
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজও রুশা
পাঠ_৩১
নাভানের কথা শুনে অধীর যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেল। চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠেছে – সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই ছেলে এতটা সরাসরি কথা বলতে পারে! পাশে দাঁড়িয়ে রুশা নিঃশব্দে পুরো দৃশ্যটা দেখছে – তার চোখে একসাথে ভয়, বিস্ময় আর অদ্ভুত এক উত্তেজনা।
ঘরের এক কোণায় বসে আছেন ফারুখ সিকদার। টাক মাথার উপর একটা আইস প্যাক চেপে ধরে রেখেছেন – মাথা ঠান্ডা করার জন্য, নাকি পরিস্থিতি বুঝে নেওয়ার জন্য, সেটা বোঝা দায়। এতক্ষণে রুশা আর অধীর নাভান সম্পর্কে যা জানার সবই খুলে বলেছে তাকে। সেই থেকে মানুষটা একদম চুপচাপ – কখনো চোখ বন্ধ করছেন, কখনো খুলে নাভানের দিকে তাকাচ্ছেন, যেন ছেলেটার ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করছেন।
আর বেচারা কাজি সাহেব! জীবনে অনেক বিয়ে পড়িয়েছেন, অনেক নাটক দেখেছেন – কিন্তু এমন পরিস্থিতি? তাকে একপ্রকার জোর করেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। অধীর একরকম পাহারা দিচ্ছে তাকে—- বিয়ে না পড়িয়ে গেলে কিন্তু মানসম্মান থাকবে না, কাজি সাহেব এর ”
জাওয়াদ খান এবার আর চুপ থাকলেন না। ছেলের দিকে সোজা তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন—
“ মানে কী বলতে চাচ্ছো তুমি? তুমি মানলে কি, আর না মানলে কি?”
জাওয়াদ খান এর কথা শুনে অধীর বেশ আগ্রহ নিয়ে ভাই এর দিকে তাকিয়ে আছে,শুধু যে অধীর তাও না পাঠক পাঠিকা সবাই তাকিয়ে আছে । সবাই অপেক্ষা করছে,,,নাভান কী বলে!
নাভান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—
“ নিজের বেলায় ষোল আনা… আর নিজের ছেলের বেলায় এক আনাও না,কেমন বাবা তুমি?”
একটা নিস্তব্ধ বিস্ফোরণ ঘটল যেন। কথাটা সোজা গিয়ে আঘাত করল জাওয়াদ খানের ইজ্জতে ।
এই মুহূর্তটা শুধু বাবা-ছেলের তর্ক না…
এটা বহু বছরের জমে থাকা অভিমান, না বলা অভিযোগ, ভালোবাসার অভাব আর ভুল বোঝাবুঝির বিস্ফোরণ।
নাভান জানে – তার একটা ভুল কথা মায়ের মতো বাবাকেও ভেঙে দিতে পারে। তাই সে বাবাকে অনুশোচনা থেকে দূরে রাখছে আপাতত । কারণ সে চায়,এই মানুষটা সত্যিটা দেখুক খুব কাছ থেকে। মায়ের সামনাসামনি হওয়া খুব দরকার, অনেক তো হয়েছে এবার ভুল বুঝবুঝির সমাপ্তি ঘটুক।
জাওয়াদ খান এবার ধীরে ধীরে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে কঠোরতা, কণ্ঠে দৃঢ়তা–
“ কাজল রেখা যদি বিয়ে না করে থাকে… তাহলে সে এখনো আমার বউ। যদি তোমার কথা সত্যি হয়ে থাকে।”
নাভান হালকা হেসে মাথা কাত করল–
“ আমি অ্যাডভোকেট এম.এল.এ কাজল খানের গার্ডিয়ান। আমার পারমিশন তো নিতেই হবে।”
“ তুমি কি নিজেকে খুব বড় প্রমাণ করতে চাচ্ছো, শেহতাজ?”
জাওয়াদ খানের গলায় এবার তাচ্ছিল্য।
“ বড় না… দায়িত্বশীল। বাবার দাড়ি-চুল পেকে যাচ্ছে, এখনো কি ছেলে দায়িত্ব নেবে না? বাবা-মা বয়স্ক হলে সন্তানদের ঘাড়েই তো সব দায়িত্ব পড়ে, তাই না?”
জাওয়াদ খানের চোখ ছোট ছোট করে তাকালো —
“ তুমি কি আমায় বুড়ো বলছো? ইনডিরেক্টলি?”
নাভান একটুও না থেমে উত্তর দিল–
“ ইনডিরেক্ট কেনো? ডিরেক্টই বলছি। তবে আমার মা’কে এখনো বিয়ে দেওয়া যাবে।”
“ স্টপ নাভান !”
চিৎকার করে উঠলেন জাওয়াদ খান।
“ আমার মেয়ে কোথায় ?”
নাভান হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকাল —
“ এতো হাইপার হচ্ছো কেনো? তোমার ছেলের বউ কি অন্য পুরুষের দেওয়া জামা পরে থাকবে? তাই চেঞ্জ করতে বলেছি।”
ঠিক তখনই দরজাটা ধীরে খুলল । সব চোখ ঘুরে গেল সেদিকে । হেরা বেরিয়ে এলো — একটা স্কার্ট আর টি-শার্ট পরে, ওড়নাটা গলায় আলগোছে পেঁচানো। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে একটু ভয়, একটু লজ্জা… আর অদ্ভুত এক নীরব স্বীকৃতি।
নাভান হেরাকে দেখে হালকা হাসল — অধীর বলে উঠলো।
“ যাক… কিউটি পাই ভাবি চলে এসেছে। কাজি মশাই, আপনি আপনার কাজ শুরু করুন। (অধীর)
“ মানে কী ?” কি শুরু করবে?( জাওয়াদ খান)
” বিয়ে শুরু করবে। (অধীর)
জাওয়াদ খান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
” কি! (জাওয়াদ খান)
“ আরে ফাদার বাংলাদেশ ! তুমি তো আমার ব্রাদার বাংলাদেশের বিয়ে দেখো নি। তাই মিথ্যা বলছো। এবার তোমার সামনেই হোক বিয়েটা তাহলে আর স্বাক্ষী নেই বলতে পারবে না । ( অধীর)
অধীর এর কথায় নাভান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল —
“একদম ! শেহতাজ খান নাভানের ভাই হিসেবে কথাটা ঠিক বলেছিস। শুরু করুন, কাজি সাহেব!”
কাজি সাহেব কাঁপা গলায় দোয়া পড়তে শুরু করলেন…
- কবুল * কবুল * কবুল,
হেরা বলার পর নাভান বলে উঠে।
আমাদের ১৮ কবুল এর জোরে মরার আগ অব্দি লম্বা সংসার হোক,,, আমিন ( নাভান)
কথাটা জাওয়াদ খান এর সামনে এসে বলে নাভান,ছেলের এমন উগ্র লজ্জাবিহীন বিহেভিয়ারে জাওয়াদ খান হতবিহ্বল। আর সেইদিন,,,
না চাইতেও , না মানলেও – হেরার জীবনে আবারো বিয়ে হয়ে গেল। নাভানের হুমকি, জেদ আর অদ্ভুত এক অধিকারবোধের কাছে হার মানল সব নিয়ম, সব আপত্তি।
বিয়ের পর সেদিনি ফিরে এসেছে তারা বাংলাদেশে । জাওয়াদ খান কাজল রেখার সাথে কথা বলতে চাইলেন,, কিন্তু কাজল খান
দরজা সোজা মুখের ওপর বন্ধ করে দিয়েছিলো,,
এই বন্ধ দরজাটা শুধু রাগের ছিল না।
এটা ছিল অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে টানা এক সীমারেখা।
বর্তমান*
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ কাঁপছে গানের তালে।
স্টেজের উপর নাভান — মাইক্রোফোন হাতে, আলো ঝলমলে পরিবেশ, চারদিকে উন্মাদনা।
সে এমনভাবে গান গাইছে —
যেন প্রতিটা লিরিকে আগুন, প্রতিটা সুরে দাবি। এই ছেলের গলা বরাবরি ভালো যেখানে পুরুনো গান আধুনিক যুগের কাছে হাড়িয়ে যাচ্ছে,সেই গান তার গলায় যেন প্রান পেয়েছে,, ছেলে-মেয়ে সবাই নাচছে, চিৎকার করছে, আনন্দে ভেসে যাচ্ছে।
গান শেষ হওয়ার ঠিক আগে — নাভান হঠাৎ থেমে হেরার দিকে তাকাল। একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিল তার দিকে।
পুরো ভিড় চিৎকারে ফেটে পড়ল। আর ঠিক তখনই —
নিলয় চেয়ারের হাতলে এমন জোরে আঘাত করল যে শব্দটা ভিড়ের মাঝেও কানে গেল কিছু মানুষ এর । সিয়াম নিলয় কে শান্ত করলো কোনো মতে। নেন্সি দূরে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে।
শার্টটা ফেলে দিতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারলো না হেরা। অদ্ভুত এক টান অনুভব করে নভান এর উপর, মনে হয় খুব আপন এই লোক, আজকাল না চাইতেও নাভান এর উপর অনুভূতি খুব যন্ত করে লাড়া দিচ্ছে তাকে । তাই শার্টটা শক্ত করে চেপে ধরেই দাঁড়িয়ে রইল সে। চারপাশে তখনো আলো, শব্দ, উল্লাস… কিন্তু হেরার ভেতরটা যেন নিস্তব্ধ।
এদিকে একে একে স্টেজ থেকে নামতে লাগলো সৃজন, অধীর, আর নাভান। যেন তিনজন তিনরকম ঝড়—কেউ শান্ত, কেউ অস্থির, কেউ ভয়ংকর স্থিরতায় ভরা।
রোজ এবার আর হেরাকে আটকাতে পারলো না। এতক্ষণ ধরে যে জেদ, যে টানাপোড়েন চলছিল—তা ভেঙে হেরা হঠাৎই একটা ফাঁক খুঁজে বেরিয়ে গেল। যেন সে পালাচ্ছে… কারো কাছ থেকে নয়, নিজের ভেতরের কিছুর কাছ থেকে। নাভান আসার আগেই সে কেটে পরে,,অস্থিরতায় ভরা মন, চোখের অবাধ্য চাহনি,, সব এলোমেলো কপ্রে দিচ্ছে,, প্রিয়র কথা ভুলতে বসেছে হেরা তাই নাভান এর ভয়ংকর অধীকারবোধ থেকে পালাতে চলে গিয়েছে সে।
অধীর ধীরে ধীরে রুশার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তাদের সম্পর্কটা অদ্ভুত—নরম, মিষ্টি, কিন্তু ভীষণ টকও মাঝে মাঝে। তাদের প্রেমটা জমে ওঠে ঠিক তখনই, যখন অধীর হেরার কথামতো চলে। আর যেই একটু উল্টো পথে হাঁটে, অমনি শুরু হয় রুশার খোঁচা—
“দেখছো? আমার উপন্যাসের হিরোগুলো কত কেয়ারিং! আর তুমি?
বাস্তবে তুলনা করলে একটা মানা যায়, কিন্তু যাদের অস্তিত্বই নেই, তাদের সাথে নিজেকে মেলালেই অধীর এর রাগ ক্ষনে ক্ষনে বেড়ে যায় ”
অধীর তখন চুপ করে শোনে। কারণ সে জানে—রুশার এই অভিযোগের পেছনে রাগ কম, ভালোবাসাই বেশি।
তবুও অধীর কিছু বলে না। কারণ রুশা তার “লাল গোলাপি —নামটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই মিষ্টি তার প্রতি অধীরের ভালোবাসা।
ওদিকে রোজকে চলে যেতে দেখে সৃজনের চোখে হালকা এক ঝিলিক খেলে গেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে স্টেজের পেছন দিকে গিয়ে রোজের হাত টেনে ধরলো।
“এই, কোথায় পালাচ্ছো ?
সৃজনের গলায় চাপা রাগ, কিন্তু ভেতরে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
রোজ একটু চমকে উঠলো, তারপর আগের মতোই তিরিং-বিরিং করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো—
“ছাড়ো! আমাকে যেতে দাও!
মেয়েটার এই অস্থিরতা, এই পালানোর চেষ্টা—সবকিছুই যেন সৃজনকে আরও টেনে ধরে। সে এবার একটু শক্ত করেই ধরে রাখলো তাকে।
রোজ সৃজনের দিকে তাকালো। চোখে এক মুহূর্তের জন্য আনন্দ ঝলকে উঠলো, যেন সে তাকে দেখেই খুশি হয়েছে। কিন্তু ঠিক পরের সেকেন্ডেই সেই আলো নিভে গেল। কিছু একটা মনে পড়ে গেল হয়তো… কোনো কথা, কোনো স্মৃতি, কিংবা কোনো অজানা ভয়।
রোজ এর মুখটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ নামিয়ে নিল সে। সৃজন সেটা খেয়াল করলো। কিন্তু কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইল,, যেন বুঝতে চাইছে, এই মেয়েটার ভেতরে ঠিক কী চলছে।
“কি হলো ফুল? জান, আমার দিকে তাকাও… আমি ফোন দিচ্ছি, রিসিভ করছো না কেনো? সারাদিন আমাকে এড়িয়ে চলছো কেনো?”
সৃজনের কণ্ঠে অস্থিরতা, চোখে অজস্র প্রশ্ন।
আর রোজ… সে একবারও তার চোখে চোখ রাখতে পারছে না। চারপাশে তাকাচ্ছে, যেন কোথাও লুকাতে চায় নিজের ভাঙা মনটা। কারণ সে জানে—একবার চোখ মেললেই সৃজন দেখে ফেলবে তার চোখের ভেজা কষ্ট।
রোজ আমতা আমতা করে বলে ওঠে–
“দে-দেখুন… সৃজন, ছাড়ুন আমায়… কেউ দেখে ফেললে খারাপ ভাববে… প্লিজ, ছাড়ুন…”
কিন্তু সৃজন ছাড়ার মানুষ না আজ। সে আরও কাছে টেনে নেয় রোজকে, কণ্ঠটা কাঁপে —
“ তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো না ? আমার দিকে তাকাও, জান… তুমি কথা না বললে আমার ভেতরটা পাগল হয়ে যায়। প্লিজ বলো… কি হয়েছে ? আমার জান, প্লিজ… স্পিক আপ…”
হঠাৎই রোজ ভেঙে পড়ে।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না — সৃজনকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে।
এই কান্না… এই ভেঙে পড়া… কোনো প্রেমিক পুরুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না। সৃজন শক্ত করে তাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নেয়, যেন এই বুকটাই তার আশ্রয়, তার নিরাপদ জায়গা।
কান্নার মাঝেই রোজ কাঁপা গলায় বলে —
“ আমি তো এই দুনিয়ায় একা… আমায় আরো একা করে দিয়ে চলে যাবেন না তো, সৃজন…?
এই কথাটা শুনে সৃজনের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে।
একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে ভেতরে —
মেয়েটা এখনো কি তাকে নিজের করে ভাবতে পারেনি?
তাহলে সে “একা ” কেনো ? এসব ভাবে রোজ?
সৃজন আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রোজকে, গলা ভারী হয়ে আসে ভাঙা গলায় বলে —
“ যেদিন আমি, সৃজন… এই দুনিয়ায় থাকবো না, সেদিন নিজেকে একা ভাববে। তার আগে না… কখনো না। যতদিন আমি আছি, তুমি একা না—কখনোই না…”
সৃজনের কথায় রোজের বুক ধক করে ওঠে।
এই মানুষটাই তো তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ… তার সবকিছু।
সে সৃজনকে ছেড়ে তার চোখের দিকে তাকায়,চোখ ভরা ভয়, ভালোবাসা, আর একরাশ অসহায়তা।
ভাঙা কণ্ঠে বলে —
“ তুমি যেদিন এই দুনিয়ায় থাকবে না… সেদিন আমার রোজ নামটারও আর কোনো মানে থাকবে না।
তোমার রুহ যখন বের হবে… আমি চাই, আল্লাহ তখনই আমার রুহটাও নিয়ে নিক…
কারণ… আমি এই নশ্বর দুনিয়ায় তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না সৃজন … এক মুহূর্তও না…”
দুজনেই চুপ হয়ে যায়… কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও তাদের ভালোবাসা আরও জোরে কথা বলে একটা এমন টান, যা ছাড়ার নয়…একটা এমন সম্পর্ক, যেখানে একজন ছাড়া আরেকজনের অস্তিত্বই অসম্পূর্ণ।
রোজের কথাটা যেন সৃজনের ভেতরে জমে থাকা সব অনুভূতির দরজা এক মুহূর্তে খুলে দিল। একটুও দেরি না করে সে রোজকে নিজের বুকে টেনে নিল—মজবুত, কিন্তু অদ্ভুত কোমল সেই আলিঙ্গন। যেন এতদিনের সব দূরত্ব, অভিমান, না বলা কথা,সবকিছু একসাথে মুছে দিতে চাইছে।
রোজ প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেলেও ধীরে ধীরে নিজেকে ছেড়ে দিল সেই উষ্ণতার ভেতরে। সৃজনের বুকের স্পন্দন যেন তার কানে এসে লাগছিল, আর সেই স্পন্দনে ছিল একটাই কথা“আমি আছি।”
সৃজন দু’হাতে আলতো করে রোজের মুখটা তুলে ধরলো। তার চোখে এমন এক গভীরতা, যেন সেখানে হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসার ইচ্ছে থাকবে না। খুব যত্ন করে, খুব ভালোবাসা নিয়ে সে রোজের কপালে একের পর এক চুমু এঁকে দিল, প্রতিটা ছোঁয়ায় ছিল মায়া, ছিল প্রতিশ্রুতি, ছিল না বলা হাজারো অনুভূতি।
রোজের চোখে জমে থাকা জলটুকু সে ঠোঁটের ছোয়ায় মুছে দিল, যেন কোনো মূল্যবান কিছু ছুঁয়ে দেখছে। তার দৃষ্টিতে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো, ছিল শুধু গভীর ভালোবাসা আর শান্ত একটা আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি।
রোজ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে দিল। সৃজনের কাছে নিজেকে এমনভাবে সঁপে দিল, যেন এই মানুষটাই তার সব। চারপাশের সব শব্দ, সব মানুষ, সব বাস্তবতা মুছে গিয়ে যেন শুধু তাদের দু’জনের ছোট্ট একটা পৃথিবী তৈরি হলো,যেখানে শুধু ভালোবাসা, স্পর্শ আর নীরব অনুভূতির ভাষা।
সেই মুহূর্তে সৃজন নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না, ফুল … তুমি আমার সব।”
আর রোজ, চোখ বন্ধ রেখেই, মৃদু হাসলো,কারণ সে বুঝে গেছে, এই আলিঙ্গনটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
“
হেরাকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে রুমে ঢুকিয়েই দরজাটা ধাক্কা মেরে বন্ধ করে দিল নাভান। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, চোখে জ্বলছে দমবন্ধ করা রাগ।
হেরা পেছাতে পেছাতে দেয়ালে গিয়ে ঠেকে গেল। তার শ্বাস কাঁপছে, চোখে ভয় আর রাগ মিশে এক অদ্ভুত ঝড়।
“দূরে থাকুন… প্লিজ…” কাঁপা গলায় বললো হেরা।
নাভান ম্লান হেসে উঠলো, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই — শুধু রাগের তীব্রতা।
“প্লিজ? না এমন টা করবেন না প্লিজ।
” নাভান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো —
“এই শব্দটা তোমার মুখে মানায় না, । যখন আমার থেকে পালাচ্ছিলে, তখন তো প্লিজ ছিল না! এখন এই ওয়ার্ড আসলো কই থেকে?
হেরা মাথা নাড়িয়ে বললো,
“আমি পালাইনি… আমি নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছি!”
“ আমার থেকে? আমি এতটাই ভয়ংকর ?
হঠাৎই গলার স্বর নিচু হয়ে গেল নাভানের —
হেরা কিছু বললো না। তার নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে দাঁড়ালো। এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল নাভান। তার চোখে ক্ষণিকের জন্য কিছু একটা নরম হলো… কিন্তু পরক্ষণেই আবার শক্ত হয়ে গেল। হেচকা টানে হেরাকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। কামিজ টা উপরে উঠাতেই হেরা চেচাতে লাগে । নাভান এমন ভাবে ধরেছে যেনো হেরার আত্না বের হয়ে যাচ্ছে। নাভান বিরক্ত সুরে বলে উঠে।
” তুমি ব্যাথা পাচ্ছো চিল্লাও,, আরো জোরে চিল্লাও,, ডাজেন্ট মেটার বাট থামতে বলবা না,,আর আমি তোমায় ছাড়ছি না,, আরো ব্যাথা দিবো দরকার হয়। বাট কথা না শুনার শাস্তি দিবোই,, মিসাইল গার্ল!!
চলবে…..
প্রেমের বাজিমাত পর্ব-৩২