তোমাতেই আসক্ত ২ পর্ব-২ | Tomatei Asokto 2 Part-2

ভালোবাসার টান ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে, আর অনুভূতির জালে জড়িয়ে পড়ে দুইটি হৃদয়।

তোমাতেই আসক্ত ২

পর্ব:২

তানিশা সুলতানা 

হাফিজুর রহমান চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র কর্ণধার। 

ছোট বেলায় ভীষণ দুষ্টু এবং বখাটে ছিলেন। বাবা দরিদ্র কৃষক। তাদের সংসারে সদস্য সংখ্যা ছিলেন মোট ৯ নয়। চার ভাই তিন বোন বাবা এবং মা। ১৭ বিঘা ফসলি জমি ছিলেন৷ সেখানে চাষ করতেন তিন ভাই এবং বাবা। হাফিজুরের কাজ করতে ভালো লাগতো না। তারওপর ধুমপানের নেশায় আসক্ত হয়। কিন্তু বিড়ি কেনার টাকা ছিলো না। শেষমেশ চুরি করা শুরু করলো। 

কারো মাঠের ফসল তো কারো বাড়ির থালাবাসন সবই চুরি করতেন। ধরাও পড়েছে বহুবার। 

শেষবার গরু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লো। বিশাল বিচার সভা বসানো হলো। এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হলো। বিচারের রায় ঘোষণা হলো “১০০ বার কান ধরে উঠবস করতে হবে এবং থু থু ফেলে আবার চেটে তুলতে হবে”

তাতে হাফিজুর রাজি হলো না। বরং সে বলে

“আমি এটা করবো না। বরং এই গ্রাম থেকে চলে যাবো। যদি কোনোদিন মানুষ হতে পারি তবে সেইদিনই ফিরবো”

আরো পড়ুন

আসলেই তাই হলো। পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর সেন্ডো গেঞ্জি পড়েই গ্রাম ছেড়ে চলে আসে। 

টানা তিন দিন ঢাকার শহরের আনাচেকানাচে ঘোরার পড়ে দেখা হয় পাকিস্তানি এক লোকের সঙ্গে। সে তাকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়। সে সেখানের সব কাজ করতো। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। তারপরের দিন গুলো ভালোই চলছিলো। হঠাৎ মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি সেই লোকটা বিশাল টাকার পাহাড় গড়েছিলো বাংলাদেশে। তবে এবার তার ফেরার পালা। যাওয়ার আগে মীরপুরের বিশাল জমিদারি বাড়ি এবং টাকা পয়সা বুঝিয়ে দেয় হাফিজুরকে আর বলে “যদি যুদ্ধে জিতে ফিরে আসতে পারি তাহলে আমার সম্পদ আমাকে বুঝিয়ে দিবে। আর না আসতে পারলে সব তোমার”

এক টানা নয় মাস যুদ্ধ চলে। পাকিস্তান পরাজিত হয়। সেই লোকটা হয়ত যুদ্ধে জান হারিয়েছে।

বুদ্ধিমান হাফিজুর সেই টাকা নষ্ট করে নি। মীরপুর ১১ তে অবস্থিত সেই জমির ওপর একটা বিড়ির ফ্যাক্টরি দেয়। 

শুরু ১৯ জন কর্মী নিয়ে শুরু করে বিড়ি বানানোর প্রক্রিয়া। কয়েক বছরেই সেই কোম্পানি বিশাল সুনাম অর্জন করে। তারপর মীরপুর ৩,৪,৮, ধানমন্ডি, মানিকগঞ্জ সহ বিভিন্ন জায়গায় জমি কিনতে শুরু করে। তার ইচ্ছে ছিলো প্রতিটা জেলায় নিজের বাসস্থান তৈরি করবে। করেছেনও। 

১৯৭৩ সালে নিজ জন্মস্থানে ফিরে যায়। সবাই ছিলো, ছিলো না শুধু মা। মায়ের মৃ/ত্যুর খবর সে জানতেও পারে নি। 

বাবা এবং ভাইদের পছন্দে গ্রামের সাধারণ একটা মেয়েকল বিয়ে করে।

তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। একে একপ গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। 

ঢাকার শহরে ১৯ খানা বাড়ি বানিয়েছে, কক্সবাজারে শুঁটকির ব্যবসায়, এবং তিন খানা হোটেল রয়েছে। সাজেক ৭ খানা রিসোর্ট বানিয়েছে। 

এভাবেই আজকে বাংলাদেশে সফল ব্যবসায়ী পদবিতে ভূষিত হয়েছে। 

এই মুহুর্তে চৌধুরী বাড়ির মূল ফটকে বসে আছেন হাফিজুর চৌধুরী। কাঠের তৈরি নরম কেদারায় বসে রোদের উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করতে বড়ই ভালো লাগে তার। সেই জন্যই এখানে কেদারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

বাড়ির সামনে অবস্থিত সুন্দর রাস্তার চারিধারেই ফুলের বাগান। এবং গেইট খানাও নাম না জানা ফুল দ্বারা ডেকোরেশন করা। 

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজ তৈরি বাড়ির সৌন্দর্য উপভোকরতে থাকেন হাফিজুর। তখনই নজর পড়ে দোলনার ধারে প্রজাপতির পেছনে দৌড়াতে থাকা আদ্রিতার পানে। মেয়েটি দেখতে ভাড়ি মিষ্টি। সর্বক্ষণ ঠোঁটের কোণে হাসি লেপ্টে থাকে। 

হাফিজুরের দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে আব্দুল রহমান এখন তার ব্যবসার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ছোট ছেলে আব্দুল রহিম। বউ বাচ্চা নিয়ে সাজেক ট্যুর দিতে গিয়েছে। এবং একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আব্দুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরিফের সঙ্গে। 

দুই নাতি আর তিন নাতনিকে ঘিরে তার সংসার সত্যিই সুন্দর।

আদ্রিতার প্রজাপতি উড়তে উড়তে গেইটের দিকে চলে আসছে। বেজায় বিরক্ত সে। প্রজাপ্রতি ভীষণ খারাপ। একটু ধরা দিলে কি হবে? 

আদ্রিতাও প্রচন্ড জেদি সে ধরবে মানে ধরবেই। 

তাই প্রজাপতির পেছনে দৌড়াতে থাকে। 

হাফিজুর ডেকে বলে

“বোনু পড়ে যাবা। আস্তে দৌড়াও।

আদ্রিতা থোরাই কেয়ার করলো। সে জুতো ফেলে পূণরায় ছোটে।

হঠাৎ করে শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা করে ঠাসস পড়ে যায়। ইট সিমেন্ট দ্বারা ঢালাই করা ছিলো বিধায় প্রচন্ড ব্যাথা পায় ডান পায়ে।

হাফিজুর চমকায়। চায়ের কাপ ফেলে দৌড়ে আসে। আদ্রিতা ততক্ষণে ব্যাথায় এবং ভয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিয়েছে। আবরার বুকে হাত গুঁজে টানটান হয়ে দাঁড়ায়। তার হাত পা এবং কপালে ক্ষতের চিহ্ন। বাজে ভাবে বাইক এক্সিডেন্ট করেছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। 

তার পেছনে রোগা পাতলা ফর্সা একটা ছেলে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়ত বেশ ভয় পেয়েছে নয়ত ঘাবড়ে গিয়েছে।

সে বিরবির করে বলছে

” আসলাম দেখতে বন্ধুর বাড়ি

সামনে পাইলাম পরি

বন্ধু আমার দিলো ধাক্কা মেরে

পরি গেলো উস্টা খেয়ে পড়ে

ওরেহহ আমার পাষাণ বন্ধু 

এখন আমার কি হবে? 

পা যদি ভেঙে পরির

তাহলে 

আরো পড়ুন

আবরার গরম চোখে তাকায় সিয়ামের মুখ পানে। ব্যাসস মুহুর্তেই তার মুখ থেকে কবিতা গায়েব হয়ে যায়। দুই হাতে ঠোঁট চেপে ধরে। যেনো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও সে আর কবিতা আবৃত্তি করবে না। 

হাফিজুর আদ্রিতার দিকে চোখ দিয়ে তাকিয়ে, আবরারের দিকে গম্ভীর স্বরে বলল।

“দেখতে চলবে তো দাদাভাই 

আবরার যেনো বিরক্ত হলো। সে ফোঁস করে শ্বাস টেনে এদিক ওদিক দৃষ্টি ঘোরায় এবং বলে

” ও অটিস্টিক না কি? বাঁদরের মতো লাফাচ্ছিলো কেনো? 

আদ্রিতার খুবই সম্মান লাগলো। সে নাক টেনে কিছু বলতে গেলে, হঠাৎ সর্দি তাকে বেইমানি করল। ডান নাকের ফাঁকা দিয়ে বাবল ফুলে উঠল।

কি লজ্জা জনক পরিস্থিতি। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলে আদ্রিতা। 

বুকের ভেতরে ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। পায়ের ব্যাথার কথা বেমালুম ভুলেই গেলো। 

আপাতত লজ্জা জনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেলেই বাঁচে।

আবরার আদ্রিতার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। 

সিয়াম ফিসফিস করে বলে

“ভাই সর্দির কি পাওয়ার?

নাক দিয়ে ফোঁটা বের হতে থাকতেই সে পায়ের ব্যাথা ভুলে গেল। ভ্যা‑ভ্যা করে কান্না শেষ হলো।

আবরার শুনলো না বোধহয়। সে শার্টের বাটন খুলতে ব্যস্ত। 

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *