
পূর্ণহীন পূর্ণতা
লেখিকা সুমি চৌধুরী
পর্ব ৩
সারা সোফা থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলালো। কিন্তু নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে সে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। সারা নিজের বুক ধড়ফড়ানি থামানোর চেষ্টা করে অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে বলল।
“ক ক কে কে এখানে। কো কোন সাহসে বাতি নিভালো। সাহস থাকলে সামনে আসেন।”
রাফসান আড়ালে দাঁড়িয়ে সারার গলার স্বর শুনেই বুঝে নিল সারা ভেতরে ভেতরে একদম শেষ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে সারাকে এভাবে নাস্তানাবুদ করতে রাফসানের কাছে পরম তৃপ্তি লাগছে। সে সারাকে আরও আতঙ্কিত করতে একদম অশরীরী আত্মার মতো গলাটা অসম্ভব রকম ভারী আর ভয়ংকর করে কুহক হাসি দিয়ে টেনে টেনে ডাকল।
“সা-রা-হ-হ-হ-হ… তো-র-র ম-রণ স-ম-য় হো-য়ে-ছে-ছে-ছে সা-রা-হ-হ-হ… পা-লা-বি-বি কো-থা-য়-য়-য়।”
রাফসানের সেই অমানুষিক গম্ভীর শব্দটা বড় হলরুমের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করল। মনে হচ্ছে যেন অন্ধকার দেয়ালগুলো কথা বলছে। সারা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দুই কানে হাত দিয়ে সজোরে চিৎকার করে উঠল।
“আহহহহ। ভ ভুত… ভুত। বাঁচাও… কেউ বাঁচাও আমাকে।”
রাফসান তবুও থামল না। সে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে সারার আরও কাছে সরে এল। রাফসান এগোতে এগোতে অশরীরী আত্মার মতো ফিসফিস করে হিমশীতল কণ্ঠে বলল।
“সা-রা-হ-হ-হ… তো-র-র ঘাড় আজ আ-মি ম-ট-কি-য়ে-য়ে দি-বো-বো… তো-র-র ত-প্ত র-ক্ত কা-ঁচা চি-বি-য়ে খাবো-বো-বো… হা-হা-হা-হা।”
সারা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে চোখ তুলে সামনে তাকাল। আবছা অন্ধকারে দেখল একটা বিশাল লম্বা কালো অবয়ব। মুহূর্তে সারা ভয়ে জমে পাথর হয়ে গেল। সেই ছায়াটা ধীরে ধীরে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। সারা যেন ভয়ে নড়তেও ভুলে গেল, তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। অবয়বটা যখন সারার একদম কাছে এসে ওর গলা টিপে ধরার জন্য হাত বাড়াল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সারা চরম আতঙ্কে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।সে বাঁচার চেষ্টা হিসেবে খপ করে সেই অবয়বটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। সারার দুই হাত রাফসানের পিঠের দিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, আর মাথাটা রাফসানের বুকের ওপর। সে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে আর বলছে।
কাঁপা গলায় সে বলল,
“আমাকে মেরো না, ভূত দাদু… দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে দাও!”
আচমকা এমন ঘটনায় রাফসান একদম হকচকিয়ে গেল। সে তো চেয়েছিল সারাকে ভয় দেখিয়ে মজা নিতে, কিন্তু সারা যে ওকে এভাবে জড়িয়ে ধরবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। রাফসান যেন একটা জীবন্ত মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীরের ওপর সারার নরম হাতের স্পর্শ আর ফোঁপানোর শব্দে হঠাৎ করেই তার বুকের হার্টবিট কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ধকধক শব্দটা সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে। রাফসান বুঝতে পারছে না হঠাৎ তার হার্টবিট এমন করছে কেন।
ধীরে ধীরে রাফসানের হুঁশ ফিরে এলো। সে খেয়াল করল সারা তখনো আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে ডুকরে কাঁদছে। মুহূর্তেই রাফসানের মনে হলো কোনো এক অপবিত্র স্পর্শ তাকে কলুষিত করছে, আর সেই রাগে ওর সারা শরীর জ্বলে উঠল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সারাকে সজোরে এক ধাক্কা মারল। হঠাৎ এমন প্রচণ্ড ধাক্কায় সারা ছিটকে গিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কোমরে প্রচণ্ড চোট পেয়ে সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল।
“আহহহ। মাগো… আমার কোমরটা গেল রে।”
রাফসান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অন্ধকারের মাঝেই সারার দিকে আঙুল তুলে গর্জে উঠল,
“হাউ ডেয়ার ইউ! তোর এত সাহস হলো কী করে—আমাকে জড়িয়ে ধরিস? তোর এই নোংরা শরীর নিয়ে আমাকে টাচ করার দুঃসাহস পেলি কোথা থেকে? জানিস তুই কার গায়ে হাত দিয়েছিস?”
সারা যন্ত্রণায় কুঁকাচ্ছিল, কিন্তু রাফসানের পরিচিত কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনে সে চমকে উঠল। অন্ধকারের মাঝেই সে রাফসানের অবয়বটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তার মানে এতক্ষণ কোনো ভূত ছিল না, এই পাষাণ লোকটা তাকে ওভাবে ভয় দেখিয়েছে। এটা বুঝতে পারার সাথে সাথে অপমানে আর রাগে সারার শরীর রি রি করে উঠল। যদিও সে রাফসানকে যমের মতো ভয় পায়, তবুও এমন অমানবিক কাণ্ডের পর সে আর চুপ থাকতে পারল না। সে এক ঝটকায় কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
“আপনার সাহস সত্যিই কম না… আমাকে একা পেয়ে এভাবে আমার জীবন নিয়ে খেললেন? আপনি কি জানেন, আপনার এই নিচু কাজটার জন্য ভয়ে আমার কিছু হয়ে যেতে পারত? কীভাবে পারলেন আপনি?
রাফসানের সারা শরীর রাগে রি রি করে উঠল। সারা তার সাথে তর্ক করছে। একে তো সে কারো স্পর্শ একদম সহ্য করতে পারে না, তার ওপর এই মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে কথা বলছে। রাফসান এক মুহূর্ত দেরি না করে অন্ধকারের মাঝেই এগিয়ে এসে কষিয়ে সারার গালে একটা থাপ্পড় মারল। থাপ্পড়ের চোটে সারা টাল সামলাতে না পেরে সোফার ওপর আছড়ে পড়ল। রাফসান রাগে দাঁতে দাঁত চেপে সারার একদম কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বিষাক্ত গলায় বলল।
“আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস। আমাদের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে থেকে, আমার বাবার দয়ায় দুবেলা খেয়ে আবার আমার সাথেই পাল্লা দিচ্ছিস। রাস্তা থেকে আব্বু তোকে কুড়িয়ে এনেছে বলে নিজেকে কী ভাবিস। এই বাড়ির মালকিন। শোন, যতই আব্বু তোকে এই রাজমহলে রাখুক না কেন, তোর রক্তে ওই নোংরা রাস্তারই গন্ধ লেগে আছে। তুই জন্মেছিস নর্দমায়, আর মরবিও ওখানেই। জাস্ট বিকজ ইউ লিভ ইন আ প্যালেস, ডাজেন্ট মিন ইউ আর আ প্রিন্সেস। ইউ আর নাথিং বাট আ প্যাথেটিক বেগার। কিপ ইওর ডিসটেন্স ফ্রম মি, অর আই উইল মেক ইউর লাইফ ওর্স দ্যান ডেথ।”
কথাটা বলেই রাফসান অন্ধকারের মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেল। সারা গালে হাত দিয়ে সোফাই বসে ডুকরে কেঁদে উঠল। রাফসানের কথাগুলো যেন তপ্ত সিসার মতো ওর কানে বাজছে। অন্ধকারে একা একা সারার কান্নার শব্দটা পুরো ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, কিন্তু সেই কান্না শোনার মতো কেউ ছিল না।
চলবে…!