
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজ ও রুশা
পাঠ-২০
ফারুখ, আমি মেয়েটার কাছে যাবো। আর পারছি না মেয়েটাকে না দেখে থাকতে।
“ওকে, যা। কিছুদিন পর নাহয় আমিও যাবো। তুই গিয়ে ঘুরে আয়।”
“হ্যাঁ, সব রেডি করে দে। আমি যাবো।”
এডভোকেট কাজল খান নিজের অফিসে বসে ফাইল দেখছিল। কোর্টের কাজ শেষ করে একটু শান্তিতে বসবে—এই আশা করেছিল। কিন্তু তার কপালে শান্তি খুব কমই জোটে।
হঠাৎ দরজা না নক করেই কেউ ঢুকে পড়ে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
“আমি এসে গেছি, সুন্দরী।”
কাজল খান মাথা তুলে তাকাতেই দেখে মন্ত্রী শামসুল দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই কাজল খানের কপাল কুঁচকে যায়।
ঠান্ডা গলায় বলে—
“তোকে কি ইনভাইটেশন কার্ড পাঠিয়েছিলাম আমি?”
শামসুল হেসে সামনে থাকা চেয়ারে আরাম করে বসে পড়ে।
“তোমার কাছে আসতে আবার ইনভাইটেশন লাগে নাকি? আমি তো রেগুলার ভিজিটর।”
কাজল খান বিরক্ত হয়ে বলে—
“আপনি একজন মন্ত্রী মানুষ। কাজকাম নাই? রোজ রোজ আমার অফিসে এসে বসেন কেন?”
শামসুল গম্ভীর মুখ করে বলে—
“দেশের কাজ করি… আর তোমার কাজ দেখি।”
কাজল ভ্রু কুঁচকে বললো।
“আমার কাজ দেখার দরকার নাই। আমি নিজেই পারি।”
শামসুল মুচকি হেসে ঝুঁকে বলে।
“জানি তো। তুমি শক্ত মেয়ে বলেই তো ভালো লাগে।”
কাজল খান চোখ ঘুরিয়ে বলে।
“এইসব ডায়লগ অন্য কোথাও দেন। আমি কোর্টে এসব শুনতে অভ্যস্ত এখানে না ।”
শামসুল নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“আহা! আমি তো অনেক আগেই বলছি, আমি তোমারে পছন্দ করি।”
কাজল খান সঙ্গে সঙ্গে বলে।
“আর আমি অনেক আগেই বলছি, এই কথা আরেকবার বললে কোর্টে মানহানির মামলা দিব”।
শামসুল হেসে বলে।
“মামলা দিলে তো আরো ভালো। কোর্টে রোজ দেখা হবে।” কাজল রেখা।
“স্টপ! অনলি এডভোকেট, এমএলএ কাজল খান। নো কাজল রেখা। এই ডাক শুধু একজনের জন্য বরাদ্দকৃত। এই নামে ফারদার ডাকলে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
“আবার তুই! তোমার আমার বয়স হয়েছে, এখনো এমন ব্যবহার মানায় না।”
“তোর কপাল ভালো আমি চুপ আছি।”
“কপাল খারাপ হলে কী করতে?”
“তোর মরার চল্লিশা খাওয়ার প্রস্তুতি নিতাম। আর এক কাজ কর, এমনিতেও মনে হচ্ছে তোর মরার সময় ঘনিয়ে আসছে। তুই বরং এক কাজ কর, মরার চল্লিশাটা আগে খাইয়ে দিস। সাওয়াব পাবি বহুত।”
“উফফ সুন্দরী! চল্লিশা তো খাবে না, বিয়ের দাওয়াত খেতে পারো। ছেলে আর আমি একসাথে বিয়ের পিরিতে বিয়ে করবো ভাবছি। ছেলেটা খালি একটা মেয়ের দিকে মন দিলেই হলো, আমার মতো। তাহলে বাপ–ছেলে একসাথে বিয়ে করে রেকর্ড করবো। ব্যাপারটা কেমন বলো তো?”
“এই মাঝ বয়সে এসেও তোর বিয়ের সখ মিটে নি, দুই বিয়ে করার পরও?”
“বিয়ে তো দুইটা করেছি। এখন তোমাকে দুইবার বিয়ে করে ফরজ কাজ চারটা সেরে ফেলবো। ইসলামে জায়েজ আছে, চার বিয়ে।”
“সারাজীবনে মসজিদের বারান্দায় ঢুকেছিস কিনা সন্দেহ, আর চার বিয়ের হাদিস । ইসলামের কথা বলছিস! চার বিয়ের ফরজ তোকে জান্নাতে নেবে না। জীবনে যে পাপ করেছিস তার জন্য শাস্তি ইহকালেও পাবি, পরকালেও।”
বান্দরবন থেকে ফিরে আসার পর অনেক দিন কেটে গেছে। সেই পাহাড়ি স্মৃতি যেন ধীরে ধীরে মনের কোণে মলিন হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু অনুভূতি আছে , যেগুলো যত সময় যায় ততই গভীর হয়।
ভার্সিটির দিনগুলো আবার আগের মতোই চলতে শুরু করেছে। ক্যান্টিনে আজও জমজমাট আড্ডা বসেছে। রোজ, রুশা, ঝিনুক, সৃজন, অধীর আর হেরা—সবাই মিলে গল্পে মশগুল। হাসি–ঠাট্টায় পুরো ক্যান্টিন যেন মুখর হয়ে উঠেছে।
অধীর মাঝে মাঝেই হেরাকে মজা করে “কিউটি পাই” বলে ডাকে। আর সৃজন তো হেরাকে নিজের ছোট বোন বানিয়েই ফেলেছে। তাই তার যত্নটাও নেয় ভাইয়ের মতো করেই।
ঝিনুকেরও জীবন এখন নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই তার বিয়ে তুষারের সঙ্গে। এই নিয়ে বন্ধুমহলে চলছে মজা, খুনসুটি আর ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা।
ঝিনুক আগের মতোই সবাইকে প্রটেক্ট করে বড় বোনের মতো। পাহাড়ের ঘটনা শুনে সে কী কান্না! তুষারকে জড়িয়ে ধরে। তুষার শুধু তাকিয়েছিল তার ঝিনুকমালার দিকে। মেয়েটা সম্পর্কের মানে খুব ভালো বুঝে।
সব মিলিয়ে সবার দিন যেন খুব সুন্দর করেই কাটছে।
কিন্তু এই সুখের ভিড়েও দুজন মানুষের মন যেন অদ্ভুত এক অশান্তিতে ভরা—হেরা আর নাভান।
দুজনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে এখনো।
এদিকে তিতির ও নেন্সির মনে আগের সেই হিংসা এখনও জ্বলজ্বল করছে। তারা সুযোগ পেলেই হেরাকে অপমান করতে চায়, হেয় করতে চায়। কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হয় নিলয়ের জন্য।
আজও তিতির ক্যান্টিনে ঢুকল, মুখে সেই চিরচেনা অহংকারের ছাপ।
হেরা তখন বন্ধুদের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত। সে খেয়ালই করেনি তিতির তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ ধাক্কা! দুজনের গায়ে গিয়ে ধাক্কা লাগল।
তিতির ভারসাম্য হারিয়ে সোজা মেঝেতে পড়ে গেল। পড়ার সময় তার মাথা মেঝেতে আঘাত পেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
তারপর তিতির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে-মুখে আগুন জ্বলছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে এগিয়ে এসে—
ঠাস!!
একটা জোরালো থাপ্পড় বসিয়ে দিল হেরার গালে।
হেরা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে বিস্ময়, অপমান আর রাগ একসাথে জ্বলে উঠল। চারপাশের সবাই হতভম্ব।
হেরার ভেতরেও আগুন জ্বলে উঠল। সে রাগে হাত তুলল তিতিরকে থাপ্পড় মারার জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত এসে তার কব্জি শক্ত করে ধরে ফেলল।
হেরা ঘুরে তাকাতেই দেখল।
নাভান। তার চোখে আজ অদ্ভুত রকমের কঠোরতা।
নাভান দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“তোমার মতো অসভ্য মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। তিতিরের গায়ে হাত তোলার সাহস তুমি কোথায় পাও?”
তার গলায় তীব্র ঘৃণা মেশানো কড়া স্বর। থেমে আবার বলে।
“আসলে তুমি একটা অসভ্য মেয়ে। সবার সঙ্গে বেয়াদবি করতেই তোমার ভালো লাগে।”
এই কথাগুলো যেন ছুরির মতো বিঁধল হেরার বুকে। হেরা ধীরে ধীরে নাভানের দিকে তাকাল। চোখে জমে উঠেছে অপমানের আগুন।
রাগে কাঁপা গলায় বলল।
“হাত ছাড়ুন!”
কিন্তু নাভান আজ যেন আরও ক্ষিপ্ত। সে হাত আরও শক্ত করে ধরে বলল—
“না ছাড়লে কি করবে?”
হেরা এবার চোখে চোখ রেখে সোজা জবাব দিল।
“যে থাপ্পড়টা তার গালে পড়েনি… সেটা আপনার গালে পড়বে।”
ক্যান্টিনে উপস্থিত সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। নাভানের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
“সাহস অনেক বেড়ে গেছে, মিস হেরা। সিনিয়রকে সম্মান করতে জানেন না দেখি?”
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।তারপর—ঠাস!
পুরো ক্যান্টিনে যেন শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
হেরা সত্যিই একটা দাবাং মার্কা চড় বসিয়ে দিল নাভানের গালে। নাভান মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়। হেরা তেজি গলায় বলল—
“সাহস এটাকেই বলে, মি. শেহতাজ খান নাভান।”
চারপাশে নিস্তব্ধতা। হেরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“আমি অসভ্য, তাই না?”
তার কণ্ঠে এবার তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ।
“তাই অসভ্যতার মতো কাজটাই করলাম।”
হেরা এক পা এগিয়ে এল নাভানের বরাবর। তেজি গলায় বলল—
“জানেন তো, আমি এমন মানুষ… আমি যা করি না, বা আমি যে টাইপের না—কেউ যদি আমাকে সেটা বলে…”
হেরা চোখে চোখ রেখে কথাটা শেষ করল—
“তাহলে তার সামনে ঠিক সেই কাজটাই করে দেখাই। যেন তার বলা কথাটা মিথ্যা না হয়।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল—
“এটাই মেহরিমা ইসলাম হেরার ক্যারেক্টার।”
নাভান রক্তচক্ষু চোখে হেরার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে—রাগ, অভিমান আর অজানা এক কষ্টের আগুন। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে আশেপাশের সবাই থমকে যায়।
তিতির রাগে ফুসফুস করছিল। সে যেন আর নিজেকে সামলাতে পারছিল না। ঠোঁট কাঁপছিল, চোখে রাগের ঝিলিক। কিছু একটা বলার জন্য সে মুখ খুলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নাভান হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়।
এক মুহূর্তও আর দাঁড়ায় না সে। লম্বা পা ফেলে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়।
“দোস্ত, নাভান শোন!”
ঝিনুক পিছন থেকে ডাকে, কিন্তু নাভান হনহনিয়ে চলে যায়।
তিতিরের রাগ হচ্ছে, আবার খুব খুশি লাগছে। একদিকে নাভান তার গায়ে হাত তুলতে দেয়নি—নিজে আঘাত নিয়েছে। অন্যদিকে তার ভালোবাসাকে আঘাত করার জন্য হেরাকে শাস্তি দিতে ইচ্ছে করছে।
থাপ্পড়, কথা বলা, চলে যাওয়া—ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যে সবাই কয়েক সেকেন্ডে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
নাভান চলে যাওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড পর হেরাও ধীরে ধীরে পা বাড়ায় । তার চোখে যেন চাপা কষ্টের ছাপ। সে কারও দিকে না তাকিয়ে চুপচাপ সেখান থেকে প্রস্থান করে। রুশা আর রোজ পিছু নিতে চায়, কিন্তু ঝিনুক বাধা দেয়।
“একটু একা থাক।”
চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে।
রোজ, রুশা, ঝিনুক, সৃজন—সবাই মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না এই দৃশ্যটা।
তিতিরের অবস্থা তখন একেবারে উল্টো।
সে রাগে ফুঁসছে। বুকটা যেন রাগে ধড়ফড় করছে।
“সব ওই হেরার জন্য।”
মনে মনে দাঁত চেপে বলে তিতির।
তার চোখে তখন স্পষ্ট হিংসা আর ক্ষোভ। সে নেন্সির কাছে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়।
পুরনো আমগাছটার নিচে একটা বেঞ্চ আছে। সেখানে বসে আছে হেরা।
তার মাথা নিচু। চোখে জল জমেছে, কিন্তু সে কাঁদছে না।
শুধু বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
সে বুঝতেই পারে না—নাভান কেন তার দিকে এমন রাগী চোখে তাকাল! তার কি এতই ভুল ছিল?
নাকি নাভান সত্যিই তাকে ঘৃণা করে? আচ্ছা সে কেনো নাভান এর এর থেকে ভালো কিছু আশা করছে? বউ বলে না না কি ভাবছে হেরা। মুহূর্তে হেরার প্রিয়র কথা মনে পড়ে।
“শোন কলিজা, তুই তোর লক্ষ থেকে সরবি না। যেভাবে হোক নিজের সম্মান রক্ষা করবি। দরকার পড়লে ওই অহংকারী লোকটার উপর দোষ চাপাবি, যেভাবেই হোক। দুর্বল হবি না। এই ছেলেটা এমন—সবাই তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। তার অহংকার ধুলায় মিশিয়ে দিবি।”
এই ভাবনাগুলোই বারবার তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।
হালকা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সেই বাতাসও যেন তার মনটা হালকা করতে পারছে না।
অন্যদিকে…
ক্যাম্পাসের শিল্পকলা ভবনের একটি নির্জন কক্ষে বসে আছে নাভান। ঘরটা অল্প আলোয় ভরা। দেয়ালে ঝুলছে কিছু ছবি, কিছু বাদ্যযন্ত্র।
নাভান চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে গিটার হাতে নিয়েছে। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তার ছুঁয়ে যাচ্ছে।
টং… টং…
একটা মৃদু, বিষণ্ন সুর ভেসে উঠছে। সেই সুরে যেন তার বুকের ভেতরের সব না-বলা কথাগুলো লুকিয়ে আছে।
নাভানের চোখ বন্ধ। তার মনে বারবার ভেসে উঠছে হেরার মুখ।
তার সেই নীরব দৃষ্টি… সেই কষ্টভরা চোখ।
নাভান হঠাৎ গিটার বাজানো থামিয়ে দেয়।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।
সে ফিসফিস করে বলে—
“কেন তুমি এমন করে আমার সামনে আসো, মিসাইল গার্ল…?”
তার কণ্ঠে রাগ নেই।
আছে শুধু এক গভীর অসহায়তা।
কারণ সত্যিটা সে কাউকে বলতে পারে না।
সে যতই রাগ দেখাক, যতই দূরে থাকার চেষ্টা করুক… তার হৃদয়ের গভীরে হেরার জন্য একটা অদ্ভুত, অপ্রকাশিত ভালোবাসা ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে।
আর সেই ভালোবাসাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
⸻
“ছি! হেরা, তোমার মতো মেয়ের কাছে এটা আশা করিনি! নাভানের আধিপত্যের জন্য তার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছো—ছি! ছি!”
ম্যাডামের কুরুচিপূর্ণ কথায় হেরা হতভম্ব, কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
“আমি কিছু করিনি, আর না বাজে কোনো কাজ করছিলাম আমরা। আমি তো…”
হেরাকে থামিয়ে দিয়ে ম্যাডাম আবার বাজে মন্তব্য করে—
“ও? তাহলে নাভানের উপর কি করছিলে তুমি?”
“আ… আমি তো…”
“হয়েছে, থাক! আমাদের ভার্সিটির মানসম্মান আর রইল না। ছি! ছি!”
তখন তিতির আর নেন্সি মিলে একটা ছেলেকে ঠিক করে হেরাকে শায়েস্তা করার জন্য। তার কলিজায় হাত দিয়েছে—এবার তো শিক্ষা পেতে হবে।
এই ছেলেটা তাদের ভার্সিটির এক বড় ভাই। সে হেরাকে পছন্দ করত, প্রোপোজ করতে চেয়েছিল। বাজে কথাও বলেছে হেরার ফিগার নিয়ে। নিলয় শুনে ওই ছেলেকে ইচ্ছেমতো মেরে রক্তাক্ত করে ফেলেছিল। তাই হেরার প্রতি ক্ষোভটা অনেক ছেলেটার।
আজ তিতির অনেক রেগে ছিল। তার ভালোবাসার মানুষটাকে আজ থাপ্পড় মেরেছে ওই মেয়ে। আর নেন্সি তো হেরার প্রতি আরো প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে। কেন তার ভালোবাসা তাকে রেখে ওই মেয়ের প্রতি এত টান?
আজ যে করে হোক এই মেয়েকে একটা শাস্তি দেবে।
প্রিন্সিপাল স্যারের কথা বলে হেরাকে উপরের একটা হলে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে ওই ছেলে আগে থেকেই থাকবে—এমনটাই তাদের প্ল্যান।
কিন্তু কোথা থেকে যেন নাভান এসে পড়ে।
আর পরিকল্পনা মতো নাভানের উপর পড়ে যায় হেরা। নেন্সি আর তিতির মিলে কিছু স্টুডেন্ট ও ম্যাডামকে নিয়ে যায়। তারা ম্যাডামকে এটা বুঝিয়েছে—ওই হলরুমে খারাপ কাজ করছে হেরা একটা ছেলের সাথে। আর তাকে হাতে-নাতে ধরতে দরজা আটকে দিয়েছে।
এদিকে অন্ধকারে নাভানের উপর পড়ে হেরা ভয় পেয়ে যায়। ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি হয় যেন সব পরিকল্পিত।
সবসময়কার মতো মাটিতে পড়ে ও তারা ঝামেলা করতে থাকে। আর ওই অবস্থায় দরজা খুলে বাজে অবস্থায় দেখে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
নেন্সি আর তিতিরের চোখ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম—ওই ছেলের জায়গায় নাভানকে দেখে।
তিতির রাগে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে পরপর দুই গালে চারটা থাপ্পড় মারে হেরাকে।
তারপর ম্যাডামের কুরুচিপূর্ণ কথা।
আমরা মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতিতে পড়ি, যা এক্সপ্লেন করার উপায় থাকে না। পরিস্থিতি আমাদের বিপক্ষে থাকে—যেমনটা হেরার হয়েছে।
আর নাভানও কিছু বলছে না।
এর মানে কি দাঁড়ায়?
এটা পরিকল্পিত ছিল—হেরার ধারণা এটা নাভানের কোনো চক্রান্ত।
ম্যাডামের কথায় নেন্সি বলে ওঠে—
“স্যার, এরা আমাদের নেতা, আমাদের আইডল। তাদের থেকে আমরা শিখবো—আর এরা নষ্টামি করছে! এদের কি বিচার হবে, স্যার?”
প্রিন্সিপাল স্যারের মাথায় হাত। হেরা ও নাভান—দুজনই তার প্রিয় ছাত্রছাত্রী।
ম্যাডাম বলে ওঠে—
“আমি তাদের অভিভাবকদের ডেকেছি। আসুক তারা।”
তিতির হেরার দিকে আঙুল তাক করে বলল—
“ভার্সিটিকে এই মেয়ে নিজ বাড়ি পেয়েছে। আজ নিলয়ের সাথে, কাল নাভানের সাথে। একে বের করে দেন। এর চরিত্র খারাপ। আমরা নাভানকে খুব ভালো করে চিনি। এই মেয়ের জন্য আমাদের ভার্সিটির নাম খারাপ হোক—আমরা চাই না। একজন খারাপ চরিত্রের মেয়ে আমাদের সাথে পড়ালেখা করুক—আমরা কেউ চাই না।”
এবার অনেকেই বলে ওঠে—
“ঠিক! ঠিক! আমরা চাই না! এমন নেত্রীর কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের!”
নেন্সি আবার বলল—
“হ্যাঁ! নাভান মেয়েদের সাথে এমন অসভ্যতা করবে না—এটা আমরা মানি। সব এই মেয়ের দোষ।”
রোজ আর রুশা ছুটে আসে। ভিড় সরিয়ে প্রাণপ্রিয় বান্ধবী—কম বোন বেশি—মানুষটাকে এমন অবস্থায় দেখে রুশা জাপটে ধরে হেরাকে বলল—
“না! আমার হেরা পাখি নির্দোষ! তোমরা ওকে কিছু বলবে না। ওর চরিত্রের দিকে কেউ আঙুল তুলবে না। কী করেছে যে তোমরা এগুলো বলছো তাকে?”
রুশার কথায় নেন্সি বলল—
“রুশা, আমরা দেখেছি। এই মেয়ে এতদিন নিলয়ের সাথে ডলাডলি করত, এখন নিলয় যেতেই নাভানের সাথে! ছি! সবাই দেখেছে! ছি! কী লজ্জা!”
শ্বাস নিয়ে নেন্সি আবার বলে ওঠে—
“বের করে দেওয়া হোক! আর কিছু চাই না আমরা!”
ক্যান্টিনের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আজ যেন এক অদ্ভুত অশান্তির শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
চারপাশে ভিড় জমেছে ছাত্রছাত্রীদের। সবাই ফিসফিস করছে, কেউ কেউ আবার জোরে জোরে কথা বলছে।
সেই ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হেরা—মাথা নিচু, চোখে অঝোর কান্না।
নেন্সির কথা শুনে চারপাশে যেন গুঞ্জন আরও বেড়ে গেল। অনেকেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে লাগল।
তিতির গভীর শ্বাস নিয়ে বলল—
“এই মেয়েকে ভার্সিটি থেকে বের করে দেওয়া হোক। এর মতো মেয়ের এখানে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমরা আর কিছু চাই না!”
তার কথা শেষ হতেই ভিড়ের মাঝ থেকে কয়েকজন ছাত্র একসাথে বলে উঠল—
“হ্যাঁ! ঠিক বলেছে! বের করে দেওয়া হোক!”
মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় সব স্টুডেন্ট একমত হয়ে গেল। ক্যান্টিনের বাতাসটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
এইসব কথার মাঝখানে হেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে নিরবধি পানি ঝরছে। বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তবুও সে কোনো কথা বলছে না।
ধীরে ধীরে সে কান্নাভেজা মুখটা তুলে তাকাল নাভানের দিকে।
একটা আশার আলো যেন তার চোখে ঝলসে উঠল—হয়তো নাভান কিছু বলবে… হয়তো সে সবাইকে বলবে আসলে কী হয়েছিল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই নাভান মুখ ঘুরিয়ে নিল।
মুহূর্তে হেরার বুকটা যেন হিম হয়ে গেল।
তার মনে হলো কেউ যেন ভেতর থেকে হৃদয়টা মুচড়ে ধরেছে। এই মানুষটার দিকে সে এতক্ষণ ভরসা করে তাকিয়ে ছিল… অথচ সেই মানুষটাই চোখ ফিরিয়ে নিল!
নাভানের বুক ধক করে উঠল হেরার চাহনিতে। কী হলো তার—কে জানে! সব কিছু গোলমাল লেগে গেছে হেরার চোখ দেখে।
হেরার ঠোঁট কেঁপে উঠল নাভানের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে।
…আজ সত্যিই সে মন থেকে ঘৃণা করবে নাভানকে। একটা কথাও বলছে না…
মনে মনে বিড়বিড় করল হেরা।
“আসলেই তো সব জানে সে। কী হয়েছিল তখন… তবুও চুপ করে আছে!” আসলে প্রিয় আপুর কথা ঠিক আপনি খুব খারাপ অহংকারী, আপনার অহংকার সবার সামনে একদিন ধুলোয় মিশে যাবে।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
“নিজের নামে আর কত সাফাই গাইব আমি?”আল্লাহ তুমি আমার সম্মান বাচাও!! ( কান্না করে )
মনে মনে বললো হেরা।
হেরার মনে হলো, নাভান হয়তো ইচ্ছা করেই এমনটা করছে। তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য… তাকে অপমান করার জন্যই হয়তো এই নোংরা খেলাটা খেলেছে সে।
হেরা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
মুহূর্তেই তার মনে ভেসে উঠল নিলয়ের মুখটা। প্রিয়র কথা শুনে আজ এই অব্দি তার আসা আর নিলয়ের সাথে বন্ধুত্ব করা—যাতে সহজে নাভানের বিরুদ্ধে যাওয়া যায়। কিন্তু নিলয় যে তাকে ভালোবাসবে এটা ধারনার বাহিরে ছিলো। হেরা চাইলেও যে নিলয়কে ভালোবাসার জায়গা দিতে পারেনি—জাস্ট বন্ধুত্বের জায়গা দিয়েছে। আচ্ছা, নিলয় যদি আজ এখানে থাকত… তাহলে কি এমনটা হতে দিত?
হয়তো না। নিলয় সবসময় তাকে আগলে রাখত। কারও সামনে তাকে অপমানিত হতে দিত না।
এই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে হেরা নিজের চোখের পানি মুছল না।
আজ যেন এই কান্নাই তার একমাত্র সঙ্গী।
এই কান্নাই যেন তার মনের সব কথা বুঝতে পারে ।
চারপাশে সবাই যখন তাকে দোষারোপ করছে, তখন হেরা অনুভব করল—সে আজ ভীষণ একা। রোজ রুশা বার বার বলছে।
“আমার হেরা পাখি কোনো বাজে কাজ করতে পারে না প্লিজ তোমরা বাজে কথা বলো না!! (রুশা)
” হ্যাঁ আমাদের হেরা পাখি অনেক ভালো প্লিজ তোমরা এগুলো বলো না। (রোজ )
কান্না করতে করতে দুজনের অবস্থা নাজেহাল, ঝিনুক, সৃজন, অধীর, ঠাই জায়গায় দাড়িয়ে আছে কি বলবে ঠিক বুজে উঠতে পারছে না। ঠিক তখনই…
সবার মাঝে দাঁড়িয়ে নাভান হঠাৎ একটা কথা বলল__
তার কণ্ঠটা ঠান্ডা, কিন্তু সেই কণ্ঠে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে মুহূর্তেই পুরো ক্যান্টিন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এমন এক কথা বলল, যা শুনে সবার হুশ উড়ে যায়।
“আর একটা কথা বললে আমার স্ত্রীকে—তাদের জবান এখনই বন্ধ করে দিবো আমি।”
সবাই নাভানের দিকে ভূত দেখার মতো তাকিয়ে আছে।
রোজ ও রুশার কান্না অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায়। অধীর এক সেকেন্ড ও সময় নেয় নি কথাটা তার কানে বাজে আর ছোট ছোট হাড়ে গিয়ে যখন লাগে তখন হাড়গুলো
মেশিন সিগনাল বানায়। ভেতরে একটা অংশ আছে যেটা ককলিয়া। তারপর সেই কথা স্নায়ুর রাস্তা দিয়ে ব্রেনে চলে যায়। এটা যেন একটা মেশিন, যা কাঁপনকে ইলেকট্রিক মেসেজে বদলে দেয়।অধীরের ব্রেন তখন বলে।
“ওহ! এটা তো আমার গিটার ওয়ালা হিরো ভাই এর কথা”সে এটা বলছে”!!
মুখে বিরবির করতে করতে অধীর সৃজনের হাতের উপর পড়ে যায়—জ্ঞান হারালো নাকি বোঝা গেল না।
ঝিনুক অধীরকে এক থাপ্পড় মারে বাহুতে। ছেলেটা সত্যি শকড পেয়েছে।
এবার ব্যাগ খুলে পানির বোতল বের করে পানি অধীরের মুখে ঢেলে দেয়। ঝিনুক যেন আগে থেকেই জানত—এমন একটা ভাব তার। ঠিক বোঝা গেল না ঝিনুকের আচরণে। নাভানের চোখে তখন এমন এক আগুন জ্বলছিল, যেন তার ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও কেউ ছুঁয়ে ফেলেছে।
আবার সেই কথাটাই বলল নাভান—
“আর একটা কথা বললে আমার স্ত্রীকে… তাদের জবান এখনই বন্ধ করে দিবো আমি।”
তার কণ্ঠ ছিল নিচু, কিন্তু সেই নিচুতেই লুকিয়ে ছিল বজ্রপাতের মতো ভয়ংকর হুঁশিয়ারি।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নাভানের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন তারা কোনো মানুষ নয়—একটা জীবন্ত ঝড়কে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে।
অধীর একটু চোখ খুলেছিল পানির ঝাপটা পেয়ে —আবার তার হিরো গম্ভীরমুখো ভাইয়ের কথা শুনে আবার বেহুঁশ।
অধীর, যে এতক্ষণ সাহস দেখানোর ভান করছিল, কিছু বলবে তাদের পক্ষে—কিন্তু হঠাৎ তা বেলুনের মতো ফুসসস।
হঠাৎ করেই সৃজনের গায়ের উপর ঢলে পড়তে পড়তে বলল—
“এই এই! আরে ধর আমায়! আমি কি মারা যাচ্ছি নাকি?”
ঝিনুক বিরক্ত হয়ে অধীরের বাহুতে আবার দেয় এক থাপ্পড়।
“ড্রামা বন্ধ কর! উঠ। অধীর, পরে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কিছু বলবো না কিন্তু। সবটা দেখ, হারামি।”
কিন্তু অধীরের চোখ-মুখ এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, মনে হচ্ছিল সত্যিই সে পৃথিবীর সব ভূত একসাথে দেখে ফেলেছে। ঝিনুক ব্যাগ খুলে আবার পানির বোতল বের করল, আর কোনো সতর্কতা ছাড়াই পুরো বোতলটাই অধীরের মুখে ঢেলে দিল।
“ওইইইই! ডুবাই ফেলবি নাকি আমাকে?”
অধীর হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে তার একমাত্র আইডল ভাই নাভানের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমি বেঁচে আছি তো? কেউ আমার জানাজা পড়ে ফেলিসনি তো?”
হেরার দিকে তাকিয়ে দেখে বন্ধুমহল—হেরা যে মেয়ে মিথ্যা কথা বললে এতক্ষণে নাভানের চোদ্দগুষ্টির নামে জপমালা পড়ত, কিন্তু হেরা তেমন কিছু করছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে! তার মানে সত্যি কথা বলছে নাভান !?
বন্ধুমহল স্তব্ধ!
নাভানের মুখ থেকে “স্ত্রী” শব্দটা বের হতেই পুরো জায়গাটা যেন হঠাৎ করে থেমে গেল।
সবাই একসাথে হেরার দিকে তাকালো… তারপর নাভানের দিকে… আবার হেরার দিকে…
আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্টুডেন্ট, স্যার, ম্যাডাম আর বন্ধুমহল পুরোপুরি হ্যাং হয়ে গেল।
হেরাকে জড়িয়ে ধরা রুশা ছেড়ে দেয় হেরাকে।
তারা সবাই একসাথেই ছিল।
অধীরের অবস্থা দেখে রুশাও বুঝতে পারে—তার লাইভ টেলিকাস্ট ভালো শকড পেয়েছে।
অধীর মনে মনে হিসাব করতে লাগল—
নাভান + বিয়ে + হেরা = ERROR 404! REALITY NOT FOUND!
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“স্ত্রী মানে… বউ… মানে… লিগ্যাল বউ… মানে… ক বু ল বলা সেই বউ???!!!”
সে সৃজনের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমাকে চিমটি কাট… আমি স্বপ্ন দেখতেছি।”
সৃজন সত্যিই জোরে একটা চিমটি কাটল।
“আউউউউচ! আরে আস্তে! আমি স্বপ্ন দেখতেছি কিনা চেক করতে বলছি, হত্যা করতে না!”
অধীর আবার নাভানের দিকে তাকালো।
নাভান তখন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাটাই সে বলেছে।
অধীরের বুক ধক ধক করতে লাগল।
“না… না… এটা হতে পারে না… এরা তো একে অপরকে দেখলেই Tom & Jerry হয়ে যায়…!”
সে কাঁপা গলায় বলল, নাভানকে উদ্দেশ্য করে—
“মানে… তুই… তুই তোর সবচেয়ে বড় শত্রুকে বিয়ে করছিস?? এটা কোন ধরনের গল্প? Horror, Thriller, না Science Fiction??”
ঝিনুক দেয় এর চাপড় অধীরের মাথায়।
এখানে এত ঝামেলা হচ্ছে, আর এই নাটকবাজ নাটক করছে। অধীর নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলল।
“আমি বুঝছি… আমার ব্রেইন এটা সহ্য করতে পারতেছে না… তাই সে নিজেই Shut Down নিচ্ছে… ঝিনুক মালা।”
বলেই সে নাটকীয়ভাবে চোখ উল্টে সৃজনের উপর ঢলে পড়ল। সৃজন বিরক্ত হয়ে বলল।
“সালা আবার যাচ্ছিস! এবার কি তোর আত্মা ডাকতেছে তোরে?”
অধীর পড়ে রইল সৃজনের কাঁধে।
রোজ সৃজনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বলল—
“আমার কানে কি সমস্যা হয়েছে? আমি কি বিয়ের কথা ভুল শুনেছি, চুমুর স্প্লাই ম্যান?”
সৃজন বিরক্ত—সবার নাটক দেখে!
আর সে নিজেও তো শকড! তাই বলে তাদের মতো ড্রামা করবে? সৃজন অধীরের উপর বিরক্ত হয়ে বলল—
“এই হারামি, নাটক বন্ধ কর!”
ঝিনুক অধীরের বাহুতে আবারো কষিয়ে থাপ্পড় মারল।
“উঠ! এখন মেইন ধামাকা খোলাসা হবে।”
অধীর চোখ খুলে ফিসফিস করে বলল—
“ওই শাকচুন্নি, তুষারপাতের বউ… সত্যি বল… এটা prank না তো?”
ঝিনুক ভ্রু তুলে ঠান্ডা গলায় বলল—
“না। এটা বাস্তব।”
অধীর আবার চোখ বন্ধ করে বলল—
“ঠিক আছে… আমাকে আবার অজ্ঞান হাড়াতে দে বইন… এবার properly…”
ঝিনুক সাথে সাথে রুশার ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে, রোজের ব্যাগ থেকেও পুরো পানির বোতলগুলো অধীরের মুখে ঢেলে দিল।
অধীর লাফিয়ে বলল।
“ওইইই! তুষারপাতের বউ! সাগর বানিয়ে ডুবিয়ে মারবি নাকি!”
অধীর হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসে হেরার দিকে তাকালো।
এবার তাদের মাঝামাঝি গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল—
“কিউটি পাই বনু… সত্যি কি তুমি বউ হও নাভানের?”
হেরার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। যে সম্পর্ক পবিত্রর ট্যাগ লাগিয়ে পবিত্র হয়েছে, আজ আবার সেই পবিত্র ট্যাগ তাকে অপবিত্রর থেকে বাঁচাতে পারে।
কিন্তু সে তো এই বিয়ে কোনোদিন সামনে আনতে চায়নি। কি হচ্ছে তার সাথে? হেরা নিস্তব্ধ।
কি বলবে? এটা তো সত্যি—তারা বিবাহিত, সেটা মানুক বা না মানুক। তাছাড়া এখন যেহেতু ওই অসভ্য গিটারওয়ালা বলে ফেলেছে, এখন কিভাবে সে না করবে? এতে তো আরো খারাপ প্রমাণিত হতে হবে তাকে। হেরা অধীরের কথায় আর স্যার–ম্যাডামের কথায় মাথা উপর নিচ করল। এবার চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে মাঠের ঘাসের উপর—শিশিরবিন্দুর মতো। হেরা মনে মনে ভাবছে—তার প্রিয়কে সে কি জবাব দিবে? আর বাবাকে কি বলবে? আর এই সম্পর্ক থেকে কিভাবে বের হবে সে?
অধীর বুক চাপড়ে এবার বন্ধুমহলের কাছে বলল—
“হায় আল্লাহ… শত্রু থেকে সরাসরি বউ! এই স্পিডে চললে কালকে দেখবো এদের বাচ্চাও কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে!”
সৃজন মাথা নাড়িয়ে বলল—
“আমি এতদিন Love Story দেখছি… আজ প্রথমবার Enemy to Wife Story Live দেখলাম… আমার ব্রেইন এই update নিতে পারতেছে না!”
রোজ নাভানের দিকে তাকিয়ে বলল—
“চকলেট হিরো—মানুষ না, পুরাই টুইস্ট!”
হেরার মাথা উপর নিচ করা দেখে যেন শান্ত হলো নাভান। আবার সেই তেজি কণ্ঠে বলল—
“ও আমার স্ত্রী। তাই আমরা একরুমে একে উপরের উপরে শুয়ে থাকা না—আরো অনেক কিছু করতে পারি। এটা কারো দেখার বিষয় না।
আর ম্যাডাম, আপনাকে বলছি—আপনি আমার ব্যাপারে খুব ভালো জানেন। আমি কেমন ফ্যামেলির ছেলে, আশা করি মিথ্যা বলে ধরবেন না কথা।
এই শেহতাজ খান নাভান যা বলে তা সত্যি।”
নাভানের এক কথায় ভার্সিটির সেই ব্যস্ত এলাকা স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষের গুঞ্জন, পাখির ডানা ঝাপটানো, রাস্তার ধুলো—সবই হঠাৎ নিস্তব্ধ। তার চোখের সামনে শুধু তিতির দাঁড়িয়ে আছে, চোখে অশ্রু আর হৃদয়ে ব্যথা।
তিতির ছুটে এলো, চোখের জল মুছতে মুছতে। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“তুমি কি বললে… কে স্ত্রী? তুমি ওকে বাঁচাতে চাও… আমি জানি তোমার মন উদার, কিন্তু… এটা ঠিক না! প্লিজ, এগুলো মিথ্যা বলো। বলো, বেবি… এটা সব মিথ্যা!”
নাভান ধীরে ধীরে তিতিরের হাত ধরে নিজ থেকে সরাল। তার চোখে অটল দৃঢ়তা, মুখে সত্যের ছাপ।
“না, তিতির… ও আমার স্ত্রী। আমাদের বিয়ে হয়েছে… তিন মাস আগে।”
তিতিরের হৃদয় যেন থেমে গেল। এই সত্যের বোঝা তার কাঁধে নেমে এল—ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা, বিশ্বাসঘাতকতার বেদনা আর হারানো সময়ের আফসোস। সে দাঁড়িয়ে আছে, চোখের জল গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ সে চুপচাপ। হৃদয় যেন ভেঙে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
তিতির চেপে ধরে নিজের বুক। চোখের আড়ালে নাভানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি… তুমি কি সত্যিটা বলছ? বেবি… আমি তো সব সময় তোমার জন্যই… আমি… আমি কেবল তোমাকে চাই… আমার সবটাই শেষ হয়ে যাবে, যদি এটা সত্যি হয়। তুমি কেবল আমার জি ম্যান।”
নাভান এক মুহূর্ত থেমে তিতিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তিতির, আমি জানি এটা তোমার জন্য কষ্টের। কিন্তু সত্যি বলার কোনো বিকল্প নেই। ও আমার স্ত্রী… আর আমি ওকে বাঁচাবো। আমি চাই তুমি বুঝতে পারবে।”
তিতির যেন হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে যায়। চোখে আরও জল জমল। হৃদয় চিৎকার করছে, প্রেমের ব্যথা রক্তের মতো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
নাভানের এই স্থিরতা, সত্যের অটলতা আর তার নিজের হৃদয়ের ব্যথা—সব মিলেমিশে তিতিরকে ভেঙে দিল। সে কেবল দাঁড়িয়ে আছে, নাভানের দিকে তাকিয়ে, এবং হৃদয়ে চেপে ধরে নিজের অনাহুত ভালোবাসার বেদনা। তার জি ম্যান অন্য কারো নামে কবুল পরেছে।
সেই মুহূর্তে ভার্সিটি এলাকা যেন ক্ষণিকের জন্য নিস্তব্ধ। শুধু তাদের দুইজনের হৃদয়ের শব্দ, ভালোবাসার যন্ত্রণা এবং চিরন্তন সত্যের কম্পন অনুভূত হচ্ছে।
নাভান তিতিরের দিকে তাকাতে পারছে না কোনো এক কারণে। কিন্তু তার যে আজ উপায় নেই।
তারপর কিভাবে বিয়ে হয় তা ছোট করে জানায় নাভান।
জাওয়াদ খান মেয়েকে সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে যায়। এডভোকেট কাজল খান অফিস থেকে ছুটে আসে ভার্সিটিতে। একটু উনিশ-বিশ হলে নিউজ হতে টাইম লাগবে না।
কিন্তু এসে ছেলের মুখে যা শুনে, নিজেও স্তব্ধ।
পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“বিয়ে!”
জাওয়াদ খান বলে। যেই সামনে তাকায়, সেখানেই স্ট্যাচুর মতো হয়ে যায় জাওয়াদ খান।
নিজের প্রাণপ্রিয়তমা স্ত্রী প্রথম ভালোবাসা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—একেবারে ভিন্ন রূপে।
এই মাঝ বয়সে এসেও রূপ যেন ঝলমল করছে।
তার কাছে যখন ছিল, তখন তো শাড়ি সামলাতে পারত না। আঁচল আঁচলের জায়গায় থাকত না। আর এসব দেখে জাওয়াদ খান আরো বেসামাল হয়ে যেত।
কিন্তু এখন যে নারী দাঁড়িয়ে আছে, তাকে যেন চিনতেই পারছে না জাওয়াদ খান।
পড়নে শাড়ির পরিপাটি বলে দিচ্ছে কতটা ম্যাচিউর হয়েছে তার কাজল রেখা।
বুকের বাঁ পাশে অটোমেটিক হাত চলে যায়।
কেন নিয়তি তার সামনে দাঁড় করায়, যাকে দেখলে বুকের বাঁ পাশটা চিনচিন করে ওঠে?
এদিকে নাভান তার প্রিয় মানুষটাকে কাছে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এত বছর পর বাবাকে দেখে শক্তপোক্ত ছেলেটা মুহূর্তে নরম মোমের মতো গলে যায়।
বাবার স্পর্শ পেতে ছুটে যায়।
“বাবা!”
নাভানকে দেখে জাওয়াদ খানের বুকের ভিতর এক অজানা চাপা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল।
চোখে অচেনা উজ্জ্বল জল, যা এক মুহূর্তে তার সব স্মৃতি একত্রে জাগিয়ে তুলল।
এই সেই ছেলে—যাকে জন্মের পর নিজের পরিচয় দিয়ে বড় করেছে দশ বছর।
সেই ছেলে, যার প্রথম কোলে নেওয়া মুহূর্তগুলো আজও তার মনে গভীরভাবে বদ্ধ।
জাওয়াদ নিঃশব্দে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
চোখে পানি টলমল করছে, যেন এই অদ্ভুত মিলন তার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা, তার সব কষ্ট আর তার অভিমানকে একসাথে নিয়ে এসেছে।
তার ছেলে—যাকে নিজের কোলের উষ্ণতায় বড় করেছে, যার মুখ দেখার জন্য কতটা পাগলামি, কতটা অপেক্ষা—সবকিছু যেন আজ এক মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে উঠল।
যে ছেলেকে বুকে না নিয়ে তার রাতের ঘুম হতো না, যে ছেলেকে বুকে না নিয়ে সে শান্তি পেত না—আজ সেই ছেলের মুখে “বাবা” ডাক শুনে জাওয়াদ খানের নিজের মনে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস জেগে উঠল।
বছরগুলোর দূরত্ব, বঞ্চনা আর অন্তর্নিহিত ব্যথা—সব মিলিয়ে এক মুহূর্তে তার বুকের ভিতর শান্তির ঢেউ ছুঁয়ে গেল। হঠাৎ করেই মনে হলো—এটাই তার ছেলেকে কাছাকাছি ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
এক প্রশান্তি, যা সব কথার চেয়ে গভীর, সব আবেগের চেয়ে বড়। জাওয়াদ খান হঠাৎই নাভানকে জড়িয়ে ধরে সব ভুলে । পরোক্ষনে মনে পরে না এ তোর রক্তের না!!
মুহূর্তেই শূন্যে যেন সময় থেমে যায়।
নাভান কিছুটা অবাক হয়ে ওঠে, কিন্তু ঠিক তখনই জাওয়াদ খান দূরত্ব ঠিক করার জন্য নাভানকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নেন।
নাভানের চোখে তখন বাবার দিকে এক অদ্ভুত মায়াময় দৃষ্টি।
সে তাকিয়ে থাকে—একদিকে বিস্ময়, অন্যদিকে ভালোবাসার অদ্ভুত অনুভূতি।
হেরা আর রুশা যেন মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের মনে একটাই প্রশ্ন—নাভানকে জাওয়াদ খান কেন জড়িয়ে ধরল? আর বাবার মুখে একটুও প্রতিক্রিয়া নেই কেন?
আর নাভান “বাবা” বলে যে সম্বোধন করেছে—সেটা কি সত্যি, নাকি তারা নিজের কানে ভুল শুনেছে?
আজ কি হচ্ছে?
আজ কি নতুন সম্পর্কের সূচনা, নাকি কেবল একটা অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত?
সবাই ভেতরে ভেতরে হুলস্থুল করছে, কিন্তু কাজল খান সবার আড়ালে চোখ মুছে নেয়—এক ধরনের নীরব, গভীর প্রহরীর মতো।
প্রিন্সিপাল স্যার এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামলান, সব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
আর সেই সময় জাওয়াদ খান কিছুক্ষণ চুপ থাকেন।
কাজল খান হেরাকে কাছ থেকে দেখছে। চোখে চোখ রাখছে।
হেরার মায়াবি দৃষ্টি যেন নাভানের মতোই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করছে—যেন দুজনেই এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
কাজল খানের মনে ভাসে স্মৃতি—প্রায় দশ বছর আগে সে একবার এই মেয়েকে দেখেছিল।
সেই মুহূর্তে কোনো নাম জানা ছিল না, কিন্তু আজ সে জানে—হেরা জাওয়াদ খানের দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে।
কিন্তু যত ঘনিষ্ঠভাবে সে হেরার দিকে তাকাচ্ছে, হেরার সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে।
হেরাও তাকিয়ে আছে মধ্যবয়সী সুন্দর, দাম্ভিকতা-সম্পূর্ণ কাজল খানের দিকে।
এই প্রথম কাজল খানকে হেরা দেখল সামনাসামনি।
সবাই যে বলে নাভান তার মায়ের মতো হয়েছে—আসলে তাই। কিন্তু যে আরেকজন মানুষের সাথে মিল পায় খুব… মনে মনে এসব ভাবনার মাঝেই—
ঠিক তখনই জাওয়াদ খান কথার ফাঁকে মুখ খুললেন।
সারা হলঘরে স্থিরতা নেমে আসে।
শব্দগুলো শোনার সাথে সাথে সবাই উপলব্ধি করতে শুরু করে—আজকের দিনটি শুধু পারিবারিক নয়, বরং নতুন আবেগ, নতুন সম্পর্ক আর নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা।
“এই বিয়ে জায়েজ না।”
সবাই জাওয়াদ খানের দিকে তাকায়।
জায়েজ না মানে কি?
জাওয়াদ খান আবার বললেন—
“ভাই-বোনের বিয়ে এই সমাজে জায়েজ না। নাভান আর হেরা ভাই-বোন।”
এর বেশি আর বলতে পারলেন না তিনি। তার আগেই কাজল খান বলে উঠলেন—
“সুফিয়া, আমার ব্যাংক চেক দাও।”
তার এসিস্ট্যান্ট সুফিয়াকে চেক দিতে বললেন তিনি। সুফিয়া মেয়েটা অনেকদিন ধরেই এডভোকেট কাজল খানের সহকারী হিসেবে কাজ করছে। তাই কোন সময় তিনি রেগে যান, কখন কঠিন হয়ে ওঠেন—সবই তার জানা। কথার একটু এদিক-ওদিক হলেই কাজল খান কতটা রাগী হয়ে উঠতে পারেন, তা সুফিয়া খুব ভালো জানে।
তাই কথার সাথে সাথেই চেক বের করে দিল সুফিয়া।
এডভোকেট কাজল খান হেরার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললেন—
“এই নাও মামনি। যা লাগে বসিয়ে নিও। ছেলের বউকে প্রথমবার মুখ দেখে কিছু দিতে হয়, তাই দিলাম। সামনে আরো পাবে। কারো ফালতু কথা শুনবে না। বিয়ে হয়েছে মানে তুমি আমার ছেলের বউ। আমি আর যাই হই, সম্পর্কের মানে খুব ভালোভাবে বুঝি।”
হেরা সহ সবার চোখ কপালে।
সবচেয়ে বেশি অবাক হলো জাওয়াদ খান।
মানে কি? ভাই-বোনের বিয়ে এটা হয় কীভাবে? কাজল রেখা তো সব জানে। তারপরও এই কথা?
জাওয়াদ খানের চোখে এতক্ষণ যে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি ছিল, মুহূর্তেই সেখানে আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি গর্জে উঠলেন—
“কাজলরেখা, আপনি কি পাগল নাকি? যে সম্পর্ক জায়েজ না, তা মেনে নিচ্ছেন?”
এবার ঘুরে মুখোমুখি হলেন কাজল খান আর জাওয়াদ খান।
নিজের অল্প বয়সের প্রেমিক পুরুষ, নিজের স্বামীকে দেখে না চাইতেও কাজল খানের ভেতরে পুরনো স্মৃতিগুলো জেগে উঠছে। এখনো আগের মতোই শরীর, সেই চোখ, সেই নাক। শুধু দাড়িতে সাদা-কালোর মিশ্রণ।
যে কেউ বলবে—যুবক বয়সে এই লোকটা কতটা আকর্ষণীয় ছিল।
এমনকি জাওয়াদ খানের গেটআপ দেখে সৃজন, রোজসহ ছেলেমেয়েদের চোখ কপালে।
এ তো সালমান খানের থেকেও কম না!
কত পাগলামিই না করেছিল সে এই পুরুষের সাথে…
কিন্তু নিয়তি তাদের কোথায় নিয়ে এসেছে।
ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে কাজল খান শক্ত কণ্ঠে বললেন—
“মিস্টার জাওয়াদ খান, কাজলরেখা নয়। বলবেন—এডভোকেট, এমএলএ কাজল খান। মানুষকে কিভাবে সম্মান দিতে হয় তা এতদিন বিদেশে থেকেও শিখেননি দেখছি।”
কাজল খানের কথার মাঝেই জাওয়াদ খান আবার বললেন—
“এই বিয়ে জায়েজ না। এটা হারাম।”
এবার কাজল খানও সমান দাম্ভিকতায় বললেন—
“এই বিয়ে জায়েজ মানে জায়েজ।”
মাঝখান থেকে স্যার আর ম্যাডামরা প্রশ্ন করলেন—
“কেন হারাম হবে? আর নাভান জাওয়াদ খানকে বাবা বলে ডাকছে কেন?”
একজন বললেন—
“কি বলছেন এডভোকেট কাজল খান? ক্লিয়ার করুন। এখানে কি হচ্ছে?”
আজকের দিনটা যেন অন্যরকম।
যে প্রিন্সিপাল স্যারকে সবাই সবসময় নরম স্বভাবের মানুষ হিসেবে চিনত—আজ তিনি যেন অন্য রূপে দাঁড়িয়ে আছেন।
যে মানুষ এডভোকেট কাজল খানের নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠতেন—আজ তার কণ্ঠে কোনো ভয় নেই।
তিনি শান্ত কিন্তু কঠোর কণ্ঠে বললেন—
“বিয়ে জায়েজ? ভাই-বোনের সম্পর্ক কিভাবে জায়েজ হয়? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? নাভান জাওয়াদ খানকে বাবা বললো কেন? আর হেরারও বাবা জাওয়াদ খান?”
প্রশ্নটা ছোট ছিল।
কিন্তু তার ভেতরে ছিল অনেক অজানা ইঙ্গিত।
চারপাশে নীরবতা নেমে এল।
কাজল খান আর জাওয়াদ খান দুজনেই চুপ।
মনে হচ্ছে দুজন দুজনকে শুধু চোখ দিয়ে দেখছে।
জাওয়াদ খানের চোখে আফসোস।
আর কাজলরেখার চোখ যেন আগুন হয়ে জ্বলছে।
যে সত্য জানাতে সে একসময় কত মিনতি করেছিল—আজ সেই সত্য কি বলবে?
প্রিন্সিপাল আবার বললেন—
“আমার জানা মতে, এডভোকেট কাজল খান আর জাওয়াদ খান স্বামী-স্ত্রী। হেরা জাওয়াদ খানের মেয়ে, আর নাভান কাজল খানের ছেলে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—হেরা কি কাজল খানের গর্ভের সন্তান? নাকি জাওয়াদ খান দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন?”
জাওয়াদ খান সঙ্গে সঙ্গে বললেন—
“আমি বিয়ে করিনি।”
প্রিন্সিপাল বললেন—
“তাহলে কি কাজল খান বিয়ে করেছেন?”
কাজল খান শান্ত গলায় বললেন—
“না, আমিও বিয়ে করিনি।”
দুজন এবার কড়া চোখে একে অপরের দিকে তাকালেন।
জাওয়াদ খান বললেন—
“অহে নারী, তুমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মিথ্যা আর অভিনয়ের জন্য সেরা।”
কাজল খান তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন—
“পুরুষ মানুষের মতো নিকৃষ্ট আর দ্বিতীয় প্রাণী নেই। চারটা বিয়ে করলেও বলবে—আমি বিয়ে করিনি।”
প্রিন্সিপালের প্রশ্নে পুরো কক্ষের বাতাস যেন জমে গেল।
তিনি আবার বললেন—
“তাহলে কি আমরা ধরে নেব—হেরা আর নাভান অবৈধ সন্তান?”
এই কথাটা যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করল।
নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
কাজল খান ধীরে মাথা তুললেন।
তার চোখে ভয়ঙ্কর তেজ।
হঠাৎ তিনি কোটের ভেতর হাত ঢুকালেন।
পরের মুহূর্তেই বের হলো লাইসেন্স করা পিস্তল।
তিনি ধীরে পিস্তলটা তুললেন।
সোজা প্রিন্সিপালের দিকে তাক করে।
তার কণ্ঠে আগুনের মতো তেজ—
“মুখ সামলে কথা বলবেন, প্রিন্সিপাল সাহেব।
আপনার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে ভুলে গেছেন?
এই কাজল খান কারো কাছে নিজের রক্তের পরিচয় দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু এর মানে এই নয়—আপনি আমার সন্তানকে অসম্মান করবেন।”
তিনি এক পা সামনে এগিয়ে এলেন।
“এই পৃথিবীতে অনেকেই প্রশ্ন করতে জানে।
কিন্তু সবাই উত্তর শোনার সাহস রাখে না।”
এই কথা বলার সময় তিনি জাওয়াদ খানের দিকে তাকালেন।
পুরো ক্যাম্পাস নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
কারণ সবাই জানে—এডভোকেট এমএলএ কাজল খানের চরিত্র। এই মুহূর্তে তিনি শুধু একজন মা নন।
তিনি এক ঝড়। যে নিজের সন্তানের সম্মানের জন্য সব করতে পারে। কিন্তু এতে নাভান আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে কাঁপা গলায় বলল—
“প্রিন্সিপাল স্যার কি ভুল বলেছে? তোমরা কেন ক্লিয়ার করছ না আমাদের পরিচয়?”
এতক্ষণ চুপ থাকা অধীর এবার বলল—
“হ্যাঁ মা, জানতে চাই। হেরা আর নাভান কি ভাই-বোন?”
অধীরের কথায় সাহস পেল রুশা।
সে জাওয়াদ খানের কাছে গিয়ে বলল—
“ছোট বাবা, এখন যদি ক্লিয়ার না করো তাহলে খুব খারাপ হবে।”
হঠাৎ কাজল খান এগিয়ে এসে অধীরকে স্বজোরে একটা থাপ্পড় মারলেন।
“আজ তোমার ভাইয়ের জন্য আবার এই ছোট মনের মানুষের সাথে দেখা হলো।”
অধীর গালে হাত দিয়ে সৃজনের দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই জাওয়াদ খান রুশার গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারলেন।
“এখানে এসেছো এসব করতে?”
অধীর অবাক হয়ে বলল—
“এই থাপ্পড়টা কি ফ্যামিলি প্যাকেজ থেকে আসছে নাকি? একজন মারলে আরেকজন ফ্রি!”
তারপর রুশার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“লাল গোলাপি… আমরা দুইজন একই ক্লাবের মেম্বার হয়ে গেলাম। তুমি টেনশন নিও না, আমি তোমার দলেই আছি।”
চলবে…
প্রেমের বাজিমাত পর্ব-২১