
পূর্ণহীন পূর্ণতা
লেখিকা সুমি চৌধুরী
পর্ব ৯
রাফসান রাস্তার ধারে বাইক থামিয়ে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল আর একের পর এক সিগারেটে টান দিচ্ছিল। হঠাৎ সে যখন ধোঁয়া ছাড়ার জন্য মুখ খুলতে যাবে ঠিক তখনই তার নজর গেল সামনের রাস্তার দিকে। দেখল সারা সেই ছেলেটার বাইকের পেছনে বসে আছে আর বেশ সহজভাবেই ছেলেটার কাঁধে হাত দিয়ে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই রাফসানের মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা টুপ করে নিচে পড়ে গেল। মুহূর্তেই তার পুরো চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
রোহানও ঠিক সেই সময় সারাকে দেখে ফেলল। সে চট করে রাফসানের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। দেখল রাফসান কেমন যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। ওর চোখের মণি দুটো স্থির আর সারা শরীর রাগে রি রি করছে। ততক্ষণে সারাদের বাইকটা অনেক দূর চলে গেছে কিন্তু রাফসানের পলকহীন দৃষ্টি তখনো সেই শূন্য রাস্তার দিকেই নিবদ্ধ।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রোহান রাফসানের কাঁধে হাত দিয়ে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“কিরে শালা। তুই না বললি তুই জেলাস হস না। তাহলে এখন এত জেলাস হচ্ছিস কেন। আর শোন সারা যার সাথেই যাক না কেন সারা তোর জীবন থেকে চলে গেলেই তো তোর শান্তি তাই না?”
‘সারা চলে গেলেই তোর শান্তি’এই কথাটুকু রাফসানের বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে রাফসান নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুল টেনে ধরে পাগলের মতো করতে লাগল। সে কিছুতেই মাথায় নিতে পারছে না কেন সে সারাকে অন্য কারও পাশে একদমই সহ্য করতে পারছে না। কেন সারাকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে দেখলেই তার বুকের ভেতরটা এমন চিনচিন করে ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে।
সে কি তবে সারাকে ভালোবেসে ফেলল। না এটা অসম্ভব। কিন্তু নিজের ভেতরের এই অস্থিরতাকে সে কী নাম দেবে। রাফসান দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল।
“আই হেট হার। আই জাস্ট হেট হার। কিন্তু ওই ছেলেটার সাহস হয় কী করে আমার জিনিসে হাত দেওয়ার।”
রাফসান হুট করে এক ঝটকায় বাইকে উঠে বসল। ওর চোখের সেই বিধ্বংসী রূপ দেখে বন্ধুরা কেউ আর কথা বলার সাহস পেল না। সে বাইক স্টার্ট দিয়ে ঝড়ের বেগে ধুলো উড়িয়ে সারাদের বাইকের পিছু নিল।
আকাশ সোজা সারাদের বাসার সামনে এসে বাইক থামাল। সারা বাইক থেকে নেমে আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল।
“ধন্যবাদ ভাইয়া।”
আকাশ হাসিমুখে বলল। “আরে, ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই সারা। **ইটস মাই প্লেজার।”
সারা আর কথা না বাড়িয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে এল। তখন রায়ান চৌধুরী কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে বসেছিলেন। সারা তাকে দেখে বরাবরের মতোই নম্রভাবে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম আব্বু।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো মা। আর রাফসান কোথায়?”
সারা মাথা নিচু করে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল। “আব্বু, ভাইয়ার সাথে আসিনি। আমাকে কলেজের একটা বড় ভাই নামিয়ে দিয়ে গেল।”
রায়ান চৌধুরী ভুরু কুঁচকে তাকালেন। “কোন বড় ভাই?”
“তোমার কলেজেই পড়ে, আকাশ ভাইয়া।”
নামটা শুনে রায়ান চৌধুরী কিছুক্ষণ গভীর কিছু একটা ভাবলেন। আকাশের আকাশকে হয়তো তিনি চেনেন। তারপর গম্ভীর ভাব কাটিয়ে হেসে বললেন।
“আচ্ছা ঠিক আছে। তবে আজকে তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি।”
সারা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল। “কী আব্বু?”
“আগে চোখটা বন্ধ কর।”
সারা সাথে সাথে বাধ্য মেয়ের মতো চোখ বন্ধ করল। রায়ান চৌধুরী ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বের করে সারার ঠিক সামনে ধরলেন। তারপর আদুরে গলায় বললেন।
“এইটা তোর জন্য মা। এবার চোখ খোল।”
সারা চোখ খুলল। আর চোখ খুলতেই সামনের জিনিসটার দিকে তাকিয়ে ওর চোখ তো চড়কগাছ। রায়ান চৌধুরীর হাতে লেটেস্ট মডেলের একটা আইফোনের বাক্স। সারা প্রবল বিস্ময়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল।
“ফোন। কিন্তু আব্বু, ফোন তো আমার…”
বাকিটুকু বলার আগেই রায়ান চৌধুরী ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন।
“জানি কী বলবি। কিন্তু আমি নিজেই এটা নিয়ে এসেছি। দেখ সারা, আমাকে কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় দূরে চলে যেতে হয়। আবার রাফসানের সাথেও তোর সম্পর্ক এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক না। তাই আমি মনে করি এই অবস্থায় তোর কাছে একটা ফোন থাকা খুব জরুরি। যখন যা দরকার হবে আমাকে জানাবি।”
সারা আর কোনো আপত্তি করল না। সে খুব খুশি মনে ফোনটা হাতে নিল।
সারা নিজের রুমে এসে ফোনটা বিছানায় রেখে ব্যাগটা নামাল। এরপর স্কুল ইউনিফর্মের বেল্ট আর ক্রস বেল্ট আলগা করে কেবল গুছিয়ে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই রাফসান সজোরে লাথি মেরে সারার দরজায় আঘাত করল। সারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাফসান এক ঝটকায় ওর সামনে এসে ওকে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল। দেয়ালের সাথে পিঠের সজোরে ধাক্কায় সারা ব্যথায় ককিয়ে উঠল। রাফসান এক হাত দিয়ে সারার দুই গাল এমন জান্তব আক্রোশে টিপে ধরল যে সারার ঠোঁট দুটো বীভৎসভাবে উল্টে গেল। রাফসান ওর কানের কাছে মুখ এনে বিষাক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল।
“হাউ ডেয়ার ইউ! তোর সাহস দেখে তো আমার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে রে সারা। ভাতার ঘরে থাকতে থাকতেই তুই আরেক মাগির মতো অন্য লাঙের সাথে ফষ্টিনষ্টি করিস। লজ্জা-শরম কি ধুয়ে খেয়েছিস?”
রাফসানের হুটহাট আক্রমণ আর তার মুখে এমন নোংরা কথা শুনে সারার পিত্তি জ্বলে গেল। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েও কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল।
“কী বলছেন আপনি এসব আবুল-তাবুল। মুখ সামলে কথা বলুন।”
রাফসান এবার যেন আরও পাগল হয়ে গেল। সারার গালের ওপর ওর আঙুলের চাপ আরও বাড়ল। সে লাল চোখের বিষ ঝরিয়ে গর্জে উঠে বলল।
“আমি কী বলছি তুই জানিস না খানকি। আমি যখন বাইকে উঠতে বললাম তখন তো সতী সাজে ঢং চুদিয়ে উঠে গেলি না। অথচ ঠিকই তোর ওই নাগরটার বাইকে উঠে পাছা ঘষে ঘষে বাড়িতে আসলি। কেন রে। ওই চ্যাংড়া ছোকরা কি আমার চেয়েও বড় ভাতার তোর। ওর কাঁধে হাত রেখে খুব গরম লাগছিল শরীরে। তাই না?”
রাফসানের মুখ থেকে এমন অসভ্য আর জঘন্য অপবাদ শুনে সারার চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। অপমানে আর ঘেন্নায় ওর পুরো শরীর রি রি করে কাঁপছে। রাফসান তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ওর মাথায় শুধু ঘুরছে আকাশ কীভাবে সারার গায়ের ওপর ঢলে পড়েছিল আর সারা কীভাবে ওকে ধরে বাইকে বসে ছিল। সে সারাকে দেয়ালের সাথে আরও জোরে পিষে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“জবাব দিচ্ছিস না কেন রে কুত্তার বাচ্চা। ওই ছোকরাকে কি খুব পছন্দ হয়েছে তোর। কতটুকু গভীরে গেছে তোদের সম্পর্ক যে মা মাঝরাস্তায় আমাকে বাদ দিয়ে তার লাঙের ওপর চড়লি? তোর মতো নোংরা মেয়েকে তো বাজারে নামিয়ে দেওয়া উচিত। অবশ্য তোর মতো এসব রাস্তার মেয়ে এসব নোংরামি করবেই৷”
রাফসানের মুখ থেকে ওই বীভৎস অপবাদ শোনা মাত্র সারার মনে হলো কেউ ওর কলিজায় বিষাক্ত কোনো তপ্ত শলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে। ওর নিজের নারীত্বের ওপর এমন কদর্য আঘাত সে আর সইতে পারল না। অপমানে আর চরম ঘৃণায় সারার ভেতরটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে সে শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে রাফসানকে সজোরে এক ধাক্কা মারল।
হঠাৎ এমন পাল্টা আক্রমণে রাফসান অপ্রস্তুত ছিল। সে টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে দু-পা পিছিয়ে গেল। রাফসান নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারা বাঘিনীর মতো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে হাত উঁচিয়ে রাফসানের গালে কষিয়ে মারল সজোরে এক থাপ্পড়।
“ঠাসসস!”
রাফসান মুহূর্তে থমকে গেল সারার থাপ্পড়ে। সারা যে তার গায়ে হাত তোলার মতো সাহস দেখাবে, এটা রাফসান কল্পনাও করতে পারেনি। থাপ্পড়ের চোটে ওর গালটা যেমন জ্বলছে, তার চেয়ে বেশি জ্বলছে ওর অহংকার। সারা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নোনা ধরা চোখে রাফসানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চিৎকার করে বলল।
“অনেক বলেছেন আপনি। ছোটবেলা থেকে আপনি আমাকে যেভাবে ইচ্ছে অপমান করেছেন, মারধর করেছেন।আমি কোনোদিন প্রতিবাদ করিনি। সব মুখ বুজে সহ্য করেছি। কিন্তু আজ আপনি আমার নারীত্ব নিয়ে কথা বলছেন। আমি আগে ভাবতাম আপনি শুধু একজন রাগী মানুষ বা হিটলার। কিন্তু না, আজ বুঝলাম আপনি তার চেয়েও বেশি নিচ। আপনি একটা নিচ মানসিকতার কা পুরুষ।”
সারার প্রতিটি শব্দ রাফসানের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। রাফসান রাগে একদম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ওর ভেতরের জানোয়ারটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সেও সজোরে সারার গায়ে হাত তুলতে গেল। হাতটা যখন একদম সারার গালের কাছে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল সারার মুখের দিকে। দেখল সারার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। অপমানে আর কষ্টে মেয়েটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
সারার সেই টলটলে চোখের পানি দেখামাত্র রাফসানের কলিজা যেন এক নিমেষে মোচড় দিয়ে উঠল। ওর হাতটা মাঝপথেই জমে গেল। কেন জানি না, ওই চোখের পানি দেখার পর ওর হাত আর সামনের দিকে এগোল না। রাফসান নিজের মুঠো করা হাতটা নামিয়ে নিল। ওর বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে অদ্ভুত এক যন্ত্রণায়। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে সেখান থেকে বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সারা মেঝেতে বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। অন্যদিকে রাফসান সোজা নিজের রুমে ঢুকে সজোরে দরজা আটকে দিল। সে নিজের বিছানায় বসে মাথায় দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল। ওর মনে হতে লাগল, সারা ওকে থাপ্পড় মেরে যতটা কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট ওকে সারার ওই চোখের পানি দিচ্ছে।
রাফসান নিজের ঘরে ঢুকেই পৈশাচিক উন্মাদনায় ফেটে পড়ল। সে এক ঝটকায় পড়ার টেবিলের ওপর থাকা ল্যাপটপ, বই-খাতা আর পানির গ্লাসটা মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, ঠিক যেমন রাফসানের মনের শান্তিটা আজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সে পাগলের মতো ঘরের আসবাবপত্র ভাঙতে লাগল। দেওয়ালের দামি শোপিসটা টান দিয়ে ছিঁড়ে মেঝেতে ফেলে বুট দিয়ে পিষে ফেলল।
ভাঙচুর করতে করতে সে অমানুষিক গলায় চিৎকার করে বলতে লাগল।
“কেন? কেন আমি এমন পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি? ওই সামান্য মেয়েটাকে অন্য কারও সাথে দেখে আমার ভেতরটা কেন এভাবে জ্বলছে?”
সে ড্রয়ার থেকে একটা কাঁচের বোতল বের করে দেওয়ালে সজোরে ছুড়ে মারল। কাঁচের টুকরো ছিটকে এসে ওর কপালে লেগে কেটে গেল, কিন্তু সেদিকে ওর কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে আর ও উন্মত্তের মতো হাসছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল।
“সারা কে হয় আমার? ও তো জাস্ট একটা পথের কুড়ানি, একটা রাস্তার মেয়ে! আমার আব্বুর দয়ায় এ বাড়িতে জায়গা পেয়েছে। এই সামান্য রাস্তার মেয়ের জন্য আজ এই রাফসান চৌধুরীর কলিজা পুড়ছে? হাহ্!”
রাফসান আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের রক্তাক্ত কপাল আর লাল টকটকে চোখ দুটো দেখে ও নিজের প্রতিচ্ছবিকেই ঘৃণা করতে লাগল। ও আবার চিৎকার করে পাগল হয়ে বলতে লাগল।
“না! এটা হতে পারে না। আমি ওকে ভালোবাসি না। আমি শুধু ওকে ঘৃণা করি। কিন্তু ওই জানোয়ারের বাচ্চাটা ওকে টাচ করল কীভাবে? কেন সারা ওর কাঁধে হাত রাখল? কেন ও আমার বাইকে উঠল না? কেন এই দহন টা আমাকে পুড়াচ্ছে৷”
রাগে আর যন্ত্রণায় রাফসান সজোরে নিজের হাত দিয়ে আয়নায় ঘুসি মারল। মুহূর্তেই আয়নাটা মাকড়সার জালের মতো ফেটে গেল আর রাফসানের হাত থেকে তাজা রক্ত ঝরতে শুরু করল। সে মেঝেতে বসে পড়ে নিজের রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মনে হচ্ছে এই রক্তক্ষরণের চেয়েও বেশি রক্তক্ষরণ ওর ভেতরে হচ্ছে, যা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর রাফসানের মাথায় হঠাৎ তার কলারশিপের কথা মনে পড়ল। মাস দুয়েক আগেই সে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য একটা বড় কলারশিপ পেয়েছিল। কিন্তু দেশ, বন্ধু-বান্ধব আর আয়েশি জীবন ছেড়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না বলে সে সেটা একরকম ধামাচাপাই দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আজ এই মুহূর্তের তীব্র দহন থেকে বাঁচতে তার মাথায় দেশ ছাড়ার চিন্তাটা বিদ্যুতের মতো খেলে গেল।
রাফসান পাগলের মতো পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“না, না! আমি এই আগুনে আর পুড়তে পারব না। ওই কালনাগিনী নিশ্চয়ই আমাকে কোনো মন্ত্র দিয়ে বশ করে তার মুঠোয় নিতে চাইছে! নাহলে কেন আমি তাকে অন্য কারও পাশে দেখলে সহ্য করতে পারছি না? কেন আমার কলিজা এভাবে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে?”
সে নিজের রক্তাক্ত হাতের তালু দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। ওর মনে হচ্ছে সারা ওর জন্য একটা মরণফাঁদ। সে আরও উন্মত্তের মতো বলতে লাগল।
“পারব না আমি! আমাকে যেভাবেই হোক ওই কালনাগিনীর মায়া থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল। আমাকে এই দেশ ছাড়তেই হবে।”
রাফসান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে আলমারি খুলে তার বড় ট্রাভেল ব্যাগটা হিড়হিড় করে টেনে বের করল। ওর হাত দিয়ে তখনো টপটপ করে রক্ত ঝরছে, সেই রক্তমাখা হাত দিয়েই সে আলমারি থেকে জামাকাপড় টেনে বের করতে লাগল। দামী শার্ট, প্যান্ট সব রক্তে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রাফসানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে হিংস্রভাবে সব কাপড় ব্যাগে ঢোকাতে লাগল।
ওর মাথায় তখন একটাই জেদ কাল ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সে এই বাড়ি এবং এই শহর থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে। সারার ওই মায়াবী চোখের জল আর তার নারীত্বের অহংকার যেন রাফসানকে আর ছুঁতে না পারে। সে ব্যাগ প্যাক করতে করতে মনে মনে বলল, “সারা, তুই জিতলি। তোর মায়া থেকে বাঁচতে আজ আমাকে পালানো লাগছে। কিন্তু মনে রাখিস, রাফসান চৌধুরী তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না।”
রাত ঠিক একটা। চারপাশ নিঝুম, নিস্তব্ধ। রাফসান নিজের বিশাল ট্রাভেল ব্যাগটা হাতে নিয়ে চোরের মতো নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বের হলো। গেট দিয়ে বের হওয়ার পর সে শেষবারের মতো একবার ঘুরে বাড়িটার দিকে তাকাল। অন্ধকার রাতে বাড়িটাকে আজ কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল এই বাড়িতে কাটানো ছোটবেলার সব মুহূর্ত মায়ের আঁচল ধরে ঘোরে ফেরা, বাবার সাথে বাগানে দৌড়াদৌড়ি। নিজের অজান্তেই রাফসানের দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।সে হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে ধরা গলায় বিড়বিড় করে বলল।
“বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। এই প্রথম তোমার ছেলে তোমাকে না বলে এত বড় একটা কাজ করছে। জানি না আর কবে দেখা হবে, তবে খুব শীঘ্রই ফিরে আসব। নিজের খেয়াল রেখো আর পারলে তোমার এই অবাধ্য ছেলেটাকে মাফ করে দিও।”
বলেই রাফসান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে তার বাইকটা স্টার্ট দিয়ে ঝড়ের গতিতে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার চলে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন এই বাড়ির একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
চলবে…!
পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-১০