
প্রেয়সীর অনুরাগ
লেখনিতে —সাদিয়াজাহান সিমি
পর্ব-২১ ( দ্বিতীয় অংশ)
“বিয়ে করব আমি। কিছু জানিনা। বউ এনে দে।”
উদ্যান বিরক্ত হলো রোহানের কান্ডে।সে কখন থেকে জ্বালিয়ে কলিজা ভুনা খিচুড়ি করে ফেললো।
“আমি বউ নিয়ে বসে আছি স্টুপিড?যা ভাগ এখান থেকে।”
রোহান সোটান হয়ে হাত পা মেলে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আফসোস করে বলল, “আজ একটা বউ নেই বলে তুই আমাকে অপমান করলি?আমারে বিয়া করাই না ক্যা!”
এিশে দিছি পা আর কবে
বিয়া করবাম
লেইট করলে হবে দেরি
কবে ইস্কুল করবাম
ঘুম আসে না ভালো
লাগেনা ব্যাকাইদা বেরাম
আমায় বিয়া দাও বিয়া দাও
বিয়া দাও বাজান
আমায় বিয়া দাও বিয়া দাও
বিয়া দাও বাজান
“বিয়ে করে তুই কি করবি? কাজ কি তোর?”
রোহান হামাগুড়ি দিয়ে উঠে বসল। উদ্যানের দৃষ্টি ল্যাপটপের পানের নিবদ্ধ।কোলের উপর ল্যাপটপ রেখে কাজ করছে। শরীরে কালো ট্রাউজার এবং অনাবৃত শরীর। চুল গুলো ভেজা। সন্ধ্যার পর ছাদ থেকে নেমে কতক্ষন পায়চারি করেছিল।নিজেকে ঠান্ডা করতেই চট করে শাওয়ার ছেড়ে বেরোয়।
রোহান চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“কাজ কি মানে? তোর কাজ কি আগে তা শুনি।আগে তুই বলবি। তারপর নাহয় আমি বললাম। সবসময় তুই আমাকে মাসুম বাচ্চা পেয়ে পেট থেকে কথা বের করে আনিস।এখন আর সেটি হচ্ছে না।আগে তুই বল।”
উদ্যানের দৃষ্টি সরিয়ে সরিয়ে আনল ল্যাপটপ হতে। ব্যস্ত হাতের টাইপিং থেমে গেছে।জিভ দিয়ে গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করে। পুনরায় ব্যস্ত আঙ্গুল গুলো কীবোর্ডে চালাতে চালাতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
“ফিজিক্যাল এক্সারসাইজের জন্য।এতে শরীর আর মন দুটোই ফুলফিল থাকে।”
রোহান ততক্ষণাৎ চোখজোড়া বড় বড় করে তাকালো। যেন এক্ষুনি বেরিয়ে আসতে চাইছে।ডান হাত দিয়ে বুকের বা পাশে হাত রেখে চেপে ধরে বলে উঠলো,
“ইয়া আল্লাহ! তুলে নাও এসব ঝামেলা।কি শুনলাম আমি? কানে তুলো দেয়নি কেন! কি পাপ করেছিলাম! এই গম্ভীর ওয়ালা ছেলের মুখ থেকে এমন কথা শুনতে হলো।ইয়া আল্লাহ ,তওবা তওবা।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বেয়াদব আজকে কাজ করতে দিবে না বলে পণ করেছে।সেই কখন বসেছে।একটু যদি শান্তিতে কাজ করতে পারতো। উদ্যান একেতো আজকে ভীষণ বাজে ভাবে বিরক্ত।রাফসার কথা গুলো মাথায় ঘুরছে।ওই পুচকি আজ কতগুলো কথা শুনিয়ে দিল। উদ্যানের লালিত চোখ জোড়া দেখে রোহান আঁতকে উঠে।
তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“কি হলো তোর? চোখে কি মরিচের গুঁড়ার বোয়াম ঢেলেছিস? এতো লাল কেন তোর চোখ!”
উদ্যান দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আই সোয়ার তুই আমার রুম থেকে না বেরোলে কি যে করব নিজেই জানি না।”
রোহান ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে আফসোসের স্বরে বলল,
“আমাকে তোরা এক আনা পরিমাণ দাম দিস না। কেন? আমি কি জানতে পারি? ও বুঝেছি আর বলা লাগবে না। আমার বউ নেই তাই অপমান করিস! সমস্যা নেই।সময় একদিন আমার ও আসবে দেখিস।আর তোর আগে বাপ হয়েও দেখাবো।মনে রাখিস।”
উদ্যান ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
“ওকে মনে রাখলাম।এখন তুই যাবি নাকি ধাক্কা মেরে বের করব?”
রোহান উঠে দাঁড়ালো।ঘর থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,
“তোর অবস্থা এর চেয়েও বেশি করুন হোক আমিন।”
“ভাই ভাবী কে তুলে নিয়ে আসি?”
আভিয়ান চট করে তাকালো রনির পানে।রনি আভিয়ানের দৃষ্টিতে থতমত খায়।বেচারা বুঝতেই পারেনি কি এমন কথা বলেছে।
“এ কথা কেন হঠাৎ? আজ কি নেশা বেশি করেছিস?”
রনি আমতা আমতা করে বলে,
“ভাই আজ নেশা করিনি। শুধু উল্টো ভাবেন।”
আভিয়ান ভাবলেশহীন ভাবে বলে উঠলো
“হয়তো।”
“ভাই আপনার কি হয়েছে? মন খারাপ? কেমন উদাসীন দেখাচ্ছে।কি হয়েছে?”
আভিয়ান হেলান দিয়ে বসে।শরীর টা এলিয়ে দিল সোফায়।হাতে দুই আঙ্গুলের ফাকে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরা।তাতে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল। কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যায় ধোঁয়া।
কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে উঠলো,
“তেমন কিছু না।কাল একবার কোচিংয়ে যাবো। অনেক দিন হয় ওকে দেখি না।”
“আপনি চিন্তা করবেন না ভাই।ভাবী বাড়ি ফিরে এসেছে।”
আভিয়ান শুনল রনির কথা।সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মত একটা টান দিল তাতে। তারপর পায়ের নিচে পিষ্ট করে।
আবেগহীন কন্ঠে বলল,
“ওকে।কাল কোচিং আছে কিনা খবর নে।আর টাইমটা অবশ্যই জেনে নিবি।”
“জ্বী ভাই। আমি একঘন্টার মধ্যে খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি।”
:
:
:
সবাই একসাথে রাতের খাবার খেতে বসেছে।আজ বাড়ির কর্তারা বাড়িতে উপস্থিত আছেন।ওনাদের এতো একটা দেখা যায় না বাড়িতে। টেবিলে সবাই থাকলেও রাফসা অনুপস্থিত।বোনকে দেখতে না পেয়ে রিশান পুরো ডাইনিং চোখ বুলায় সাথে ড্রয়িং রুমেও। তবুও রাফসার দেখা মেলেনি।রিলান বসতে গিয়েও বসলো না।আজ অনেক দিন পর বাড়ি ফিরেছে। এতো দিন বাইরে ছিল।আজই দেশে ফিরে।এসেছে সেই সন্ধ্যায়। ফ্রেশ হয়ে ঘুম দিয়ে নিজেকে চাঙ্গা করেছে।এসেছে পর থেকেই বোনের সাথে দেখা করতে সময় হয়ে উঠেনি ওর।বসতে গিয়েও আর বসলো না। উল্টো ঘুরে পা বাড়ায় উপরে।
দরজার চাপানোই ছিল। সহজেই ঢুকতে পেরেছে রিশান।তবে রুম অন্ধকারে ডুবে আছে। ব্যালকনিতে লাইট জ্বালিয়ে রাখা। জানালার গ্ৰিলের ফাঁক গলে মৃদু অস্পষ্ট আলো ঘরে প্রবেশ করছে। নিস্তব্ধতার মাঝেই বড় বড় নিশ্বাসের আওয়াজ শুনে ভ্রু কুঁচকালো রিশান।জলদি করে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দেখলো বেডে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে রাফসা।রিশান বড় বড় পা ফেলে বেডে গিয়ে বসে।
রাফসার গালে হাতে দিয়ে নরম গলায় ডাকে,
“বোন উঠ।ভাইয়া এসেছি দেখ। চোখ মেলে তাকা।”
সন্ধ্যার থেকে পড়ে ঘুমিয়েছে রাফসা।পড়তে বসা হয়নি আজ। মাথা ভার হয়ে ছিল। কান্নার ফলে চোখমুখ ফুলে উঠেছে। লম্বা চুলগুলো ছড়ানো। বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।ভাইয়ের ডাকে পিটপিট করে চোখ মেলে রাফসা। ঘুম একেবারে হালকা ওর।
রিশান আবার ডাকে,
“উঠ ডিনার করবি না?”
রাফসা উঠে বসলো।চোখে ঘুম এখনো।চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। রিশান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হল।
থমথমে গলায় বলল,
“কেদেছিস কেন?”
রাফসা জড়সড় হয়ে বসে খানিক।ঘুম উড়ে গেছে চোখ থেকে।
জড়ানো কন্ঠে শুধায়,
“কাদবো কেন! কাঁদিনি যোগ।ঘুযানোর ফলে এমন দেখাচ্ছে হয়তো। তুমি কখন এসেছো?”
রিশান বুঝলো রাফসা কথা ঘুরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু চোখ ফাঁকি দিতে পারবে এই মেয়ে।
“পুচকি মেয়ে আমাকে তোর বোকা মনে হয়? কেন কেঁদেছিস! কেউ বকেছে?”
রাফসা ততক্ষণাৎ বলে উঠলো,
”না কে বকবে?”
রিশান হঠাৎ করেই বললো,
“উদ্যান ভাই বকেছে? কি বলেছে ? ভাইয়াকে বল।ধরে বেঁধে রাখবো আমার বোনকে কিছু বললে।”
রাফসা আঁতকে উঠল। হঠাৎ ভাইয়ের মুখে উদ্যানের নাম শুনে।ভাই কি কিছু জানে?
জড়তা নিয়ে বলল,
“তুমি হঠাৎ এ কথা বলছো কেন ভাইয়া?”
“উদ্যান ভাই ছাড়া তোকে আর কেই বা বকে? আরেকদিন কিছু বললে আমায় বলবি। আমি উদ্যান ভাইয়ের বোনকে বকে দিব।তাহলে সমান সমান হবে।”
রাফসা হেসে ফেলল ভাইয়ের কথায়।