
প্রেমের_বাজিমাত
লেখনিতে রোজও_রুশা
পাঠ_২৭
"কি রে, কী হয়েছে? এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি যে?
'নেপালের বাড়ির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ফারুখ সিকদার প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন জাওয়াদ খানের দিকে। তিনি
আগেই এখানে ছিলেন। ব্যাবসার কাজে এ দেশ ও
দেশে ঘুড়লেও আজ তিন দিন ধরে শরীর টা ভালো না তাই নিজ বাসস্থানে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু রিলেক্স করাচ্ছে, হঠাৎ করে জাওয়াদ খান দুই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এভাবে চলে আসবে,এটা তিনি একদমই আশা করেন নি। কিন্তু জাওয়াদ খান যেন কিছুই শুনলেন না ফারুক সাহেব এর কথা । তার চোখ শুধু হেরার উপর থেমে আছে, মেয়েটাকে একের পর এক কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এতে তার হাত নেই।
"জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়ের কপালে চুমু খেলেন। সেই চুমুতেই যেন হাজারটা না বলা কথা---দুঃখ, ভয়, আর অদ্ভুত এক দায়বদ্ধতা।
"তারপর হাত বাড়ালেন রুশার দিকে। রুশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না—
ছোট বাবা…”
' বলে এমনভাবে কেঁদে উঠল, যেন পুরো পৃথিবীর দুঃখ একসাথে তার কাঁধে বসে আছে।
" জাওয়াদ খান হালকা হেসে তাকে বুকে টেনে নিলেন--
“ এই পাগলি, এত কাদছিস কেন?”
>>কিন্তু নিজের চোখের কোণেও পানি চিকচিক করছে --সেটা তিনি কাউকে দেখতে দিলেন না।
>>দুই মেয়েকে বুকের মাঝে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
একটা নিজের মেয়ে… আরেকটা বন্ধুর মেয়ে--
কিন্তু ভালোবাসায় কোনো পার্থক্য নেই।
>>>অন্যদিকে ফারুখ সিকদার তাকিয়ে আছেন। বন্ধুর দিকে। তারও তো আরেকটা মেয়ে আছে… কিন্তু সে আজ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।হেরার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা ব্যথা করে উঠল। তার মেয়েটা হেরার মতো, এবার নিজ মেয়েকে ফারুক সিকদার বুকে জরিয়ে নিলেন, রুশা নিজ জন্মদাতার ছোয়া পেয়ে অভিযোগ জানাতে চাইলো ছোট বাবার নামে কিন্তু পারলো না, একটু আগে একটা আদর তাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে। হেরা ফারুক সিকদারকে বাবাই বলে ডাকে। ফারুখ সাহেব মেয়েদের বুকে টেনে নেয়,,
" হেরা এতক্ষণ চুপ ছিল। কিন্তু আজ তার ভেতরের সব জমে থাকা কথা একসাথে বের হতে চাইছে। যতো অভিযোগ আছে হেরা দিতে চাইলো ফারুখ সাহেব এর কাছে নিজের বাবার নামে!!
' নাক টেনে, চোখ মুছতে মুছতে বলল__
“ বাবাই তোমার বন্ধু আমাদের এভাবে হঠাৎ করে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এলে কেন? তোমার বন্ধুর সাথে জোর করে নিয়ে আসার কি দরকার ছিল?”
' একটু থেমে আবার বলল—
" তার থেকে বড় কথা তুমি আমার সত্যি টা জানতে তাই না?
' ফারুখ সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন---
প্রেমের বাজিমাত পড়ুন
“ কি সত্যি?”
~~এই প্রশ্নটাই যেন হেরার মাথা পুরো গরম করে দিল।সে কিছু বলতে যাবে… কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল।কেন এত রাগ হচ্ছে তার?সে নিজেও জানে না। শুধু বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছে--**নাভান।
" উফ! এই ছেলেটা না থাকলেও শান্তি নেই!
হেরা মনে মনে বলে__
“ এই লোকটা আমার লাইফে এসে ড্রামা বানিয়ে দিয়ে গেছে আমার লাইফটা!
""যাকে অপছন্দ করে তার মুখটাই বার বার চোখে ভেসে উঠে। তার মনে হচ্ছে… নিজের একটা অংশ সে বাংলাদেশেই রেখে এসেছে। তার জন্য এতো রাগ হচ্ছে। সে তো এই বিয়ে মানে না! জাওয়াদ খান বিয়ে মানে না বলে এখানে নিয়ে এসেছে যাতে নাভান ধরা ছুয়ার বাহিরে থাকে, তার তো কোনো আক্ষেপ থাকার কথা না, কিন্তু তাও কেনো মন শান্ত করতে পারছে না। সব গোলমাল লাগছে। কেন মনে হচ্ছে, কিছু একটা হাড়াতে যাচ্ছে সে। আর রুশা? সে তো একেবারে সিনেমার হিরোইন মুডে!
" মনে মনে ভাবছে__
“ আমি যদি উপন্যাসের নায়িকা হতাম, এখনই ব্যাগ গুছিয়ে পালিয়ে যেতাম! লাইভ টেলিকাস্ট এর কাছে । গিয়ে বলতাম--টেক মি ব্যাক!”
' কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
তার বাবা আর সেই ভয়ংকর “ছোট বাবা”!
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলার মিশন ইম্পসিবল!
' হেরা হঠাৎ করেই রাগে বলে ফেলল।
“আমি তোমার বন্ধুর মেয়ে নই… আর সেটা তুমিও জানো, বাবাই!” তাই না? এতো দিন লুকিয়ে ছিলে আমার থেকে দুজন। সত্যি টা কি জানার অধিকার নেই আমার,কে আমার বাবা মা কি আমার আসিল পরিচয়। আমি যদি বাংলাদেশ না যেতাম তোমরা কখনো আমায় জানতে দিতে না। আমি কি কারো বৈধ নাকি অবৈধ সন্তান। বাবা কেনো বলছে না। সমাজ যখন আমার পরিচয় জানতে চাইবে আমি কি বলবো অবৈধ, আর বলা লাগবে না এমনিতে তকমা লেগে যা,,,,
>>পুরো ঘর একদম চুপ।ফারুখ সিকদার হতভম্ব। আর জাওয়াদ খান…তার চোখ মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল।আদরে আগলে রাখা মেয়েটাকে আজ প্রথম বারের মতো গায়ে হাত তুললো।
" ঠাসসস " !
হেরার পুরো কথা শেষ হবার আগেই ঠাস "একটা জোরে থাপ্পড়। সবাই জমে গেল যেনো বরফ এর মতো। হেরা কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গালটা জ্বলছে… কিন্তু তার থেকে বেশি জ্বলছে তার ভেতরটা। মজার ব্যাপার হলো।এই রাগ করা, এই জেদ সবই কিন্তু সে শিখেছে নাভানের কাছ থেকে!
>>আগে তো সে এত কিছু করতোই না।
নাভানের কথা শোনাও তার ইগোর বিরুদ্ধে—তাই একটাও কথা শোনেনি। যখন তার সম্পর্ক ফাস হয়েছে। নাভান তখন তার কথা মতো চলতে বলেছিলো। কিন্তু মেয়েটা নাভানের একটা কথাও শুনে নি। এখন দূরে এসে ভাবছে।
“এখন কেউ তো ভিডিও কল দিয়ে দেখাবে না নাভান এর ট্রিপ্স ফলো করছে হেরা।
কিন্তু থাপ্পড় খাওয়ার পর তার মাথায় নতুন চিন্তা!!
“অই অসভ্য গিটার ওয়ালা ইচ্ছে করে এমন কথা বলতে বলেছে যাতে আমি আমার বাবার হাতে থাপ্পড় খাই।
হেরা চোখ বন্ধ করতেই সামনে ভেসে উঠল--
নাভানের সেই বিরক্তিকর, কটাক্ষভরা মুখ--
“মিসাইল গার্ল… বলেছিলাম আগে এসব বলতে! এখন বলেছো—আরো দুইটা থাপ্পড় ডিজার্ভ করো তুমি!”
হেরা দাঁত চেপে মনে মনে বলে--
“একবার সামনে আসেন … তো আপনার অই গোমড়া এ্যটেটিউড মার্কা গালে এমন থাপ্পড় বসাবো লাইফটাইম মনে রাখবেন !” অসভ্য গিটার ওয়ালা
' কিন্তু…পরক্ষণেই বুকটা কেমন করে উঠল।
কারণ সত্যিটা খুব সিম্পলসে যতই রাগ দেখাক…যতই নিজেকে শক্ত দেখাক…সে নাভানকে ভীষণ মিস করছে।
>>জাওয়াদ খান হঠাৎ করেই নিজের হাত উঠিয়ে হেরার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল… কিন্তু পরমুহূর্তেই যেন নিজের হাতটাই তার কাছে অপরাধী হয়ে উঠল। তিনি নিজেই নিজের মুখ ঢেকে সবার সামনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।চারপাশটা যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। হেরা তখনও যেন ঘোরের মধ্যে ছিল। কিন্তু বাবার সেই ভেঙে পড়া কান্নার শব্দ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। সে তাকিয়ে দেখল। তার শক্ত, দৃঢ়, কখনো না ভাঙা মানুষটা আজ শিশুর মতো কাঁদছে! বুকটা হুহু করে উঠল হেরার বাবা কে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে সে? সে তো এমন কিছু বলতে চায়নি…
কিন্তু পরিস্থিতি, নাভানের শেখানো কথাগুলো,তার মনের দুটানা,নাভান কে প্রতি সেকেন্ডে মনে করে ছটফট করা,,,,। সব মিলিয়ে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল সে।
"বাংলাদেশ থেকে হঠাৎ করে এভাবে নিয়ে আসা, নিজের জীবনের উপর কোনো অধিকার না থাকা-এই সব কষ্ট জমে ছিল তার ভেতরে। আর সেই জমে থাকা অভিমানই আজ বিষ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। নিজের উপর ভীষণ রাগ হলো হেরার।
“বাবা…”
ডাকতে ডাকতেই সে দৌড়ে গেল জাওয়াদ খানের দিকে। সব ভুলে, সব অভিমান ভুলে সে আবার সেই ছোট্ট মেয়েটাই হয়ে উঠল--যে বাবার বুকে মাথা রেখে শান্তি পেত। কিন্তু… জাওয়াদ খান হঠাৎই দু’হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলেন। কাঁপা গলায় বললেন।
“না… আপনি আমায় ছুঁবেন না, আম্মাজান… আমি তো আপনার জন্মদাতা পিতা নই! তাহলে আমি কষ্ট পেলে কি আসে যায়? আমি মরে গেলেও কার কি!”
কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধল হেরার বুকে।
সে স্তব্ধ হয়ে গেল… নিঃশব্দ… নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল।
“আমি তো বলতে চাইনি…”
গলাটা শুকিয়ে গেল তার। বলতে পারলো না কথা হেরা। কিন্তু জাওয়াদ খান থামলেন না। কান্না ভেজা গলায় বলতে লাগলেন---
“আমার বেঁচে থাকার একটাই সম্বল- আপনি, আম্মাজান…যখন আমি ভেঙে পড়েছিলাম, তখন আপনার ওই ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়েই নিজেকে সামলেছি… যখন আমার বয়স ছিল নিজের জীবন নিয়ে ভাবার--আমি আপনাকে নিয়ে ভেবেছি…
অফিসে সবাই যখন বউ-গার্লফ্রেন্ড নিয়ে গল্প করতো… আমি শুধু আপনাকে নিয়ে চিন্তা করতাম… সবার ব্যাগে যখন ল্যাপটপ, ফাইল থাকতো…
আমার ব্যাগে থাকতো--আপনার ডায়পার, ফিডার, ছোট জামা… সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে আমি নিজের বুকের ভেতর আগলে রেখে বড় করেছি…”
**কথাগুলো বলতে বলতে জাওয়াদ খান এর কন্ঠ ভেঙে পড়ছিলো বারবার।
“আজ এই কথা শোনার জন্য বড় করেছিলাম আপনাকে? জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না? … বাবা হতে হলে ভালোবাসা লাগে না? জন্ম দিলেই যদি বাবা হওয়া যেতো তাহলে রাস্তার পাগলির পেটে সন্তান ও পরিচয় পেতো জন্মদাতার। কিন্তু ঠিকই একজন না একজন তাদের নিয়ে গিয়ে নিজের সন্তান এর পরিচয়ে মানুষ করছে।
*******
সমাজের কাছে একটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই আমি --
*একজন মানুষ যদি সন্তান জন্ম না দেন, তবে কি তিনি কখনো “পিতা” হতে পারেন না? পিতৃত্ব কি শুধু রক্তের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ, নাকি ভালোবাসা, দায়িত্ব আর যত্নেই একজন সত্যিকারের পিতা তৈরি হয়?
আর যারা তথাকথিত “অবৈধ সন্তান” নামে পরিচিত--
তাদের কেনো লাঞ্ছিত করা হয়? তাদের দোষটা কোথায়? জন্ম তো তাদের হাতে ছিল না!
আসলে কি কোনো মানুষ “অবৈধ” হতে পারে?নাকি আমাদের মানসিকতাই এখনো অবৈধতায় ভরা?
জাওয়াদ খান হেরার দিকে তাকিয়ে আবারো বলে --
আপনার আর সমাজ, এর প্রশ্নের উত্তর আমি দিয়ে দিচ্ছি আম্মাজান --
"পিতা হওয়া শুধু জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
যে মানুষ সন্তানের পাশে থাকে, তাকে আগলে রাখে, ভালোবাসা আর দায়িত্ব দিয়ে বড় করে--সেই মানুষই সত্যিকারের পিতা। রক্ত নয়, সম্পর্ক গড়ে ওঠে হৃদয়ের বন্ধনে। আর “অবৈধ সন্তান” বলে কিছু নেই।
কোনো সন্তান নিজের ইচ্ছায় জন্ম নেয় না--তাই তার উপর “অবৈধ” তকমা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।
অবৈধ যদি কিছু থাকে, সেটা মানুষের কাজ হতে পারে, কিন্তু কোনো মানুষ কখনো অবৈধ হতে পারে না।
সমস্যা সন্তানদের মধ্যে নয়--সমস্যা আমাদের চিন্তাধারায়। আমরাই সমাজ বানাই, আবার আমরাই সেই সমাজকে অমানবিক করে তুলি।
>>আজ আমি আপনাকে আঘাত করতে চাইনি, আম্মাজান…শুধু আপনার কথাগুলো আমার বুকটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে…কারণ ওই পবিত্র মুখ থেকে এমন অপবিত্র কথা বের হলো…”কিভাবে।
" চারপাশে নিস্তব্ধতা। আসলেই জাওয়াদ খান এর কথা তো ঠিকি,আমাদের মন মানসিকতাই ভালো না। নাম পরিচয়হিন মানুষ যদি খারাপ থাকে তাহলে আমাদের সমাজের মানুষ বলে,,ইস কি কষ্ট,,,আবার সেই মানুষ টা যদি ভালো ভাবে দিন কাটায় তো আমরাই বলি,,ইস কি সুখ আল্লাহ কি সুখ রেখেছে কপালে অবৈধ হবার পরেও। জাওয়াদ খান করা গলায় বললেন--
“শুনে রাখুন… আপনার পরিচয় গোপন রাখতে হলে, আমাকে যদি নিজের ছেলের সাথেও বেঈমানি করতে হয়_আমি তাই করবো।তবুও আপনার পরিচয় আমি লুকিয়ে রাখবো। শেহতাজ খান নাভান-সে আমার রক্ত… সে নিজেকে সামলে নিতে পারবে।
কিন্তু তার সাথে আপনার বিয়ে মানে-একদিন সত্যিটা প্রকাশ পাবে… আর আমি সেটা হতে দেবো না। এটা আমার ওয়াদা…”
" শেষ কথাটা বলার সময় তার গলায় অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“আর একটা কথা…
আমি আপনার জন্মদাতা না হতে পারি…
কিন্তু আপনি আমার কলিজার টুকরা… আমার কলিজার বৈধ সন্তান…”
"কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। দ্রুত চলে গেলেন সেখান থেকে।
"হেরা দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো। তার চোখ থেকে নিঃশব্দে টপটপ করে পানি ঝরছে…মনে হচ্ছে নিজের অজান্তেই সে তার বাবাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
হঠাৎই ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল সে।
মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল--
“আমি… আমি এসব বলতে চাইনি বাবা…আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি…আমি তোমায় খুব ভালোবাসি বাবা…
আমার বাবা-মা বলতে তুমি… শুধু তুমি…আমি আর কখনো আমার পরিচয় জানতে চাইবো না…প্লিজ বাবা… আমায় মাফ করে দাও…”তুমি যেও না বাবা।
"তার সেই অসহায় কান্না শুনে রুশাও নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও কেঁদে উঠল। ফারুখ সিকদার ধীরে এসে রুশাকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর হেরার কাছে এগিয়ে গেলেন। মমতা ভরা কণ্ঠে বললেন।
“মা… সব সত্যি সবসময় বলা যায় না…
কিছু সত্যি থাকে, যেগুলো লুকিয়ে রাখতেই হয়… কারো জীবনের জন্য… কারো নিরাপত্তার জন্য…
তুই আজ আমার বন্ধুটাকে খুব একা করে দিলি…
সে তোর জন্যই বেঁচে আছে, মা…তুই না বললেও পারতি…তবুও… ভুল তো মানুষই করে…মনটা একটু শান্ত হলে গিয়ে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিস…বাবা তোকে খুব ভালোবাসে…তুই তার জন্মদাতা না হতে পারিস…কিন্তু তার সবচেয়ে আপন মানুষ তুইই…
নিজেকে কখনো পর ভাবিস না… সময় হলে—সব সত্যি নিজে থেকেই সামনে আসবে…”
" ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে যায় সময় …
সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে…
কিন্তু রুশার মনটা যেন স্থির হতে চায় না…
অদ্ভুত একটা অজানা ভয়, অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরে…
আর অন্যদিকে--- হেরা বসে থাকে, চোখে শুকনো অশ্রু…মনে একটাই কথা ঘুরতে থাকে--
“বাবা কি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসবে…?”
"নেপালের পাহাড়ি শহরের সেই বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে যেন এক টুকরো শান্তির ছবি। কাঠ আর পাথরের মিশেলে তৈরি, ছাদের ধারে রঙিন পতাকা উড়ছে ধীর হাওয়ায়। সামনে ছোট্ট বাগান, আর তার মাঝখানে পাথরের তৈরি একটা ফুলের ফোয়ারা--
নিরবচ্ছিন্ন টুপটাপ শব্দে চারপাশকে আরও নিস্তব্ধ করে তুলছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য অস্থিরতা…ঘরের ভেতরে, জানালার পাশে বসে আছে হেরা।
"চোখদুটো লাল, মুখে ক্লান্তির ছাপ। সে একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার দৃষ্টি আসলে কোথাও নেই--সে হারিয়ে গেছে নিজের ভেতরের ঝড়ের মধ্যে। বাবার সাথে করা ব্যাবহার তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে বার বার। সব সম্পর্ক তার সামনে চলে আসছে বারবার যা সে ভুলতে চায় কিন্তু পারছে না।
সে নাভানকে ঘৃণা করে।হ্যাঁ, সে সত্যিই তাকে ঘৃণা করে। তবুও…কেন জানি সেই মানুষটার কথাই বারবার মনে পড়ে।
“কবুল…” শব্দটা হঠাৎ করেই তার কানে বাজে।
সে চমকে ওঠে।
" সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে--যেটা সে কখনোই মানতে চায়নি…কিন্তু তবুও, নিজের অজান্তেই বলা সেই একটা শব্দ--কবুল”--এখন যেন তাকে শেকল বেঁধে রেখেছে। একটু আগে জাওয়াদ খান ফোন করে ফারুখ সিকদার কে বলেছে হেরার বিয়ে সে এক সাপ্তাহের মধ্যে দিবে। এটা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সবাই,, হেরা বির বির করে নিজের মনে নিজেকেই বলতে লাগে।
" আমি তো চাইনি…এমন কিছুই চাইনি আমি।
জীবন যেন আমার চাওয়াগুলোকে উপহাস করে,
আমার না চাওয়ার ভেতরেই গুঁজে দেয় অগণিত বোঝা, যেগুলো আমি কখনোই চাইনি।তাহলে এমন হলো কেন?কেন এই রকম হলো , কেন এই অনুভূতির ঘূর্ণিঝড় আমার মনে বয়ে চলছে। যেখানে আমি নিজেকেই চিনতে পারি না! ধ্বংসের খেলা খেলতে গিয়ে,আমি বুঝতেই পারিনি কখন যে সেই খেলাটাই আমাকে গ্রাস করে নিলো।আমি ভেবেছিলাম আমি খেলছি,কিন্তু শেষে দেখি--আমি নিজেই খেলনার মতো ভেঙে যাচ্ছি, টুকরো টুকরো হয়ে।
"নিজের ধ্বংস আমি নিজেই ডেকে এনেছি…এই সত্যটা যতবার মনে পড়ে,ততবার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠে। কারণ আমি তো জানতাম না,
এই পথের শেষে এমন অন্ধকার অপেক্ষা করে আছে। এমন লাগার তো কথা ছিলো না…কেন এতোদিন মনে হচ্ছিলো আমি শক্ত,অটুট, অনুভূতিহীন—কিন্তু আজ বুঝছি ,আমি ভুল ছিলাম। ভীষণ ভুল। তাহলে কেন এমন লাগছে?কেন এই ব্যথা থামছে না?কেন একটা ঘৃণিত ব্যক্তির জন্য আমার হৃদয় এভাবে কেঁপে উঠছে বারবার?এ কেমন বেড়াজাল! যেখানে ঘৃণাও বন্দী হয়ে যায়,আর অনুভূতি হয়ে ওঠে শত্রু। আমি তো তাকে ঘৃণা করি…তবুও কেন তার ছায়া আমাকে ছেড়ে যায় না?
নিজের ভেতরেই যেন এক যুদ্ধ চলছে--একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে অজানা টান।আমি পালাতে চাই,কিন্তু পারি না…কারণ এই বেড়াজালটা বাইরে নয়,এটা গড়েউঠেছে আমার নিজের ভেতরেই। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি--যাকে ঘৃণা করি,তার জন্যই অজান্তে ভেঙে পড়া।হয়তো এটাই আমার ধ্বংসের শুরু নয়,এটাই আমার ধ্বংসের শেষ দৃশ্য--যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি,নিজের তৈরি অন্ধকারের মাঝখানে,নিজেকেই হারিয়ে ফেলে… নিঃশেষ হয়ে।
আরো পড়ুন
>>এক মন দুই স্বত্তা,, এক মন বলছে তুই অই অসভ্য গিটার ওয়ালা কে মিস করছিস,আরেক স্বত্তা বলছে,,ওর সাথে তোর হিসাব নিকাশ বাকি আছে। এগুলো না উসুল হবার আগ অব্দি তাকে মনে রাখ হেরা।
" হেরা ঠোঁট কামড়ে ধরে। তার ভেতরে জমে থাকা রাগ আর অপমান আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
" নাভানের মুখটা মনে পড়ে__
তার সেই দৃষ্টিটা… যেন সবকিছু জানে, সব বুঝে… তবুও কিছু বলে না।
“আমি তাকে ঘৃণা করি…”
নিজেকেই বোঝাতে চায় হেরা।
কিন্তু মনটা যেন মানতে চায় না।
ঘৃণার মাঝেও এক অদ্ভুত টান_--যেটা সে নিজেও স্বীকার করতে চায় না। হঠাৎই তার চিন্তা ঘুরে যায় অন্যদিকে…
রুশা*
তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আর অধীর…
যে ছেলেটাকে রুশা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।
হেরার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। রুশার সেই হাসি… অধীরের নাম শুনলেই তার চোখের ঝিলিক…
সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পায় সে। তার জন্য প্রিয় বান্ধবী কিছু বলতে পারছে না। আর অধীর, যে ছেলেটা তাকে বোন এর জায়গা দিয়েছে সেই ছেলেটার তো দোষ নেই কোনো,,হেরা চোখ বন্ধ করে, রোজ এর মুখ টা ভেসে উঠে, আচ্ছা অই প্রবিত্র ফুলের মতো মেয়েটা তো একা তার লাইফে,, তাকে আর রুশাকে না পেয়ে নিশ্চই কেদেকুটে সৃজন এর বুক ভাসাচ্ছে,, রোজ এর কথা মনে হতে হেরা মুখ ধরে কেদে উঠে, আচ্ছা অই বোনের মতো মেয়েটার সাথে কি আর কখনো দেখা হবে তাদের নাকি এখানেই সব শেষ,, হেরা আর কিছু ভাবতে পারছে না,, নিজের জীবনের ঝামেলা, নিজের অজান্তে হয়ে যাওয়া বিয়ে। নতুন সম্পর্ক সবকিছুর মাঝেও সে শুধু একটা জিনিস নিশ্চিত করতে চায়--
" রুশার ভালোবাসা যেন ভেঙে না যায়। কারণ সে জানে, ভালোবাসা হারানোর কষ্ট কেমন হতে পারে…খুব কাছ থেকে যে দেখেছে সে। আর সে চায় না, রুশা সেই কষ্ট পাক। বাইরে ফোয়ারার পানি পড়ার শব্দটা হঠাৎ যেন ভারী হয়ে ওঠে। আকাশটা ধূসর, হালকা কুয়াশা নেমে এসেছে। দূরের পাহাড়গুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। হেরা ধীরে ধীরে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ায়। ঠান্ডা হাওয়া তার চুল উড়িয়ে দেয়, কিন্তু সে যেন কিছুই অনুভব করছে না।
" তার মনে পড়ে--
বাবা এখনো বাসায় ফেরেনি।
" এই চেনা দেশ, চেনা ঘর, চেনা সম্পর্ক--সবকিছু মিলিয়ে তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
"সবকিছু এত জটিল কেন…?”
তার গলা কেঁপে ওঠে।
"নাভান--যাকে সে ঘৃণা করে, তবুও যার বলা “কবুল” শব্দটা তাকে তাড়া করে…রুশা আর অধীর--যাদের ভালোবাসা সে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে চায়… রোজ এর বন্ধুত্ব, ভাই এর মতো দুইটা ছেলে, সৃজন ও অধীর এর বড় ভাই এর মতো আঁচড়ন আর ঝিনুক এর মতো বড় টেককেয়ার করার মতো বোন সবাইকে সে মস্তিষ্কের রাখছে,তাদের কখনো ভুলতে পারবে না।
আর বাবা--যার সিদ্ধান্তের বাইরে সে কিছু করতে পারবে না,,এমনি অনেক কষ্ট দিয়েছে সে তার বাবাকে। সব মিলিয়ে হেরা যেন নিজের জীবনেই বন্দি হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে, মাথা দেয়ালে ঠেকিয়ে। চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে। বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে--
ফোয়ারার পানির সাথে মিশে টুপটাপ শব্দ করছে।
আর সেই শব্দের মাঝেই-- হেরা বসে থাকে…ঘৃণা, বাধ্যতা, আর অস্বীকার করা এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে আটকে যাওয়া এক নিঃশব্দ গল্প হয়ে…।
___________
এখন আমি যেমনভাবে বলব, ঠিক সেই লাইনেই চলবে--বাকিটা আমি সামলে নেবো।
"শামশুল চৌধুরী বসে আছে তার বিলাসবহুল বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমে। চারপাশে নীরবতার এক অদ্ভুত ভার, দেয়ালে ঝোলানো দামি চিত্রকর্ম, ঝাড়বাতির আলোয় চকচক করছে মার্বেলের মেঝে-- মন্ত্রীর বাড়ি সবকিছুই যেন তার ক্ষমতা আর প্রভাবের নিঃশব্দ সাক্ষী। কিন্তু আজ তার চোখে সেই চেনা কঠোরতা নেই, বরং সেখানে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত দ্বিধা আর গভীর চিন্তার ছাপ।
"তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ছেলে--নিলয়। মুখে একরাশ হাসি, চোখে উজ্জ্বল স্বপ্ন। এতদিনের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে। বাবার কাছাকাছি আসার এই অনুভূতি, এই স্বীকৃতি--নিলয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে। সে তাকিয়ে আছে শামশুলের দিকে, যেন বহুদিনের অপূর্ণতা আজ পূর্ণ হতে চলেছে।
নিলয়ের কণ্ঠে ভেসে আসে আবেগ মাখা আবেদন--
সে তার হেরা ফুলকে চায়, নিজের করে চায়। শুধু ভালোবাসার অধিকার নয়, তাকে নিজের জীবনের অংশ করে নিতে চায় চিরতরে।
“থ্যাংকস, ড্যাড… লাভ ইউ সো মাচ…”
"ছেলের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর স্বস্তির মিশেল। মনে হচ্ছে, তার পৃথিবীটা যেন ঠিক হয়ে গেছে এই একটুখানি সম্মতিতে।
কিন্তু শামশুলের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত হাসি--যেখানে মায়ার চেয়ে রহস্যটাই বেশি। সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়, নিলয়ের কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে। সেই স্পর্শে আছে স্নেহ, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু—অদৃশ্য এক আগুনের ইঙ্গিত।
তার কণ্ঠ এবার ভারী, গভীর--
"না বাবা " আমি যে আগুনে পুড়ছি, সেই একই আগুনে তোকে কখনোই পুড়তে দেব না।”
"নিলয় কিছু বুঝে ওঠার আগেই শামশুলের চোখের দৃষ্টি বদলে যায়। সেখানে এখন কঠোরতা, প্রতিজ্ঞা আর এক অদ্ভুত অন্ধকার জেদ।
“প্রয়োজন হলে ছিনিয়ে আনবো… তাকে তোর পায়ের কাছে এনে রাখবো। কেউ যদি পথে দাঁড়ায়। ভেঙে ফেলবো সেই পথ।”উপরে ফেলবো পথের কাটা!
তার কণ্ঠে যেন বজ্রের গর্জন___
“খেলা তো সবে শুরু হয়েছে, মাই সান…”
ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। ঝাড়বাতির আলোও যেন ম্লান হয়ে আসে সেই কথার ভারে। নিলয় স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে দোল খাওয়া এক অজানা অনুভূতি।
আর শামশুল—সে যেন নতুন এক খেলার সূচনা ঘোষণা করল, যেখানে ভালোবাসা, ক্ষমতা আর প্রতিশোধ একসাথে জড়িয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর ভাবে।
________
"হাসপাতালের সাদা নীরবতায় ডুবে থাকা এক নিঃশব্দ দুপুর।
ক্যাবিনের জানালা দিয়ে আসা ফিকে আলোটা এসে পড়েছে বিছানায় শুয়ে থাকা এডভোকেট কাজল খানের মুখে। চোখ দুটো স্থির--সিলিংয়ের দিকে তাকানো, অথচ সেই দৃষ্টি যেন ছুঁয়ে আছে বহু বছর আগের কোনো ভাঙা স্মৃতি।
"আজ তার শক্ত মুখোশটা আর ধরে রাখা যায়নি।
যে মানুষটা এত বছর ধরে নিজের হৃদয়কে কঠিন আবরণে মুড়ে রেখেছিল, সবাইকে দেখিয়েছিল নির্লিপ্ত এক ব্যক্তিত্ব--আজ সেই মানুষটার ভেতরের কোমল, ভাঙা মনটা সবাই দেখে ফেলেছে।
"কিশোরী বয়সের সেই প্রথম পবিত্র ভালোবাসা…
যে ভালোবাসা একদিন তার সমস্ত পৃথিবী ছিল—আজও তার বুকের গভীরে কোথাও নিঃশব্দে বেঁচে আছে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেনি, এই খবরটা যখন তার কানে এসেছিল, তখন যেন বুকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা ভালোবাসার চাদরটা হঠাৎ খুলে গিয়েছিল।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, সব ভুল বোঝাবুঝি, সব দূরত্ব হয়তো মুছে যেতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। হাসপাতালের সেই বিছানায় শুয়ে কাজল খান চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায়—
সেই দিনটা…
যেদিন সে আকুতি মিনতি করেছিল, পা ধরে কেঁদে বলেছিল__
“বিশ্বাস করো আমাকে… আমি তোমাকে কখনো ঠকাইনি…”
কিন্তু ভালোবাসা কি? শুধু ভালোবাসলেই হয়?
না… ভালোবাসার আগে আসে বিশ্বাস।
একটা সম্পর্ক তখনই বাঁচে, যখন সেখানে নির্ভেজাল বিশ্বাস থাকে। সন্দেহ যখন ঢুকে পড়ে, তখন ভালোবাসা ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়--নিঃশব্দে, কারও চোখে না পড়ে। নিজের রক্ত, নিজের স্ত্রী--যাকে বিশ্বাস করতে পারেনি, সে ভালোবাসার মূল্যই বা কিভাবে দেবে?
~
“মায়ের পাশে নীরবে বসে আছে নাভান। কাঁপা কাঁপা হাতে মায়ের দু’হাত নিজের বুকের কাছে টেনে এনে বারবার চুমু খায় সে–যেনো প্রতিটা চুমুতে নিজের অপরাধবোধ মুছে ফেলতে চায়।
নাভানের স্পর্শ পেয়ে কাজল খান চুপ করে থাকে… কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, শুধু বুকের ভেতরটা নিঃশব্দে ভেঙে যেতে থাকে।
“যে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে…যার জন্য শত অপমান, হাজার যুদ্ধ সহ্য করেছে– আজ সেই ছেলের চোখেই সে অপরাধী!তার মনে প্রশ্ন জাগে—আসলে কি সে এমন কোনো ভুল করেছে, যার জন্য নিজের সন্তানও আঙুল তোলে তার দিকে?না… হয়তো সে না,ভুলটা এই সমাজের। এই সমাজ–যেখানে একজন নারী একা হলেই তার চরিত্র নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়,যেখানে পুরুষের ভুল চোখ এড়িয়ে যায়, কিন্তু নারীর নিঃশ্বাসও বিচার হয়।
এই অসুস্থ, নির্মম সমাজই কাজল খানের মতো হাজারো নারীকেবাইরে থেকে নয়, ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। নাভান নিচু স্বরে ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলে।
“আমায় মাফ করে দাও মা… আমি আসলে… তোমার মুখ থেকে সত্যিটা বের করার জন্যই এমনটা করেছি…”
কাজল খান ধীরে হাত তুলে নাভানকে থামিয়ে দেয়।
তার কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, শুধু গভীর ক্লান্তি—
“শেহতাজ… আমি জানি এসব… কিন্তু… শেষ পর্যন্ত আমি একাই রয়ে গেলাম…”
নাভান যেনো বিদ্যুৎ খেয়ে ওঠে–
“কি বলছো মা! আমি, অধীর থাকতে তুমি একা—এই কথা কীভাবে বলতে পারলে?”
“কাজল খান মনে মনে তিক্ত একটা হাসি হেসে ফেলে।
কিছু হাসি থাকে, যা ঠোঁটে নয়, শুধু ব্যথায় ভেঙে পড়ে ভিতরে ভিতরে।
‘তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ধীরে…বালিশ ভিজে যায়, কিন্তু সে চোখ মুছে না।
ধীরে ধীরে সে তাকায় তার দুই চাঁদের দিকে—
যাদের জন্য সে নিজের সব অন্ধকার গিলে ফেলেছিল।
কাঁপা কণ্ঠে বলতে থাকে>>
“তোমরা আছো… জানি। কিন্তু কিছু একাকীত্ব থাকে, বাবা… যা ভিড়ের মাঝেও মানুষকে একা করে দেয়।
যে কথা আমি বছরের পর বছর বুকের ভেতর পুড়িয়ে রেখেছি__সেই কথাগুলো কেউ শোনেনি… কেউ জানতে চায়নি। আমি মা ছিলাম… তাই শক্ত ছিলাম।
কিন্তু আমি তো মানুষও…আমারও ভেঙে পড়তে ইচ্ছে করত…”
‘কাজল খান থামে… শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। তাও জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে।
“আজ যখন তোমার চোখেও প্রশ্ন দেখলাম–
তখন মনে হলো,,আমি সত্যিই একা হয়ে গেছি…”
“নাভান মায়ের কথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে,,মাকে সে কষ্ট দিতে চায় না,,কিন্তু তার মা,বাবা এমন যে নরম কথায় কাজ হয় না তাই তো ইগোতে লাগে এমন কথা বলে সত্যি বের করেছে,,যে সত্যি সে এতো বছর খুজে চলেছিলো,,কিন্তু ফলাফল শুন্য, আজ মায়ের মুখ থেকে সব শুনে ক্লিয়ার,,এখন বাবাকে বুঝাতে পারলেই তাদের একটা সুখের সংসার হবে,,আর সে তার পরি বউ কে পাবে,,হেরার কথা মনে পরতে নাভান এর বুকে কেমন চিন চিন ব্যাথা করে,, মিসাই গার্ল এর মুখ থেকে এটোম বোম এর মতো কথা শুনতে পারছে না ২৪ ঘন্টা প্লাস হয়ে গেছে,,জোরে একটা শ্বাস ছাড়ে নাভান যা হসপিটালের চার দেয়ালে বারি খায়। একবুক কষ্টের নিশ্বাস, কাওকে মিস করার কথা জানান দিচ্ছে। নাভান মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে,, বলে।
“বাবা কে এবার মেনে নাও মা!
প্রতি উত্তরে কাজল খান বলে উঠে।
“জানো “এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী জিনিসটা হয়তো ভালোবাসা নয়…!! আমার মতে বিশ্বাস। ভালোবাসা জন্ম নিতে পারে এক মুহূর্তে !! কিন্তু বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লাগে !! অনেক সময়!! আর ভাঙতে?একটা ভুল সন্দেহই যথেষ্ট। অনেক সময় চোখ যা দেখে, তা-ও ভুল হয়।চোখ প্রতারণা করতে পারে, পরিস্থিতি ভুল ব্যাখ্যা দিতে পারে । কিন্তু হৃদয় যদি একবার বিশ্বাস হারায়, তাহলে সেই সম্পর্ক আর আগের মতো থাকে না কখনোই। ভালোবাসা টিকে থাকার জন্য দরকার।
বিশ্বাস, সম্মান, আর একে অপরকে বোঝার ধৈর্য।
“নাভান মায়ের পেটে মুখ গুজে দেয়,বয়স হবার পর নাভান মায়ের আচলের নিচে এসেছে বোধয় আজ ,কিন্তু অধীর সে সব সময় কাজল খান এর আচলের নিচে থাকে। নাভান মাথা নিচু করে ক্ষমা চাওয়ার মতো করে বলে।
” i am সরি মা,,আমি তোমায় ইচ্ছে করে হার্ট করি নি,বিলিভ মি, সত্তিটা জানার খুব দরকার!! আমার যে তোমায় আর বাবাকে একসাথে দেখতে ইচ্ছে করে!! প্লিজ সব ভুল বুঝাবুঝি ঠিক করে আমরা আবার সুখের একটা সংসার পাতবো!!
“কাজল খান আজ বুঝতে পেরেছে নাভান এসব তাদের মিলানোর জন্য করেছে,,তা না হলে যে ছেলে মায়ের নামে কেউ বাজে কথা বললে পিস্তল চালাতে দু বার ভাবে না সেই ছেলে আর যাই হোক তার দিকে আঙুল তুলবে না কাজল খান ছেলের মাথায় হাত বুলিতে বলে
“জানো শেহতাজ আমি হারিয়েছে শুধু একজন মানুষকে নয়, হারিয়েছে একটি সম্পর্কের সবচেয়ে শক্ত ভিত, বিশ্বাসকে। আর যেখানে বিশ্বাস নেই…সেখানে ভালোবাসা শুধু একটি স্মৃতি হয়ে থাকে। যা মাঝরাতে নিঃশব্দে কাঁদায়, কিন্তু কখনো আর ফিরে আসে না…।
“ঝিনুক নাভানের কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। তার চোখে মুখে দায়িত্ব স্পষ্ট – যেনো সব বুঝেও না বোঝার ভান করছে। পাশে দাঁড়িয়ে তুষার স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে ভীষণ সিরিয়াস মুখ করে কাজল খানকে পরীক্ষা করছিল… কিন্তু তার চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসিটা কিছুতেই চাপা থাকছিল না।
একটু পর হঠাৎই সে নাটকীয় ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল!
“কিউটি পাই! আমার মামনি একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন! রিপোর্ট বলে–একদম ঝকঝকে, নতুন মডেল!”
“কথা শেষ করে সে চোখ টিপে নাভানের দিকে তাকাল। মূলত এসব হটাৎ হার্ট এটাক করা রুগিদের,, বুঝতে দেয়া ঠিক না তাদের কনো সমস্যা,,জানলে এটা নিয়ে চিন্তায় থাকলে আরো সমস্যা হয়। নাভান শুনেছে,, তুষার তাকে জানিয়েছে,,কাজল খান ছোট খাটো হার্ট এটাক করেছে। তাই নাভান সব চিন্তা সাইডে রেখে মনোযোগ দেয় মায়ের পানে।
“সালা বাবু , তুমি এখন নিয়ে যেতে পারো তোমার মামনিকে। তবে সাবধানে, এত প্রেশিয়াস জিনিস কিন্তু রাস্তায় পড়ে গেলে আমি দায়ী না!”
নাভান হালকা হেসে কাজল খানের দিকে তাকালো, তারপর একটু ইতস্তত করে বলল-
“আজই যাবো?”
“কাজল খান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। তার সেই চিরচেনা দৃঢ়তা আবার যেন ফিরে আসছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা নরম ভাব এখনো রয়ে গেছে।
তুষার হঠাৎ নাটকীয়ভাবে বুক চাপড়ে বলে উঠল-
“তুমি যেতে না চাইলে যেও না! এই অধম ডাক্তার ছেলের কাছেই থেকে যাও!”
তারপর হঠাৎ করেই চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।
“তোমার ওই বিলাসবহুল বাড়ির মতো সব ফ্যাসিলিটি আমি এই হাসপাতালেই করে দিবো। আলাদা ভিআইপি রুম, গোলাপ ফুল, এসি, এমনকি চাইলে সকালে লাইভ রবীন্দ্রসঙ্গীতও বাজানো হবে!”
ঝিনুক হেসে ফেলল।
“ওরে বাবা! হাতুড়ে ডাক্তার হাসপাতাল চালান নাকি ফাইভ স্টার হোটেল?”
তুষার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল–
“না, আমি চালাই ‘হৃদয় হাসপাতাল অ্যান্ড রিসোর্ট’! এখানে রোগীরা আসে সুস্থ হতে… আর আমার ভালোবাসায় পড়ে যায়!”
ঝিনুক, তুষার,অধীর হেসে উঠে। যে হাসিতে নেই সুখ।
তুষার আবার শুরু করল–
“আর শোনো, এডভোকেট এম.এল.এ কাজল খান আমার হাসপাতালে ভর্তি, এটা যদি বাইরে ছড়িয়ে পড়ে… তাহলে কী হবে জানো?”
সে নিজের কথার উত্তেজনায় নিজেই হাত নেড়ে বলল।
“তোমার ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে এখানে আসবে! কেউ বলবে ‘ম্যাম কোথায়?’ কেউ বলবে ‘ম্যামকে একবার দেখবো!’… আর আমার হসপিটালের একটা এড হয়ে যাবে,,এখান কার চিকিৎসা ভালো, তোমার শিশ্যরা আসবে আমার হসপিটালে।
“আমি তখন টাকা গুনবো! শুধু টাকা আর টাকা!”
ঝিনুক মুচকি হেসে বলল–
“এইজন্যই হাতুড়ে ডাক্তার এতো যন্ত নিচ্ছে আমার মামনিকে,
তুষার ভান করে কষ্ট পেল—
“আহা! আমাকে এতটা নিচে নামালে ঝিনুকমালা? আমি কিন্তু একদম নিঃস্বার্থ!”
একটু থেমে আবার ফিসফিস করে বলল–
“তবে… একটু স্বার্থ থাকলে দোষ কী?”
অধীর মাথা নেড়ে হাসল। কতোক্ষন পর এই হাসিটা তার মুখে ফুটেছে—হালকা, নির্ভার। মায়ের অসুস্থতায় ছেলেটা একেবারে নরম হয়ে গেছে। মন ভালো থাকলে তুষার এর সাথে ভন্ডামি করতো কিন্তু রুশার জন্য মনটা ভিষন পুড়ছে,,ভালোবাসার মানুষ এর অনুপস্থিতিতে ভন্ড বাচাল ছেলেটাও চুপ হয়ে যায়।
কাজল খান সবার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এই ছেলেমেয়েগুলোর হাসি, ঠাট্টা, ভালোবাসা—সবকিছু তার বুকের ভেতরটা নরম করে দিল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন–
“তোমাদের সাথে থাকলে মনে হয়… জীবনটা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।”
তুষার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–
“শেষ হবে কেন? এখনো তো সিজন টু শুরুই হয়নি!” মামনি!!
ঝিনুক হেসে বলল–
“আর আমরা সবাই মিলে সেই সিজনের হিরো-হিরোইন হব ! কি বলো?
নাভান মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরল,,এতোক্ষনে কাজল খান রেডি হয়ে গিয়েছে যাওয়ার জন্য, ছেলের ভরসাময় হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন এক মন ভাঙা মা।
“চলো মা… এবার বাড়ি যাই।”
কাজল খান একবার চারপাশে তাকালেন। এই হাসি, এই উষ্ণতা, এই মানুষগুলো… তারপর ধীরে মাথা নাড়লেন।
“চলো…”
চলবে….?