প্রেমের বাজিমাত পর্ব-৩৩ | Premer Bajimat Part-33

প্রেমের বাজিমাত

লেখনিতেরোজও_রুশা

পাঠ_৩৩

>

— জাওয়াদ খান আজ যেনো নিজের ভেতরেই হারিয়ে গেছেন। একসময়ের দৃঢ়চেতা, কঠিন মানুষটা আজ ভেঙে পড়া এক নীরব নদীর মতো, শব্দ নেই, কিন্তু গভীর স্রোত বয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতর। চোখ দুটো লাল, ক্লান্ত… তবুও সেই চোখে জমে থাকা অশ্রু যেনো বের হওয়ার অনুমতি পায় না। কারণ তিনি তো পুরুষ, আর সমাজ বলে, পুরুষেরা নাকি কাঁদে না। কিন্তু আজ তার ভেতরের মানুষটা সমাজের সেই নিয়ম মানতে পারছে না।

  • হেরা ধীরে ধীরে বাবার পাশে বসে পড়ে। বাবার কাঁধে হাত রাখতেই জাওয়াদ খান কেঁপে ওঠেন, যেনো এই স্পর্শ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। মেয়ের দিকে তাকাতে গিয়েও যেনো লজ্জা পেয়ে যান, একজন বাবা, তার মেয়ের সামনে নিজের ভাঙা অবস্থাটা লুকাতে চায়।

“ কি হয়েছে বাবা…?

  • হেরার কণ্ঠটা নরম, মায়ায় ভরা। জাওয়াদ খান প্রথমে কিছু বলেন না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সামনে, যেনো অতীতের কোনো দৃশ্য আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তারপর ধীরে ধীরে ভাঙা গলায় বলতে শুরু করেন!

“ আম্মাজান… ভালোবাসায় এতো কষ্ট কেনো?

আরো পড়ুন

  • কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা আটকে আসে। চোখের কোণে জমে থাকা পানি এবার আর বাঁধ মানে না। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, ধীরে… নিঃশব্দে।

“ জানেন , আমি আপনার আম্মাজান কে খুব ভালোবাসতাম… এখনো ভালোবাসি। মানুষ নাকি ভুলে যায় দূরে থাকলে এটা সবাই বলে, কিন্তু আমি পারি নাই কেনো আম্মাজান… তাকে ভুলতে ?

  • জাওয়াদ খান এর কণ্ঠে কাঁপন, যেনো প্রতিটা শব্দ বুক ছিঁড়ে বের হচ্ছে।

“ নিজ চোখে দেখেছিলাম… এমন কিছু, যা কোনো স্বামী সহ্য করতে পারে না। আমার বিশ্বাস ভেঙে গিয়েছিল এক মুহূর্তে। আমি তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম… তাকে প্রশ্ন করিনি, তার কথা শুনিনি… শুধু নিজের চোখকে বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু জানেন আম্মাজান , দূরে সরিয়ে দিলেও… তাকে কখনো ঘৃণা করতে পারি নাই। প্রতিদিন রাতে তার কথা মনে পড়তো। মনে পরতো আমার রাজপুত্রর কথা তাদের হাসি, তাদের রাগ, আমার কাজল রেখার অভিমান… সবকিছু। দুই যুগ কেটে গেল, তবুও আমি সেই জায়গাতেই আটকে আছি। আমার কাজল রেখা শেষ বার জাওয়ার সময় একটা কথা বলেছিলো জানেন কি সেটা?

” জাওয়াদ তুমিও মনে রেখো ছটফট তুমিও একদিন করবে, আমার থেকেও বেশি। সেটা এক যুগ দুই যুগ বা মরার আগ মুহুর্ত হলেও। আমাকে অবিশ্বাস করার ফল ভোগ করতে হবে তোমার। ( কাজল )

” সেদিন আমি বুঝি নি আম্মাজান, চোখের দেখাকেই বিশ্বাস করেছিলাম।

  • হেরা নিঃশব্দে শুনে যাচ্ছে। বাবার এই রূপ সে কখনো দেখেনি। বাবার যাতে কষ্ট না পায় তার জন্য নিজের পরিচয়, এমনকি নিলয় এর সাথে তার বাবার সাথে কি শত্রুতা তাও জানতে চায় নি,কিন্তু এখন বাবা যে কষ্ট পাচ্ছে এটা যে ভিষণ পুড়াচ্ছে হেরাকে। জাওয়াদ খান থেমে আবার বলে।

“ আমি ভেবেছিলাম, সময় সব ঠিক করে দিবে… কিন্তু সময় শুধু তাকে আমার থেকে আরো দূরে নিয়ে গেছে। আমি তাকে ভুলতে পারিনি, আর নতুন করে কাউকে জায়গা দিতেও পারিনি। জানেন, ভালোবাসা যদি সত্যি হয়… সেটা কখনো শেষ হয় না। সেটা শুধু কষ্ট হয়ে বুকের ভেতর বাসা বাঁধে।

জাওয়াদ খান এর চোখে এবার একরাশ পাগলামির ছাপ ফুটে ওঠে–

“ যখন জানলাম… আমি ভুল দেখেছিলাম… সবকিছু ভুল ছিল… তখন আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম আম্মাজান । নেপাল থেকে ছুটে এসে তার কাছে বার বার ছুটে যাচ্ছি কিন্তু বরাবরের মতো আমি বের্থ। ভাবতে পারেন আম্মাজান ? যাকে আমি নিজের হাতে দূরে সরিয়ে দিলাম, যার চোখের কান্না আমি উপেক্ষা করলাম… সে তো নির্দোষ ছিল! এটা ভাবতেই আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। হ্যাঁ আম্মাজান আমার কাজল রেখার কথা সত্যি হয়েছে তার থেকে আমি বেশি ছটফট করছি।

  • কথাগুলো বলতে বলতে তিনি নিজের মাথায় দুহাতে চেপে ধরেন।

“আমি তাকে বিশ্বাস করিনি… অথচ আমি তাকে ভালোবাসতাম! আমার কাজল রেখা বলতো আমাকে ভালোভাসা তার অভিশাপ ছিলো। তাহলে এখন যে আমি ছটফট করছি এই ভালোবাসা কি তাহলে অভিশাপ না, আমার জন্য ? আমি তাকে হারিয়েছি নিজের ভুলে… নিজের অবিশ্বাস এর জন্য।

  • হেরা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। বাবার হাত ধরে ফেলে শক্ত করে। জাওয়াদ খান এবার মেয়ের দিকে তাকান। সেই দৃষ্টিতে একসাথে লজ্জা, কষ্ট আর অপার ভালোবাসা—

“ আমি এখনো তাকে খুঁজি, প্রতিটা মানুষের মাঝে… প্রতিটা স্মৃতিতে। জানেন আম্মাজান ভালোবাসা মানুষকে বাঁচায়ও… আবার ধ্বংসও করে দেয়। আমি বেঁচে আছি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে গেছি অনেক আগেই…”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। শুধু একজন ভাঙা মানুষের ভালোবাসার গল্প—যে ভালোবাসা হারিয়েও শেষ হয়নি, বরং সময়ের সাথে আরও গভীর, আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে।


–সন্ধ্যা ঠিক সাতটা ধরনিতে অন্ধকার নেমে এসেছে, বাতাসে এক ধরনের অজানা উত্তেজনা। রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে, আর সেই আলো কেটে তিনটা বাইক ছুটে চলছে— নাভান সামনে মাঝখানে ঝিনুক ও অধীর পিছনে সৃজন,ঝিনুক এর বাইকের পিছনে অধীর বসেছে , তাদের চোখে একটাই লক্ষ্য—আজকের এই বের হওয়া শুধু ঘোরাঘুরি না, একটা জরুরি মিশন।

  • ঝিনুকের হাত শক্ত করে হ্যান্ডেলে ধরা, স্পিডোমিটারের কাঁটা বাড়তেই থাকে। বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার চোখে একটুও দ্বিধা নেই। হঠাৎ করেই সে ব্রেক কষে দেয়। টায়ারের ঘর্ষণে মাটিতে তীক্ষ্ণ শব্দ হয় নাভান এর বাইকের মতো।

সে নিচু গলায় বলে উঠে-

“দোস্ত… আমার মনে হচ্ছে আশেপাশেই আছে তারা।( ঝিনুক )

তার কণ্ঠে এমন একটা দৃঢ়তা, যেন সে শুধু আন্দাজ না-অনুভব করছে। নাভান চারপাশে তাকিয়ে মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেয়–

“ তুই আর সৃজন ওইদিকে যা। আমি আর অধীর এই দিকটা কভার করছি। দেখি কিছু পাওয়া যায় কি না। ( নাভান )

“ ওকে, ডান। ( ঝিনুক )

  • ঝিনুকের মুখে শব্দটা বের হতেই তার হাত নিঃশব্দে পিছনের দিকে যায়। প্যান্টের ভেতর থেকে সে লাইসেন্স করা পিস্তলটা বের করে। তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায় এখন তারা স্টুডেন্ট বা বিজনেসমেন নয় তারা যোদ্ধা।
  • চারপাশ নিস্তব্ধ। পায়ের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। ঝিনুক খুব সাবধানে এগিয়ে যায়, আর সৃজন তার ঠিক পেছনে –একটা ছায়ার মতো। তার চোখ সবসময় ঝিনুকের দিকে, যেন কিছু হলে সে নিজের জীবন দিয়েও ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।
  • ওদিকে নাভান আর অধীরও একইভাবে সতর্ক হয়ে এগোচ্ছে। তাদের হাতেও পিস্তল, কিন্তু তার থেকেও বেশি প্রস্তুত তাদের মন। হঠাৎ

“আহ্! ( সৃজন )

  • সৃজনের পা হঠাৎ একটা গর্তে পড়ে যায়। ভারসাম্য হারিয়ে সে অনেকটা নিচে ঢুকে যায়। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে, একটা মুখোশধারী লোক ঝোপের আড়াল থেকে ছুটে আসে। ঝিনুক এক সেকেন্ডও দেরি করে না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার ওপর। এমনভাবে চেপে ধরে যে লোকটা নড়াচড়া করার সুযোগই পায় না। তার হাত শক্ত, চোখে আগুন–

“ সৃজন! কাম ফাস্ট! কিন্তু সৃজন উঠতেই পারছে না । গর্ত যেন তাকে আটকে রেখেছে। ওদিকে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে নাভান থেমে যায়।তার কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে —

“ফাস্ট অধীর! ঝিনুক বিপদে পড়েছে! ( নাভান )

  • ঠিক তখনই তাদের হাতের ঘড়িতে লাল সিগনাল জ্বলে ওঠে। বিপদের সংকেত। আর কিছু ভাবার সময় নেই—দুজনেই দৌড়ে ছুটে যায়।
    এদিকে, ঝিনুক একা লড়ছে। প্রথম লোকটাকে কাবু করলেও হঠাৎ আরেকজন ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। তার হাতে ছুরি। সে সোজা ঝিনুকের পেটে আঘাত করতে যায় –কিন্তু ঝিনুক সরে যায় নিখুঁত কৌশলে। আঘাতটা পেটে না লাগলেও তার হাতে লাগে কেটে যায় হাত এর অনেক টুকু । রক্ত বের হতে শুরু করে। তবুও ঝিনুক থামে না। তার গ্রিপ একটুও ঢিলা হয় না। ঠিক তখনই সৃজন কোনোভাবে নিজেকে টেনে তুলে দৌড়ে আসে। ঝিনুকের হাত চেপে ধরে গালি ছুড়ে —

“ শালা… সাহস কত বড় তোদের ( সৃজন )

তার চোখে আতঙ্ক না—রাগ। বন্ধুর জন্য ভয়, আর সেই ভয় থেকে জন্ম নেওয়া আগুন। নাভান আর অধীর পৌঁছে যায় ঠিক তখনই। একজন পালিয়ে গেছে, আরেকজন ঝিনুকের হাতে কাবু হয়ে পড়ে আছে। নাভান দৌড়ে এসে ঝিনুককে ধরে। তার চোখ হঠাৎ ঝিনুকের হাতে পড়ে –রক্ত। এক সেকেন্ডে তার চোখ বদলে যায়। শান্ত, ঠান্ডা নাভান যেন আগুন হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে নিজের শার্টের হাতা গুটাতে থাকে। তার প্রতিটা মুভমেন্টে ভয়ংকর একটা স্থিরতা। নিচে পড়ে থাকা লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সে নিচু গলায় বলে।

“ বাস্টার্ড… তোর সাহস হয় কী করে আমাদের কলিজায় হাত দেওয়ার? ( নাভান )

তার কণ্ঠে শুধু রাগ না—একটা অধিকার, একটা ভয়ংকর ভালোবাসা বন্ধুত্বের!

“ যে মেয়েকে আমরা তিনজন এতো প্রটেক্ট করি… যাতে তার গায়ে একটা আঁচড়ও না লাগে… তুই তার রক্ত বের করে দিলি?

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অধীর দাঁড়িয়ে আছে, চোখে আগুন। সৃজন এখনো ঝিনুকের হাত চেপে ধরে আছে, যেন রক্তটা নিজের হাতে থামিয়ে দিতে চায়। আর ঝিনুক…সে চুপ করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার হাতে ব্যথা আছে, রক্ত ঝরছে… কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক। গর্ব। এতটা পাগল হয়ে গেছে সবাই তার জন্য। এই তিনটা মানুষ—তার ঢাল, তার শক্তি, তার পরিবার। ঝিনুক হালকা হেসে ফেলে। মনে মনে বলে-

“ ভাগ্যিস তোদের পেয়েছি… না হলে আজ আমি শুধু একা একটা নাম হতাম। আজ আমি ‘আমরা’!!

বন্ধুত্বটা শুধু পাশে থাকা না-
এটা এমন একটা সম্পর্ক, যেখানে একজনের ব্যথা মানে সবার যুদ্ধ, আর একজনের রক্ত মানে সবার রাগ। সন্ধ্যার অন্ধকারে চারটা ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে
কিন্তু তারা শুধু বন্ধু না…তারা একে অপরের পৃথিবী।

সন্ধ্যার অন্ধকার তখন আরও ঘন হয়ে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা চাপা গন্ধ,রক্ত, ঘাম আর ভয় মিশে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত বাস্তবতা। চারপাশ নিস্তব্ধ, ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে, হাত থেকে রক্ত ঝরছে… কিন্তু তার দৃষ্টি নিজের দিকে না, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটা মানুষের দিকে।

সৃজন এখনো তার হাত চেপে ধরে আছে। এত জোরে ধরে আছে যেন নিজের হাত দিয়ে রক্ত থামিয়ে দেবে। তার কণ্ঠ কাঁপছে-

“তুই একটু সাবধানে থাকতে পারিস না? নিজের কথা একবারও মাথায় আসে না? ছেড়ে দিতি লোকটাকে? ( সৃজন )

কথাগুলো রাগের মতো শোনালেও, ভিতরে ভিতরে সেটা ভয় বন্ধু রুপি বোন কে আঘাত পেতে দেখে।
অধীর কিছু বলছে না। সে শুধু নিজের টি-শার্ট ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ বানাতে ব্যস্ত। তার চোখ নিচের দিকে, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা রাগ আর কষ্ট স্পষ্ট। সে ধীরে বলে–

“ আমাদের কিছু হলে সমস্যা নাই… কিন্তু তোর কিছু হলে… সহ্য করতে পারবো না রে তুষার পাত এর বউ।

এই ‘সহ্য করতে পারবো না’—এই চারটা শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারটা অনুভূতি। আর নাভান…

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ঝিনুকের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ লাল, তার রাগ, ভয়,সবকিছু এক অদ্ভুত নীরবতায় আটকে আছে। সে হাত বাড়িয়ে খুব আলতো করে ঝিনুকের কাটা জায়গার পাশটা স্পর্শ করে। যেন ভয় পাচ্ছে, আর একটু জোরে ছুঁলেই আবার কষ্ট পাবে। তারপর নিচু গলায় বলে–

“তোকে আগেও বলেছি রিক্স নিবি না। তুই কথা শুনিস না কেনো ঝিনুক তোর কিছু হলে তুষার ভাই কে কি জবাব দিবো ?

ঝিনুক কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। নাভান নিজেই উত্তর দেয়-

“ তুই যে শুধু আমাদের বন্ধু না ঝিনুক, তুই আমাদের কলিজা আমাদের বোন আমাদের হাসি… তুই না থাকলে আমরা তিনজন একসাথে থেকেও একা হয়ে যাই। আর কখনো রিক্স নিবি না এটাই ফাস্ট এন্ড এটাই লাস্ট তা না হলে তোকে আর কখনো মিশনে আনবো না গট ইট!!

একটা মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়। ঝিনুকের চোখে পানি এসে যায়, কিন্তু সে কাঁদে না। সে হাসে। একটা গভীর, তৃপ্তির হাসি। এই পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক আসে যায়, কিন্তু এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো রক্তের না হয়েও রক্তের থেকেও গাঢ় হয়ে যায়। সে ধীরে বলে-

“ আজ যদি আবারও একই পরিস্থিতি আসে… আমি আবারও ঝাঁপিয়ে পড়বো। কারণ জানি, আমি একা না… আমার পেছনে তিনটা ছায়া আছে, যারা আমার জন্য নিজের জীবনকেও তুচ্ছ করে দিবে। আমি ঠিক আছি আমার কথা বাদ দে হালকা কেটেছে আগে অই সালাকে ধর।

নাভান ঝিনুক কে ঠিক থাকতে দেখে লোকটার কাছে যায়।

‘ বল কি এমন জিনিস লুকাচ্ছে শামসুল চৌধুরী। বল?

লোকটার মুখ থেকে রক্ত বের হতে থাকে,নাভান ইচ্ছে মতো মেরে কাবু করে ফেলেছে। লোকটা রক্তাক্ত মুখ নিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে , কেউ আড়াল থেকে লোকটার মাথা বরাবর সুট করে,,নাভান কে হেচকা টানে সরিয়ে আনে সৃজন। অধীর ঝোপের দিকে ছুটতেই ঝিনুক অধীর কে থামিয়ে দেয়।

” না অধীর এখন আমাদের রিক্স হয়ে যাবে। ( ঝিনুক)

” সিট, আমি কিছুই করতে পারছি না,, কিছু তো একটা আছে যা আমরা জানি না। ( নাভান )

~~~

কাজল ভিলার বিশাল গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হেরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধকধক করে উঠলো। যেনো শুধু একটা বাড়িতে নয়—অজানা কোনো অতীতে পা রাখছে সে। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা, তবুও সেই নীরবতার মাঝেই লুকিয়ে আছে বহু না বলা গল্প।

রোজ আর রুশা পিছনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু হেরা এগিয়ে যায়। তার পায়ের শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে না—মার্বেলের ঠান্ডা ফ্লোরে পা পড়ছে, কিন্তু অনুভূতি শূন্য। কাজের মেয়েকে বলে কাজল খান এর রুমে এসেছে। বারান্দার নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে চুড়ির রিনি ঝিনি শব্দ ।

উপরে নিজের ঘরে বসে কাজল খান বারান্দা দিয়ে ফুল গাছের দিকে তাকিয়ে ছিলো। চোখে একরাশ শূন্যতা, ঠোঁটে অদ্ভুত কঠোরতা।
দরজায় টোকা পড়তেই না তাকিয়েই বললো—

“কে অধীর? আসো… দরজা খোলা আছে… কাম হেয়ার মাই সন…”

  • কিন্তু দরজার ভেতর ঢোকার সাথে সাথেই থেমে গেলো তার নিঃশ্বাস।এই পায়ের শব্দ…এই নরম উপস্থিতি…এটা অধীর না। চুড়ির শব্দে হঠাৎ ঘুরে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে গেলো হেরা। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেলো। চোখের দৃষ্টি শক্ত থেকে নরম হয়ে এলো। অবিশ্বাস, বিস্ময়… আর কোথাও যেন লুকানো এক গভীর টান। এডভোকেট এম এল এ কাজল খান এগিয়ে এলো দ্রুত। হেরা কেঁপে উঠলো।
    এতো বড়, এতো প্রভাবশালী একজন নারী—আজ তার সামনে এত কাছে দাঁড়িয়ে। সেদিনের কথা মনে পড়ে গেলো—একটা চেক হাতে দিয়ে বলেছিলো,

“ ছেলের বউকে খালি হাতে দেখতে নেই।”

  • আজ সেই একই মানুষ… কিন্তু চোখের ভেতরটা আজ অন্যরকম। হেরা কাঁপা গলায় বললো-

“আসসালামু আলাইকুম…”

“ ওয়ালাইকুমুস সালাম মা… বসো। কার সাথে এসেছো? নাভানকে বললে পারতে… নিজেই নিয়ে আসতো তোমায়…”

হেরা মাথা নিচু করে-

“ না… আমি ঠিক আছি…

কাজল খানের ভ্রু কুঁচকে গেলো।

“ কিছুই ঠিক নেই। আমার ছেলের বউ একা এসেছে… শেহতাজ কোথায়?”

  • কাজল খান ডেকে উঠে তার ছেলেকে। হেরা চমকে যায়, আজ এমনি তে অই অসভ্য গিটার ওয়ালা তার সাথে কি করেছে, কতো কষ্টে তার থেকে পালিয়ে এসেছে,এমন কি নাভান যে এখন বাসায় নেই সেটা জেনেই এসেছে যাতে নাভান এর মুখোমুখি না হতে হয়। হেরা বিচলিত হয়ে বলে।

“ আন্টি প্লিজ… কাউকে ডাকবেন না… আমি শুধু আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি…”

কাজল খান একটু থামলো।
তার চোখে সেই পুরনো কঠোরতা ফিরে এলো-

“ এভাবে বলছো কেনো? এটা তোমার বাড়ি… তুমি এই বাড়ির বড় বউ।”

হেরা মাথা তুলে তাকালো। চোখে ভয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় একরাশ জেদ–

“ আমি এই বিয়ে মানি না আন্টি… প্লিজ বউ বলে সম্মোধন করবেন না আমায়।

এক মুহূর্তে বদলে গেলো সবকিছু।
কাজল খানের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠলো-

“ হোয়াট? কি বলছো তুমি? বিয়ে কি খেলনা নাকি?”

হেরা কেঁপে উঠলো। তবুও থামলো না-

“ এই বিয়ে আমাদের ইচ্ছেতে হয়নি… এটা একটা এক্সিডেন্ট… যেখানে ভালোবাসা নেই ( হেরা)

“ স্টপ! ( কাজল খান)

কাজল খানের চোখ লাল হয়ে উঠলো।
কিন্তু তারপর হঠাৎই তার কণ্ঠে অন্যরকম ভাঙন।

“ বেশি ভালোবাসলেই,সম্পর্কে, সংসার টিকে—এমন না… আমাকে দেখো… ভালোবেসে কি পেলাম আমি…?

ঘরটা ভারী হয়ে উঠলো। হেরা মাথা উঁচু করে তাকায়, ইসস কি সুন্দর দেখতে, আচ্ছা কে বলবে এই মহিলার ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে আছে দুইটা, পা থেকে মাথা অব্দি হেরা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে, শাড়ি,চুড়ি, চুল বাধার স্টাইল সব বলে দিচ্ছে সামনের মহিলাটি একজন নামি দামি মহিলা , মায়া আর কঠোরতার মিশেলে এক মন দুই সত্বা এই এডভোকেট কাজল রেখা , হেরা ধীরে বললো-

“ বাবা আপনাকে এখনো ভালোবাসে…!( হেরা)

মুহূর্তে কাজল খান এর মুড চেঞ্জ হয়ে যায়।

“ ওই লোকের কথা আমার সামনে বলবে না!( কাজল খান)

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কাজল খান–

“ তুমি আমার ছেলের বউ। বিয়ে যেমনই হোক… নাভান তোমাকে মেনে নিয়েছে। আর আমার ছেলে যা মানে—সেটাই সত্যি। সেটাই তার!

তারপর হঠাৎ স্বাভাবিক হয়ে কাজের মেয়েকে ডাকলো–

“ শিলা! আমার ছেলের বউ এসেছে… আয়োজন করো… আজ আমি নিজে রান্না করবো…”

পরিস্থিতি পাল্টে গেলো।
কিন্তু হেরা থামলো না।সে দৌড়ে এসে কাজল খানের পায়ে পড়ে গেলো।

“ প্লিজ আন্টি… আমার কথা শুনুন…”

কাজল খান যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট।
তার চোখ বিস্ফারিত। এই মেয়েটা…
যাকে সে পুতুলের মতো আগলে রাখতে চাইতো…
আজ তার পায়ে! সব কঠোরতা গলে গেলো এক মুহূর্তে। সে তাড়াতাড়ি হেরাকে তুলে বুকে জড়িয়ে নিলো—

“ এ কি করলি মা তুই… তোকে এভাবে দেখতে চাইনি কখনো… তুই যে আমার আদরের… তুই যে আমার ভাইয়ের কলিজা… আমার ছেলের দুনিয়া…”

হেরা থমকে গেলো। সব কথা যেন তার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। আমতা আমতা করে বললো।

“ মা মানে…? আপনি কি বলছেন…?”

কাজল খান থেমে গেলো।
চোখে আতঙ্ক। ঠোঁট শুকিয়ে এলো।

“ তুই… কিছু জানিস না? ( কাজল খান)

“ না… কিছুই না… (হেরা)

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো হেরা স্তব্দ কি বলেছে ছেলের দুনিয়া,ভাই এর কলিজা মানে কি? হেরা মনে হয় কিছু একটা আশার আলো দেখতে পেয়েছে। হেরা ভয় কেটে বলে উঠে।

“ আমি আমি কে আন্টি বলুন? আমি কি তোমাদের পরিচিত কেউ,নাকি কারো অবৈধ সন্তান!

  • ককাজল খান এক পা পিছিয়ে গেলো।
    তার চোখে জল জমে উঠছে। যতই জিহান তালুকদার তার সাথে বেঈমানী করুক না কেনো সে তো জানে জিহানতালুকদার আর তার সম্পর্ক কতোটা পবিত্র ছিলো,তার জিহান ভাই যে কেমন সে ভালো করে জানে,সেই ভাই এর মেয়ে তাদের কলিজা সে নিজেকে অবৈধ দাবি করছে এটা কেমন করে মানবে কাজল খান । এতদিনের লুকানো সত্যি আর আটকানো গেলো না। তিনি জানেন না কেনো জাওয়াদ খান হেরার পরিচয় লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু এর পিছনে নিশ্চয়ই বড় কারন আছে বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া ছেলের কথা চিন্তা করেও তিনি বলে দিবেন, আর হেরার যথেষ্ট বয়স হয়েছে,সবাই অধিকার আছে নিজের পরিচয় জানার কাজল খান ধীরে ধীরে বলতে লাগে —

“ তুই… আমার একমাত্র ফুপাতো ভাইয়ের রাজকন্যা…।

হেরা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলো, কাজল খান থেমে আবার বলে।

“ জাওয়াদ খানের বোন… তৌদিদা খানের মেয়ে তুই…”

“ মানে…?”

কাজল খান চোখ বন্ধ করলো। তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে–

“ আমার ভাই জিহান তালুকদারের সাথে তোর মা, মানে জাওয়াদ খান এর এক মাত্র বোন এর বিয়ে হয়… আর তারপর… আমার বিয়ে হয় জাওয়াদ খানের সাথে…”

এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো দুই জন এর চোখ থেকে–

“ আমি জানতাম না তুই সেই পিচ্চি পরিটা… কারণ তোর বাবা… সব লুকিয়ে রেখেছিলো…!

হেরা কাঁপছে-তার মন এতো টুকু ভেবে শান্তি পাচ্ছে সে অপরিচিত, বা অবৈধ সন্তান না, তার বাবার খুব কাছে মানুষ সে। এতো দিন এর কষ্ট, এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো। ইস কতই না কষ্ট পেয়েছে এতোদিন, কাওকে বুঝতে দেয় নি, হেরার মনে প্রশ্ন জাগে,বোনের মেয়েকে নিজের মেয়ে বলে মানুষ করা যায়, বাট তাই বলে পরিচয় লুকিয়ে কেনো,একটু ভয় মনে বাসা বাধে,আচ্ছা তার বাবা মা কোথায় তাহলে? হেরা কাজল খান এর দিকে তাকায়,এই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি,তার সম্পর্কে মামি,ও ফুপি হয়। তার জন্য অই দিন ভার্সিটিতে যখন দেখেছিলো তখন নিজের সাথে অনেক মিল পেয়েছিলো। যে কেউ দেখলে বলবে কাজল খান আর হেরার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? হেরা কাপা গলায় বলে।

“আমার বাবা মা কোথায়…আন্টি?

এই প্রশ্নটাই যেন ছুরির মতো বিঁধলো।
কাজল খান বসে পড়লো ধীরে। তার মুখের শক্ত মুখোশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

“,বলবো

তার কণ্ঠে আর দম্ভ নেই।
শুধু ক্লান্তি… অনুতাপ… আর হারানোর বেদনা।
সে বলতে শুরু করলো, অতীতের প্রতিটা ঘটনা… ভালোবাসা… বিশ্বাসঘাতকতা… ভুল… লুকানো পরিচয়… নিলয় এর বাবার ষড়যন্ত্র…ঘরটা যেন কাঁদছে। এই সময় রোজ আর রুশা ভেতরে ঢুকে পড়ে। সব শুনে তারা স্তব্ধ। তাদের চোখের সামনে সম্পর্কগুলো নতুন করে গড়ে উঠছে… আবার ভেঙেও যাচ্ছে। হেরা নিঃশব্দে বসে আছে।
তার পুরো পৃথিবীটা বদলে গেছে। কাজল খান ধীরে হেরার মাথায় হাত রাখলো—

“ তুই শুধু আমার ছেলের বউ না… তুই আমার মা… আমার হারানো সম্পর্কের শেষ চিহ্ন…।

তার কণ্ঠ কাঁপছে–হটাৎ হেরা মাথা চেপে ধরে পরে যায় ফ্লোরে। মাথা ফ্লোরে আঘাত লাগার আগেই নাভান ধরে ফেলে,, হেরাকে বুকে জরিয়ে ধরেছে ভয়ে কাপছে শক্ত পোক্ত ছেলেটা।

রুমটার ভেতর হঠাৎ করেই যেন সবকিছু থেমে গেছে।
হেরা নিথর হয়ে পড়ে আছে—নাভানের হাতে ধরা, তার মাথাটা বুকের কাছে চেপে রেখেছে নাভান… যেন একটু ছেড়ে দিলেই লুটিয়ে পরবে হেরা।

নাভানের আঙুল কাঁপছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে।

“ প-পরি বউ… ওপেন ইউর আইস… প্লিজ…

নাভান এর গলা ভেঙে যাচ্ছে যেনো।

” মিসাইল গার্ল … ওপেন ইউর আইস… প্লিজ…

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।

“এই মেয়ে… কথা বলছো না কেনো? উঠো… পিক আপ… ডেম ইট! তুমি তো চুপ থাকার মেয়ে না … মিসাইল গার্ল… উঠো…। শাস্তি পাবে কিন্তু তুমি এই ইডিয়েট।

তার কণ্ঠে রাগ নেই, আছে ভয়—একটা অসহায়, দমবন্ধ করা ভয়। হেরা কোনো সাড়া দেয় না।
নাভান হেরাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে—
যেন নিজের হৃদস্পন্দন দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনবে।

কাজল খান সামনে এগিয়ে আসে। মুখটা ফ্যাকাশে, তবুও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।

“ নাভান… তুমি শান্ত হও…

তার গলাও কাঁপছে, কিন্তু দৃঢ় হওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট।

“ হেরার জ্ঞান নেই… তুমি ওকে বিছানায় শুইয়ে দাও… আমি ডক্টরকে ফোন দিচ্ছি…”

এমন সময় ঝিনুক আর তুষার রুমে ঢোকে। তুষার এসে থমকে যায়—একদিকে ঝিনুকের হাত কাটা, আরেকদিকে হেরা অজ্ঞান।

“ নাভান, তুমি হেরাকে শুইতে দাও…

তুষারের কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু চোখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
নাভান কোনো কথা না বলে খুব যত্ন করে হেরাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
তার হাত এখনো ছাড়তে চাইছে না। তারপর তুষারকে আড়ালে ডাকে– নাভান কিছু একটা বলতে তুষার চিন্তিত হয়ে পরে।

তুষারের মুখ শক্ত হয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি কাগজে কিছু লিখে দেয়।
নাভান সেটা নিয়েই এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

এদিকে, ফোন না পেয়ে জাওয়াদ খান বারবার কল দিচ্ছিলো হেরাকে।
শেষে রুশা ফোন রিসিভ করতেই সব যানায় রুশা ।
আর তারপর,,একটা ঝড়ের মতো কাজল ভিলায় ঢুকে পড়েন তিনি ২০ মিনিটের মাথায়।

রুমে ঢুকেই মেয়েকে সেই অবস্থায় দেখে থমকে যান।

“ আম্মাজান!

একটা শব্দ, কিন্তু তার ভেতরে হাজারটা ভয়।
তার পা কাঁপে… তবুও এগিয়ে যায়। আর তখনই তার চোখ পড়ে,,কাজল খানের ওপর।
দুজনের চোখ এক হয়। কত বছরের অভিমান, দূরত্ব, না বলা কথা—সব এক মুহূর্তে ফিরে আসে।
কেউ কিছু বলে না। হঠাৎ করেই জাওয়াদ খান এগিয়ে গিয়ে কাজল খানকে জড়িয়ে ধরে।
কাজল খান থমকে যায়-এতদিন পর… এমন স্পর্শ! কিন্তু জাওয়াদ খান ছাড়ে না।
বরং আরও শক্ত করে টেনে নেয় বুকের মাঝে। তার কণ্ঠ ভেঙে যায়–

“ কাজল… আমাদের মেয়েটা… কিছু হবে না তো?”

এই মানুষটা-যে সবসময় শক্ত—আজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কাজল খানের বুক কেঁপে ওঠে।
চোখ ভিজে আসে… তবুও অভিমান এখনো মরে যায়নি। গলা শক্ত করে বলে-

“ কিছু হবে না… ঠিক হয়ে যাবে…” ছাড়ুন আমায়!

কিন্তু তার নিজের কণ্ঠই তাকে বিশ্বাস করাতে পারছে না কেনো জানি,সামান্য একটা অজ্ঞান হওয়া নিয়ে যে নাভান বা জাওয়াদ খান এমন করবেন না এটা ভালো বুঝতে পারছে কাজল খান । জাওয়াদ খান একটু দূরে সরে এসে তার চোখের দিকে তাকায়—

“ সত্যি বলছো? আমার মেয়েটা ঠিক হয়ে যাবে?”

ঘরের ভেতরটা যেন এক অদৃশ্য ঝড়ের মধ্যে আটকে আছে—কেউ কথা বলছে না, কিন্তু সবার বুকের ভেতর শব্দ হচ্ছে প্রবলভাবে। নাভান কাক ভেজা হয়ে মেডিছিন হাতে নিয়ে আসে, সবাইকে রুম থেকে বের করে তুষার নিজ কাজ করতে থাকে।

কাজল খান চুপ করে দাঁড়িয়ে… তার হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। ফোনটা শক্ত করে ধরে আছে, যেন এটা ছেড়ে দিলেই সব সত্যি বাইরে চলে আসবে। চোখ দিয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখটা এখনো শক্ত—কারণ সে জানে, ভেঙে পড়ার সময় এটা না।

জাওয়াদ খান এক কোণে দাঁড়িয়ে… তার দৃষ্টি স্থির না। বারবার কাজল রেখার দিকে তাকাচ্ছে। চোখে ভয়, অস্থিরতা, আর এক অজানা আশঙ্কা। তার মনে হচ্ছে—যে সত্য এতদিন চাপা ছিল, সেটা আজ নিজে থেকেই বের হয়ে আসতে চাইছে।

অধীর সোফার পাশে দাঁড়িয়ে… তার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে-

” ওই মেসেজে কি ছিল?

কাজল খানের আচরণ, হঠাৎ ফোন আড়াল করে ফেলা, সবকিছু মিলিয়ে সন্দেহটা আরও ঘন হয়ে উঠছে। তার মনে হচ্ছে, এই বাড়িতে কিছু একটা অনেক বড় লুকানো আছে, আর সে সেটা জানার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ড্রয়িং রুমের নিরবতা হঠাৎ ভেঙে দেয় নাভান, তার চোখ লাল, চুল ভেজা, শরীর কাঁপছে রাগে আর অসহায়ত্বে। সে সামনে এগিয়ে আসে, গলার স্বর কাঁপছে কিন্তু প্রতিটা শব্দে আগুন—

“ তোমরা কি আমাদের বাঁচতে দিবে না? কি চাও তোমরা? আমরা মরে যাই? এই লুকোচুরি আর ভালো লাগছে না… আমি আজ শেষবার বলছি—সব মিটিয়ে ফেলো। নইলে আমি হেরাকে নিয়ে… হয় মরে যাবো, নয়তো এমন দূরে চলে যাবো—যেখানে কেউ আমাদের খুঁজেও পাবে না!”

  • তার কথায় যেন পুরো ঘর কেঁপে ওঠে।
    কাজল খান আর জাওয়াদ খান একসাথে চমকে ওঠে। তারা দুজনেই জানে—নাভান যা বলে, সেটা করে সে এক সেকেন্ডও ভাবে না।
    তার ভালোবাসা যেমন গভীর… তার পাগলামিও ততটাই ভয়ংকর। কাজল খানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে ওঠে। সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়, ফোনটা এখনো হাতে।তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে… মনে হচ্ছে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

“তুমি… তুমি কেন হেরাকে তার আসল পরিচয় বলোনি?

” নাভানের গলা এবার নিচু, কিন্তু আরও ভয়ংকর। বাবার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে মারে।

এই প্রশ্নটা যেন ছুরি হয়ে ঢুকে যায় জাওয়াদ খানের বুকে। জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
তার চোখ দুটো লাল, ভেজা… কিন্তু ভেতরের ঝড়টা সে আর লুকাতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে—মনে হয় শব্দ খুঁজছে, সাহস জোগাড় করছে।
তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে কথা শুরু করে—

“ আজ… আজ আর চুপ করে থাকার সুযোগ নেই আমার। অনেকদিন ধরে একটা সত্য বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে রেখেছি… ভাবছিলাম, সময় হলে বলবো—কিন্তু আজ বুঝলাম, সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না।”

জাওয়াদ খান একবার দরজা ফাক দিয়ে হেরার দিকে তাকায়… আবার চোখ নামিয়ে ফেলে।

‘হেরার আসল পরিচয় যেন কেউ কোনোদিন না জানতে পারে… যদি কেউ জানে… ওরা হেরাকেও মেরে ফেলবে।

কথাটা বলে জাওয়াদ খান এর দৃষ্টি নাভানের দিকে যায়।

“ আমার একমাত্র কলিজার ছোট বোন এর একমাত্র রাজকন্যা হেরা! আমার বোন শেষ বারের মতো সেদিন আমার কাছে কিছু চেয়েছিলো। নাভানের সাথে ছোটবেলার সেই বিয়েটা… কখনো যাতে না মানি ’

নাভানের মুখ শক্ত হয়ে যায়… মুঠো বন্ধ হয়ে আসে।
জাওয়াদ খান আবার বলতে শুরু করে—তৌহিদার শেষ কথা ছিলো।

‘হেরাকে নিজের মেয়ের মতো বড় করিস ভাই … নিজের পরিচয় দিস…কিন্তু ওর আসল পরিচয়টা যেনো সারা জীবন … মাটির নিচেই চাপা থাকে।( তৌহিদা)

  • সেদিন আমরা বাংলাদেশ থেকে ভাঙা মন নিয়ে ছুটে আসি,,পিছনে রেখে আসি আমার ভালোবাসা আমার অস্তিতকে ,সেদিন যাচাই না করে চোখের দেখাকে সত্যি মনে করে ভুল করেছিলাম, আমাদের ফ্লাইটের পরের ফ্লাইটে আসে জিহান, আমি মন খারাপ নিয়ে যেখান কাজল রেখা আর আমার রাজপুত্রকে শেহতাজ কে নিয়ে যেতাম সেখানে যাই কষ্ট লুকাতে। ( জাওয়াদ)

— একদিকে ভাই এর মন ভাঙা আরেকদিকে নিজের,মেয়েকে নিয়ে একা রুমে বসে কাদছিলেন তৌহিদা, হন্তদন্ত হয়ে সেদিন কি হয়েছিলো তা কেবল তৌহিদা আর জিহান জানে হটাৎ এক ঘন্টা পর ফোন আসে তাদের গাড়ি ব্রেকফেল সাথে জিহান ও আছে হেরা তখন কাজের মেয়ের কাছে ছিলো,, জাওয়াদ খান এর গলা ভেঙে যায় এবার।

“ আমি… আমি আমার বোনকে কথা দিয়েছিলাম।
একজন ভাই হিসেবে… একজন মানুষ হিসেবে…
আমি ওর শেষ ইচ্ছাটা ভাঙতে পারিনি।

সে ধীরে ধীরে নাভান এর দিকে এগিয়ে আসে-

” তাই… হেরাকে আমি নিজের মেয়ের পরিচয়ে বড় করেছি। কারণ যখন তোদের কথা মনে করে আমি প্রতিদিন ভিতরে ভিতরে মরে যাচ্ছিলাম, বুকটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল… ঠিক তখনই ওই নিষ্পাপ, পবিত্র মুখটা আমার জীবনে এক টুকরো আলো হয়ে এসেছিল। সে আমাকে আবার বাঁচতে শিখিয়েছে। সত্যি বলতে, হেরা না থাকলে হয়তো অনেক আগেই আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতাম…

  • জাওয়াদ খানের চোখ দুটো তখন ভিজে উঠেছে। সেখানে একসাথে জমে আছে অসহায়তা, অভিমান আর না বলা হাজারো কষ্ট। তিনি থেমে আবার বলতে শুরু করলেন—

” শেষবার… যখন আমি তোর মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম, তখনই শামসুল আবার আমাদের মাঝে এসে দাঁড়াল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানিয়ে দিল, তারা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
সেদিন… আমি সব ভুলে, সব অভিমান গিলে, খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলাম। সবচেয়ে কষ্টের কথা জানিস কি? তোর মা তখন একটাও কথা বলেনি। একবারও না। না আমার পক্ষে, না আমার বিপক্ষে… শুধু চুপ ছিল। আমি সত্যি ভেবেছিলাম, সে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। তাই আর জোর করিনি।
কিন্তু অধীরকেও ছাড়ে নি, তাকে নিয়েও আজে বাজে কথা বলছিল, তখনও তোর মা চুপ ছিল… তাকে থামায়নি। বল তো, এখানে আমার দোষটা কোথায়?
আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম যে একটা সুযোগও পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না? নিজের চোখে প্রিয় বন্ধু উরফে বোনের স্বামীকে নিজ প্রান প্রিয় স্ত্রীর সাথে এতো কিছু দেখে কি রিয়েক্ট করা ভুলের ছিলো, তারপরও… আমি আবার গিয়েছিলাম। শেষবারের মতো… সব ঠিক করার আশায়। কিন্তু তখনও—সে কিছু বলেনি… কেন বলেনি বল তো? একবার… শুধু একবার যদি বলত, তহলে তো এতো কিছু হতো না।

–জাওয়াদ খান আবারো কাপা পায়ে কাজল রেখার দিকে যায়। সবার সামনে কাজল রেখার পা ধরে বলে উঠে।

” আমি ভুল করেছি সন্দেহ করেছি, এতো বছরেও তোমার জায়গা আমি কাওকে দি নি কাজল রেখা,আমি মেনে নিচ্ছি সব ভুল আমার তুমি আমায় মাফ করে দাও,বয়স তো অনেক হলো, শেষ বয়সে তোমার পাশে থাকতে দাও কাজল রেখা। আমি আমার ছেলে মেয়েদের সাথে তোমার সাথে থাকতে চাই এক ছাদের নিচে।

  • নিজ স্বামী কে পায়ে পরে থাকতে দেখে বুক দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে কাজল রেখার ,হ্যাঁ সে জাওয়াদ খান এর কাজল রেখা। যতই শক্ত থাকুক এই লোকের সামনে যে নিজেকে শক্ত রাখতে কষ্ট হয়। তবু ফোনের দিকে তাকিয়ে, শক্ত কন্ঠে বলে উঠে।
  • কাগজের নৌকা দিয়ে যেমন নদী পার হওয়া যায় না, তেমনি অবিশ্বাস আর সন্দেহ নিয়ে ভালোবাসা,সংসার করা যায় না , পুরুষ মানুষ শুরুতে যে ভালোবাসা দেয়, আর নাড়ী সেই ভালোবাসাটুকু নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে,আমিও তাই করবো,আমার জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই,না চাওয়ার আছে।
  • বাবার অঘাত ভালোবাসা দেখে বাভান এরচোখ থেকে পানি পড়ে অজান্তেই,শুধু যে নাভান তা না সবার চোখে পানি চিক চিক করছে। মায়ের কঠোরতা এখন যেন নিতে পারছে না নাভান। নাভান নিজের মুখ আর নাক বার বার মুখছে শার্ট এর হাতা দিয়ে। জাওয়াদ খান এর মুখ টা নিমিষেই ছোট হয়ে যায়, নাভান মায়ের দিকে গিয়ে ঠিক বাবার মতো করে বসে পা জরিয়ে ধরে বলে উঠে।

” মা আমি জানি তুমি যা বলছো তা সব মিথ্যা,তুমিও যে বাবাকে ছাড়া ভালো নেই,আমি সব জানি মা,প্লিজ আমি জানি তোমার অভিমান স্বাভাবিক কিন্তু একটা বার বাবাকে সুযোগ দাও, তোমাদের এই ভালোবাসা যে আমি নিজ চোখে দেখেছি,তাই এতো কিছু করেছি,আমার এতো বছরের কষ্ট বৃথা যেতে দিও না। আমি তোমাদের এক সাথে দেখতে চাই মা এক সাথে। তোমার দেয়া কসমের জন্য আমি অনেক সাফার করেছি। প্লিজ আর না এখন তো সব জানো প্লিজ আর অভিমান করো না সব ঠিক করে নাও প্লিজ মা। দয়া করো আমাদের।

আরো পড়ুন

নাভানের এমন কাজে সবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরে।

” এতো বছর আমার সাথে থেকেছো,এখন বাবার সাথে থাকো, আমি চলে যাচ্ছি থাকো তোমরা এখানে।

এই বলে কাজল খান বের হয়ে যায় বাসা থেকে। পিছনে ফেলে যায় বাবা ছেলের ভাঙা মন।

চলবে….

প্রেমের বাজিমাত পর্ব-৩৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *