‎পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-২ | Purnohin Purnota Part-2

পূর্ণহীন পূর্ণতা — অপূর্ণতার মাঝেও ভালোবাসার গল্প

পূর্ণহীন পূর্ণতা

লেখিকা সুমি চৌধুরী

পর্ব ২

সারা মাঝরাস্তায় একদম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত রাফসান প্রচণ্ড রাগী আর গম্ভীর, কিন্তু সেই রাফসান যে এমন কুটিল নাটক করে তাকে মাঝরাস্তায় অপদস্থ করতে পারে, তা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। অপমানে সারার কানঝাঁঝাঁ করছে। তার ঘোর কাটল রোহানের কণ্ঠস্বরে।।

রোহান কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, “সারা, এখনো দাঁড়িয়ে আছো? বাসায় যাবে না?”

সারা জোর করে ঠোঁটে একটা হাসি ফুটিয়ে রোহানের দিকে তাকাল। সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। সে নিচু স্বরে বলল, “জ্বি ভাইয়া, এই তো রিকশায় উঠব।”

রোহান একটু ইতস্তত করে বলল,
“ওহ আচ্ছা, এক মিনিট… আমি ডেকে দিচ্ছি।”

রোহান একটু এগিয়ে গিয়ে দূর থেকে একটা রিকশা ডেকে সারাকে তুলে দিল। সারা রিকশায় উঠে এক পলকও পিছনে তাকাল না। রিকশাটা তাকে নিয়ে ধীরগতিতে এগোতে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সোজা বাড়ির সামনে এনে নামাল।সারা অত্যন্ত ধীরপদে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকতেই দেখল ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে রায়ান চৌধুরী বেশ মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। সারা পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে ওনার সামনে দাঁড়াল এবং নিচু স্বরে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম, আব্বু।”

আরো পড়ুন

রায়ান চৌধুরী খবরের কাগজ থেকে মাথা তুলে সারার দিকে তাকালেন। সারাকে দেখে তিনি কাগজটা ভাজ করে পাশে রেখে সস্নেহে বললেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আজ আসতে তোর কোনো সমস্যা হয়নি তো মা?”

ভেতরে তোলপাড় চললেও সারা মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না, আব্বু।”

রায়ান চৌধুরী একটু থামলেন, তারপর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “যাক। আর তোর সাথে রাফসানের দেখা হয়েছিল?”

সারা কোনো কথা না বলে শুধু মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক ইশারা করল। রায়ান চৌধুরী সারার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তিত স্বরে বললেন, “আজকেও কি বকেছে তোকে?”

সারা একটা লম্বা শ্বাস নিল। গালের চড় আর রাস্তার সেই অপমানের কথা মনে পড়তেই ওর ভেতরটা হাহাকার করে উঠল, কিন্তু সে সব চেপে গিয়ে শান্ত গলায় বলল, “না আব্বু, বকেনি।”

রায়ান চৌধুরী আশ্বস্ত হয়ে হাসলেন। তিনি জানতেন না যে তাঁর ছেলের দেওয়া ক্ষতের দাগ সারা ওড়না দিয়ে আড়াল করে রেখেছে। তিনি বললেন, “শুনে খুশি হলাম। যা, হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।”

সারা মাথা নিচু করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে রুমে চলে গেল।

এদিকে রাফসান বাইক নিয়ে সোজা তার ফ্ল্যাটের সামনে এসে থামল। রাফসান চৌধুরী বাড়িতে থাকে না। সে শহরের এক অভিজাত এলাকায় বিশাল এক ফ্ল্যাটে থাকে। বাড়িতে তার একদম ভালো লাগে না, আর সব থেকে বড় কথা বাড়িতে থাকলে রায়ান চৌধুরী এটা-সেটা নিয়ে পড়াশোনাই বকাঝকা করবেন, যা রাফসানের দুচক্ষুর বিষ। তাই পরিবারের থেকে দূরে থাকতেই সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।রাফসানের সাথে এই ফ্ল্যাটে রোহানও থাকে। রোহানের কেউ নেই, সে গ্রাম থেকে শহরে পড়তে এসেছে। গ্রামে শুধু তার এক চাচা আর চাচি আছেন। রোহানের পড়াশোনা আর থাকার প্রায় সব খরচই রাফসান চালায়। রোহান চাইলেও বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারছিল না। তবু রাফসান যে ছাড়ার পাত্র নয়, সেটা সে জানত। তাই বন্ধুত্বের টানেই শেষ পর্যন্ত তাকে মেনে নিতেই হলো।

রাফসান ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। কোমরে শুধু একটা সাদা তোয়ালে জড়ানো। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, আর সেই পানি ওর সুঠাম চওড়া বুকে আছড়ে পড়ে মুক্তোর মতো চকচক করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রোহানও ফ্ল্যাটে চলে এলো। সে সরাসরি রুমে ঢুকে রাফসানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।

“এইটা তুই কি করলি?”

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছছিল রাফসান। খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“হোয়াট? আমি আবার কী করলাম?”

রোহানের চোখেমুখে রাগের ঝলক স্পষ্ট। ফুঁসতে ফুঁসতে সে বলল,
“সারাকে মাঝরাস্তায় এভাবে অপমান করলি তুই? একবারও কি মনে হলো না—ও এখনো ছোট? হোয়াই রাফসান? হোয়াই সো মাচ হার্শ?”

রাফসান আয়নায় নিজের নীল চোখের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল। তারপর নির্লিপ্ত গলায় বলল, ” আমার ইচ্ছে হয়েছে করেছি। আই ডোন্ট স্পেয়ার এনিওয়ান।”

রাফসানের কথা শুনে রোহান রাগে গজগজ করতে করতে বিছানা থেকে তোয়ালেটা এক হ্যাঁচকায় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই একগুঁয়ে রাফসানের সাথে তর্কে গিয়ে কোনো লাভ নেই। তার মাথায় একবার যা জেদ চাপে, তা সে করেই ছাড়ে।রাফসান আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবিটা দেখল। তারপর বাঁকা একটা হাসি দিয়ে ব্যাঙ্গ করে বলল।

নাকে টিপে দিলে এখনো দুধ বের হবে, আর সেই মেয়ে নাকি আমাকে ইউজ করছে!”।”

রাগে রাফসানের নীল চোখ দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে। সে আলমারি থেকে একটা কালো শার্ট বের করতে করতে বিড়বিড় করে বলল, “イッツ জাস্ট দ্য বিগিনিং। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ বেবি, হাউ আই মেক ইওর লাইফ আ লিভিং হেল।”

সন্ধ্যার পর রায়ান চৌধুরী বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে রাফসানের নাম্বারে কল দিলেন। রাফসান তখন রাস্তার ধারে রোহান আর আরও কিছু পোলাপানের সাথে বাইকে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ ফোন বাজতেই পকেট থেকে ফোন বের করে বাবার নাম্বার দেখে কয়েক ঢোক গিলল সে। রাফসান সবাইকে হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বলে নিজেকে স্বাভাবিক করে কল রিসিভ করে বলল।

আরো পড়ুন

“আসসালামু আলাইকুম আব্বু।”
ওয়ালাইকুম আসসালাম। রাফসান, তুমি এখনই বাসায় যাও। আমি একটা মিটিংয়ে যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে। সারা একা আছে, ভয় পেতে পারে। তুমি এখনই যাও—আমি ফিরলে তখন আসো।”

রাফসান প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই রায়ান চৌধুরী কড়া গলায় বললেন, “নো। আমি কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাই না রাফসান। তুমি এখনই বাড়ি যাবে মানে যাবে। দ্যাটস মাই অর্ডার।”

কথাটা বলেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে গেল। রাফসান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাইকের টায়ারে সজোরে একটা লাথি মারল। ওর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

রোহান অবাক হয়ে বলল, “কী হয়েছে রাফসান? আংকেল কিছু বলেছে?”

“ড্যাম ইট! আব্বু অর্ডার দিয়েছে—এখনই বাড়িতে যেতে হবে। ওই আপদটা নাকি একা আছে, তাই আমাকে গিয়ে পাহারা দিতে হবে। আই জাস্ট ক্যান্ট বিলিভ দিস! আমার কি আর কোনো কাজ নেই? শি ইজ সো অ্যানোয়িং।”

রোহান বিরক্ত হয়ে বলল, “রাফসান, ওকে আপদ বলিস কেন? ভুলে যাস না, আঙ্কেল সারাকে কতটা ভালোবাসেন। তিনি ওকে নিজের মেয়ের মতো মনে করেন, সেই হিসেবে সারা তোর বোন লাগে।”

রাফসান এক হাত দিয়ে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর চোখেমুখে ফুটে উঠল চরম অবজ্ঞা। সে বাঁকা গলায় বলল।

“কে বোন? ওই পেত্নীটা? হাসাইলি আমাকে। শোন রোহান, জাস্ট গেট দিস ক্লিয়ার। ও জাস্ট একটা রাস্তার মেয়ে, আমার বাবার দয়ায় আমাদের বাড়িতে অন্ন ধ্বংস করে বেঁচে আছে ও। আর ওই রাস্তার মেয়ে কি না হবে রাফসান চৌধুরীর বোন? ইন হার ড্রিমস। শি ইজ নাথিং বাট আ ডাস্ট আন্ডার মাই ফিট।”

“আরে শা*লা, এত অহংকার যে দেখাচ্ছিস, বোন বলে স্বীকার করছিস না। দেখবি বোন না, একদিন এই মেয়েই তোর বউ হয়ে ঘরে আসবে। ভাগ্য না চাইলে কি না পারে?”

মাসরাফির কথা শেষ হতেই আশেপাশের সব পোলাপান একসাথে হেসে উঠল। কেউ কেউ শিস দিয়ে রাফসানকে আরও খেপানোর চেষ্টা করতে লাগল। রাফসানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে রাগে মুখটা কুঁচকে বাইক স্টার্ট দিল এবং বিরক্তির সুরে বলল।

‎”ডিসকাসটিং। তোদের রুচি এত চিপ যে ওই জংলি মেয়েকে নিয়ে এসব ফালতু কথা বলতে পারিস? ছিহ্ তোদের মুখে থুথু মারি আমি।”

‎বলেই রাফসান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। বাইকের গতি বাড়িয়ে ওখান থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। মাসরাফির বলা ‘বউ’ শব্দটা ওর কানে বার বার বাজছে আর ওর পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। ও মনে মনে বলল, “রাফসান চৌধুরী আর ওই ভিখারি মেয়ে? ইটস এন ইমপসিবল থিং।”

‎আরেকটা কথা বলাই হয়নি রাফসানের মা নেই। রাফসান যখন ক্লাস টেনে পড়ে, তখনই ওর মা পরপারে চলে গেছেন। রায়ান চৌধুরী এরপর আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি, শুধুমাত্র রাফসান আর সারার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তিনি একাই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন।

‎রাফসান বাড়িতে ঢুকে দেখল সারা ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে বেশ আয়েশ করে পাপড় খাচ্ছে আর গভীর মনোযোগ দিয়ে টিভিতে একটা মুভি দেখছে। সারাকে ওভাবে শান্তিতে বসে থাকতে দেখে রাফসানের রাগে গা জ্বলে উঠল। সে এক পা এগিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই থমকে দাঁড়াল। দেখল, সারা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আসলে টিভিতে তখন একটা ভয়ংকর ভূতের মুভি চলছে সারা ভয় পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কৌতূহলবশত চ্যানেল পালটাচ্ছে না।

‎মুহূর্তেই রাফসানের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে একদম নিঃশব্দে পা টিপে টিপে হল রুমের মাল্টিপ্লাগের কাছে এগিয়ে গেল। তারপর ‘টুস’ করে হল রুমের মেইন সুইচটা নিভিয়ে দিয়ে পুরো ঘর অন্ধকার করে দিল। হঠাৎ বাতি নিভে যাওয়ায় সারা আতঙ্কে জমে গেল। তার বুক ধড়ফড়ানি কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

‎সারা অন্ধকারে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতড়ে আশেপাশে তাকাল। সে বুঝতে পারছে না হঠাৎ বাতিটা কে নিভালো। অন্ধকারে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না, শুধু টিভির নীলচে আলোয় আসবাবপত্রগুলো অদ্ভুত দেখাচ্ছে। সারার প্রচণ্ড ভয় লাগছে। কাজের লোকগুলোও তাদের কাজ শেষ করে আগেই চলে গেছে। এই বিশাল বাড়িতে সারা এখন একদম একা আর ওর ঠিক পিছনেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে এক ‘হিটলার’।

‎চলবে…!

পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব -৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *