
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজও রুশা
পাঠ ২৪
ফোনের কর্কশ আওয়াজটা যেন পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিলো। টেবিলের উপর ছড়ানো খাতা, নোট, কলম—সব কিছুর মাঝখান থেকে একসাথে দুইটা ফোন বেজে উঠতেই চমকে উঠলো রোজ আর রুশা।
দুজন একে অপরের দিকে তাকালো—চোখে একই প্রশ্ন, একই ভয়, একই লজ্জা। সামনে পরীক্ষা, অথচ পড়া এখনো কমপ্লিট না… তার ওপর আজকের সেই ঘটনা! কেউ কাউকে কিছু বলেনি, কিন্তু দুজনের চোখেই সব লেখা যেন —আজ যা হয়েছে, সেটা ভুলার মতো না দুজনের!
হেরা তখন বারান্দায় একা বসে। মনটা ভারী। পড়া শেষ করেও তার ভেতরের অস্থিরতা থামছে না। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না—সবকিছু যেন ঝাপসা।
আরো পড়ুন
অন্যদিকে রোজ আর রুশা—দুইজন দুই শোকে শোকাহত। একেকজনের জীবনে একেকটা “ঝড়” এসে গেছে আজ। তার উপর বান্ধবী কম বোন বেশি হেরার জীবন এর নতুন নতুন সম্পর্ক আর মোড় যেন একেকটা ধাক্কা তাদের জীবনে। দুই পাগল উপন্যাস প্রেমি। গল্প-উপন্যাসে এমন মুহূর্ত পড়লে বুক কাঁপতো, ভালো লাগতো, নিজেকে নায়িকার জায়গায় বসিয়ে কল্পনা করলে মনে হতো—“আহা, কি রুমান্টিক কাহিনি।
কিন্তু আজ… বাস্তবে?
ব্লেসিং তো দূরের কথা—পুরো “মিরকি রোগী” হয়ে গেছে তারা! রুশা মনে মনে বললো,
“ধুর! এতদিন যা যা পড়লাম, সব মিথ্যা! বাস্তবে এমন হলে মানুষ রোমান্টিক না, সোজা লজ্জায় মরে যায়!”
ফোনটা এখনো বেজেই যাচ্ছে।
দুজনই বুঝে গেছে—এই ফোন “সাধারণ” কারো না।
একই সাথে ফোন হাতে নিয়ে, দুইজন দুইদিকে সরে গেলো। রুশার হাত কাঁপছে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এমন, মনে হচ্ছে ফোনের ওপাশ থেকেও শোনা যাবে।
অবশেষে রিসিভ করলো—
“আসসালামু আলাইকুম…”
ওপাশ থেকে শান্ত, ভারী কণ্ঠ—
“ওয়ালাইকুমুসসালাম… কি করছো, লাল গোলাপি?”
এই “লাল গোলাপি” ডাকটা শুনেই রুশার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেলো।
“এ… এই তো… কিছু নোট করছিলাম… আপনি?”
“আমি? এই তো… একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ছিলাম।”
“ও… আচ্ছা…”
একটু নীরবতা।
তারপর হঠাৎ—
“আজ এটা কি ছিলো?”
রুশার বুক ধক করে উঠলো।
“ক… কই? কি ছিলো?”
“কেন? তুমি জানো না তুমি কি করেছো আজ?”
এবার রুশার মনে হলো—পৃথিবী ফেটে গেলে এখনই ঢুকে পড়তো!
মনে মনে গালি দিতে লাগলো—
“সালা লুইচ্চা বেডা! যা করছি করছি—এভাবে ঢোল পিটাইতে হবে নাকি! আমার বুঝি লজ্জা লাগে না!”
আস্তে করে ফিসফিস করছিলো, কিন্তু সে জানতো না।ওপাশের মানুষটা সব শুনছে। অধীর মুচকি হেসে ফেললো। মেয়েটার এই লাজুক-রাগী স্বভাবটা তার ভীষণ ভালো লাগে। সে আবার বললো—
“যাক, ভালো হয়েছে। ওই ফুসকা ওয়ালা মামাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। সবই তো তার ফুসকা মামার ফুসকার ক্যারামতি… তা না হলে এমন টেস্টি ‘হানি’ খেতে পেতাম আমি আজ। কেউ কি খাওয়াতো আমায় ?”
রুশার চোখ কপালে! এই ছেলে কি বলছে!!!” অধীর থামলো না—
“ভাবছি এখন থেকে মামাকে মাসে বেতন দিবো। প্রতিদিন এমন ফুসকা বানাবে… কি বলো, চলবে তো লাল গোলাপি?”
রুশার মনে হচ্ছে কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে।
লজ্জা, রাগ, অস্বস্তি—সব একসাথে!সে দাঁত চেপে বললো—
“অসভ্য! লাইভ টেলিকাস্ট কি যা তা বলছেন ? আমি জীবনে আর ফুসকা খাবো না!
”অধীর অবাক হবার ভাব ধরে হেসে বললো—
“এই - না, কেনো? তোমার এক টাকাও লাগবে না—আমি খাওয়াবো। তাও খেতে হবে তোমায় লাল গোলাপি! ”
একটু থেমে আবার—
“আর শোনো… অডিও বুক আর উপন্যাস পড়ে বেশ উন্নতি হয়েছে তোমার। ঝাল খাবে, আবার আমাকেও খাওয়াবে… আর এখন থেকে প্রতিদিন এই টেস্ট নিতে হবে আমার। ”না বললে তো চলবে না লাল গোলাপি।
এইবার রুশা আর পারলো না।
লজ্জায়, অপমানে, রাগে—সব মিলিয়ে ফোনটা কেটে দিলো।ফোন কেটে দিয়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বললো—
“হায় আল্লাহ… আজ যা করলাম! এই ছেলের সামনে এমন করা মোটেও উচিত হয়নি…”
তারপর নিজেই নিজের মাথায় চাপড় দিলো—
“এমনি এই ছেলের মুখে ব্রেক নাই… এখন তো আমাকে নিয়ে সারাজীবন মজা করবে!”
রাতটা আজ যেন অন্যসব রাতের চেয়ে আলাদা।
চারপাশ নিস্তব্ধ… শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা বাতাস, আর সেই বাতাসে পর্দার মৃদু দুলুনি—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করেছে। যেন পৃথিবী থেমে আছে, শুধু দুটো হৃদয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে… একটার নাম রোজ, আরেকটা সৃজন।ফোনটা কানে চেপে ধরে বসে আছে রোজ। ওপাশে সৃজন একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে… কিন্তু রোজ—চুপ।
একটা “হুম” বা “হ্যাঁ” কিছুই বলছে না। আজকের ঘঠনার জন্য লজ্জায় মুখ দিয়ে কথাই বের করতে পারছে না। কিন্তু এই নীরবতা সৃজনের বুকের ভেতর কেমন করে যেন কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।
“জান… কিছু বলো না প্লিজ… তুমি এমন চুপ করে থাকলে আমার খুব ভয় লাগে…”
তার কণ্ঠে আজ আর সেই দুষ্টুমি নেই, নেই কোনো হাসি—শুধু ভয়… আর অপরাধবোধ।
“আই এম সরি জান… আমি জানি আমি ভুল করেছি… কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি… ওই মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে পারিনি… তোমাকে এতটা কাছে পেয়ে… আমি হেরে গিয়েছিলাম নিজের কাছেই…”
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে আসে।
“আমি আর কখনো এমন করবো না… তোমার অনুমতি ছাড়া তোমাকে ছোঁয়ার কথা ভাববোও না… কসম… বিয়ের আগে আমি তোমার দিকে ভালো করে তাকাবোও না যদি তুমি না চাও… কিন্তু প্লিজ… তুমি চুপ থেকো না…”
রোজ চোখ বন্ধ করে ফেলে।
সৃজনের প্রতিটা শব্দ তার হৃদয়ে গিয়ে লাগছে।
এই মানুষটা—এতটা নিচু হয়ে ক্ষমা চাইছে… শুধু তার জন্য।তার বুকটা হু হু করে ওঠে। ওপাশে সৃজন আবার বলতে থাকে—
“জান… তুমি যদি চাও আমি তোমার পায়ে পড়ে থাকবো… তুমি যা শাস্তি দাও আমি মেনে নেবো… কিন্তু তোমার এই চুপ থাকা… এটা আমি সহ্য করতে পারছি না…”
একটু থেমে, ভাঙা গলায় বলল—
“তোমার একটা শব্দ… একটা ‘হুম’… আমার পুরো পৃথিবী ঠিক করে দেয় জান…”
রোজের চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না… হঠাৎ করেই ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। এই কান্নার শব্দটা যেন সৃজনের বুক চিরে ঢুকে যায়।
“জান! প্লিজ কেঁদো না… প্লিজ… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে… তুমি কাঁদলে মনে হয় আমি নিজেই ভেঙে পড়ছি…”
তার কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট।
“আমি বলেছি না… আমি আর তোমার দিকে তাকাবোও না… তোমার কাছ থেকে দূরে থাকবো… শুধু তুমি কেঁদো না… প্লিজ…”
রোজ চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে…
কিন্তু কান্না থামছে না। সৃজন হঠাৎ কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
“তুমি যদি এখন কান্না না থামাও… আমি সত্যি বলছি… আমি নিজের ক্ষতি করে ফেলবো… আমি পারছি না তোমাকে এমন কাঁদতে শুনতে…”
এই কথাটা শুনেই রোজ যেন হুঁশে ফিরে আসে।
“না! প্লিজ… এমন কথা বলবেন না…”
তার কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু এবার সে কথা বলছে।
ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নেয় রোজ।
একটু চুপ থেকে, ভাঙা গলায় বলে—
“জানেন… চুমুর সাপ্লাই ম্যান…”
সৃজন থমকে যায়।
এই নামটা শুনেই তার বুকের ভেতর একটু স্বস্তি ফিরে আসে।
“হুম… বলো জান…”
রোজ ধীরে ধীরে বলতে থাকে—
“বাবা মা মারা যাওয়ার পর… আমি যখন রাগ করতাম… কেউ এসে আমার রাগ ভাঙাতো না… আমি কাঁদলে কেউ বলতো না ‘চুপ করো’… কেউ আমার মাথায় হাত রাখতো না…”
তার গলা আবার ভারী হয়ে আসে।
“আজ আপনি যেভাবে আমার জন্য কাঁপছেন… আমার জন্য এতটা নিচু হয়ে যাচ্ছেন… এটা দেখে আমার খুব ভয় লাগে…”
মেয়েটা অই মুহূর্ত নিয়ে রেগে নেই ভেবে সৃজন আস্তে করে জিজ্ঞেস করে—
“ভয় কেনো জান?”
“কারণ… এত ভালোবাসা আমি ধরে রাখতে পারবো তো? যদি একদিন আপনি ক্লান্ত হয়ে যান… যদি একদিন আপনি আর এমন না থাকেন…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সৃজন দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে—
“থামো।”
একটু নীরবতা…দুজনের ফোনের মধ্যে।
“আমি ক্লান্ত হবো না জান… কারণ এটা কোনো বোঝা না… এটা আমার শ্বাস নেওয়ার মতো… আমি তোমাকে ভালোবাসি, কারণ তুমি আমার অভ্যাস না—তুমি আমার প্রয়োজন…”
রোজ নিঃশব্দে কেঁদে যায়।
সৃজন আবার নরম গলায় বলে—
“আর তুমি ভয় পাচ্ছো কারণ তুমি আমাকে হারাতে চাও না…এটাই প্রমাণ তুমি আমায় কতটা ভালোবাসো…”
রোজ হালকা করে হেসে ফেলে কান্নার মাঝেই—
“আপনি একটা পাগল…”
“হ্যাঁ… তোমার পাগল… শুধু তোমার…”
“আর ওই চুমুর সাপ্লাই ম্যান নামটা…”
“লাইফটাইম কন্ট্রাক্ট!”
সৃজন হেসে বলে।
রোজ একটু দুষ্টুমি করে—
“আগে ডেলিভারি হবে না?”
“না ম্যাডাম… বিয়ের আগে শুধু চোখে চোখে প্রেম… আর দূর থেকে আদর…”
তার কণ্ঠে এমন এক প্রতিশ্রুতি… যা শুধু শোনা যায় না, অনুভব করা যায়।
রোজ ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে…
মনে হচ্ছে সৃজন যেন ঠিক তার পাশেই আছে।
“সৃজন…”
“হুম জান?”
“আপনি থাকবেন তো?”
এই প্রশ্নটার ভেতর লুকিয়ে আছে হাজার ভয়… হাজার আশা…
সৃজন একটুও দেরি না করে বলে—
“তোমার শ্বাস যতদিন চলবে… আমি ততদিন থাকবো।
আর যদি তার আগেই চলে যাই… তাহলে জানবে—
আমি কোথাও বসে আছি… তোমার জন্য অপেক্ষা করছি…”
রোজ চোখ বন্ধ করে দেয়।
তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি… চোখে জল…
আজ সে বুঝলো—ভালোবাসা শুধু পাওয়া না…
ভালোবাসা মানে কেউ একজন তোমার জন্য ভেঙে পড়ে… আবার সেই মানুষটাই তোমাকে আগলে রাখে।
রাতটা আরও গভীর হয়…
কিন্তু তাদের দুজনের মন আজ হালকা…কারণ—তারা জানে…যত ঝড়ই আসুক…তারা একে অপরের হাত ছাড়বে না।
~~~
মন খারাপ করে বারান্দার এক কোণে বসে আছে হেরা। রাতটা আজ অদ্ভুত নিরব, তবুও সেই নীরবতার মাঝেই ভেসে আসছে হাসির শব্দ। রোজ আর রুশা দু’জনেই ফোনে ব্যস্ত—নিজ নিজ প্রেমিক পুরুষের সাথে গল্পে মশগুল। তাদের হাসি, খুনসুটি, অভিমান ভরা কথার ফাঁকেও বারবার উঠে আসছে হেরার নাম। যেন আজকের রাতের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু সে-ই।
হেরা চুপচাপ বসে আছে। যেন এই পৃথিবীর সব শব্দ তার থেকে অনেক দূরে।
জাওয়াদ খানের দুইটা বাড়ি—একটা ঢাকায়, আরেকটা গাজীপুরে। অথচ আজ কোনো বাড়িতেই তার শান্তি নেই। কিছুক্ষণ আগে এই বাসায় এসেছিলেন তিনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের খবর নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ঢুকে আর থাকতে পারেননি। চারপাশের এই কোলাহল, মানুষের ভিড়, ফিসফাস—সবকিছু আজ তার কাছে অসহ্য লাগছে।
তাই আবার চলে গেছেন। তিনি একা থাকতে চান… খুব একা। এমনকি নিজের মেয়ের থেকেও দূরে।
কারণ তিনি জানেন—মেয়ের চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই।
প্রেয়সির এমন পরিবর্তন… যেন বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দেয়। যে মেয়েটাকে তিনি সবসময় শক্ত, অহংকারী আর নির্ভীক দেখতে চেয়েছিলেন— সেই মেয়েটার ভাঙা চেহারা তার চোখে কাঁটার মতো বিঁধে।
আর এই নিঃশব্দ রাতেই খুব করে মনে পড়ছে কাজল রেখাকে। এই নারী… যার জন্য একসময় নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি ছিলেন তিনি।
একটা মেয়ের জন্য আজও মাঝরাতে অন্ধকারের ভিতর দাঁড়িয়ে হাহাকার করে ওঠে জাওয়াদ খান।
প্রেয়সির বিয়ের খবর শুনে কত রাত নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করেছেন তিনি—তার দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে। জ্বলজ্বল করে… যেন প্রতিটা দাগ একটা করে অসমাপ্ত গল্প।
জীবনে একে একে দুইবার ঠকেছেন জাওয়াদ খান।
তাইতো নিজের প্রাণপ্রেয়সী অর্ধাঙ্গিনীকে এত কাছে পেয়েও মায়ার চাদরটা তার গায়ে জড়াতে দেননি।
বরং নিজের হৃদয়ের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন কঠিনতার ভারী চাদর।
যেন ভালোবাসা নামের শব্দটাই তার জীবনে নিষিদ্ধ।
এদিকে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে হেরা।
পূর্ণিমার গোল চাঁদটা যেন আজ অদ্ভুত উজ্জ্বল।
কিন্তু সেই আলোও তার বুকের অন্ধকার ভেদ করতে পারছে না।
ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।
চাঁদের আলোয় ভিজে উঠেছে তার চোখ।
দুই গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রুগুলো যেন চুপচাপ সাক্ষী দিচ্ছে তার ভেতরের ভাঙনের।
হেরা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো—
“হে খোদা… এ কেমন নিয়তি আমার?একটা ছেলেকে নিচে নামানোর জন্য এসেছিলাম আমি…
তাকে অপমান করতে, তাকে হারাতে…কিন্তু আজ দেখো—নিজেই সবার চোখে নিচু হয়ে গেছি। সবার সামনে অপমানিত হয়েছি আমি…
শুধুমাত্র ওই অহংকারী লোকটার জন্য।”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো।
চোখের পানি থামানোর চেষ্টা করেও পারলো না।
“না… আমি তাকে ছাড়বো না।খুব হিসাব করে… খুব বুদ্ধি করে আমাকে সবার সামনে ছোট করেছে সে।আমার সম্মান, আমার অহংকার—সবকিছু মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই অপমান আমি ভুলবো না। একদিন… ঠিক একদিন…
এই অপমানের হিসাব আমি নেবোই।”
শেষ কথাটা বলতেই তার গলা আটকে গেল।
চাঁদের আলোয় বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছিল—সে শুধু কাঁদছে না, বরং নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলোকে বুকের ভেতর শক্ত করে চেপে ধরে আছে।
সেই কান্না ছিল নিঃশব্দ…
কিন্তু এত গভীর…
যে কেউ যদি এই দৃশ্যটা দেখতো—
তার নিজের চোখও হয়তো অজান্তেই ভিজে উঠতো হেরার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু হঠাৎ করেই গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। কয়েক ফোঁটা পানি যেন বুকের ভেতরের সব অস্থিরতা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো।কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠলো সবকিছু।
অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ করেই ভেসে উঠলো একটা মুখ—শেহতাজ খান নাভান
সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি…
সেই আত্মবিশ্বাসে ভরা চোখ…
আর সেই অদ্ভুত হাসি…
হেরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যে তার মনে ভেসে উঠলো সেই দিনের দৃশ্য। কবুল বলার সময়ের মুহূর্তটা।
কেমন যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেলেও সেই মুহূর্তটা স্পষ্ট মনে আছে তার। যখন কাজী সাহেব বলেছিলেন। “কবুল?”সেই সময় নাভান হঠাৎ করে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়েছিলো।
এত কাছে…এতটাই কাছে যে হেরা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলো তার বুকের ধুকপুক শব্দ। তারপর…
হেরার হাতটা নিজের বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরেছিলো নাভান।সেই চাপ…সেই স্পর্শ…
যেন এখনো হাতের তালুতে লেগে আছে।
হেরা হঠাৎ করেই চোখ খুলে ফেললো।
আরেকটা দৃশ্য ভেসে উঠলো মনে—
নাভান বাইক চালাচ্ছে…চুলগুলো বাতাসে উড়ছে…
একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী এটিটিউড…
হ্যান্ডেলে এক হাত…
অন্য হাতে সানগ্লাস ঠিক করছে…
আর সেই স্বভাবসুলভ কথা বলার ধরন—
আধা রাগী, আধা ঠাট্টা মেশানো কণ্ঠ।
হেরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেঁপে উঠলো।
সে দ্রুত নিজের বুকের ওপর হাত চেপে ধরলো, যেন হৃদয়ের অস্থির ধুকপুকানি থামাতে চাইছে।
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।
“না… না… না…”
মাথা নেড়ে নিজেকেই যেন বোঝাতে লাগলো সে।
কণ্ঠটা কাঁপছিলো।
“আমি ওই লোকটাকে ঘৃণা করি…! শুনছো? আমি তাকে ঘৃণা করি!”
তার চোখ আবার ভিজে উঠলো।
“আর সারাজীবন ঘৃণা করবো…! আমি শুধু প্রতিশোধ নিতে এসেছি… হ্যাঁ… আমি শুধু প্রতিশোধ নিতে এসেছি!”
তার কণ্ঠে ছিলো রাগ…
যন্ত্রণা…
আর একটা অদ্ভুত জেদ।
পাশে বসে থাকা রোজ অনেকক্ষণ ধরে সবকিছু দেখছিলো চুপচাপ।
হেরার কাঁপতে থাকা শরীরটা দেখে তার বুকটাও কেমন ভারী হয়ে উঠলো। রোজ ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে হেরার কাঁধে রাখলো। নরম কণ্ঠে বললো—
“জানিস হেরা পাখি…”
হেরা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।
রোজের চোখে অদ্ভুত এক মায়া ছিলো।
“বিয়ে একটা পবিত্র সম্পর্ক।”
সে একটু থামলো।
“তুই চাইলে হয়তো অস্বীকার করতে পারবি না—এটা আমি জানি। কিন্তু প্লিজ… একটু ভেবে দেখ।”
রোজের কণ্ঠে ছিলো শান্ত একটা দৃঢ়তা।
“আল্লাহ না চাইলে কিছুই হয় না পাখি। আর বিয়ের মতো এত বড় একটা সম্পর্ক… এটা তো এমনি এমনি হয়ে যায় না।”
হেরা হঠাৎ করেই মাথা তুলে তাকালো।
তার চোখে তখন রাগের আগুন জ্বলছিলো।
সে প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলো—
“আমি ওই লোকটাকে ঘৃণা করি! ফুল সত্যি—ভীষণ ঘৃণা করি!”
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো।
“ওই লোকটার জন্য আমার প্রিয়… আজ কথা বলার বাকশক্তি হারিয়েছে!”
কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে এলো।
চোখের পানি এবার আর থামলো না।
“আজ সে আমাদের থেকে অনেক দূরে… অনেক দূরে!”
হেরার মুঠো শক্ত হয়ে গেলো।
চোখে ভেসে উঠলো প্রতিশোধের আগুন।
“আমি তার ক্ষমতা মাটির সাথে মিশিয়ে দিবো। আমি তাকে শেষ করে দিবো!”
রোজ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো।
সে হেরার হাতটা আলতো করে ধরে বললো—
“পাখি… কেউ পাপ করলে তার শাস্তি আল্লাহ দেন।”
তার কণ্ঠে ছিলো অদ্ভুত কোমলতা।
“তুই শাস্তি দিয়ে নিজেকে দোষী বানাচ্ছিস কেনো?”
হেরা ঠোঁট কামড়ে ধরলো।
তার চোখে তখনো জেদের আগুন।
“এটা দোষ না।”
সে ধীরে ধীরে বললো।
“এটা তার শিক্ষা।”
হেরার ঠোঁটে তিক্ত একটা হাসি ফুটে উঠলো।
“আমি আমার দক্ষতা দিয়ে তাকে টপকাচ্ছি। তার মতো ক্ষমতার দাপটে না—ফুল।”
রোজ চুপচাপ শুনছিলো।
তারপর একটু মৃদু হাসলো।
“পাখি… আমি জানি তুই খুব শক্ত মনের মেয়ে।”
সে আবার বললো—
“কিন্তু কথায় আছে না— নিয়ত গুণে বরকত।”
রোজের কণ্ঠটা এবার একটু গভীর হয়ে উঠলো।
“তোর মন জানে তোর আসল উদ্দেশ্য কি। তুই ভালো উপায়ে করলেও… উদ্দেশ্যটা কিন্তু খারাপই।”
হেরা কিছু বললো না।
চুপ করে রইলো।
রোজ আবার বললো—
“আর একটা কথা বলি?”
হেরা তাকালো। রোজ হালকা দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো—
“তোর ওই চকলেট হিরোটাকে দেখ।”
হেরা ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
“মানে?”
রোজ বললো—
“সে কিন্তু তিতিরকে রেখে তোকে বউ হিসেবে স্বীকার করেছে।”
সে ধীরে ধীরে বললো—
“তিতির মেয়েটা নাভান ভাইয়ের জন্য কতটা পাগল—তা তো তুই জানিস।”
“তাও ভাই এই পবিত্র সম্পর্কটা সবার সামনে স্বীকার করেছে।”
হেরা ঠান্ডা কণ্ঠে বললো—
“ক্যারেক্টারই এমন।”
রোজ সাথে সাথে মাথা নাড়লো।
“না পাখি… আমি কিন্তু নাভান ভাইয়ের চরিত্র খারাপ কখনো দেখিনি।”
সে একটু ভেবে বললো—
“তিতিরকে হয়তো বেশি প্রায়োরিটি দেয়… কিন্তু খারাপ কিছু না। পুতুপুতু টাইপও না।”
রোজ হালকা হেসে বললো—
“ফ্রেন্ডদের মতোই আচরণ করে।”
হেরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো তার দিকে।
“তুই এই লোকটাকে চিনিস না ফুল।”
তার কণ্ঠে ছিলো কঠিন একটা বিশ্বাস।
“তাই এমন কথা বলছিস।”
রোজ শান্তভাবে হাসলো।
“হতে পারে।”
তারপর ধীরে বললো—
“আমি যা মনে হয়েছে তাই বললাম পাখি।”
রোজ আবার হেরার কাঁধে হাত রাখলো।
নরম কণ্ঠে বললো—
“তুই একটু ভেবে দেখিস…”
কথাটা বলেই সে চুপ করে গেলো।
আর হেরা…
সে স্থির হয়ে বসে রইলো। তার বুকের ভেতর তখনও কেমন অদ্ভুত এক ঝড় বইছে—ঘৃণা…
প্রতিশোধ…আর কোথাও যেন খুব গভীরে…
একটা অজানা অনুভূতি
রাতটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। নদীর বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কয়েকটা স্পিডবোট। চারপাশে ঘন অন্ধকার—শুধু দূরের কোনো ঘাটের আলো কাঁপতে কাঁপতে জ্বলছে। সেই নৌপথ দিয়েই আজ পাচার হচ্ছে প্রায় একশো কোটি টাকার মাদক। পুরো অপারেশনটার নেতৃত্বে আছে নিলয়।
কাগজে-কলমে সবকিছু নিখুঁত। লোকজন, পথ, সময়—সব হিসাব করে সাজানো। তবুও আজ নিলয়ের মন যেন এই অপারেশনে নেই।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে হেরার মুখ।
নৌকার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিলয় নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল—
“কেন এমন করছো তুমি, হেরা…আমায় হয়ে যাচ্ছো না কেনো,কেনো আমার ভালোবাসা তোমার চোখে পরছে না ?”
তার চোখে কাজে আসার পর সেই পরিচিত কঠোরতা নেই আজ। যেন কোনো অদৃশ্য চিন্তা তাকে ভিতর থেকে গ্রাস করে রেখেছে। টিমের একজন এসে বলল—
“বস, সব ক্লিয়ার। আর দশ মিনিটের মধ্যে মাল উঠাবো । “
নিলয় শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। কিন্তু তার দৃষ্টি তখনো দূরের অন্ধকারে আটকে আছে।
সে জানে না—অনেকক্ষণ ধরেই দূর থেকে তাদের গতিবিধি নজর রাখছে সি আই ডি-র চারটি বিশেষ টিম।
ঝোপের আড়ালে, কালো গাড়ির ভিতর, ওয়্যারলেস হাতে কয়েকজন অফিসার ফিসফিস করে বলছে—
“টার্গেট কনফার্মড। নিলয় নিজে আছে টিমে।”
“অর্ডার পেলেই ঘেরাও করবো।”
রাতের বাতাসে উত্তেজনার ঘন গন্ধ।
অবশেষে সময় এলো।
নিলয়দের গাড়িগুলো যখন নদীর ঘাট ছেড়ে নির্জন রাস্তায় উঠলো, ঠিক তখনই হঠাৎ—
সাইরেনের কর্কশ শব্দ!
চারদিক থেকে হেডলাইট জ্বলে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা ঘিরে ফেলল কয়েকটা কালো জিপ। সি আই ডির হেড তিনি খুব সাবধান করলো সবাইকে।
কেউ নড়বে না!”
চিৎকার করে উঠল সেই হেড অফিসার।
এক মুহূর্তের জন্য নিলয় স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন হঠাৎ করেই বাস্তবে ফিরল সে। তার চোখে তখন বজ্রপাতের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
“ড্যামিট!”
ফিসফিস করে বলেই সে দ্রুত পকেট থেকে কালো মাস্কটা মুখে ভালো করে এঁটে নিল।
পরের মুহূর্তেই কোমর থেকে বের করল তার পিস্তল।
টিমের লোকজন তখনো বুঝে উঠতে পারেনি কি হবে। কিন্তু নিলয় বিদ্যুৎগতিতে গাড়ির জানালা দিয়ে ঝুঁকে একের পর এক গুলি চালাতে শুরু করল। সোজা গিয়ে লাগল সি আই ডি গাড়িগুলোর চাকায়। দুইটা গাড়ি সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠে বসে গেল রাস্তার মাঝখানে।
“কভার! কভার!”
চিৎকার করে উঠল সি আই ডি অফিসার।
ঠিক সেই সময় নিলয় পকেট থেকে একটা ছোট্ট স্মোক ক্যানিস্টার বের করে মাটিতে ছুড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল ঘন ধোঁয়া। রাস্তা ভরে গেল ধূসর কুয়াশার মতো ধোঁয়ায়।
সি আই ডি সদস্যরা কাশতে কাশতে প্রায় দম বন্ধ হয়ে মাটিতে ঝুঁকে পড়ল। চোখ জ্বালা করতে লাগল সবার। এই সুযোগটাই নিল নিলয়।
ধোঁয়ার আড়ালে সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তার টিমের লোকজনও নির্দেশ বুঝে গেল মুহূর্তেই।
“চলো! এখনই!”
নিলয় নিচু স্বরে বলতেই সবাই ছুটে গেল অন্ধকারের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা গায়েব। ধোঁয়া ধীরে ধীরে পাতলা হলে দেখা গেল—রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে কয়েকটা বিকল গাড়ি, আর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সি আই ডি-র সদস্যরা। অফিসার টা নিজের মাক্স খুলে ছুড়ে মারে রাস্তায়,রাগে শরীর তার রি রি করছে।
এতো সাবধানে অপারেশন চালিয়েও ধরা গেল না নিলয়কে। দূরের অন্ধকারে তখন শুধু মিলিয়ে যাচ্ছে কয়েকটা ছায়ামূর্তি। নিলয় যেন রাতের অন্ধকারেরই অংশ—
ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। আর তার চরিত্রও ঠিক সেই রাতের মতোই—
রহস্যে ঢাকা, অন্ধকারে মোড়া।
রাতের আধারে নিলয় হেরাকে মনে করতে থাকে তার কালো দুনিয়ার সব সামনে আসে এমন করে উপস্থাপন করো
রাতটা ছিল অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
চারদিকে শুধু অন্ধকার আর দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক।
নিলয় একা দাঁড়িয়ে ছিল তার বিশাল বাড়ির বারান্দায়। হাতে সিগারেট, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে সেটা জ্বলছে—টান দেওয়ার কথা তার মনে নেই। তার চোখ যেন কোথাও দূরে আটকে আছে… সেই জায়গায়, যেখানে বারবার ভেসে উঠছে একটা মুখ— হেরা। ১০০ কোটি টাকা আজ লস গেলো তার একটু ভুলের জন্য।
হঠাৎ সে নিচু গলায় বলে উঠলো—
“এই দুনিয়ায় আমি সব হারাতে পারি…
কিন্তু তোকে না পেলে আমি সব ধংস করে দিবো।
রাতের বাতাস যেন আরো ঠান্ডা হয়ে গেল। দিনের আলোর সাথে আবার সে হয়ে গেলো সবার ক্রাস বয় নিলয় চৌধুরী। নতুন রুপে আবার ধরা দিলো হেরার সামনে।
আমি তোমায় ভালোবাসি, হেরা… তুমি সেটা জানো।”
নিলয়ের কণ্ঠে এমন এক অসহায়তা ছিল, যেন বহুদিন ধরে বুকের ভিতর আটকে থাকা একটা ঝড় আজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার চোখ লাল, কণ্ঠ কাঁপছে। যেন এই একটা উত্তরই তার পুরো পৃথিবী ঠিক করে দেবে।
হেরা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। চোখে কোনো দুর্বলতা নেই, বরং এক ধরনের ক্লান্ত দৃঢ়তা।
“দেখুন নিলয়, আমি আপনাকে খুব ভালো বন্ধু মনে করি। আগেও বলেছি, এখনো বলছি—দয়া করে ভালোবাসার দাবি নিয়ে আর কিছু বলবেন না।”
কথাগুলো খুব শান্তভাবে বললেও নিলয়ের কাছে সেগুলো ছুরির মতো বিঁধল। নিলয় তিক্ত হাসল।
“তার মানে… এই বিয়েটা তুমি মেনে নিয়েছো?”
হেরার চোখে হঠাৎ ঘৃণার ঝিলিক দেখা দিল।
“না। কখনো না। আমি আমার জায়গা থেকে এক পা-ও সরব না। আগে যেমন ঘৃণা করতাম, এখনো করি। আর এই বিয়ের কোনো মূল্য নেই আমার কাছে।”
সে একটু থামল, তারপর গম্ভীর স্বরে বলল—
“সেদিন পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমি কিছু বলতে পারিনি। তাই বলে এখনো বলতে পারব না—এটা কিন্তু নয়।”
নিলয়ের বুকটা ধক করে উঠল।
“তাহলে… তাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।”
হেরা মাথা নাড়ল।
“আমাদের বিয়েটা কোনো আইনি ভাবে হয়নি। তাই ডিভোর্স দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার কাজ শেষ হলে আমি নিজে থেকেই চলে যাব।”
নিলয় যেন শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরল।
তার কণ্ঠ একেবারে ভেঙে গেল।
“তুমি কি আমায় ভালোবাসো না, হেরা ফুল?”
হেরা একটু নরম হলো, কিন্তু তাও সেই নরমতা বন্ধুত্বের।
“হ্যাঁ, অবশ্যই ভালোবাসি… কিন্তু একজন ভালো বন্ধু হিসেবে।”
“হেরা…”
নিলয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হেরা আর সুযোগ দিল না।
“আমি আমার বাবার কথায় বিয়ে করব, নিজের ইচ্ছায় না। আর খুব দ্রুত এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যাব।”
এ কথা বলেই হেরা ঘুরে চলে গেল।
এদিকে রোজ আর রুশা হেরাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রেমিকরা স্পষ্ট করে বলে গেছে—হেরার দিকে নজর রাখতে হবে।
কিন্তু হেরা কারো কথাই শুনল না কই জানি চলে গেলো, হেরা চলে যেতে । নিলয়ের ভিতরের সব রাগ, কষ্ট, অপমান একসাথে বিস্ফোরিত হলো।
ধপ! ধপ!দেয়ালে একের পর এক ঘুসি মারতে লাগল সে। রক্ত বেরিয়ে আসছে হাত থেকে, কিন্তু যেন সে কিছুই অনুভব করছে না। সিয়াম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তার হাত ধরে ফেলল।
“দোস্ত! কি করছিস তুই!”
নিলয় দাঁত চেপে বলল।
“ছাড় আমাকে!”
সিয়াম শক্ত করে ধরে রাখল।
“এগুলো করে কোনো লাভ নেই। তোকে কতবার বুঝিয়েছি—হেরা তোকে ভালোবাসে না। তুই বুঝতে চাইছিস না।”
নিলয়ের চোখে পানি চলে এল।
“দোস্ত… আমি তো আমার সবটা দিয়ে ভালোবাসি হেরাকে। আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“এমন পাগলামি করিস না। একটা উপায় বের করতে হবে। আপাতত শান্ত থাক।”
নেন্সি তিতির এর সাথে আপাতত, সে খুব খুশি হেরাকে নিলয় এর জীবন থেকে সরাতে পেরে কিন্তু বান্ধবীর জন্য ও খারাপ লাগছে মেয়েটা অসুস্থ্য হয়ে পরে আছে হসপিটালের বেডে।
অন্যদিকে নাভান।
রাগে, উত্তেজনায় সে নিজের বাইকে একের পর এক ঘুসি মারছে।
টাং! টাং!
লোহার গায়ে ঘুসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
নাভান দাঁত চেপে বলল—
“এই শামসুল আজমির চৌধুরী… নিলয়ের বাবা!”
সে নিজের কপালে হাত চাপড়ে বলল।
“উফ! এটা আমার মাথায় এতদিন কেন আসেনি? কেন আমি আগে খোঁজ করিনি!”
ঝিনুক তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
“নাভান, এখন এগুলো বলার সময় না।”
কিন্তু নাভানের মাথায় এখন ঝড় বইছে। ঝিনুক নাভান কে শান্ত করে বললো।
“নিলয় কেন তার বাবার পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল? কেন কখনো খোলাসা করে বলেনি? আর আন্টির সাথে এই লোকটার সম্পর্কটা কি?”
ঝিনুক এর কথায় নাভান এর চোখ হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“এতদিন ছেলে আমার পিছনে পড়েছিল… এখন দেখি বাপও যোগ দিয়েছে।”
নাভান হেলমেট টা দুই দাঁত চেপে বলল।
“সেদিন যে কিডন্যাপটা হয়েছিল… সেটা নিলয়ের বাবাই করিয়েছে।”
ঝিনুক,অধীর,সৃজন অবাক, তিন জন কি বলে উচ্চারণ করলো? ঝিনুক একটু থেমে জিজ্ঞেস করল।
“নিলয় কি কোনোভাবে জড়িত?”
এবার অধীর মুখ খুললো সে মাথা নাড়ল।
“না… আমার মনে হয় না। বেটা চোর হলেও ইমানদার আছে।”
তারপর একটু হেসে বলল।
“নিজের পরিচয়ে চলতে পছন্দ করে। মাঝে মাঝে ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু কোনোদিন পুরোটা বলেনি।”
ঝিনুক হতাশ গলায় বলল।
“ভাই, আমার তো মনে হচ্ছে সব সম্পর্কই জিলাপির পেঁচের মতো হয়ে গেছে।”
ঝিনুক এর কথায় সায় দেয় সৃজন!
ঠিক বলেছিস তুষার পাত এর বউ “যার সত্যিটা কেবল তিনজনই বলতে পারবে।
ওই শামসুল…
…মাদার বাংলাদেশ
আর ফাদার বাংলাদেশ ।”
অধীর বললো।
নাভানের চোখ তখন দূরে কোথাও স্থির।
তার মাথায় একটা ভয়ংকর সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে।
“চল।”
সে গাড়ি স্টার্ট দিল।
ঝিনুকও তার পিছু নিল।
তারা এসেছে এক গোপন জায়গায়—সেখান থেকেই এতগুলো তথ্য জেনেছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো—
নাভানের বাবার বিচ্ছেদের সময়
আর নিলয়ের মায়ের মৃত্যুর সময়…
একই।
নাভান গাড়ি চালাতে চালাতে মনে মনে হাজারটা হিসাব মিলাতে লাগল।
কোথাও যেন একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে।
আর সেই সত্যটা হয়তো—
তাদের সবার জীবন উল্টে দিতে পারে।
গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।
রাতের রাস্তা প্রায় ফাঁকা, শুধু হেডলাইটের আলো সামনে লম্বা ছায়া ফেলছে।
স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে নাভান।
তার চোয়াল শক্ত, চোখে অদ্ভুত এক ঝড়।
ঝিনুক কয়েকবার তাকিয়ে দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। সে জানে—এই সময় নাভানের মাথায় কিছু চলছে।ঠাৎ নাভান নিজেই বলল—
“ঝিনুক… একটা কথা বল।”
“কি?”
“যদি ধরে নেই… আমার বাবার ডিভোর্সের সময় আর নিলয়ের মায়ের মৃত্যুর সময় এক হয়… তাহলে এর মানে কি দাঁড়ায়?”
ঝিনুক একটু থেমে বলল।
“মানে… হয়তো কোনো সম্পর্ক ছিল?”
নাভান ঠান্ডা হেসে উঠল।
“হয়তো না… নিশ্চিত কিছু ছিল।”
তার চোখে তখন সন্দেহের ছায়া।
“শামসুল আজমির চৌধুরী… এতদিন ছায়ার মতো খেলাটা খেলেছে।”
ঝিনুক অবাক হয়ে তাকাল।
“তুই কি বলতে চাস নাভান ”
নাভান ধীরে ধীরে বলল।
“আমি বলতে চাই… এই গল্পে আমরা যতটা জানি, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু লুকিয়ে আছে।”
নাভান আর কিছু বলল না।
সে জানে—এই কথাটা এখন বলা যাবে না।গাড়ি ইউটান নেয় ঝিনুক কে ইশারা করতে ঝিনুক নাভান এর পিছু নেয়।
গাড়িটা এসে থামল একটা ঝলমলে নাইট ক্লাবের সামনে। বাইরে নিয়ন লাইট ঝিকমিক করছে, ভেতর থেকে ভেসে আসছে তীব্র মিউজিক আর মানুষের হাসাহাসি।
এখান নিলয় এর বসবাস বলা চলে। মেয়ে নেশা আগে থাককেও আপাতত নেই কিন্তু এখানে বসে সে বড় বড় বায়ারদের সাথে ডিল করে অবৈধ ব্যাবসার।নাভান যানে নিলয় কে এখানেই পাওতা যাবে। এদিকে নিলয় যেন নিজের সব কষ্ট গ্লাসের ভেতর ডুবিয়ে ফেলতে বসেছে। টেবিলের উপর সারি সারি গ্লাস—একটা শেষ না হতেই আরেকটা তুলে নিচ্ছে। চোখ লাল, চুল এলোমেলো, শার্টের দুইটা বোতাম খোলা।
সে ঢুলু ঢুলু চোখে সামনে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“হেরা আমায় চাক বা না চাক… বাট তাকে আমি চাই… মানে সে আমার… শুধু আমার…”
তারপর গ্লাসটা তুলে ধরে যেন কাউকে চ্যালেঞ্জ করল।
“শুনছিস পৃথিবী! হেরা আমার! কেউ তাকে আমার থেকে নিতে পারবে না…”
ঠিক তখনই হঠাৎ করে কেউ তার কলার শক্ত করে চেপে ধরল। ধপ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল নিলয়। সে টলতে টলতে সামনে তাকাল—
নাভান। নিলয়ের নেশা যেন একটু বাড়লই।
“ওই কে রে! কার এত বড় সাহস আমার এই নিলয় চৌধুরীর কলার ধরার?”
সে আঙুল তুলে হুমকি দিল—
“জানিস আমার বাবা মন্ত্রী! আমার কলার ধরার জন্য তোকে সারাজীবন জেলে পচতে হবে!”
চারপাশের কয়েকজন তাকিয়ে আছে। কিন্তু নাভানের চোখে কোনো ভয় নেই। নাভান কে সবাই খুব ভালো করে চেনে আর নিলয় এর ব্যাপারেও জানে যদিও সে নিজের পরিচয় দিতে পছন্দ করে, কোনো এক কারনে। কিন্তু তাই বলে যে বাবাকে ভালোবাসে না এমন না, তার দুনিয়া তার বাবা। নিলয় যা করে তা তার বাবার থেকে শেখা, কিন্তু নিলয় গভির জ্বলের মাছ তাকে ধরা কার সাধ্যি আছে?
নাভান এর চোয়াল শক্ত। তিব্র কন্ঠে বলে উঠে।
“তুই কেন তোর বাবার পরিচয় সামনে আনিসনি?”
“বাপ-ছেলে মিলে কেন আমাদের পেছনে লেগে আছিস—বল।”
নিলয় কয়েক সেকেন্ড চোখ কুঁচকে নাভানের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন চিনতে চেষ্টা করছে।
তারপর হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখ।
তুই কে জানি “ওওও… মনে পড়ছে!”
সে আঙুল তুলে নাভানের দিকে দেখিয়ে বলল—
“তুই… তুই তো আমার সতিন!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধীর কাশতে কাশতে বলল—
“ভাই… সতিন তো মেয়েদের বেলায় হয়!”
নিলয় সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল।
“থুক্কু! ঠিক বলছিস… সতিন তো মেয়েদের বলে।”
তারপর খুব গভীর ভাবে চিন্তা করার ভঙ্গি করল। কপালে ভাঁজ ফেলল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন গণিত করছে নিলয় এখন। হাসি দিয়ে বললো।
“তাহলে তুই… তুই আমার সিয়াম সতিনের মেল ভার্সন কি যেনো দোস্ত!! ”
সিয়াম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে তার নেশা নেই বললেই চলে তাই সে পরিস্থিতি কি হতে যাচ্ছে এটাই দেখছে। নিলয় একটু থেমে আবার উল্লাস করে বলল।
“ও হ্যাঁ! বুঝছি! তুই আমার সতান!”
নিলয় বুক চাপড়ে ঘোষণা দিল যেনো।
“হ্যাঁ! তুই আমার সতান! আমার না হওয়া বউয়ের… মানে আমার হেরার না আমার … সতান!”
অধীর এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
“ব্রো… তুই তো বাংলা ভাষাকে আজ নতুন দিক দেখাইলি!”
নাটক বাজ অধীর নাটকীয়ভাবে বলল কথাটা!
“সতিনের বিপরীত শব্দ ‘সতান’! এই আবিষ্কারের জন্য তোকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া উচিত!” তোর নামে সামনের বছর বই বের হবে দেখিস।
সৃজন আর ঝিনুক তখন হাসতে হাসতে প্রায় মাটিতে বসার উপক্রম কিন্তু নাভান এর জন্য আপাতত তারা নিজেদের শক্ত রাখছে ।
ঝিনুক বলল।
“আমি শপথ করে বলছি, আজ থেকে বাংলা ডিকশনারিতে নতুন শব্দ ঢুকবে—সতান!”
অধীর আবার বলল।
“সারা জীবন ইশকুলে না গেলেও মানুষ এত ভুল করে না। এমনি এমনি তোকে বলে না—তোর মাথায় উলুর মাটি আছে, মগজ নাই!”
নিলয় রাগ দেখাতে গিয়ে হোঁচট খেল।
“এই… আমারে অপমান করিস না! আমি অনেক পড়ালেখা করছি!”
অধীর ভ্রু তুলে বলল।
“কোথায়?”
নিলয় গর্ব করে বলল।
“গুগল ইউনিভার্সিটিতে!”
এবার পুরো হলে ফেটে পড়ল হাসিতে।
কিন্তু একজন হাসছে না। নাভান।
তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে। কপালের শিরা টান টান। সে টেবিলের উপর রাখা ঠান্ডা পানির জগটা তুল নিল।
কেউ বুঝে ওঠার আগেই—ঝাপ! পুরো পানি সোজা নিলয়ের মুখে ছুড়ে মারল।
ঠান্ডা পানির ধাক্কায় নিলয় কেঁপে উঠল।
চুল থেকে পানি ঝরছে, শার্ট ভিজে গেছে।
সে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে চারপাশে তাকাল।
“এই… কে আমারে ওয়াশ করে দিলি রে?”
সে নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি কি গাড়ি নাকি—কার ওয়াশ চলছে!”
সৃজন হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম এবার
অধীর বলল।
“না ব্রো… তোর ফ্রি সার্ভিসিং চলছে!”
নিলয় আবার গম্ভীর হয়ে বলল।
“ঠিক আছে… কিন্তু সাবান কই?”
এই কথা শুনে আবার সবাই হো হো করে হাসতে লাগল।
শুধু নাভান দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে।
তার চোখে এখনও রাগ।
আর কোথাও গভীরে—
একটা তীব্র ঈর্ষা। সে নিচু গলায় বলল—
“হেরার নাম আর একবার মুখে আনবি… দাঁত গুনে গুনে হাতে ধরিয়ে দেব।”
নিলয় টলতে টলতে হেসে উঠল।
“ওই দেখ! সতান আবার রাগ করছে!”
তারপর গ্লাস তুলে বলল
“চল সতান… বস। আমরা দুইজন একই দুঃখের মানুষ… একই মেয়ের প্রেমে পড়েছি!”
“জাস্ট দশ মিনিটের মধ্যে ওর হুঁশ ফিরিয়ে আনো।”
নাভানের ঠান্ডা অথচ কঠোর কণ্ঠে কথাটা বের হতেই ওয়েটারদের অবস্থা নাজেহাল হয়ে গেল। সবাই ছুটোছুটি শুরু করলো। কেউ ঠান্ডা পানি আনছে, কেউ বরফ, কেউ আবার নিলয়ের মুখে পানি ছিটাচ্ছে।
ঠিক দশ মিনিট পর ধীরে ধীরে নিলয়ের চোখ নড়ে উঠলো। মাথা ভারী লাগছে, চোখ ঝাপসা। চারপাশটা ঠিক বোঝার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাতেই বুকের ভিতর কেমন যেন ধক করে উঠলো।
নাভান পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো অদ্ভুত ঠান্ডা, কিন্তু সেই ঠান্ডার ভিতর জমে আছে বহু বছরের আগুন।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর নাভান ধীরে ধীরে বলে উঠলো—
“তোর বাবার সাথে আমার মায়ের কী সম্পর্ক, নিলয়?”
নিলয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
নাভান আবার বললো—
“তোর বাবা আমাকে কিডন্যাপ করিয়েছিল ? আমার মাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ? এসব এর কারন কি?
কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো পড়লো নিলয়ের মাথায়।
সে যেন আকাশ থেকে পড়লো।
তার বাবা?
কিডন্যাপ?
ব্ল্যাকমেইল?
কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখ লাল হয়ে উঠলো। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে বললো—
“একদম চুপ!”
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমার বাবার নামে একটা বাজে কথা বলবি না, নাভান। বাবা আমার বাবা। তার নামে আজেবাজে কথা আমি সহ্য করবো না।”
নাভান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বললো—
“নে, দেখ।”
সে পকেট থেকে কয়েকটা ছবি বের করে নিলয়ের দিকে ছুঁড়ে দিল।
নিলয় ছবিগুলো হাতে নিতেই তার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
প্রথম ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
একটা নির্জন জায়গায় শামসুল চৌধুরী কারো হাতে টাকা দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় ছবিতে, কেবিনে তার বাবা একজন মহিলার সাথে কথা বলছেন।
তৃতীয় ছবিতে—
সেই মহিলা স্পষ্ট… নাভানের মা। নিলয়ের চোখ বড় হয়ে গেল। তার হাত কাঁপছে।
মাথার ভেতর যেন ঝড় উঠেছে।
নাভান ধীরে ধীরে বললো—
“এখনো বলবি আমি মিথ্যা বলছি?”
কোনো কথা বললো না নিলয়।
সে শুধু ছবিগুলো শক্ত করে মুঠো করে ধরে ঘুরে দাঁড়ালো।
এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ালো না।
নাভানও আর কিছু বললো না। সবার দিকে ইশারা করে চলে গেল।
বাড়িতে ঢুকেই নিলয় ঝড়ের মতো ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লো।
শামসুল চৌধুরী তখন সোফায় বসে ফাইল দেখছিলেন।
হঠাৎ নিলয় সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।
এরপরই—
ছবিগুলো তার সামনে ছুঁড়ে মারলো নিলয়।
“এগুলো কী বাবা?”
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“তুমি কেন নাভানের মায়ের সাথে প্রতিদিন দেখা করতে যাও?”কেন নাভানকে কিডন্যাপ করিয়েছিলে?”সেদিন তুমি কিডন্যাপ না করালে… হয়তো আজ আমার হেরা নাভানের বউ হতো না!”
শেষ কথাটা বলতে বলতেই নিলয়ের গলা ভেঙে গেল।
“কেন করলে বাবা… কেন করলে?”
ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো সে।
তার বুক উঠানামা করছে। চোখে জমে থাকা রাগ, কষ্ট আর অপমান একসাথে বের হয়ে আসতে চাইছে। নিলয় শামসুল চৌধুরীর প্রথম স্ত্রীর সন্তান।
তখন শামসুল চৌধুরী মেয়েদের নেশায় মত্ত থাকতেন। মদ, জুয়া, নারী— সবকিছুতেই ডুবে থাকতেন। নিলয়ের মা কিছু বললেই মারধর করতেন। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে একদিন চলে যান তিনি। নিলয়কে রেখে। স্ত্রীকে সহ্য করতে না পারলেও নিলয় ছিল শামসুলের চোখের মণি।
ছেলেকে তিনি মোমের মতো করে বড় করেছেন।
কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজের কালো ব্যবসার দুনিয়ায়ও টেনে নিয়েছেন তাকে।
আজ সেই কালো দুনিয়ায় নিলয় বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সবাই তাকে ভয় পায়। নিলয়ের মায়ের সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিল যখন সে ক্লাস টেনে পড়ে। সেদিন তার মা চুপিচুপি তাকে দেখতে এসেছিলেন অনেক কাঠ খোড় পুড়িয়ে, নিলয় এর বাবা তাকে সব জায়গায় থেকে ছেলের কাছে যাতে না আসতে পারে অই ব্যাবস্থা করেছিলো। নিলয় এর মার, তখন মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলো!! শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে এসেছিলেন। সেদিনই নিলয় প্রথম জানতে পারে তার বাবার আসল রূপ।
সেদিন থেকেই বাবার প্রতি তার ভেতরে জমে ওঠে চাপা রাগ।তবুও—সে বাবাকে ছেড়ে যেতে পারেনি। কারণ একটা কথা সবসময় তার কানে বাজে। নিলয় মাথা নিচু করে বসে আছে।
“বিয়ে এমন একটা সম্পর্ক… আর মায়া এমন একটা অনুভূতি… যা যদি নির্দিষ্ট কারো প্রতি লেগে যায়…”তাহলে দুনিয়ার আর কাউকেই ভালো লাগে না।”“আমার ভালোবাসা একজন, নিলয় …”
“আমি তাকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পারি না।”“নিজেকে হাজারভাবে বদলাতে চেয়েছি… তাও পারিনি…”
বাবার এই কথার পর নিলয় আর কিছু বলতো না তার বাবাকে কিন্তু বাবার উপর অভিমান ছিলো। সিয়াম আজ সকালে ফোন দিয়ে জানায় শামসুল চৌধুরীকে নিলয় একটা মেয়ের জন্য কি পাগলামি করছে, আর খোজ নিয়ে জানতে পারে নিলয় যাকে পছন্দ করে সে আর কেউ না জাওয়াদ খান এর মেয়ে । শামসুল নিজেও জানে এই মেয়ে তার নিজের না। জাওয়াদ খান এর বিয়ের ব্যাপারটা তার এক লোক বলেছে প্রথমে মিথ্যা প্রেজেন্ট করতে চেয়েছে কাজল খান এর সামনে পরে শুনতে পারে বিয়ে করেছে জাওয়াদ খান আর তার মেয়ে আছে আর সেই মেয়েকে নিজের নামে বড় করছে, সেই দেশ থেকে তারা নেপালে চলে যায় এর পর শামসুল হাজারো খোজ নিয়ে জাওয়াদ খান এর ঠিকানা বের করতে পারে নি। নিজের ছেলের নিজের মতো অবস্থ্য দেখে তিনি ভেঙে পরেছেন আর মনে মনে সমস্ত রাগ জিত তাদের উপর পরছে। নিচে থেকে ছেলেকে উঠিয়ে বলতে থাকে। শামসুলের চৌধুরীর বুকটা কেঁপে উঠলো।এ কি তার সেই শক্ত ছেলে?তিনি এগিয়ে এসে নিচে বসে পড়লেন নিলয়ের সামনে। তারপর দু’হাতে ছেলের কাঁধ ধরে ধীরে ধীরে তাকে উঠিয়ে বললেন—
“আমি জানতাম না বাবা… জাওয়াদ খানের মেয়েকে তোমার পছন্দ।”
তার গলায় অপরাধবোধ মিশে ছিল।
“এটা একটা ভুল হয়েছে…”
নিলয় নিঃশ্বাস আটকে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।শামসুল চৌধুরী আবার বললেন—
“আমি তোকে বলেছিলাম না… একটা মেয়ের জন্য আমি আমার পুরো সংসার শেষ করে দিয়েছি।”
তার চোখে তখন পুরোনো কষ্টের ছাপ।
“সেই মেয়ে আর কেউ না… শেহতাজ খান নাভানের মা… এডভোকেট এমএলএ কাজল খান।”
কথাটা শেষ হতেই যেন সময় থেমে গেল।
নিলয়ের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো।
মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।সে যেন শুনেও বিশ্বাস করতে পারছে না। মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে—
কাজল খান… নাভানের মা… আর তার বাবার অতীত?তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।শামসুল চৌধুরী ছেলের সেই অবস্থা দেখে আরও ভেঙে পড়লেন। কিন্তু নিলয় হঠাৎ বাবার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো। তার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে অদ্ভুত এক পাগলামি।
“আমি কিছু জানি না বাবা…”
সে মাথা নেড়ে বলতে লাগলো—
“আমি এসব কিছু জানি না… অতীত, শত্রুতা, কিছুই না…”আমার শুধু হেরাকে চাই…”
তার কণ্ঠ যেন ভেঙে যাচ্ছে।
“বাবা… আমার হেরাকে চাই… আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।”
তার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছে।
শামসুল চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার নিজের ভেতরেও তখন আগুন জ্বলছে—অতীতের অপমান, হারানো ভালোবাসা, আর এখন নিজের ছেলের ভাঙা অবস্থা।
তিনি ধীরে ধীরে নিলয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
তার চোখে তখন কঠিন একটা সিদ্ধান্ত।
“চিন্তা করো না।”
গভীর, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
“তুমি যাকে চাইছো… তাকে আমি তোমার কাছেই এনে দেব।”
নিলয় অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালো।
শামসুল চৌধুরীর চোখ তখন ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ংকর।
“সবকিছুর একটা সময় থাকে, একটা পদ্ধতি থাকে।”
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“আমি যেভাবে বলবো… ঠিক সেভাবেই এগোবে।”
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক কঠিন হাসি ফুটে উঠলো।
“এই খেলাটা এবার আমি খেলবো।”
আর নিলয় তখনও শুধু একটা কথাই বলছে—
“আমার হেরাকে চাই বাবা…”
“শুধু… আমার হেরাকে…”
নাভান তার বাবার সাথে দেখা করেছে,,অনেক কিছু জানার চেষ্টা ও করেছে কিন্তু ফলাফল শুন্য, নিলয় ও চুপচাপ, তিতির হসপিটালে নাভান তাকে দেখে আসে,,এভানেই পরিস্থিতি ছিলো কিছুদিন হটাৎ একদিন। জাওয়াদ খান ভার্সিতে গিয়ে তাদের বের হতে বলে। স্যার দের অনুমতি নিয়ে।
” কি হলো বাবা কই নিয়ে যাচ্ছো?
“রেডি হও জলদি?
জাওয়াদ খান তাড়াহুড়া করে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন।
ভার্সিটি থেকে হেরা আর রুশাকে নিয়ে সোজা গাড়িতে তুলে নেন জাওয়াদ খান। মেয়েদের কোনো কথা শুনলেন না, কোনো প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন না। সেই অদ্ভুত তাড়াহুড়োর মধ্যেই তাদের নিয়ে ঢুকে গেলেন এয়ারপোর্টের ভেতরে।
ওদিকে রোজ সারাটা ক্লাস জুড়ে কিছু বলার সুযোগই পায়নি। বুকের ভেতর অজানা এক অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। ক্লাস শেষ হতেই সে ছুটে যায় তাদের আড্ডার জায়গায়।
সেখানে সৃজন বাইকের ওপর বসে ছিল। নাভান কোনো কাজে বাইরে গেছে। বাকি সবাই প্রায় উপস্থিত।
দূর থেকে রোজকে দৌড়ে আসতে দেখে ঝিনুক হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়।
রোজের অবস্থা দেখে সৃজন লাফ দিয়ে বাইক থেকে নেমে পড়ে। মেয়েটাকে ধরে ফেলে সে।
রোজ যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে, কপাল ভেজা ঘামে। যেন দৌড়ে আসতে আসতে সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেছে।
ভয় মিশ্রিত চোখে সৃজন বলে উঠল—
— “রোজ জান, কী হয়েছে তোমার? এমন দেখাচ্ছে কেন তোমাকে ?”
সৃজন এর বুক ধরফর করতে শুরু করলো রোজের এমন অবস্থা দেখে!! পকেট হাতড়িয়ে নিজের মায়ের নেয়া হাতে বানানো রুমালটা দিয়ে নিজের রোজের মুখের ঘাম মুছে দিয়ে থাকে।
ঝিনুক বুঝতে পারল রোজ অতিরিক্ত দৌড়ানোর কারণে হাঁপিয়ে গেছে। তার হাতে থাকা ঠান্ডা পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে সে নরম গলায় বলল।
“নাও রোজ, এটা খাও। আগে একটু রিল্যাক্স হও। তারপর বলো কী হয়েছে। আর রুশা, হেরা কোথায়? তুমি একা কেনো রোজ?
রোজ এক নিঃশ্বাসে বোতলের পানি শেষ করে ফেলল। তারপর একটু শ্বাস সামলে কাঁপা কণ্ঠে বলতে শুরু করল!!
“জাওয়াদ আঙ্কেল… হেরা আর রুশাকে নিয়ে চলে গেছে। আমি অনেকবার ফোন দিয়েছি… কিন্তু তাদের ফোন বন্ধ। আমার খুব ভয় করছে আপু… কোথায় নিয়ে গেলো তাদের?
তার কথা শেষ হতে না হতেই সৃজন অবাক হয়ে বলে উঠল!!
“মানে কী বলো ভাবিজি??… আমার লাল গোলাপিকেও নিয়ে গেছে?
অধীর গম্ভীর ভয় মিশ্রিত গলায় বলল কথাটা –
“আজ নাভান এমন জায়গায় গিয়েছে যেখানে ফোন ও ধরবে না। চল আগে তাদের বাসায় গিয়ে দেখি। হয়তো সেখানে গেছে।
ঝিনুকের কথায় সৃজন মাথা নাড়ে।
ইদানীং ঝিনুক প্রায়ই বাইক নিয়ে আসে—তারও একটা কারণ আছে। হুটা হাট তাদের বের হতে হয়। তুষার কে অনেক বুঝিয়ে বাইক নিয়ে আসে।
অধীর বাইক স্টার্ট দেয়। ঝিনুক গিয়ে তার পিছনে বসে। আর সৃজনের বাইকের পিছনে বসে রোজ।
রোজ সাধারণত বাইকে উঠতে ভয় পায়।
কিন্তু আজ ভয় পাওয়ার সময় নেই। সৃজন বুঝতে পারল মেয়েটা ভয় পাচ্ছে। সে একটু পিছনে ঘুরে রোজের ঘামে ভেজা, উদ্বিগ্ন মুখটার দিকে তাকাল। তারপর আলতো করে তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল–
“আমি আছি জান, ভয় নেই। এই সৃজন থাকতে ভয় কিসের? আমাকে শক্ত করে ধরে বসো। বনুদের কিছুই হবে না। নাভান আছে… তুমি রিল্যাক্স হও।”
কথাগুলো শুনে রোজের চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। বোনের মতো প্রিয় বন্ধুদের হারানোর ভয় বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধছে তার। তবুও সৃজনের কথায় সে একটু সাহস পেল।
আসলে এমন বন্ধু কয়জনের ভাগ্যে জোটে?
কখনো কখনো বিপদের কথা ভাবলেই বুক ভেঙে আসে, চোখে পানি চলে আসে। সত্যিই… হেরা আর রুশা ভীষণ ভাগ্যবতী। কারণ তাদের জীবনে রোজের মতো একটা বন্ধু আছে—যে তাদের জন্য নিজের সবকিছু ভুলে ছুটে যেতে পারে। সৃজনও বুঝতে পারছিল রোজের মনের অবস্থা। তার নিজেরও এমনই লেগেছিল একবার… যখন নাভান বিপদে পড়েছিল। বন্ধুকে হারানোর ভয় মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। কিন্তু বাসায় গিয়েও তারা হেরা আর রুশার কোনো খবর পেল না। সেই মুহূর্তে রোজের বুকটা যেন ভেঙে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
কাঁপা গলায় বলল—
“আমার হেরা পাখি… আর রুসুন রানীর সাথে কি আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না?”
–তার কণ্ঠে এমন অসহায়তা ছিল… যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আপন দুটো মানুষকে হারিয়ে ফেলেছে সে।
রোজের কান্না দেখে সবার চোখেই পানি এসে গেছে। যেন পুরো ঘরটা একটা অদৃশ্য শোকের ভারে নুয়ে আছে। রাত তখন ঠিক আটটা। নাভানদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে—কিন্তু কেউ যেন ঠিক করে বসেও নেই। অস্থিরতা, ভয় আর দুশ্চিন্তায় সবার বুক কেঁপে উঠছে বারবার।
রোজ তো থামছেই না। একটানা কাঁদছে সে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মামিদের কাছে বড় হওয়া মেয়েটা জীবনে খুব বেশি আপন মানুষ পায়নি। হেরা আর রুশাই ছিল তার সব—বন্ধু, বোন, সঙ্গী, আশ্রয়। এই কয় মাসে নিজের সবচেয়ে কাছে মানুষ হয়ে গিয়েছে তারা। আর আজ তারা নেই… কোথায় আছে কেউ জানে না। সেই শূন্যতা যেন তাকে ভিতর থেকে ভেঙে ফেলেছে।
সৃজন এক হাতে রোজকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ঝিনুক তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
“রোজ, প্লিজ… একটু শান্ত হও…”
ঝিনুক বড় বোন এর মতো আগলে নেয় মেয়েটাকে, কিন্তু রোজের কান্না থামে না।
এদিকে অধীর মাথা নিচু করে সোফায় বসে আছে। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছে বা কান্না আটকে রেখেছে। তার হাতের ফোনটা যেন আজ তার শত্রু হয়ে গেছে। একটার পর একটা কল দিয়ে যাচ্ছে সে।
রুশার নম্বরে…
এক হাজারেরও বেশি কল দিয়ে ফেলেছে।
প্রতিবারই একই উত্তর।
“Phone is switched off.”
মেয়েটাকে সে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে—আজ যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে। রুশার সেই লাল-গোলাপি হাসি ছাড়া যেন তার দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা হাসি কি লাল গোলাপি হয় নাকি।হয় তো রুশার হাসলে যে অধীরর এর কাছে মনে হয় লাল গোলাপির আভা ফুটে উঠে রুশার মুখে। অধীর ভাবনার মাঝে বাইক এর আওয়াজ আসে কানে!! সারভেন্ট দরজা খুলতেই নাভান ঢোকে।
আর তাকে দেখেই অধীর যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। প্রায় দৌড়ে গিয়ে হামলে পড়ে নাভানের বুকে। নাভান হতভম্ব হয়ে যায়।
অধীর এমন ছেলে না। সে সবসময় হাসি-ঠাট্টা করে, ফাজলামি করে, সবাইকে হাসায়। কিন্তু আজ তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। কারণ সে জানে—অধীর এমনভাবে ভেঙে পড়ে না, যদি না সত্যিই বড় কিছু ঘটে।
অধীর তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলে—
“ভাই…”
শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই তার গলা আটকে যায়।
নাভানের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। এক পলক তাকায় সে সবার দিকে। সৃজনের মুখ শক্ত।
ঝিনুকের চোখ লাল। রোজ কান্নায় ভেঙে পড়া।এই দৃশ্য দেখে নাভানের বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। রোজ এগিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে সবটা বলে দেয়।
“ভাইয়া… তুমি আমার হেরা আর রুশা রানির খবর এনে দাও… প্লিজ ভাইয়া… প্লিজ…”
তার কণ্ঠটা এমন অসহায় যে শুনলে পাথরও গলে যাবে । একে একে সব বলে!! সব কথা শুনে নাভানের চোখের ভেতরটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে। এই সময়টাতে আরেকজন মানুষ নিঃশব্দে সব শুনছিলেন। কাজল খান। তার বুকের ভিতরে একটাই ভয় কাজ করছে—
নাভান। ছেলেটার রাগ সে খুব ভালো করেই জানে। হঠাৎ করেই নাভান ঝড়ের মতো উঠে দাঁড়ায়।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সোজা মায়ের ঘরের দিকে চলে যায়।
তার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে কাজল খান আতকে ওঠেন।
“শেহতাজ…”
কিন্তু নাভান তখন আর কারও কথা শোনার অবস্থায় নেই।
ঘরে ঢুকেই টেবিলের উপর রাখা একটা ফুলদানি তুলে নেয়। মেঝেতে আছড়ে ফেলে। কাঁচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
একটা…
দুইটা…
তিনটা…
এক এক করে সব ফুলদানি তুলে আছড়ে মারতে থাকে সে।
কাজল খান দুই পা বাড়ায় । কিন্তু ছেলেকে থামান না। কারণ তিনি জানেন—এই মুহূর্তে তাকে ছোঁয়া মানে আগুনে হাত দেওয়া।
ঠিক তখনই নাভান টেবিলটা উল্টে দিতে যাবে।
কাজল খানের কণ্ঠ ভেসে আসে।
“এবার বেশি হয়ে যাচ্ছে, শেহতাজ।”
নাভান থেমে যায়। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়।
তার চোখে এমন আগুন, যেন সবকিছু পুড়িয়ে ফেলবে।
“বেশি? তুমি এখনো বেশি দেখনি। আমি সব ধ্বংস করে দেবো! তুমি তো এটাই চাও… তোমার মতো আমরা সবাই জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাই!”
কাজল খান স্তব্ধ হয়ে যান।
“শেহতাজ, কি বলছ তুমি?”
নাভান তীব্র কণ্ঠে বলে ওঠে।
“হ্যাঁ! ঠিকই বলছি! তুমি না অধীরের কান্না দেখতে পারো না? আজ তোমার সামনে সে কাঁদছে… তোমার চোখে কিছুই পড়ছে না?”
কাজল খান ক্লান্ত গলায় বলেন।
“আমি কি করবো এখানে?”
নাভান তিক্ত হাসে।
“তোমার কিছুই করার নেই। কারণ তোমার জিত!! তোমার সেই জিতের জন্য আজ কিছুই পরিষ্কার হচ্ছে না!”
কাজল খান ভ্রু কুঁচকে তাকান।
“মানে?”কই বলতে চাচ্ছো শেহতাজ?
নাভান গর্জে ওঠে।
“বাবার সাথে আজ আমার কথা হয়েছে। তোমার সাথে ওই শামসুলের কি সম্পর্ক? কেন জানতে চাইলে তুমি এড়িয়ে যাও?
কাজল খান যেন অপমানিত হন।
“তোমার বাবার মতো ছোট মনের মানুষ এসব কথা বলবে… আর তুমিও তার কাতারে দাঁড়াবে?”
নাভানের চোখে সন্দেহের ছায়া যেন দেখতে পেলো কাজল খান!! নাভান সেই রাগী কন্ঠে গর্জে উঠে!!
“না দাঁড়িয়ে উপায় কি? চোখের দেখা কি মিথ্যা হয়? এখন তো আমারও সন্দেহ হচ্ছে…”
এই কথা শুনে কাজল খানের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“শেহতাজ… তুমিও আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলছ?”
নাভান ঠান্ডা গলায় বলে।
“আমি না… সমাজ বলবে।”আর আমি বললে দোষ সমাজ বললে দোষ না?? “
কাজল খান তীব্র গলায় বলে ওঠেন।”
“আমি সমাজেরটা খাই ও না, পরি না! যখন তোমাকে নিয়ে কাজের জন্য এদিক-ওদিক ঘুরেছি… তিনবেলার জায়গায় একবেলা খেয়েছি… তখন সেই সমাজ আমাকে একমুঠো খাবারও দেয়নি! আমি সেই সমাজকে ঘৃণা করি! যে সমাজ স্বামী ছাড়া একটা মেয়েকে অন্য চোখে দেখে।আমি সেই সমাজকে ঘৃণা করি!”যে সমাজে একাকিত্ব থাকার জন্য হাসা হাসি করে!!
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
নাভান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে।তারপর ধীরে বলে—
“তার মানে তুমি কিছু বলবে না?”
কাজল খান চোখ বন্ধ করেন।
“চলে যাও।”আমাকে একা থাকতে দাও। যদি ভালোবাসো বউ এর মর্যাদা দিতে চাও!! তাহলে অই মেয়েদের নিয়ে আসো আমার মানতে সমস্যা নেই!! বাট অই লোকের মুখোমুখি আমি হব না এটাই শেষ কথা!!
এই একটা কথায় যেন নাভান আবার হেরে যায়।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ এবার অন্য রূপ নেয়। মেঝে থেকে কাঁচের দুইটা টুকরো তুলে নেয় সে।একটা নিজের হাতে চেপে ধরে। আরেকটা গিয়ে অধীরের হাতে দেয়।সবাই চমকে ওঠে।
“নাভান! কি করছিস তুই!” সৃজন চিৎকার করে ওঠে।
কিন্তু নাভান কারও কথা শোনে না।
ঠান্ডা কণ্ঠে বলে।
“আজ তুমি সত্যিটা বলবে… নয়তো আমাদের রক্তাক্ত দেহ তোমার সামনে পড়ে থাকবে।”
সৃজন আর ঝিনুক কাছে আসতেই—নাভান নিজের হাতে একটা টান দেয়। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে।
“নাভান!”
“নাভান!”
দুজন একসাথে চিৎকার করে ওঠে।
নাভান গর্জে ওঠে—
“একদম কাছে আসবি না কেউ!”
তার চোখে তখন এক ভয়ংকর জেদ। ঝিনুক কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“মামনি… বলে দাও… তুমি নাভানের জিত সম্পর্কে জানো…
”সৃজন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
“মামনি প্লিজ… বলে দিন…”
রোজ কাঁদতে কাঁদতে কাজল খানের পা জড়িয়ে ধরে।
“আন্টি… একটু দয়া করুন…”সব টা বলে দিন কেনো আংকেল এমন করছে। কেনো আপনাকে দেখতে পারে না। আর কেনই বা নাভান ভাই এর সম্পর্কে মেনে নিচ্ছে না। কেনো সম্পর্ক থেকে হেরাকে সরিয়ে ফেলতে চাচ্ছে?
এই শক্ত, দৃঢ়চেতা মহিলা আজ যেন সবার চোখে দোষী হয়ে গেছেন। সবাই হাঁটু গেড়ে বসে সত্যিটা জানতে চাচ্ছে । জাওয়াদ খান তো বার বার বলেছিলো হেরাকে নাভান এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে? যখন রুশা আর রোজ বুঝিয়েছিলো, তখন জাওয়াদ খান বলেছিলো। তিনি এই সম্পর্ক মেনে নিবেন না। দরকার হয় ছেলের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবেন তাও এই সম্পর্ক মেনে নেয়ার মতো না। তাহলে যে তার নিজের কাছে অপরাধী হয়ে যাবেন তিনি। কথার বরখেলাপ তিনি করবেন না কখনো!! এই বিয়ে জায়েজ হলেও তিনি এই বিয়ে কখনো মানবে না। সেদিন ছেলে মেয়ের ইজ্জত এর কথা ভেবে চুপ ছিলেন। আর কতো বেজ্জতি করবেন ছেলে মেয়েদের। কিন্তু বাসায় এসে সম্পুর্ন চেঞ্জ করেছে তার মত।সম্পুর্ন টা রোজ নিজ চোখে দেখেছে ও শুনেছে।
হঠাৎ নাভান অধীরের হাতে কাঁচটা টেনে দেয়।
অধীর ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে। তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে। নাভান সেই রক্তমাখা হাত গলায় কাঁচ ঠেকিয়ে ধরে। কাজল খান ছুটে যান।
“শেহতাজ! ওর লেগে যাবে! ছাড়ো!”
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“ও পিঁপড়ার কামড়ও সহ্য করতে পারে না… তুমি জানো! ছাড়ো… আমার কলিজার লেগে যাবে… ও ব্যথা পাচ্ছে…”
অধীরের চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।
সে জানে—তার কিউটি পাই তার মাদার বাংলাদেশ তাকে কতটা ভালোবাসে। তার একটু রক্ত দেখে কেমন হাইপার হয়ে গেছে। কে বলে নিজের গর্বের সন্তান এর জন্য মানুষ সব করে। তারা ভুল!! অধীর তো এই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝ বয়সি সাহসী, নামকরা,সুন্দরী মহিলার গর্বের সন্তান না তাও অধীর এর কিছু হলে এই মহিলা পাগল হয়ে যাবে। কথায় আছে না পালা জিনিস এর জ্বালা বেশি,,তার থেকে বড় কথা কারো দেয়া সম্পদ এর তিল পরিমান যে ক্ষতি করতে পারবেন না কাজল খান। তাই তো সই এর দেয়া সেরা উপহারটা দিয়ে গেছেন তার জীবন এর বিনিময়ে,সেই জিনিস টা যে বরাবরি অমূল্য কাজল খান এর কাছে। অধীর কে তিনি এমন করে মানুষ করেছে। নাভান একটু বুঝ হবার পর কিছুটা কষ্ট করলে ও অধীরকে একেবারে মোমের মতো করে মানুষ করেছে কাজল খান। সেই ছেলের রক্তাক্ত দেহ কাজল খান যে দেখতে পারবে না সেটা অধীর ও নাভান ভালো করে জানে। ভাই এর বুদ্ধি মত্তার পরিচয় পায় চোখ দেখে, গলায় ছুড়ি যে নাভান ইহ জিন্দিগিতে পারবে না সেটা অধীর ভালো জানে। জানে বন্ধুমহল এর সবাই, তাও ভয় এতো কিছুর মধ্যে যদি একটু লেগে যায় তো কি হবে!! এই ভয় পাচ্ছে সবাই!! অধীর বুঝে আজই শেষ সুযোগ এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না, আজ তার ভেতরেও এক অদ্ভুত সাহস জন্মেছে। রক্ত ঝরতে ঝরতে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
“না ভাই… তুই আমায় মেরে দে…”
সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। অধীর কাঁপা কণ্ঠে বলে–
“আমিও চাই… আমাদের একটা সুন্দর সংসার হোক… আমার মায়ের দিকে কেউ আঙুল না তুলুক… আমি তোর মতো এত কিছু সহ্য করতে পারবো না… তার উপর ভালোবাসার মানুষটাও নেই… তাহলে বেঁচে থেকে কি হবে… মেরে দে ভাই… মেরে দে…”
নাভান নিঃশ্বাস নেয়।
“তাহলে এটাই হোক… রাগ আর জিত নিয়ে তারা বাঁচুক… আমরা না হয়…”
সে কাঁচটা আরও একটু চাপ দেয়।ঠিক তখনই।
কাজল খানের কণ্ঠ ভেঙে আসে।
“না শেহতাজ… না…”
তিনি ভেঙে পড়েন ছেলেদের এমন কর্মকান্ড দেখে। কাপা গলায় বলে।
“আমি বলবো… তোমরা নিজেদের ক্ষতি করো না… তোমরাই তো আমার বেঁচে থাকার সম্বল…”
এই কথা বলেই তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
রোজ আর ঝিনুক ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
আর সেই মুহূর্তে পুরো ঘরটা ভরে যায় কান্নার শব্দে… যেন দুঃখ রা চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাজল খানের!!
To be continued….