পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-৬ | Purnohin Purnota Part-6

পূর্ণহীন পূর্ণতা গল্পের পর্ব ৬ এর আবেগঘন দৃশ্য
অপূর্ণতার ভেতরেও জেগে ওঠে ভালোবাসার নীরব আকাঙ্ক্ষা।

পূর্ণহীন পূর্ণতা

লেখিকা সুমি চৌধুরী

পর্ব-৬

“সারা, আমাকে তুই বাবা হিসেবে কতটুকু ভালোবাসিস রে মা?”

রায়ান চৌধুরীর মুখে এমন হঠাৎ প্রশ্নে কিছুটা অবাক হলো সারা। তার মনে একরাশ বিস্ময় জাগলেও নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল।

“তোমাকে কতটা ভালোবাসি তা হয়তো আমি কোনোদিন মুখে বলে বোঝাতে পারব না বাবা। কারণ আমার ভালোবাসার কোনো মাপকাঠি নেই যে তোমাকে হিসাব করে বলব কতটুকু ভালোবাসি। শুধু এইটুকুই জানি, এই বিশাল পৃথিবীতে আমার আপন বলতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।”

রায়ান চৌধুরী সারার কথা শুনে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তাঁর চোখের কোণে এক চিলতে মমতা চিকচিক করে উঠল। তিনি বললেন।

আরো পড়ুন

“সারা মা, আমিও তোকে সবসময় নিজের মেয়ের মতোই মনে করি। অহেতুক পুরনো কথা তুলে তোকে আজ মনে করিয়ে দিতে চাই না যে তুই আমার আসল রক্তের মেয়ে না। তাই বাবা হয়েই আজ তোর কাছে একটা জিনিস চাইছি। আমি যদি আজ তোর কাছে কিছু চাই, তুই কি তা দিবি আমাকে?”

সারা এবার মাথা উঁচু করে দৃঢ়তার সাথে বলল।

“বাবা, তোমার কাছে ‘না’ করার মতো কোনো সাধ্য বা ইচ্ছা আমার নেই। তোমার সম্মানের জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমি আমার জীবনটাও দিতে রাজি।”

রায়ান চৌধুরী এবার আসল কথাটা পাড়লেন। ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল। তিনি বললেন।

“আমি তোর সাথে রাফসানের বিয়ে দিতে চাই। এবং সেটা আজই। তুই কি এই বিয়েতে রাজি? মনে রাখিস মা, আমি তোকে বিন্দুমাত্র জোর করব না। শুধু একজন বাবা হিসেবে মেয়ের সারাজীবনের ভালোর কথা চিন্তা করেই বলছি।”

সারার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।রায়ান চৌধুরী এসব কী বলছেন। তাঁর সাথে রাফসানের বিয়ে। রাফসান তো তাকে দুচোখে দেখতেই পারে না। সারা এবার হাড়েমজ্জায় টের পেল রাফসান তখন ছাদে কেন ওমন পৈশাচিক আচরণ করল আর কেন তাকে বিয়েতে ‘না’ করার জন্য হুমকি দিয়ে এল। সারা কোনো উত্তর দিতে পারছে না। ওর মনে হচ্ছে কেউ যেন গলার সুর শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। ভয়ে আর আতঙ্কে ওর হাঁটু দুটো থরথর করে কাঁপছে, ঠোঁট জোড়া বারবার শুকিয়ে আসছে। সারাকে দীর্ঘক্ষণ পাথরের মতো নিস্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখে রায়ান চৌধুরী একটু তাগাদা দিয়ে বললেন।

আরো পড়ুন

“কী হলো মা, কিছু বলছিস না কেন।”

সারা এবার সাহস সঞ্চয় করে রাফসানের দিকে তাকাল। দেখল রাফসান তার দিকেই রক্তবর্ণ চোখে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাফসান চোখের ইশারায় বারবার তাকে ‘না’ বলতে বলছে, যেন এখনই কোনো ভয়ংকর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে। সারা ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কীভাবে রায়ান চৌধুরীর এই অনুরোধ সে প্রত্যাখ্যান করবে। এই মানুষটাই তো তাকে অন্ধকার রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে বুকভরা আদর, স্নেহ আর মমতা দিয়ে আগলে বড় করেছেন। কোনো কিছুর অভাব কোনোদিন তাকে বুঝতে দেননি। আর আজ সারা কি না সামান্য নিজের জীবনের কথা ভেবে এই মানুষটার কথা রাখতে পারবে না।

কেন পারবে না। অবশ্যই পারবে। সে তার বাবার সম্মানের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হবে না। যদি রাফসানকে বিয়ে করে তাকে তিলে তিলে মরতেও হয়, তবুও সে মরবে। অন্তত মরার আগে এটা বলতে পারবে যে সে তার বাবার দেওয়া কথার মর্যাদা রেখেছে।

সারা একটা দীর্ঘ বুক চেরা শ্বাস নিল। তারপর সব ভয়কে জয় করে কাঁপা কাঁপা গলায় কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল।

“হ্যাঁ আব্বু, আমি এই বিয়েতে রাজি।”

সারার মুখ থেকে ‘রাজি’ শব্দটা শোনামাত্র রাফসানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে রাগে সোফার কুশনটা হাতের মুঠোয় পিষে ফেলল। ও ভাবতেও পারেনি এই ‘জংলি মেয়েটা’র এত সাহস হবে যে তার চোখের ইশারা আর হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। অন্যদিকে রায়ান চৌধুরীর চোখেমুখে তখন এক আকাশ তৃপ্তির হাসি ফুটল।


সব নিয়ম-কানুন মেনে অবশেষে সারা আর রাফসানের বিয়েটা সন্ধ্যার পর পড়ানো হলো। সাক্ষী হিসেবে রোহান আর মাসরাফিকে রাখা হলো। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রায়ান চৌধুরী কাজী সাহেবকে বিদায় দিতে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। সারা আর সেখানে বসে থাকতে পারল না। ওর বুক আর কলিজা যেন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে এক দৌড়ে নিজের রুমে এসে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল।

সোফায় পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে আছে রাফসান। ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ও যেন জীবনে অনেক বড় কোনো ধোঁকা খেয়েছে। মুখে কোনো কথা নেই, হাসি নেই, এমনকি সেই বিধ্বংসী রাগটাও যেন এখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। রোহান রাফসানের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলল।

“রাফসান, মন খারাপ করিস না। সারা অনেক ভালো মেয়ে। সে তোর সব কথা শুনবে। অনর্থক মেয়েটাকে কষ্ট দিস না।”

রাফসান কোনো উত্তর দিল না। ও নির্বাক হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে ও খুব গভীর আর অন্ধকার কোনো চিন্তায় ডুবে আছে। মাসরাফি এবার মুখ খুলল।

“রাফসান, দেখ বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা না। তাই এখন থেকে সারা তোর আইনত স্ত্রী। কাল তোকে বলেছিলাম না যে সারাকে তুই বোন বলে মানিস না, দেখবি সারাই তোর ঘরে বউ হয়ে ঢুকবে। ভাগ্য চাইলে কী না হয়। দেখলি তো, আমার কথা একদম পাক্কা একদিনের মাথায় মিলে গেল। তবে যাই হোক, এখন আর রাগারাগি করিস না। আগে যা হয়েছে সবকিছু ভুলে গিয়ে সব ঠিক করে নে। দেখবি তুই একদিন নিজেই বলবি, সারার মতো মেয়ে পেয়ে তুই জীবনে অনেক সুখী হয়েছিস।”

রাফসান হঠাৎ মাথা তুলে মাসরাফির দিকে তাকাল। ওর চোখের মণি দুটো তখনো টকটকে লাল। মুখে অদ্ভুত এক নিস্পৃহ হাসি ফুটিয়ে ও খুব নিচু গলায় বলল।

“সুখী হব কি না জানি না মাসরাফি। তবে আমি কথা দিচ্ছি, এই বিয়েটা সারার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে থাকবে। এমন স্মৃতি যা ও মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভুলতে পারবে না।”

রোহান আর মাসরাফি একে অপরের দিকে তাকাল। রাফসানের গলার স্বরে এমন একটা হিমশীতল ভাব ছিল যা শুনে ওদের দুজনেরই গা শিউরে উঠল। ওরা বুঝতে পারল না রাফসান আসলে কী করতে চাইছে।


রাত ১:০০ টা। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। সারা ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে আছে। শরীরটা তার থরথর করে কাঁপছে। এই রুমটা এখন থেকে রাফসানের আর সারার। রায়ান চৌধুরী নিজেই সারাকে রাফসানের রুমে দিয়ে গেছেন। তাঁর ধারণা, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকা গুনাহের কাজ, তাই তিনি চান না তারা আলাদা থাকুক। কিন্তু রায়ান চৌধুরীর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে তাঁর আদরের ছেলে রাফসান আসলে কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তিনি ভাবতেন রাফসান হয়তো সারাকে কেবল বকাঝকা করে, কিন্তু কখনো গায়ে হাত তোলে না। অথচ তিনি জানেন না, আজ পর্যন্ত রাফসান কতবার সারার ওপর হাত তুলেছে। শুধু নিজের কপাল আর রায়ান চৌধুরীর সম্মানের কথা ভেবে সারা কখনো কাউকে কিচ্ছু বলেনি।

সারা খাটের নিচে অন্ধকারে নিজের নিঃশ্বাস চেপে ধরে আছে। ওর মনে হচ্ছে, রাফসান রুমে ঢুকেই আজ ওকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। অনেকক্ষণ পর দরজার কাছে কারো ভারী পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। খট করে দরজা খোলার আওয়াজ হলো। রাফসান ধীরে ধীরে রুমে ঢুকল। রায়ান চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন রাফসানকে এখন থেকে বাড়িতেই থাকতে হবে এবং সেটা সারার সাথে একই রুমে। বাবার আদেশ অমান্য করার সাহস রাফসানের নেই, তাই সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এত রাত পর্যন্ত ছাদে কাটিয়ে এখন রুমে এল।

রাফসান রুমে ঢুকে চারপাশটা একবার দেখে নিল। সারাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ওর ঠোঁটের কোণে সেই পৈশাচিক হাসিটা আবার ফিরে এল। সে খুব মিষ্টি, প্রায় মধুর স্বরে বলতে লাগল।

“সারা পাখি আমার জানু তুমি কোথায়? বের হও সোনা। আজ না আমাদের বাসর রাত? একটু সামনে আসো সোনা, তোমাকে একটু আদর করি।”

রাফসানের এই অতিরিক্ত মধুমাখা কণ্ঠ শুনে সারার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে জানে, এই মিষ্টি সুরের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর কালনাগিনী। সারা খাটের নিচে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল, ওর চোখের জল তখন গাল বেয়ে টপ টপ করে মেঝেতে পড়ছে। রাফসান খাটের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, সারা নিচ থেকে ওর জুতো জোড়া দেখতে পাচ্ছে।

রাফসান এবার নিচু হয়ে খাটের নিচে উঁকি দিয়ে দাঁত বের করে হাসল। সেই হাসি দেখে সারার মনে হলো ওর হার্টবিট এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। রাফসান ফিসফিস করে বলল।

“ওহ! আমার বউটা দেখি এখানে লুকোচুরি খেলছে। বের হয়ে আসো সারা, নাকি আমি ভেতরে গিয়ে তোমাকে টেনে বের করব?”

চলবে…!

পূর্ণহীন পূর্ণতা পর্ব-৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *