প্রেমের বাজিমাত পর্ব-২১ | Premer Bajimat Part-21

ভালোবাসার খেলায় যখন অনুভূতি গভীর হয়, তখন প্রতিটি সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে কঠিন।

প্রেমের বাজিমাত

লেখনিতে রোজ ও রুশা

পাঠ ২১

চারিদিকে মানুষের গুঞ্জন যেন হঠাৎ করেই বিষাক্ত ফিসফিসানিতে পরিণত হয়েছে। কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, তবুও প্রতিটি চোখ যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে মারছে—নিষ্ঠুর, নির্মম, নির্দয়।

হেরা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক মাঝখানে। চারপাশে এত মানুষ, তবুও সে একা। ভীষণ একা।

তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। মনে হচ্ছে কেউ তার শ্বাস কেড়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। পৃথিবীটা যেন দুলছে, সব শব্দ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? আর কেন তার সাথেই হচ্ছে?

আরো পড়ুন

হঠাৎ করেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে নাভান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।

তার চোখ দুটো লাল, ক্লান্ত, ভাঙা। সেই চোখে আজ কোনো অহংকার নেই, কোনো জেদ নেই—শুধু এক অসহায় সন্তানের আকুতি।

সবাইয়ের সামনে জাওয়াদ খান ও কাজল খানের সামনে সে হঠাৎ করেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।

চারিদিকে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

একজন শক্ত, দৃঢ়চেতা ছেলে আজ ভেঙে পড়েছে সবার সামনে। দুই হাত জোড় করে, কাঁপা কণ্ঠে, বুক ভেঙে যাওয়া আর্তনাদ নিয়ে সে বলে ওঠে—

“প্লিজ… তোমরা এবার অন্তত সত্যিটা বলো…
আমি আর নিতে পারছি না! প্রতিদিন এই প্রশ্ন নিয়ে বাঁচা… প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করা—এটা খুব কষ্টের, খুব কষ্টের!”

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। তার চোখ থেকে টপ… টপ… করে পানি মাটিতে পড়ে।

সেই পানি শুধু চোখের পানি নয়—একটা সন্তানের ভাঙা বিশ্বাস, একটা জীবনের ভেঙে যাওয়া পরিচয়।

হঠাৎ জাওয়াদ খান ঠান্ডা, নির্দয় কণ্ঠে বলে ওঠে—

“কি সত্যি? কোনো সত্যি নেই।
হেরা আমার মেয়ে, আর এটাই সত্যি।
শেহতাজ খান নাভান আমার সন্তান না।”

হঠাৎ পাশ থেকে কাজল খানের কণ্ঠ—কাঁপা, অপরাধবোধে ভাঙা গলায় বললেন তিনি। ঠিক যেমনভাবে তার সন্তানকে অস্বীকার করেছে, ঠিক তেমনভাবেই বললেন—

“এই মেয়ে জাওয়াদ খানের রক্ত না—এটাই সত্যি।”

এদিকে হেরা স্থির হয়ে যায়।

তার কান বিশ্বাস করতে চায় না। তার হৃদয় মানতে চায় না।

তার পৃথিবী… এই মানুষটাকে ঘিরেই তো ছিল।

এই স্বীকারোক্তি যেন বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়ে।

হেরা ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায়। তার চোখে অবিশ্বাস। ভয়। ভাঙা স্বপ্নের রক্তক্ষরণ।

সে দৌড়ে গিয়ে জাওয়াদ খানের বুকে জড়িয়ে ধরে।

তার ছোট্ট হাতগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সেই মানুষটাকে, যাকে সে “বাবা” বলে জেনেছে।

তার কণ্ঠ কাঁপছে… ভেঙে যাচ্ছে—

“বাবা… বলো…
বলো ওই আন্টি মিথ্যে বলছে…
বলো আমি তোমার মেয়ে…
বলো না বাবা… প্লিজ বলো…”

“আমি তো তোমাকেই বাবা বলে ডাকেছি সবসময়…
আমি তো তোমার হাত ধরেই হাঁটতে শিখেছি…
তোমার কাঁধে মাথা রেখেই ঘুমিয়েছি…”

তার কান্না এখন আর শব্দ না—একটা ছিন্ন হৃদয়ের চিৎকার।

জাওয়াদ খান স্থির হয়ে আছে।

তার হাত উঠছে না… তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে।

কারণ সত্যি… তার হাত বেঁধে রেখেছে।

তার চোখ দিয়ে নীরবেই পানি গড়িয়ে পড়ছে।

এই প্রথম “বাবা” শব্দটা তার কাছে আশীর্বাদ না, অভিশাপ মনে হচ্ছে।

হেরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।

তার চোখে সেই প্রশ্ন—

“তাহলে… আমি কার মেয়ে?”

ওদিকে নাভান এখনো হাঁটু গেড়ে বসে আছে। কিন্তু তার চোখে আর কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ সে তার উত্তর পেয়ে গেছে।

আর সেই উত্তর তাকে শেষ করে দিয়েছে।

সে ধীরে ধীরে নিজের বুকের উপর হাত রাখে। মনে হচ্ছে ভেতরটা ফাঁকা।

কারণ আজ সে শুধু তার বাবাকে হারায়নি—সে তার পরিচয় হারিয়েছে। সে তার অস্তিত্ব হারিয়েছে।

হেরা তাকিয়ে আছে নাভানের দিকে।

তাদের আসল পরিচয়টা কী?

চারপাশে এত মানুষ থাকতেও তবুও আজ তারা সবচেয়ে বড় একাকীত্বের বন্দী।

একজন হারিয়েছে “বাবা” শব্দটার অধিকার…
আরেকজন হারিয়েছে “বাবা” শব্দটার সত্যতা।

চারিদিকে মানুষ আছে… তবুও সেই মুহূর্তে হেরা আর নাভান পৃথিবীর সবচেয়ে একা দুটি মানুষ।

আর তাদের চোখের পানি নীরবে সাক্ষী হয়ে থাকে—

“আমার সন্তান না”—এই কয়েকটা শব্দ শুধু শব্দ না। এগুলো যেন ছুরি হয়ে নাভানের বুকে বারবার গেঁথে যাচ্ছে।

নাভানের হাত দুটো ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। তার চোখে সেই মুহূর্তে যে শূন্যতা জন্ম নেয়, তা মৃত্যু থেকেও ভয়ংকর।

কাজল খান এই প্রথম ছেলেকে এমন ভেঙে পড়তে দেখেছে—যে ছেলের চোখে সে আজ অব্দি পানি পড়তে দেয়নি।

নাভানের চোখের জল যেন কাজল খানের বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিল।

ছোট্ট ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, দুটো হাত শক্ত করে মুঠো করে রেখেছে—যেন কান্নাটাকে আটকে রাখতে চায়… কিন্তু পারে না।

চোখের কোণ বেয়ে নীরব জল গড়িয়ে পড়ছে।

সেই জল কোনো সাধারণ কান্না নয়—এটা অপমানের, অবহেলার, আর নিজের পরিচয় না পাওয়ার অসহ্য যন্ত্রণার কান্না।

MLA এডভোকেট কাজল খানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘুরে গিয়ে থামল জাওয়াদ খানের উপর।

সেই দৃষ্টিতে ছিল না শুধু রাগ—ছিল তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ, আর এক মায়ের অসীম কষ্ট।

কাজল খান এগিয়ে এসে নাভানের কাঁধে হাত রাখলেন।

ছেলেটা কেঁপে উঠল—যেন এতক্ষণ ধরে শক্ত হয়ে থাকা দেয়ালটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল।

কাজল খান নিচু হয়ে তার মুখের দিকে তাকালেন।

এই মুখটা তিনি কত রাত জেগে দেখেছেন… জ্বরের রাতে কপালে হাত রেখে কাটিয়েছেন, না খেয়ে থেকেও ছেলেকে খাইয়েছেন, নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রেখে হাসি দিয়েছেন—শুধু যেন তার ছেলে কখনো নিজেকে একা না ভাবে।

তার চোখে জল চলে এলো, কিন্তু তিনি সেটা পড়তে দিলেন না।

কারণ তিনি দুর্বল নন—তিনি একজন মা, যিনি নিজের সন্তানের জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়তে পারেন।

তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ছিল বজ্রের মতো শক্ত—

“কেমন পিতা আপনি, মিঃ জাওয়াদ খান? নিজের রক্তকে চিনতে পারেন না? অস্বীকার করেন?”

তিনি এক মুহূর্ত থামলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো দিনের কষ্ট যেন গলায় আটকে আছে।

“আপনি জানেন, এই ছেলেকে আমি কীভাবে মানুষ করেছি? যখন আমার পাশে কেউ ছিল না, তখন আমি একা ছিলাম। নিজের কষ্ট, নিজের চোখের জল লুকিয়ে রেখে কাজ করেছি… দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। নিজের স্বপ্ন ভুলে গিয়ে শুধু তার স্বপ্ন বুনেছি। নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়েও তাকে স্কুলে পাঠিয়েছি, পড়িয়েছি, আগলে রেখেছি। কারণ আমি মা।”

কাজল খান তার হাতটা আরও শক্ত করে নাভানের কাঁধে চেপে ধরলেন।

“সবাই পারে না, জাওয়াদ খান। সবাই পারে না!! নিজের ভাঙা হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকতে… আবার সেই ভাঙা হৃদয় দিয়েই নিজের সন্তানকে শক্ত করে গড়ে তুলতে। কিন্তু আমি পেরেছি। কারণ সে আমার সন্তান। আমার রক্ত। আমার অস্তিত্ব।”

আরো পড়ুন

নাভান তখন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হঠাৎ করে কাজল খানের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল।

সেই কান্না যেন কাজল খানের বুকের ভেতর হাজারটা ছুরি হয়ে বিঁধছিল।

কাজল খান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, চোখ বন্ধ করে।

হায়… কাজল খান মনে মনে বললেন শুধু কথাগুলো, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেননি। সব তার কল্পনা। নাভানকে বুকে নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—

“কাঁদিস না, তুই না আমার ছেলে। শোন, তোর চোখের জল আমার দুর্বলতা না, আমার শক্তি। তোকে কেউ অস্বীকার করলেও আমি কখনো করব না। পুরো পৃথিবী যদি তোকে ছেড়ে দেয়, তবুও আমি থাকব। আমি শুধু তোর মা নই… আমি তোর ঢাল, তোর আশ্রয়, তোর পুরো পৃথিবী।”

কাজল খান চোখ খুললেন।

সেই চোখে আর জল নেই—আছে শুধু আগুন।

আজ তিনি শুধু একজন MLA নন।
আজ তিনি শুধু একজন এডভোকেট নন।
আজ তিনি শুধু একজন নারী নন।

আজ তিনি একজন মা,
যিনি নিজের সন্তানের চোখের জলের হিসাব পুরো পৃথিবীর কাছে চাইতে প্রস্তুত।

কাজল খান ঘুরে জাওয়াদ খানের গালে একটা থাপ্পড় দেয়।

“এই থাপ্পড়টা আপনার অবিশ্বাসের উপর।”

আবার আরেকটা থাপ্পড় মারে।

“এই থাপ্পড়টা আমার ছেলের চোখের পানির জন্য।

এই থাপ্পড়টা নিজের রক্তকে চিনতে না পারার অপরাধে।

এই থাপ্পড়টা না জেনে কারো উপর দোষ চাপিয়ে চলে যাওয়ার স্বভাবের জন্য।

এই থাপ্পড়টা আমার সমাজ আমার ছেলের দিকে আঙুল তাক করার জন্য।”

অনেক আগেই এই থাপ্পড়গুলো আপনার পাওনা ছিল।

“শুনুন কান খুলে জাওয়াদ খান।
অবিশ্বাস আমি ভাঙাতে আসিনি—শুধু একটা সত্য প্রমাণ করতে এসেছি।
নাভান এই অযোগ্য লোকটারই জন্মদাতা পিতার সন্তান। আর নাভান যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছে, তার সঙ্গে এর রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।”

কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এলো।

মুহূর্তের মধ্যেই সবার মধ্যে নেমে এলো গভীর নীরবতা। চারপাশের ফিসফাস, হাঁটার শব্দ, এমনকি বাতাসের হালকা সোঁ সোঁ আওয়াজটুকুও যেন থেমে গেল। সবাই তাকিয়ে আছে এক জায়গায়।

জাওয়াদ খান গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ আগেও তাঁর চোখেমুখে ছিল রূঢ়তা, তাচ্ছিল্য আর অস্বীকারের ছাপ। কিন্তু এখন?

এখন তাঁর দৃষ্টি স্থির কাজল রেখার দিকে। বিস্ময়, সন্দেহ আর অদ্ভুত এক ভয় মিশে গেছে সেই চোখে।

এত কঠিন তো কখনো ছিল না কাজল রেখার মন। যে মেয়েটা একসময় ভালোবাসা আর বিশ্বাসে ভর করে জীবন গড়তে চেয়েছিল, আজ সে দাঁড়িয়ে আছে আগুনের মতো কঠিন হয়ে। কণ্ঠে কাঁপন নেই, চোখে জল নেই—শুধু সত্য বলার এক অদম্য দৃঢ়তা।

কিন্তু কেন জানি আজ জাওয়াদ খানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। মেয়ের পরিচয় সামনে চলে আসার ভয় কি এতটাই বড়? এতদিন যেটা অস্বীকার করেছেন, আজ যদি সেটাই সত্য হয়ে দাঁড়ায়?

সবকিছু কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সময় যেন আটকে আছে কয়েকটা নিঃশ্বাসের মাঝে।

হঠাৎ মনে প্রশ্নের ঝড় ওঠে জাওয়াদ খানের ভেতর।

কাজল রেখা যে বলল, নাভান তার ছেলে। সত্যিই কি তাই?

যদি তাই হয়, তবে সেদিন জিহান কেন বলেছিল নাভান তার সন্তান?

মাথা কাজ করছে না জাওয়াদ খানের। অতীতের প্রতিটি ঘটনা যেন একে একে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। কে সত্য বলেছে? কে মিথ্যে? নাকি সবাই কোনো না কোনো সত্য লুকিয়ে রেখেছে?

চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার মুখে কি নিজের ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন তিনি? নাকি এটা কেবল কাকতালীয় মিল?

কাজল রেখা স্থির। তার চোখে আজ আর ভালোবাসার আবেদন নেই—আছে শুধু দীর্ঘদিনের জমে থাকা অপমান, অবহেলা আর অস্বীকৃতির প্রতিবাদ।

আর জাওয়াদ খান?

তিনি দাঁড়িয়ে আছেন দুই সত্যের মাঝখানে—
একদিকে অতীতের অস্বীকার,
অন্যদিকে বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা।

সবার নীরবতা যেন চিৎকার করে বলছে—

আজ সত্য লুকিয়ে থাকার দিন নয়।

ডিএনএ রিপোর্টের জন্য সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা—যেন সময় নিজেও থমকে গেছে।

ডিএনএ রিপোর্টের কাগজটা হাতে আসার আগেই যেন সবাই নিজেদের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি হয়ে গেছে। কিছুটা সেটা হলো হেরা আর নাভান এর বিয়ে নিয়ে। অধীর তার মাদার বাংলাদেশের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। হেরা আর নাভান মুখোমুখি, কিন্তু কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। ঝিনুক, রোজ, হেরা, সৃজন — সবাই ভেবে একটু স্বস্তি পেয়েছে যে হেরা আর নাভান ভাই-বোন নয়। তবুও তাদের মনটা ভারী হয়ে আছে এই ভেবে যে নাভানের নিজের বাবা তাকে অস্বীকার করেছে।

এত গম্ভীর, শক্ত-পোক্ত ছেলেটা সবার সামনে এভাবে ভেঙে পড়ে কেঁদে ফেলবে—কেউ ভাবতেই পারেনি।

ঝিনুক ধীরে ধীরে নাভানের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলে—

“তুই এভাবে ভেঙে পড়ছিস কেন? তুই তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত একজন ছেলে। তোকে অস্বীকার করেছে বলে তোর পরিচয় মুছে গেছে নাকি? রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করা যায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে না। যে বাবা তোকে চিনতে পারেনি, সেটা তার ব্যর্থতা—তোর না। আজ কাঁদছিস, কাঁদ—কারণ কষ্টটা সত্যি। কিন্তু মনে রাখ, এই কান্না তোর দুর্বলতা না, এটা তোর ভালোবাসার প্রমাণ।

তুই একা না নাভান। আমি আছি, আমরা আছি। তোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য রক্তের সম্পর্ক লাগে না, লাগে হৃদয়ের সম্পর্ক। তাই মাথা তুলে দাঁড়া। যেদিন তুই নিজের চোখের পানি মুছে হাসবি, সেদিন তোর এই কষ্টটাই তোর শক্তি হবে।”

ঝিনুকের কথায় চারপাশের ভারী নীরবতার ভেতরেও যেন একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।

হঠাৎ জাওয়াদ খানের মুখের ওপর কয়েকটা কাগজ ছুড়ে মারল কাজল খান। সেই আগের রিপোর্ট—যেই রিপোর্ট দেখে জাওয়াদ খান অস্বীকার করেছিলেন কাজল খানকে তার নিজের রক্তকে। পিছনে ডাক্তাররা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো। কাজল খানের রাগ সম্পর্কে তাদের সবারই ধারণা আছে। এই মহিলা যেমন রাগি, তেমন বদমেজাজি কাজের হের ফের হলে কিন্তু এমনিতে মাটির মানুষ তিনি। আজ অব্দি যতো কেস লড়াই করেছেন, সিবগুলোতে জয়ী হয়ে এসেছেন।

জাওয়াদ খান কাঁপা হাতে কাগজগুলো তুলে নিলেন। একবার নাভানের দিকে তাকালেন, আরেকবার কাগজের দিকে। স্পষ্ট লেখা—তাদের ডিএনএ এক।

কাগজের ওপর টুপটাপ করে পড়ে গেল তাঁর চোখের পানি। ছেলেকে জড়িয়ে ধরবেন, নাকি দূরে দাঁড়িয়ে থাকবেন—এই দ্বন্দ্বে যেন জমে গেলেন তিনি। যে ছেলেটাকে ছোটবেলায় একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই ছেলে কত বড় হয়ে গেছে! মুখের আদলও যেন তাঁরই প্রতিচ্ছবি—কার্বন কপি। তবু তিনি বুঝতে পারেননি।
ইশ… কী ব্যর্থ বাবা তিনি! হেরা শুধু তাকিয়ে আছে—এতো দিন যাকে জন্মদাতা পিতা জানতো, আজ সেই পিতার চোখে সন্তানের আসল ভালোবাসা দেখতে পারছে।

হাসপাতালের কেবিনে তখন নিস্তব্ধতা। শুধু মেশিনের হালকা শব্দ আর ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ। সবাই চুপচাপ।

জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে নাভানের সামনে এগিয়ে গেলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। এত বছরের জমে থাকা অপরাধবোধ যেন বুক চেপে ধরেছে।

“বাবা…” শব্দটা ঠোঁট পর্যন্ত এসেও থেমে গেল। এই ডাক দেওয়ার অধিকার কি তাঁর আছে? কিছুক্ষন আগেও যাকে অস্বীকার করেছে।

নাভান স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে অভিমান, প্রশ্ন, আর অচেনা এক কঠোরতার প্রশ্ন—কেনো তাকে অস্বীকার করলো। বাবা হয়ে ছেলেকে চিনতে পারলো না।

জাওয়াদ খান হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন নাভানের সামনে। একে একে সব পরিষ্কার হচ্ছে তার সামনে—

“অই দিন একই রিপোর্ট আমাকে দেখিয়েছিলো, কিন্তু কোনটা আসল আর কোনটা নকল আমরা দেখিনি। কারণ এমন মানুষ আমায় এগুলো দেখিয়েছে যাদের অবিশ্বাস করার মতো ছিলো না।”

বলে চোখ থেকে পানি পড়ে জাওয়াদ খানের। ডাক্তাররা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বিদেশের এত বড় ব্যবসায়ী, ক্ষমতাবান মানুষ—আজ একটা কাগজের সামনে ভেঙে পড়েছেন।

জাওয়াদ খান আবার বলে—

“তোমার প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা… সব কিছু আমি করেছি। তোমার স্কুলের প্রথম দিন, তোমার জ্বরের রাত, সব করেছি। একজন বাবা হিসেবে যা যা করার কথা, তা ওই ১০ বছরে করেছি আমি।”

নাভানের মনে পড়ে সেই সময়গুলো—
স্কুলে যখন ফর্ম পূরণ করতে হতো,
“বাবার নাম?”
কলমটা কাঁপত।
নাভান লিখত, জাওয়াদ খান।
কিন্তু পাশে কেউ না থাকলে নামটা কাগজে খুব একা লাগত।

বন্ধুরা বাবার সাথে ঘুরতে যেত, ঈদের জামা কিনত, বাবা হাত ধরে রাস্তা পার করত।
নাভান দূর থেকে দেখত।
তারও ইচ্ছে হতো, একবার কেউ মাথায় হাত রেখে বলুক, “আমি আছি।”

কিন্তু তার বাবা ছিল, শুধু কাগজে।
আজ এত বছর পর, সেই মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে।
ডিএনএ রিপোর্টের সাদা কাগজ যেন জাওয়াদ খানের সমস্ত অহংকার ছিঁড়ে ফেলেছে।

“স্পষ্ট মিল,” ডাক্তারের কণ্ঠ এখনও কানে বাজছে তাঁর।

জাওয়াদ খানের চোখ ঝাপসা।
মনে পড়ে যাচ্ছে সেই রাত। সেই কথাগুলো—

“এই ছেলেকে আমি মানি না।”
কত সহজে বলেছিলেন!
কিন্তু সেই বাক্য যে একটা শিশুর আত্মাকে প্রতিদিন হত্যা করেছে, তা কি জানতেন?

জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে বললেন—

“আমি ভুল করেছি, নাভান… খুব বড় ভুল।”

নাভানের চোখে জল নেই। শুকনো, শক্ত একটা দৃষ্টি।

“ভুল?”
তার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্য।
“দশ বছর বয়সে যখন আপনি আমাকে অস্বীকার করেছিলেন, তখনও কি এটাকে ভুল বলেছিলেন? যখন আম্মু কাঁদছিল, তখন?”

প্রতিটা শব্দ তীরের মতো বিঁধছিল জাওয়াদ খানের বুকে।

“আমি রাগে অন্ধ ছিলাম… সন্দেহে পুড়ছিলাম। কিন্তু তুমি তো কোনো দোষ করোনি। শাস্তি পেয়েছ শুধু আমার সন্তানের পরিচয় নিয়ে জন্মানোর জন্য।”

কণ্ঠটা থেমে গেল।

“বিদেশে ছিলাম, বড় বড় চুক্তি করেছি, কোটি টাকার ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি… কিন্তু প্রতি রাতে একটা মুখ মনে পড়ত। ভাবতাম, এখন হয়তো তুমি স্কুলে যাচ্ছো… হয়তো আমার মতো হেসে ওঠো… কিন্তু ফোন করার সাহস হয়নি।”

“কেন?”
নাভানের প্রশ্নটা সরাসরি।

জাওয়াদ খান মাথা নিচু করলেন।
“কারণ ভয় পেতাম। যদি সত্যিই তুমি আমার না হও? যদি আমি আবার ভেঙে যাই? তাই পালিয়েছিলাম। নিজের রক্ত থেকে পালিয়েছিলাম।”

নাভান ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি ভেঙে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন। আর আমি? আমি তো ভেঙেই গিয়েছিলাম, বাবা।”

“বাবা।” শব্দটা বেরিয়ে আসতেই দু’জনেই চমকে উঠল।

নাভান নিজেও বুঝতে পারেনি কীভাবে শব্দটা বেরোল। হয়তো এত বছরের চেপে রাখা ডাক আর আটকে রাখতে পারেনি।

জাওয়াদ খানের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। তিনি এগিয়ে এসে খুব ধীরে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন—যে হাত দশ বছর আগে তুলে নিয়েছিলেন।

“আমাকে শাস্তি দাও, ঘৃণা করো… কিন্তু আমাকে আর দূরে রেখো না। বাকি জীবনটা অন্তত তোমার পাশে থাকতে দাও।”

নাভান চুপ করে রইল। বুকের ভেতর যুদ্ধ চলছে—অভিমান আর রক্তের টান।

কাজল খান ঠান্ডা গলায় বলল,
“দেখলেন? এখন কি বলবেন? এত বছর যে ছেলেকে অস্বীকার করলেন, সে আপনারই রক্ত।”

জাওয়াদ খান ধীরে মুখ তুললেন। চোখ লাল, কিন্তু কণ্ঠ স্থির।
“নাভান আমার ছেলে। এতে আর এখন কোনো সন্দেহ নেই।”

কথাটা শুনে কেবিনে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

নাভানের বুক কেঁপে উঠল। এই স্বীকৃতিটুকুর জন্যই তো সে এত বছর অপেক্ষা করেছে।

কিন্তু জাওয়াদের পরের কথাটা ছিল আরও কঠিন—

“কিন্তু তোমাকে আমি কখনোই মেনে নেব না, কাজল।”

কাজল খান তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“আমার স্বীকৃতির দরকার নেই আপনার। আমার জন্য আমার পরিচয় যথেষ্ট, আর আমার ছেলের পরিচয় আমার জন্য যথেষ্ট।”

জাওয়াদ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“তুমি আমার জীবন থেকে সম্মান কেড়ে নিয়েছ, সন্দেহ ঢুকিয়েছ, একটা শিশুকে বাবার ছায়া থেকে বঞ্চিত করেছ। আমি ভুল করেছি, ছেলেকে অস্বীকার করেছি। কিন্তু তোমার সাথে আমার সম্পর্ক সেদিনই শেষ হয়ে গেছে, যেদিন তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছিলে।”

কাজল খান গর্জে উঠল,
“বিশ্বাস? আপনি কি বিশ্বাস করেছিলেন আমায়? বরং আমি ঠকেছি আপনার মতো মানুষদের কাছে বারবার গিয়ে!!”

নাভান দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে। এক পাশে তার জন্মদাতা বাবা, অন্য পাশে তার মা। দুজনের চোখে আগুন, অথচ সে দাঁড়িয়ে আছে ছাই হয়ে।

জাওয়াদ খান এবার ছেলের দিকে ফিরলেন। কণ্ঠটা নরম হয়ে গেল।
“নাভান, আমি তোমার মাকে স্ত্রী হিসেবে কখনোই আর মেনে নিতে পারব না। আমাদের মধ্যে যা ভেঙেছে, সেটা আর জোড়া লাগবে না। কিন্তু তুমি…”

তিনি এগিয়ে এসে ছেলের সামনে দাঁড়ালেন।
“তুমি আমার রক্ত। আমার নাম, আমার পরিচয়, আমার সম্পত্তি—সবকিছুর অধিকার তোমার। তুমি আমার ছেলে, এটা আমি সবার সামনে বলব এখন থেকে।”

নাভানের চোখ ভিজে উঠল। মায়া ভরা কণ্ঠে বললো,
“তাহলে এত বছর কোথায় ছিলেন?”

প্রশ্নটা তীব্র।

জাওয়াদ মাথা নিচু করলেন।
“ভুল করেছি, তোমায় অস্বীকার করে বাবা। কিন্তু ভুলটা আমার আর তোমার মায়ের সম্পর্কের। তার শাস্তি তুমি পাবে কেন?”

কাজল খান তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“এখন নাটক করছেন? ছেলের সাথে, এই ছেলে আমার জন্ম দিলে বাবা হওয়া যায় না। আর আজকের পর থেকে আমার ছেলের আশেপাশে যাতে না দেখি, তাহকে পিস্তলের গুলি দিয়ে কথা বলবে—গট ইট?”

জাওয়াদ সোজা তাকালেন তার দিকে।
“নাটক নয়। আমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু তোমার সাথে আমার সম্পর্ক মৃত। তুমি স্বাধীন, আমিও স্বাধীন। আমাদের মধ্যে শুধু একটা সম্পর্ক থাকবে—নাভানের বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ব।”

কাজল খান ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। তার অহংকার তাকে নত হতে দেবে না।

“আমার ছেলে আমার কাছেই থাকবে, তার দায়িত্ব আপনার মতো মানুষকে নিতে হবে না।”

জাওয়াদ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
“তোমার কাছে থাকবে, যদি সে থাকতে চায়। জোর করব না। কিন্তু সে জানবে, তার বাবা বেঁচে আছে, আর সে একা না।”

নাভানের বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন একটু নড়ল। প্রথমবার সে অনুভব করল, তার অস্তিত্ব নিয়ে আর কোনো দ্বিধা নেই।

সে ধীরে বলল,
“আমি কারও বিরুদ্ধে না। কিন্তু আমি আর অস্বীকৃত হতে চাই না।”

জাওয়াদ এগিয়ে এসে বললেন,
“আজ থেকে কেউ তোমাকে অস্বীকার করবে না। যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি।”

কাজল খান মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার চোখেও জল, কিন্তু সে কাঁদবে না, কারণ সে শক্ত। সে ভাঙবে না, কারণ সে অভিমানী।

জাওয়াদ খান বুঝলেন—স্ত্রীকে তিনি হারিয়েছেন বহু আগেই। কিন্তু আজ, বহু বছরের বিনিময়ে, তিনি তার ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন।

সম্পর্কটা আর স্বামী-স্ত্রীর নয়।
এটা এখন শুধু এক বাবার লড়াই।
নিজের রক্তকে আগলে রাখার লড়াই।

কিন্তু কাজল খান এর জন্য কি পারবে? দেখা যাক। কাজল খান আদেশের সুরে বললো,
“নাভান, বাসায় চলো। নেক্স টাইম যাতে এই লোকের সাথে না দেখি তোমায়!”

চলবে……?

প্রেমের বাজিমাত পর্ব-২২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *