আবিরের স্প্যারো পর্ব-২ | Abir-er Sparrow part-2

রহস্যের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় আবির। সত্যের খোঁজে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।

আবিরের স্প্যারো (০২)

লেখনীতে সালমা চৌধুরী 

তানভীর কাশতে কাশতে বলল,

” তোমার ভাবনা এতদূর….! “

” কেউ একজন আসুক৷ ছোট্ট ছোট্ট পায়ে পুরো বাড়ি ছুটোছুটি করুক। আর আদুরে কণ্ঠে বলুক, 

‘মামা আমাতে তকলেত এনে দাও’ 

ভালো লাগবে না তোর? আমি তো খুব করে চাই।”

তানভীর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

” বিয়ের কোনো খোঁজখবর নেই। এখনই বাবা হওয়ার চিন্তায় আছো। আমার বোন আদোও তোমাকে বিয়ে করবে তো!”

আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল,

” তোর বোন বিয়ে না করলে আমি তাঁকে বিয়ে করব।”

তানভীর কোনো কথা বলছে না। আবির অকস্মাৎ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল। চিন্তিত কণ্ঠে শুধাল,

” বাই এনি চান্স, তুই কি আমার নামে বদনাম করেছিস?”

“কি যা-তা বলছো! আমি বদনাম করতে যাব কেন? আমি যতদূর বনুকে বুঝি, ওর মাথায় এসব চিন্তাভাবনা একদম নেই। তাছাড়া তোমার সাথে ছোটোবেলা থেকে ওর দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। তাই বললাম, একটু রিস্ক হবে।”

আবির নিস্প্রভ কণ্ঠে বলল,

” যে ভালোবাসায় যত রিস্ক, সে ভালোবাসা তত বিশুদ্ধ। একটা সময় আসবে যখন তোর বোন আমার জন্য দিওয়ানা হয়ে যাবে। আমাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠবে। ঠিক যেমনটা এখন আমার মধ্যে চলছে।”

তানভীরের ঠোঁটে প্রাণবন্ত হাসি ফুটল। বুকে আঁটকে থাকা উষ্ণ নিঃশ্বাস ছেড়ে কোমল গলায় বলল,

” আমার বোনকে সামলে নিও ভাইয়া। ও খুব অবুঝ। তুমি যেমন আমার ভাই, তেমনি মেঘও আমার একমাত্র বোন। তোমার সাথে আমার কেবল রক্তের সম্পর্ক। কিন্তু বনুর সাথে আমার নাড়ির সম্পর্ক। তুমি যেভাবে বলেছিলে, আমিও তোমায় দেওয়া কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। বনুর গায়ে একটা আঁচড়ও পড়তে দেইনি আমি। বড়ো ভাই, বন্ধু, গার্ডিয়ান সবদিক একা সামলিয়েছি। এত দায়িত্ব পালন করতে করতে আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতেই ভুলে গেছিলাম। তোমার গচ্ছিত রেখে যাওয়া অমূল্য সম্পত্তি আজ তোমাকে ফেরত দিয়ে দিচ্ছি। প্রণয়ঘোরে আগলে রেখো তাঁকে, যাকে ঘিরে সুখের আবেশে কতশত স্বপ্ন দেখেছ ভোরে। আজ থেকে আমার মুক্তি। আমার বোন এখন থেকে তোমার। তাই তোমার ভালোবাসাকে সামলানোর গুরুদায়িত্বটাও তোমার।”

আবির মুচকি হাসল। অতঃপর মেকি স্বরে বলল,

” সে না হয় নিলাম৷ কিন্তু এখন তো চিন্তা হচ্ছে আমার।”

তানভীর শশব্যস্ত কণ্ঠে আওড়াল,

” কি চিন্তা? “

” তোর বোন যদি আমাকে দেখেই বলে, 

I Hate You. তখন?”

তানভীর এবার শব্দ করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল,

” বলতেই পারে। তোমার রূপের যে বাহার!  

 পাগলও তোমার চেয়ে সুদর্শন দেখতে।”

আবির বিষন্ন চেহারায় তানভীরের দিকে তাকাল। আবছা আলোয় উষ্কখুষ্ক চুলগুলো ঝলমল করছে। মৃদু হাওয়ায় উড়তে থাকা চুলের অগ্রভাগে দুচোখ ডেকে যাচ্ছে। আবির হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে মলিন কণ্ঠে বলল,

” তোর মতো কিউট দেখতে নয় বলে এমনভাবে খুঁটা দিলি! তোর জন্য মেয়েরা পাগল হতেই পারে। আমার ভাই এত লোভ নেই। আমি জীবনে একজনকেই বৌয়ের নজরে দেখেছি । বাকি সবাই আমার দৃষ্টিতে খালার সমতুল্য।”

তানভীর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

” রাতে খেয়েছ কিছু?”

“না।”

” খাবে চলো।”

” কোথায়?”

“বাসায় যেহেতু যাবে না তাহলে বাইরেই খেতে হবে।”

” হ্যাঁ, চল। তাছাড়া তোকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।”

” হাঁটতে হাঁটতে শুনছি। চলো।”

” আচ্ছা।”

আরো পড়ুন

কৃষ্ণচূড়ার ডালে কোকিলের কুহুতানে অপরূপ বসন্তের আভাস দিচ্ছে। নব্য পাতার ফাঁকে সূর্যের উদ্ভাসিত আলো, রাতের আঁধার ঘুচিয়েছে। মোহঘোরে আচ্ছন্ন এক জোড়া চোখের নিষ্পলক দৃষ্টি শোভমান সূর্যের পানে। শীতল হাওয়ায় শরীরের প্রতিটা লোমকূপ কম্পমান হচ্ছে। তবুও অদূরের দৃষ্টি সরছে না৷ 

“বনু…”

অকস্মাৎ ঘোর কাটল মেঘের। দিঘল চোখের পাপড়ি সহসা সংকীর্ণ হলো। ফর্সা আদলের টানাটানা চোখ দুটো ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকাল মেয়েটা। ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তানভীর। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। সী গ্রীন রঙের টিশার্টটা বেশ মানিয়েছে তাঁকে। সে আর কেউ নয়, মেঘের একমাত্র ভাই সাফিয়াদ্দীন খান তানভীর।

দু’জনের চোখাচোখি হতেই হাসল তানভীর। কি স্নিগ্ধ হাসি! যেন অমাবস্যার বুকে এক টুকরো চাঁদের আলো। তানভীরের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে মেঘও ক্ষীণ হাসল। মৃদুস্বরে আওড়াল, 

“কিছু বলবে ভাইয়া?”

” জানিস, আজকের দিনটা আমার কাছে খুব স্পেশাল। “

“কেন?”

তানভীর একটু ভাবল। তারপর বলল,

” কারণ, আজ পহেলা ফাল্গুন।”

মেঘ আলগোছে কপাল গুটাল। তানভীরের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠেছে। মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেই হাসি পরখ করছে। তানভীর ছেলেটা খুব শান্ত স্বভাবের। প্রয়োজনের বাইরে কথা কম বলে। অযথা দুষ্টামি করা তার স্বভাবে নেই। বন্ধুমহলও খুব সংকীর্ণ। তবে যারা আছে তাদের জন্য সব করতে পারে। এক কথায় দায়িত্বশীল এবং অত্যন্ত ভদ্র একটা ছেলে। 

বাবা-মা, একমাত্র ছোট বোন মাহদিবা খান মেঘকে ঘিরেই তাঁর জীবন। 

মেঘ সিক্ত গলায় বলতে শুরু করল,

” পহেলা ফাল্গুন তো প্রতিবছরই আসে। বকুলতলায় মেলাও বসে। গাছে গাছে রঙবেরঙের ফুল ফুটে, কোকিলের গান শুনে ঘুমও ভাঙে। কই আমার জীবনে তো স্পেশাল কিছু হয় না!”

কথাগুলো বলে শেষ করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। হৃদয়ের অন্তস্তলে শূন্যতার সুর বাজছে।

তানভীর বোনের ম্লান চেহারার পানে চেয়ে আছে। ঠোঁটের কোণের হাসির রেখা অচিরেই ঘুচে গেছে। কি বলতে এসেছিল তা ভুলতে বসেছে। তানভীর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করল।

 আচমকা মেঘ হাসতে শুরু করল। অকপট হাসির শব্দে চমকে ওঠল তানভীর। হাসির দরুন মেঘের ফর্সা আদল ঝলমল করছে। গালের পাশের কৃষ্ণবর্ণের বিউটি স্পটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘ হাসতে হাসতে বলল,

” আমি মজা করছিলাম, ভাইয়া। তুমি দেখছি সিরিয়াস হয়ে গেলে।”

তানভীরের ঠোঁট দু’টো কিছুটা প্রশস্ত হলো। আস্তে করে বলল,

” আব্বু ঠিকই বলেন,

তুই সত্যিই একটা পাগলী।”

মেঘ ঠোঁট বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলল,

” হ্যাঁ, আর তুমি আমার ভাই। মানে মেঘ পাগলীর ভাই।”

তানভীর সে কথায় আর কোনো উত্তর দিল না। পেছন থেকে হাত সামনে আনলো। হাতে বাসন্তী রঙের শাড়ি, ম্যাচিং চুড়ি, কানের দুল, এমনকি বেলীফুলের গাজরাও আছে। তানভীর নরম স্বরে বলল,

” এগুলো তোর।”

মেঘ চমকাল। এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে ভাইয়ের মুখের পানে চাইল। জীবনের এতগুলো বসন্ত কাটালো। শাড়ি, চুড়ি দেওয়া তো দূর মেঘকে বাসা থেকে বেরই হতে দেয়নি তানভীর। সবসময় কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে মেঘের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিত। অথচ আজ সেই তানভীর কি না শাড়ি দিচ্ছে! 

মেঘ কৌতুহলী চোখে চেয়ে বিড়বিড় করল,

” তুমি আমার জন্য শাড়ি এনেছো, ভাইয়া? 

এটা কিভাবে সম্ভব! “

তানভীর ওইরকমভাবেই জবাব দিল,

” আমি কেন আনতে যাব? আমার কি আর কোনো কাজ নেই! “

তানভীরের মুখে এমন উত্তর আশা করেনি মেঘ। থমথমে গলায় আওড়াল, 

” এই শাড়ি পড়ে কি বাইরে ঘুরতে যেতে পারব নাকি বাসার ছাদে ছবি তুলে ফিরে আসতে হবে?”

তানভীর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

” তোর বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরে আসিস।”

“কোন বান্ধবী? “

” বর্ষা নাকি ছাতা নামে একজন আছে না! তাঁকে নিয়ে যাস।”

মেঘ গম্ভীরমুখে বলে ওঠল,

“আমার বান্ধবীর নাম বন্যা। বর্ষা, ছাতা-মাথা না।”

তানভীরের সহজ স্বীকারোক্তি,

“ওই একই হলো৷”

মেঘ এবার কপট রাগী স্বরে বলতে শুরু করল,

” একই হলো কিভাবে? ছাতা মানে কি?

 তুমি আমার বান্ধবীকে ছাতার সাথে তুলনা করলে! বন্যা যদি এই কথা জানতে পারে তাহলে তোমার সাথে কথায় বলবে না কখনো।”

“তোর বান্ধবী কথা না বললে আমার কি!

 সে তোর বান্ধবী আমার না।”

“তাই বলে ছাতা বলবে! 

এটা কোনো কথা হলো?”

তানভীর চেহারায় বিরক্তির ভাব নিয়ে বলল,

“উফফ। আচ্ছা বাবা, সরি। এবার হয়েছে?”

মেঘ তানভীরের হাত থেকে শাড়ি চুড়িগুলো নিতে নিতে হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

” হয়েছে। কিন্তু বন্যা কি আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে?”

“কেন যাবে না?”

“প্রতিবছর আমাকে রিকুয়েষ্ট করে ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিন্তু আমি যাই না। তারজন্য ও রাগ করে ওর বোনের সাথে ঘুরতে বের হয়৷ এবছর অভিমানে আমাকে কলই দেয়নি৷ আমি কল দিয়েছিলাম। কিন্তু রিসিভও করেনি।”

তানভীর পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখল। অদম্য কণ্ঠে বলল,

” তুই রেডি হয়ে নে। আমি দেখছি।”

মেঘ রুমে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। হাতে থাকা বাসন্তী রঙের শাড়িটা গায়ের উপর জড়িয়ে আয়নার দিকে তাকাল। সূর্যের কোমল আলোতে মেঘের ফর্সা চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, কাঁচা হলুদের ছোঁয়া লেগেছে গায়ে। এলোমেলো বাতাসে ঘন, কালো চুলগুলো নিজ গতিতে উড়ছে। শাড়ি পরার আগেই মনের ভেতরের অনুভূতিরা সমুদ্রের জলরাশির মতো উপচে পড়ছে। মেঘ আনমনে বলে ওঠল,

“এই বসন্ত সত্যিই স্পেশাল।”

আরো পড়ুন

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে মেঘ রেডি হয়ে নিল। শাড়িটা অবশ্য মেঘের আম্মু, হালিমা বেগমই পড়িয়ে দিয়েছেন। চুল খোঁপা করে গাজরা দিয়েছে, দু’হাত ভর্তি চুড়ি। মুখে ভারী কোনো মেকআপ নেই। চোখে গাঢ় কাজল টানা, অধর যুগলে গোলাপি লিপস্টিক। এতটুকুতেই সাজ কমপ্লিট। 

রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে আসতেই আব্বুর সঙ্গে দেখা। প্রথমবার মেয়েকে শাড়ি পড়তে দেখে বিস্ময় চোখে চেয়ে আছেন তিনি। দেখতে দেখতে মেয়ে যে কবে এত বড় হয়ে গেল বুঝতেও পারেন নি। এই তো সেদিন জন্মাল। ক’দিনেই কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেল৷ সময় কত দ্রুত চলে যায়। 

মেঘ আদুরে গলায় আওড়াল,

” আব্বু, আমাকে কেমন লাগছে?”

জবাবে মোজাম্মেল খান বললেন,

“মাশা-আল্লাহ। রাজকন্যার মতো লাগছে তোমাকে।

 কোথাও যাবে?”

মেঘ মিষ্টি হেসে বলল,

” ভার্সিটিতে যাব।পোগ্রাম আছে।”

“তানভীর যাবে?”

” জানি না৷ আমাকে রেডি হতে বলে ভাইয়া কোথায় চলে গেল!”

হালিমা বেগম নিজের রুম থেকে বের হতে হতে বললেন,

” তানভীরকে দেখলাম তাড়াহুড়ো করে কোথায় গেল। খেয়েও গেল না কিছু।”

“দাঁড়াও কল দিচ্ছি ভাইয়াকে।” 

মেঘ কল দিতে যাবে ওমনি তানভীরের নাম্বার থেকে কল এসেছে। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তানভীর জানতে চাইল,

” রেডি হয়েছিস? “

” হ্যাঁ। কোথায় তুমি?”

“নিচে আয়। আমি অপেক্ষা করছি।”

মেঘ আব্বু, আম্মুর থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত নিচে নামল। গেইটের সামনে যেতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। রাস্তার পাশে এক রিক্সায় বন্যা বসে আছে। পাশেই তানভীর দাঁড়ানো। বন্যার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখে-মুখে রাগ আর বিতৃষ্ণা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘ চাপা স্বরে আওড়াল,

” তুই এখানে!”

বন্যার নজর পড়ল মেঘের দিকে। মেঘের ললিত রূপ দেখে বন্যার রাগী চোখের দৃষ্টি কিঞ্চিৎ কোমল হলো। কিন্তু ঠোঁটে হাসি ফুটল না। তানভীর মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

” নে তোর বান্ধবীকে এনে দিলাম৷ এবার ঘুরতে যা। “

মেঘ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,

” তুমি কি বন্যাকে বাসা থেকে উঠিয়ে এনেছো?”

তানভীর আড়চোখে বন্যার দিকে একবার তাকাল। পরপর মেঘের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

” আমাকে দেখে কি তোর ভিলেন মনে হয়?”

আবিরের স্প্যারো পর্ব-৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *