স্নিগ্ধবিষ | Snigdhobish

স্নিগ্ধবিষ এক রহস্যময় ও আবেগঘন গল্পের সূচনা, যেখানে অনুভূতি আর ঘটনার মিলন হয় এক সঙ্গে।

‎মাত্র আঠারো বছরের নাজহার বিয়ে হলো চৌত্রিশ বছর বয়সী তৌসিরের সঙ্গে। পরিবারের মান–সম্মান রক্ষার নামে নাজহাকে তুলে দেওয়া হলো তার হাতে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তারা ভাবল না—তারা কি মেয়েকে একজন মানুষের হাতে দিচ্ছে, নাকি এক দানবের কাছে সমর্পণ করছে। মূলত নাজহার দশ নাম্বার চাচা নো”মান তালুকদারের পছন্দ ছিল এই শিকদার বাড়ির সায়েক শিকদার, অর্থাৎ নাজহার দাদাশ্বশুরের মেয়ে সাফা কে।আর নোমান সাহেব তিনখানা বছর ধরে অসম্ভব সাধ্য করে দুই পরিবারকে মানাতে পেরেছেন।দুই পরিবার মেনে নিলেও শিকদার পরিবারের একখানা আবদারও ছিলো বটে।তালুকদাররা তো আবদারের কথা শুনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন না জানি কার কলিজা বা মগজ চেয়ে বসে!এরা তো মানুষ বটে তবে ভেতরে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট সত্তা লুকিয়ে আছে।

‎তবে শিকদাররা এবার খারাপ কিছু আবদার করেনি তারা আবদার করেছিলো একজন মেয়ে।সে তালুকদারদের যে কারো হোক, তবে মেয়ের বদলে যেনো মেয়ে তারা পায়।

‎নাজহাদের বাড়ির মেয়ে তো অনেক আছেন ওর ফুফু তিনজন এখনো কুমারী।তবে বোনদের মধ্যে ও বর্তমানে বড়, ওর বড় চাচাতো চার বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।আর শিকদাররা নিজেদের ছেলের জন্য পাত্রী চেয়েছিলেন, ভাইদের জন্য নয় । তাই নাজহার বাপ-চাচারা নাজহা কেই সঁপে দিয়েছেন।মনে করবেন না, উনারা শুধু ওর চাচার পছন্দের জন্য বিয়ে দিয়েছেন এতে জমি-জমার হিসেবটাও বেশ আছে।রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতেই এই আত্মীয়তার বন্ধন। নয়তো শত্রুর সঙ্গে কে-ই বা স্বেচ্ছায় সম্পর্ক গড়তে যায়?

‎আরো পড়ুন

‎নাজহা বিষয়টা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। ভাবতে গেলেই বুকের ভেতরটা কষ্টে মোচড় দেয়—যে মানুষটা একসময় নির্মমভাবে তার এক চাচাকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছিল, সেই মানুষটার হাতেই কীভাবে তার দাদা নাজহার জীবন তুলে দিলেন? কিন্তু নাজহা বর্তমানে নিরুপায়, উত্তরও পাবে না।জীবনে বাপ-চাচার কথার ওপর কোনো কথা বলেনি,কিন্তু বিয়ের সময় মিনতি করে বলেছিলো“আর যার সাথেই বিয়ে দাও, তাও এই পরিবারে দিও না।”ওর পনেরো জন চাচার মধ্যে কেউ তার কথা শুনেনি।সবাই বলেছেন, “এটাই তোর নিয়তি।”পনেরোজন চাচা শুনে আবার হট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন না!আসলে নাজহার দাদা আবার বেশ শৌখিন মানুষ তাই তো বিয়ে করেছেন চার খানা।আল্লাহর হুকুম বলে বলে সন্তান এনেছেন বিশ-একুশজনেরও বেশি।আগের আমলের মানুষ বলে কথা।এর মধ্যে কয়েকজন বে-নালেই মারা গেছেন, কাউকে কুপানো হয়েছে, কাউকে আবার জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে।আচ্ছা যাই হোক এখন বর্তমানে আসি।


‎নাজহা কে বাসর ঘরে ফুল সাজানো বিছানায় বসিয়ে দিয়ে গেছেন এই বাড়ির মহিলারা।কত কিছু হেনতেন- এনসেন বলে গেছেন নাজহার এসব এক কান দিয়ে ঢুকেছে, অন্য কান দিয়ে চলে গেছে।এসবে ও ভুরুক্ষেপ করেনি।সবাই ওকে লাল শাড়ি পরিয়ে লাল বউ বানিয়ে দিয়েছেন কিন্তু নাজহা এসব খুলে ধবধবে সাদা সেলোয়ার কামিজ পড়ে নিয়েছে।বউ হওয়ার শখ নেই ওর। তাও আবার নিজের চাচার খুনির জন্য বউ সাজার। নাজহার পুরো নাম ” নওরিন সিদ্দিয়া নাজহা” নাজহা কাপর বদলিয়ে রুমের বেলকনিতে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায়।বেলকনিতে সাদা পাতলা পর্দা ফেলা এ পর্দাগুলো আবার আলতো বাতাসে দুলছে।নাজহা অবাক নয়নে তাকিয়ে, হালকা পায়ে বেলকনির রেলিং এর দিকে এগিয়ে নিচের দিকে তাকায়।


‎নিচে তাকাতেই এক কর্কশ, বিশ্রী গলা কানে ভেসে এলো—

‎“রাজনীতি চেনিস না, আর এসে বসছিস রাজনীতি করতে! নামই নিয়েছিস রাজনীতির, অথচ কিছুই জানিস না!”

‎এত বিশ্রী কণ্ঠে শুনে নাজহার বুঝতে বাকি থাকে না

‎এটাই তার বর, তৌসির শিকদার ।কারণ এমন বিশ্রী গালি ওর পক্ষেই সম্ভব। একবার কিসের ভাষণ দিতে গিয়ে তৌসির চিল্লাপাল্লা থামাতে মাইকেই বলে ওঠেছিল। ” এই খা**নকির পোলারা মুখ বন্ধ কর নয়তো বোম দিয়া সবগুলারে উড়াইয়া দিমু!” আর এইটি নাজহা ভালোভাবেই শুনেছিলো। ভাবা যায় কতবড় গালি বাজ।বক্তব্য দিতে গিয়েও গালি।নাজহা নিচে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে তৌসির একটা চেয়ারে বসে আছে পড়নে সাদা পাঞ্জাবি আর কালো আর সাদার চেকের লুঙ্গি হাতে একটা লোহার বড় দা আর ওর সামনে হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে একটহ যুবক।তৌসির কথাটি বলেই নিজের হাতে।থাকা দা দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে সেই যুবকের গর্দানে ছেদ মারে।কিন্তু পুরো গর্দানটা লুটিয়ে পড়ে না মাটিতে দা ভোঁতা হওয়ায় অর্ধেক কেটে গিয়ে ঝুলে থাকে।এটা দেখে নাজহার হাত-পা তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে।কিন্তু ও ভয় না পেয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।এগুলো ও প্রথম দেখছে না। এর চেয়ে মারাত্মক দূশ্য দেখে বড় হয়েছে। যুবকটি মাটিতে লুটিয়ে চিৎকার করতে থাকে, ছটফট করতে থাকে।তৌসির কিছু সময় হাতের দা’র দিকে তাকিয়ে তা দূরে ছুড়ে মেরে আশেপাশে দাড়িয়ে থাকা নিজের পালোয়ান দের দিকে তাকিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলে,“সাউয়ার দা দিয়ে একটা গর্দানও নামাইতে পারলাম না, এই বাল চাল সরা এন তাইকা।”

‎এ বলে নিজের লুঙ্গির নিচের অংশ এক হাতে লুঙ্গির এক কোণ, আরেক হাতে অন্য কোণ ধরে সামনের দিকে একটু তুলে ধরে কোমরে গুঁজতে গুঁজতে উঠে দাঁড়ায় দাঁড়িয়ে  সেই যুবকের অর্থ মৃত দেহের কাছে যায়,তারপর ওর সামনে বসে নিজের দুই হাতে দিয়ে মাথা চেপে ধরে ওর দড় থেকে মাথা আলাদা করে দেয়।প্রাণ কে মুক্তি দেয়।


‎মাথা আলাদা করে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রক্তাক্ত ডান হাত আর বাম হাতের দিকে তাকিয়ে বলে“নে, এই মাগির পোলা রে নিয়া গাঙ্গে ভাসাই দে। রাজনীতির নামে সাউয়াগিরি করে, হালা জানোয়ার।”এই অর্ডার দিয়েই তৌসির বাড়ির ভেতর চলে আসতে থাকে তৌসির কে বাড়ির ভেতর আসতে দেখে নাজহার ভেতরে হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিটের ভাঙন শুরু হয় কারণ এখন এই লোক রুমে আসবে, আর নাজহা ওর সামনাসামনি হতে চায় না।ভয় পায় ওকে।তৌসির রুমে আসে, নিজের পুরো রুমকে এভাবে ফুলে সাজানো দেখে খানিকটা অবাক হয়।

‎চারদিকে ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে।তৌসির নিজের পড়নে থাকা সাদা পাঞ্জাবিটা খোলতে খোলতে রুমের মধ্যখানে এসে দাঁড়ায়।দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলাতে শুরু করে নতুন বউ খুঁজছে আর কি।কিন্তু ওর বউ তো নেই এখানে।তৌসির পাঞ্জাবিটা বিছানায় ছুড়ে মারতে মারতে আপনমনেই বলে”কি রে কই গেলো তালুকদারের মাইয়া ঐডি?”তৌসির সন্দেহ নিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়,

‎আর তখনই কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখতে পায়।


‎নাজহা দাঁড়িয়ে আছে, ওর দিকে তাকিয়ে।সাদা ধবধবে একটা থ্রি-পিস পরা।ফর্সা চেহারা, সুন্দর মুখের গঠন।

‎নাক-মুখ চুরির মতো ধারালো।তবে এগুলোতে তৌসিরের কিছু যায় আসে না বহুত সুন্দরী নারীর শরীর কেনা-বেচা করে অভ্যস্ত তৌসির।কিন্তু তৌসির খানিকটা আটকে যায় আর কিসে?নাজহার চুল খোপা করে বাঁধা, তবুও কিছু কোঁকড়ানো গোছা আলগা হয়ে কাঁধের পাশে নেমে এসেছে। চুলের রং একেবারে কালো নয়—হালকা বাদামি আভা মেশানো। কিন্তু তার চোখই যেন সবচেয়ে রহস্যময়। গভীর সবুজাভ মণির ভেতরে ধূসর-নীলের ছায়া লুকিয়ে আছে। চারপাশে পাতলা বাদামি রিং, আর চাঁদের আলো পড়তেই সেই চোখের গভীরে যেন নরম সোনালি ঝিলিক জ্বলে ওঠে। সাদা অংশ স্বচ্ছ, আর ঘন লম্বা পাপড়ি চোখ দুটিকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। তৌসির অনেক সুন্দরী দেখেছে বটে, তবে এমন সৌন্দর্য। চারপাশে আলাদা আভায় ভরা এই সৌন্দর্য প্রথম দেখলো।তার ওপর আবার নিজের বউ রূপেই।কিন্তু কথাটা হলো, ও যতই সুন্দর হোক, ও তো শত্রু বাড়ির মেয়ে। তৌসির ওকে চোখ দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে থাকে এটা দেখে নাজহা নিজের হাত কচলাতে থাকে।


‎আরো পড়ুন


‎মনে মনে ঠিক করেছে তৌসির যদি কিছু করতে আসে, তাহলে পাশে রাখা টেবিলের কাচের জগ আর গ্লাস দিয়ে তাকে মেরে ফেলবে।মানে নিজেকে শান্তনা দিচ্ছে ঐ আর কি।তৌসির লুঙ্গির নিচের অংশটা একটু তুলে হাতে ধরল। ধীরে ধীরে নাজহার দিকে এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলল,

‎“এই… তুমি সত্যিই ছিদ্দিকের মেয়ে?”

‎তৌসিরের এই কথা শুনে নাজহা ভড়কে যায়। কী প্রশ্ন এটি? নাজহা হঠাৎ থমকে গিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাল। তারপর কাঁপা গলায় বলল,

‎“হ… হ্যাঁ, কেন? কোনো সন্দেহ?”


‎তৌসির নাজহার দিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ, সন্দেহ তো বটেই। কারণ তোমার বাপ তো কাইল্লা, তাইলে তুমি ধলা কেমনে?”


‎নাজহা তৌসিরের কথা শুনে তিক্ত স্বরে বলল,

‎“আমার আব্বা কালো না, শ্যামলা।”

‎তৌসির ব্যাঙের মতো কর্কশ হাসি হেসে বলল,

‎“ঐ শ্যামলা আর কাইল্লা—সবই তো এক কথা!”

‎তারপর নাজহার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস ফেলল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বলল,

‎“সবই দয়ালের খেলা, বুঝলা? তা না হলে আমার মতো কাইল্লার কপালে তোমার মতো রূপঝরা রূপরানী জুটে—এটাও তো কম ভাগ্যের কথা না!”

‎নাজহা এক পলক তার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

‎“আপনি যদি কালো হন, তাহলে কালো মানুষদের কী বলবেন? তবে একটা কথা ঠিক—আপনি কালো না হলেও আপনার অন্তরটা ঠিকই কালো।”

‎নাজহার কথা শুনে তৌসির ভ্রু কুঁচকে গেল। খানিকটা ঝুঁকে কড়া গলায় বলল,

‎“আমার অন্তর কালা—এইডা তুমি ক্যামনে জানলা?।


‎নাজহা ঠান্ডা গলায় বলল,

‎“কেন? একটু আগেই তো দেখলাম—কতটা নিকৃষ্টভাবে একজন মানুষকে খুন করলেন। আপনার অন্তর ভালো হলে কি এভাবে খুন করতে পারতেন?”

‎নাজহার কথা শুনে তৌসির হালকা হাসল। তারপর উদাসীন ভঙ্গিতে বলল,

‎“তুমি এখনো অনেক ছোট। এসব যা দেখছো, ভুলে যাও। যাও, চুপচাপ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”

‎তৌসিরের কথায় নাজহা থমকে গেল। কথাগুলো যেন তাকে অদ্ভুত এক লজ্জা আর অপমানে ডুবিয়ে দিল। যেন তার বোঝাপড়াকেই তুচ্ছ করে দেওয়া হলো।

‎নাজহা নিজের কালচে-সবুজ চোখে একরাশ অবুঝ বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে আবার তৌসিরের দিকে তাকাল। এই তাকানোতে খানিকটা থমকে যায় তৌসির। মনে মনে প্রশ্ন জাগে, তালুকদাররা ভিন্ন দেশি কাউরে আবার ওর বউ বানাইয়া দিলো না তো? কারণ এই মেয়েটারে দেখতে ইংলিশ ইংলিশ লাগতেছে। তৌসির নাজহাকে আবারও প্রশ্ন করে, “তুমি সত্যিই তো তালুকদারের মাইয়া?”


‎তৌসিরের কথায় নাজহা বিরক্ত হয়ে উঠল। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,

‎“হ্যাঁ! কেন একই প্রশ্ন বারবার করছেন?”


‎তৌসির হালকা দাঁত চেপে বলে, “তোমার বাপ চাচা সবগুলাই তো গাদ্দারের ধরা, তাই মনে হইলো নিজের সম্পদ না দিয়া অন্য কারো সম্পদ ঝুলাইলো না তো আমার গলায়!”


‎নাজহা আর চুপ থাকতে পারে না। এইসব কথায় নাজহা বলতে না চাইলেও বলে ফেলে, “আমার বাপ চাচাকে অসম্মান করে কথা বলবেন না!”


‎নাজহার কথা শুনে তৌসির তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল। ঠোঁটে এক কটু হাসি ভেসে উঠল এবং কণ্ঠে তীক্ষ্ণ বিদ্বেষ:

‎“তোমার বাপ-চাচা সবই খাঁ*নকির মতো। তাদের কোনো সম্মান নেই। ওইসব সাউয়াগুলো সব বেইজ্জত!”


‎এমন বিশ্রী গালি শুনে নাজহার শরীরে রাগে জ্বলতে শুরু করে। নাজহা দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তৌসিরের পানে তাকিয়ে শক্ত সুরে বলে, “নিজের মুখে লাগাম টানুন!”


‎তৌসির নাজহার উপদেশ শুনে টিটকারির সুরে বলল,

‎“দুঃখিত, দুঃখিত! আমি ভেরি দুঃখিত… বাচ্চাদের সামনে গালাগালি করা আসলেই উচিত নয়!”

‎নাজহা ভ্রু কুঁচকে শুনল। ‘ভেরি দুঃখিত’—এটা সে আগে শোনেনি, আর এই প্রথম যে তৌসির ওকেই ‘বাচ্চা’ বলল! মনে হলো কথার সঙ্গে একটা অদ্ভুত হাস্যরস মিশে গেলেও, হালকা লজ্জা কেটে যায় না। নাজহা কাঠ গলায় বলে, “আমার বয়স যথেষ্ট এবং আল্লাহর হুকুমে আমি যথেষ্ট বুঝদার!”


‎তৌসির নাজহার কথায় দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর আফসোসের সুরে বলে, “হালার পুত গো, কাছে চাইলাম বউ আর ওরা আমার গলায় ঝুলাই দিলো লেদা বাইচ্ছা!”


‎এ বলেই সে আসমানের দিকে তাকিয়ে দুই হাত বুকের সামনে তুলে নাজহার দিকে তাকাল এবং কণ্ঠে তেজ মেশিয়ে বলল,

‎“সবই দয়ালের খেলা, বুঝলা তালুকদারের মাইয়া! ইচ্ছে ছিলো তোমার দাদার মতো বাইচ্চা কাইচ্চা দিয়া বংশ ভরাইয়া দেওনের। কিন্তু তোমার যে বয়স আর বুঝ, এইডায় আমি এক বাচ্চার বাপও হইতে পারমু কি না সন্দেহ আছে!”


‎নাজহা তৌসিরের কথায় এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই মানুষটি কি বলছে সব?

‎নাজহা কিছু বলতেই তৌসির উচ্চস্বরে বলে উঠল,

‎“যাও, ঘুমাও গিয়া। বাসর টাসর এসব জীবনে হইবো না! এগুলো করলে তুমি বাঁচতে পারতে না!”

‎নাজহার মনে লেগে যায়। চোখে ঝলক ধরে, কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা মেশিয়ে সে বলল,

‎“নিজের মুখ সামলানো শিখো, নয়তো ঘাঁ হয়ে যাওয়া কোনো দোষ হবে না!”

‎এই বলে নাজহা রুমের দিকে এগিয়ে আসে। কিন্তু রুমে ঢুকতেই হতাশ হয়—কোথাও বসার মতো সোফা নেই। ভাবতে থাকে, এরা এত বড়লোক, অথচ এমন ছোটলোকি আচরণ কেন? ঘরটা বেশ বড়সড়, তবে এখানে ঝাঁকঝমক কিছু নেই। একখানা নরম তোষকে মুড়ানো বড় বিছানা, একটা কাঠের আলমারি, একটা ওয়ারড্রব, তার পাশে ছোট্ট বুকশেলফ আর বেলকনির দরজা সাইডের দেয়ালে জানালার সামনে একটা চেয়ার টেবিল। নাজহা এখন খুঁজে পায় না ও কোথায় ঘুমাবে। তৌসির পিছন থেকে এসে বলে, “আমার লগে এক বিছানায় চাইলে ঘুমাইতে পারো, না চাইলে ঐ টেবিলের কোনায় পাটি রাখা আছে, এইটা বিছাইয়া নিচে ঘুমাও।”


‎নাজহা তৌসিরের কথার পর আর তার দিকে তাকায় না। ধীরে ধীরে পাটি হাতে নিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়। মেঝের উপর কোনো কার্পেট নেই, শুধু খাঁটি টাইলস। এসব অভ্যস্ত নয় নাজহার জন্য, তবু সে পাটি ঠিকঠাক করে বিছানার দিকে তাকাল। সেখানে রাখা আছে কাঁথা। উঠে গিয়ে কাঁথা আর বালিশ নিয়ে মেঝেতেই জায়গা তৈরি করল।

‎তৌসির লাইট নিভিয়ে বিছানায় উঠতে উঠতে ধীরে বলল,

‎“রাতে ঘুম ভাঙলে বিছানার দিকে আবার তাকাই টাকাও না। লুঙ্গির নিচে কিছু পরি টরি না, লুঙ্গি আবার কান্ধে উঠিয়া যাইতে পারে।”


‎নাজহা তৌসিরের কথার কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ বালিশে মাথা রেখে থাকে। এক ঘরে এক কুমিরের মতো তৌসিরের সঙ্গে থাকা—ঘুম কি আর আসবে? মনে হচ্ছে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিশ্বাস যেন তাকে জাগ্রত রাখছে। ভেতরটা খচখচ করছেই তো করছেই। আর খচখচ করার একটাই কারণ, তা হলো নিজের বাপ চাচার স্বার্থপরির কথা। তারা কীভাবে ওর জীবনটা এভাবে শেষ করে দিতে পারলেন? একটুও কি দয়া মায়া নেই? নাজহা ভেবেছিল অন্তত মাস্টার চাচ্চু, লাল চাচ্চু আর ছোট চাচ্চু বুঝবেন। কিন্তু অবাক করার বিষয়, তারা-ও বুঝল না।

‎মাস্টার বলতে নাজহা স্কুলের মাস্টারকে বোঝাচ্ছিল না—উনি ইংরিশে মাস্টারি দিচ্ছেন সেই কারণে সবাই তাকে ‘মাস্টার চাচ্চু’ বলে সম্বোধন করে। আর লাল চাচ্চু বলতে, তিনি রেগে গেলেই লাল হয়ে যান, সুন্দর বেশি তাই লাল চাচ্চু ডাকা। নাজহার ভেতর ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। তৌসিরের মুখের ভাষা খুব খারাপ, শুধু তৌসিরের নয়, তাদের বাড়ির সবারই এমন, শুনেছে নাজহা। নাজহা খুঁজে পায় না এই প্রশ্নের উত্তর, এই বাড়ির মানুষগুলো এত খারাপ হয়েও এমপি, মন্ত্রী, মেয়র হয় কীভাবে? তাও এক পরিবার থেকে


‎নাজহার স্বপ্ন ছিল ইন্টার দিয়ে আইইএলটিএস ইংল্যান্ড গিয়ে  ভার্সিটিতে পড়তে। ইংল্যান্ড যাওয়ার অনেক ইচ্ছে ওর, কারণ ওখানে গেলে যে নিজের জন্মদাত্রী মাকে দেখতে পাবে এক নজর। আসলে ওর বাবা-মা আলাদা থাকেন। ওর বাবা নিজের খালাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি ব্রিটিশ। নাজহার নানা ব্রিটিশ আর নানু বাংলাদেশি। নাজহার বাবা দেশে থাকতে চান আর নাজহার মা নিজের দেশে যেতে চাইতেন বারবার, তাই একসময় এই চাওয়া না চাওয়ার সমাপ্তি বিচ্ছেদে গিয়ে ঠেকে। নাজহার জমজ ভাই নাজহারকে নিয়ে চলে যান নাজহার না নাওলা ইংল্যান্ড আর নাজহা থেকে যায় দেশে। ছোট ছিল, তখন বুঝেনি ওত কিছু, ফুফু দাদীজানরা যা বুঝিয়েছেন সেই বুঝেই থেকে গেছে। তবে থেকে যাওয়াতে ওর কোনো অবহেলা হয়নি, ওর বাপ চাচারা পুতুলের মতো যত্নে বড় করেছেন ওকে। বাবার চোখের মণি ছিল, তবে সেই মণি কেউ এক সাপের হাতে তুলে দিয়েছেন। নাজহার চাচীরা মায়ের অভাব বুঝতে দেননি ওকে, সবসময়ই আগলে বড় করেছেন। নাজহা বছরে হয়তো দুদিনও নিজের চুল নিজে আঁচড়ায়নি, ওর চুলগুলো বেশ সুন্দর, আলাদা। সে জন্য ওর বড় আম্মা এই চুলের যত্ন অসম্ভব রকম নেন। পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কন্যা সন্তান, তাই ওকে সবাই আলাদাই যত্ন করতেন। কিন্তু কী হলো, এত ভালোবাসা দিয়ে দিনশেষে এক দানবের হাতেই তো তুলে দিলেন! নাজহার যদি তাক্কত থাকতো তবে ওর আব্বার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতো, “আব্বা, নিজের যত্নে গড়া ফুলকে এভাবে ঝড়িয়ে দিতে একটুও কষ্ট হয়নি আপনার?”

‎কিন্তু আফসোস, এই প্রশ্নটা স্বপ্নেও করা সম্ভব কিনা, তাতেও নাজহার সন্দেহ আছে। নাজহা এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে চোখ লাগায়।

‎কিছু সময় পর।
‎রাত এখন দুটোর কাছাকাছি। তৌসির ওয়াশরুমে যাবে, ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমঘুম চোখে উঠে বসে বিছানা থেকে, লুঙ্গি ঠিক করে নামতে নামতে ফিসফিসিয়ে বলে, “সাউয়ার এক যন্ত্রণার লাইগা ঘুমাইতেও পারি না।”

‎এ বলেই উঠে ওয়াশরুমের দিকে যাবে, তখনই নরম কিছু একটার উপর পা পড়ে তৌসিরের সাথে সাথে মড় করে একটা শব্দ হয় একই সাথে নাজহা চিৎকার করে উঠে। তৌসির নাজহার টাখনুর উপর অজান্তেই পা রেখে দিয়েছিল, ঘুমের তালে ভুলে গিয়েছিল যে ওর রুমে এখন নাজহা আছে, তাও মেঝেতে শুয়ে!

‎চলবে,,,
স্নিগ্ধবিষ
‎পর্ব-১
‎সানজিদা আক্তার মুন্নী

স্নিগ্ধবিষ পর্ব-২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *