করে বসল। সবাই খাওয়া শুরু করল কিন্তু পরিবেশটা ছিল ভীষণ গুমোট। রায়ান চৌধুরী খাওয়ার মাঝে হঠাৎ রাফসানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন।

“সারাকে এখন থেকে তুই-ই প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যাবি আর নিয়ে আসবি।”

রাফসান মাত্রই ভাতের লোকমা মুখে তুলতে যাচ্ছিল বাবার কথা শুনে তার হাতটা মাঝপথেই জমে গেল। সে খাবারটা প্লেটে নামিয়ে রেখে সরাসরি রায়ান চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল।

“আব্বু তুমি বিয়ে করতে বলেছো আমি করেছি। কিন্তু প্লিজ এসব ফালতু কাজের মধ্যে আমাকে টেনো না। আই হ্যাভ মাই ওউন লাইফ এন্ড মাই ওউন প্রায়োরিটিস।”

রায়ান চৌধুরী এবার হাত ধুয়ে বেশ শক্তভাবে টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি গম্ভীর চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন।

“শুধু বিয়ে করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না রাফসান। স্ত্রী যেখানেই যাক তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বামীর কর্তব্য। সারা এখন তোর ওয়াইফ তাই এখন থেকে তুই-ই সারাকে নিয়ে যাবি আর নিয়ে আসবি। দিস ইজ মাই অর্ডার রাফসান।”

বাবার এই চূড়ান্ত হুকুম শুনে রাফসান রাগে টেবিলের কিনারাটা এত জোরে খামচে ধরল যে তার নখগুলো সাদা হয়ে গেল। সারার তখন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে মাথা নিচু করে থাকলেও বুঝতে পারছিল রাফসানের অগ্নিদৃষ্টি এখন তার ওপর নিবদ্ধ। সারার গলা দিয়ে ভাত নামছে না মনে হচ্ছে খাবারগুলো পাথরের মতো আটকে আছে। রায়ান চৌধুরী সারার দিকে লক্ষ্য করে নরম গলায় বললেন।

“সারা মা কোনো সমস্যা? তুই কি একা যেতে চাস?”

সারা মুহূর্তের জন্য রাফসানের দিকে এক পলক তাকাল। দেখল রাফসান দাঁতে দাঁত চেপে তাকে ইশারা করছে ‘না’ বলার জন্য। কিন্তু সারা ভয় পেলেও এবার নিজেকে শক্ত করল। সে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে কোনোমতে বলল।

“না না আব্বু আমি ঠিক আছি।”

রাফসান না খেয়েই রাগে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই ফুটে উঠছে ভেতরের আগ্নেয়গিরি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সামনে থেকে বাইকের হর্ন বাঘের গর্জনের মতো ভেসে আসতে লাগল। ওই হর্নের তীক্ষ্ণ আওয়াজ যে সারাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া সেটা সারার বুঝতে বাকি রইল না। সারা কোনোমতে ভয়ে ভয়ে কয়েক লোকমা খেয়ে উঠে দাঁড়াল। রায়ান চৌধুরী নিজেই সারাকে সাথে করে বাইরের গেট পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। বাইরে আসতেই দেখা গেল রাফসান বাইকে বসে স্টিয়ারিংয়ের হ্যান্ডেলটা এমনভাবে চেপে ধরে আছে যেন সেটাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলবে। সে ঘনঘন বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে রাগে ওর ঘাড়ের রগগুলো ফুলে উঠেছে। রায়ান চৌধুরী পরম মমতায় সারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন।

“যা মা গিয়ে বস।”

সারা রায়ান চৌধুরীকে শেষবার সালাম দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। সে অত্যন্ত সাবধানে কাঁপা কাঁপা হাতে রাফসানের বাইকের পেছনে বসল। রাফসান বাইক স্টার্ট দিয়েই শীতল অথচ গম্ভীর গলায় হুংকার দিয়ে বলল।

“হোল্ড মি টাইট। আমি এখন একদমই নিয়ন্ত্রণে নেই। বাইক অনেক জোরে চালাতে পারি।”

রাফসানের এই শাসানি শুনে সারার কলিজা শুকিয়ে গেল। সে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রাফসানের দুই কাঁধে শক্ত করে হাত দিল। মুহূর্তের মধ্যেই রাফসান ঝড়ের বেগে বাইক টান দিল। চোখের পলকে ধুলো উড়িয়ে তারা বাড়ির মেইন গেট দিয়ে উধাও হয়ে গেল। রায়ান চৌধুরী এক দৃষ্টিতে বাইকের চলে যাওয়ার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমাটা একবার মুছে ঠিক করে চোখে দিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগত কণ্ঠে বললেন।

“আমি জানি রাফসান তুই পদে পদে আমার ওপর রেগে যাচ্ছিস। আমাকে হয়তো ভুল বুঝছিস। কিন্তু সময় হলে তুই ঠিকই বুঝবি সারা আসলে তোর জীবনের জন্য কতটা মূল্যবান জিনিস।”

চলবে…!

পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *