রেড জোন পর্ব-১ | Red Zone Part-1

রেড জোন – এক রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর গল্পের শুরু।

“ভালোবাসা অদ্ভুত তাই না? আমরা মানুষ যখন নিজেদের সব ছেড়ে-ছুড়ে ভালোবাসার হাত ধরি, ঠিক সেই সময় ভালোবাসাই আমাদের হাত ছেড়ে দেয়।”

আলাস্কার কেচিক্যান আজ যেন রোজকার থেকে নিজেকে একটু ভিন্ন ভাবেই উপস্থাপনের প্রচেষ্টায় মগ্ন। চারপাশের রেইনফরেস্টের ঘন সবুজ, বর্ষার প্রতিটি ফোঁটা শিলার মতো মাটির উপর আছড়ে পড়ছে। নদীর ধারের ঘন কুয়াশা, বনজঙ্গল সহ সবকিছুকে ঢেকে রেখেছে নিজের অন্ধকার আস্তরণের তলদেশে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাটির সোদা গন্ধ, সঙ্গে ভেজা পাইনের সেই ঝাঁঝালো গন্ধটাও আজ অন্যরকম অদ্ভুত।

হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে একটা অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। অবয়বটি ব্যস্ত হাতে কোদাল নিয়ে মাটি খুঁড়েই যাচ্ছে। প্রতিটি কদমে কাদা আর জল ছিটকে পড়ছে। বিদ্যুতের ঝলক তার গাঢ় ছায়াকে আরও ভীতিকর করে তুলল। বৃষ্টির জল তার শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সেই বৃষ্টির ধারা তার চেহারাকে লুকিয়ে দিলেও, মৃদু আলোতে তা খানিকটা দেখা যাচ্ছে। সে স্পষ্ট একজন মানুষ, হাতে কুয়াশা ভেজা গ্লাভস, ভিজে কাপড়, মাটির মধ্যে কোনো এক রহস্য তো নিশ্চিত চাপা দেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন। আলোর কম্পিত ঝলকেও তার কাজের রহস্য আংশিক দেখা গেলেও পুরোটা নয়। কাজ শেষ হতেই সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। গায়ে তার রেইনকোট, কালো রঙের সেই আবরণ তাকে করে তুলেছে আরো রহস্যময়।

সে আকাশের দিকে তাকায়। হাতে এখনো কোদালটা। বৃষ্টির পানি মুখ ছুঁয়ে যেতেই তার চেহেরায় একটা প্রশান্তি লক্ষ করা যায়। সে আপ্লূত গলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে কেবল হেসে বলে, “যা আমাকে, আমার পছন্দকে বিরক্ত করে তাকে আমিও অপছন্দ করি। তবে আমি আমার অপছন্দকারীকে বিরক্ত করি না, ভালোবেসে মৃত্যু দেই।” বলেই সে পাগলের মতো হাসল। সেই হাসির কোনো কারণ নেই, আর কারণ নেই বলেই হয়তো হাসিটা বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে এতটা ভয়ংকর শোনাচ্ছে।

আরো পড়ুন

ভোর হলেও আলাস্কার সকাল শুরু হয় ভোরহীনতায়। সূর্যের আলো এখানকার মানুষদের জন্য আকাশের নক্ষত্র স্পর্শের সমান। বাইরে এখনো ঘন কুয়াশা। অথচ ক্যালেন্ডার বলছে এখন গ্রীষ্মকাল কাচের মতো শীতল হাওয়া পাহাড়ের উপরের বরফখণ্ডগুলো ছুঁয়ে নরম কুয়াশার সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। আকাশের কোণে সূর্য কুঁচকানো সোনালী রশ্মি ছড়াচ্ছে। যা বরফের চাদরে প্রতিফলিত হয়ে রূপহীন বরফকণা গুলোকে আলোর ছোট ছোট নৃত্যকারে পরিণত করছে। এমন অদ্ভুত সকালে বাইরে চাপা ধোঁয়াটে বাতাসে পাইন গাছগুলো হুংহুং করে দুলতে থাকে, তাদের ছায়া পাহাড়ি ঢাল জুড়ে মিশে যায়। ফর বি এলাকার শেষ পথের বাড়িটার মালিক ইভাঞ্জেলিন অর্কিড। এই মুহুর্তে গভীর ঘুমে মগ্ন সে, শরীর চাদরে মুড়িয়ে ঘুম দিচ্ছে সে। হঠাৎ শব্দের প্রতিধ্বনিতে ঘুমটা হালকা হলো তার। সে চোখ মুড়ে চেষ্টা করল অচেনা শব্দগুলো এড়াতে, কিন্তু সোরগোলের তীব্রতা বাড়তে লাগল।

অবশেষে বিরক্তির ছাপ শরীরে জড়িয়ে, অর্কিড ধীরে গা থেকে চাদর সরিয়ে ফেলল। চোখ মুছে, ঘুমঘোর মাথা কাত করে, সে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোল। দরজা খুলতেই বাইরের উন্মত্ত ভিড় বা অচেনা মানুষের গর্জনকে চোখের সামনে দেখে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। বিরক্তি, ক্লান্তি, সাথে খানিক আতঙ্ক সব মিলিয়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেল মুহূর্তেই। অর্কিড দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। বাইরে কেবল ক্ষীণ আলো ছড়িয়েছে সূর্য। ঘড়িতে সময়টা দেখা না হলেও এখন ভোর পাঁচটা বাজবে এটুকু নিশ্চিত সে। হলুদ স্ট্রিটলাইটের নিচে জটলা পাকিয়ে আছে মানুষজন, কারও হাতে ফোন, কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে অকারণ রাগ। “এত লোক কেন?”


নিজের অজান্তেই কথাটা ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে এল অর্কিডের মুখ থেকে। অর্কিডকে বের হতে দেখে ঠিক তখনই ভিড় চিরে ছুটে এলো তার প্রতিবেশী এলিজা। তার চোখে মুখে নেই কোনো যুক্তি, আর না আছে কোনো ভদ্রতা। এক ঝটকায় সে অর্কিডের টি-শার্টের গলা হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। “তুমি করেছ! আমি জানি তুমি করেছ।”
এলিজার গলার স্বর কাঁপছে, কান্না আর চিৎকার একসাথে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে তার। অর্কিড একদম প্রস্তুত ছিল না এই আক্রমনের জন্য। আচমকা টানে তার শরীর সামনে ঝুঁকে গেল। “এই! হাত ছাড়ো


অর্কিড হাত বাড়িয়ে এলিজার কবজি ধরতে চাইল, তবে সেই সুযোগ দিল না এলিজা। উল্টো এলিজার আঙুল আরও শক্ত হয়ে এলো।
“আমার চার্লি, আমার চার্লিটা….!”

আরো পড়ুন
এলিজা কাঁদছে, ভেঙে ভেঙে আসছে তার কণ্ঠস্বর থেকে নির্গত বাক্য। “ও শুধু তোমার কাছে যেত, এটাই কি ওর দোষ?”
তন্মধ্যে এলিজার স্বামী লুকাস সামনে এসে দাঁড়াল অর্কিডের। তার চোখ লাল, দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে রেগে আছে সে।


“তুমি একশো বার বলেছ, চার্লি তোমার মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে।”
অর্কিড বুঝল না বিষয়টা। হঠাৎ এদের এমন আচরণের কারণটাই বা কী? লুকাস দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তাই বলে তুমি আমার চার্লিকে মেরে ফেলবে?”
“কী!”
চমকে উঠল অর্কিড! এই লুকাস পাগল নাকি? কী বলছে এসব? সে কেন চার্লিকে মারবে? তাও কি-না একটা কুকুরকে। অর্কিডের মসৃণ ত্বকে ভাজ পড়ল। কিছুটা বিরক্ত নিয়েই আওড়াল, “মাথা খারাপ হয়েছে নাকি?”


এলিজা খেঁকিয়ে উঠল, “মাথা আমাদের না, তোমার খারাপ। আমার চার্লি কেবল তোমার কাছে গিয়ে একটু আওয়াজ করত। এ নিয়ে তুমি হাজারবার বিচার দিয়েছ আমার কাছে।”
মেজাজ গরম হলো অর্কিডের। দাঁত চেপে বলল,
“হ্যাঁ, বলেছি। কারণ রাতদিন চেঁচাত। কিন্তু আমি…”


“চুপ!”
এলিজা চেঁচিয়ে উঠল। পুরো বাক্য শেষ হতে দিল না, উল্টো নিজেই বলল, “তুমি ওকে মারার হুমকি দিয়েছিলে! আমি কিচ্ছু ভুলিনি, কিন্তু তাই বলে সত্যি সত্যি এমন একটা কাজ করবে এটা ভাবিনি।”
চারপাশে জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন ফিসফিস করে বলল, “কী মারাত্মক বিষয়। একটা কুকুরকে কেও এভাবে মারে?”
বুক ধুকপুক করছে অর্কিডের। এ কোন বিপদে ফেঁসে গেল সে। “আমি কখনো কিছু মারার হুমকি দেইনি, আর না আমি মেরেছি। আপনাদের কোনো কথাই আমি বুঝতে পারছি না। রাগের মাথায় কিছু বলা আর সত্যি সত্যি খুন করা এক জিনিস না।”
লুকাস নিচু গলায় বলল,


“কুকুরটার অবস্থা দেখেছ? এটা কোনো দুর্ঘটনা হতেই পারে না।”
অর্কিডের চোখে মুখর মুহূর্তের মাঝেই বাসা বাঁধল একরাশ অস্বস্তির। গাঢ় শ্বাস টেনে বলল,
“আমি দেখিনি। আর দেখতে চাইও না।”
এই কথাটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো কাজ করল। এলিজার ইচ্ছে করল অর্কিডকে কষিয়ে একটা চড় মারতে। তবে সে পারছে না। বিকৃত ভঙ্গিতে বলল,
“দেখতে চাইবে কেন? দেখার মত অবস্থা রেখেছ? আমার চার্লির পুরো শরীরটা থেঁতলে দিয়েছ তুমি। শরীরের কোনো অংশ বোঝা যাচ্ছে না।”


অর্কিডের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। যেখানে সে কিছু করেনি সেখানে তাকে দোষারোপ করার মানেটা কী? এবার সত্যিই রেগে গেল সে।
“শোনো, এলিজা তোমার কষ্ট হচ্ছে এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু নিজের শোক ঢাকতে আমাকে দোষী বানিও না।”
এলিজা আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে অর্কিড এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল, বাহুতে ধাক্কা দিল।


ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেল এলিজা। চারপাশে একসাথে চিৎকার উঠল। লুকাস দ্রুত এলিজাকে ধরল। অর্কিডের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “তুমি আসলেই একটা পাগল মেয়ে। সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কখনো এমন কিছু করতে পারে না।
লুকাস দাঁড় করাল এলিজাকে। এলিজার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,
“তুমি ঠিক আছ?”


অর্কিড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত পা কাঁপছে তা। চোখে রাগ, ভয়, আর অনুশোচনা একসাথে। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল সাইরেনের শব্দ। নীল আর লাল আলো ভিড়ের রেশ কাটিয়ে এগিয়ে এলো। পুলিশের গাড়ি থামতেই দুইজন অফিসার নামল।
“এখানে কী হচ্ছে? কে কল করেছিল?”
একজন অফিসার চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
লুকাস দ্রুত বলল, “ আমি, স্যার। আমাদের পোষা কুকুরটাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা ওকেই সন্দেহ করছি।”


লুকাস আঙুল তুলল অর্কিডের দিকে। অর্কিড ঠোঁট চেপে রইল। তাকে এভাবে ফাঁসানোর মানে কী? অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি নির্দোষ। আমি কোনো কুকুর টুকুর মারিনি।”
অফিসার এলিজার দিকে তাকাল। “আপনি কি অভিযোগ জানাতে চান?”
এলিজা কাঁপা গলায় বলল, “হ্যাঁ। আমি চাই ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।”
অর্কিড চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। মেজাজ খিঁচে যাচ্ছে তার। এই মুহূর্তে মিশ্র এক অনুভূতি হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে তাকে শান্ত থাকতে হবে। শান্ত থেকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্কিড। অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনারা চাইলে আমি স্টেশনে যাব। তবে আমি কুকুরটাকে মারিনি।”


অফিসার কথা বাড়াল না। যা কথা হবে স্টেশনেই হবে। সেই ভিত্তিতেই অর্কিডকে নিয়ে আসা হলো পুলিশ স্টেশনে। বর্তমানে মুখো মুখি বসে আছে অর্কিড ও অফিসার সিমিন। জিগ্যাসাবাদ করেও লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত অফিসার সিমিন উঠে দাঁড়ালেন। অর্কিডকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি। তবে আমরা এটা নিয়ে তদন্ত করব। এর আগে আপনি শহর ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না।”


বিরক্ত হলো অর্কিড। সেই বিরক্তি গিলে নিয়ে বলল, “ওকে ফাইন, যাব না কোথাও।”
অফিসার সিমিন উপর নিচ মাথা দুলালেন। একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এখানে সাইন করুন।”


অর্কিড কথা বাড়াল না। চুপচাপ সাইন করে বেরিয়ে আসলো পুলিশ স্টেশন থেকে। বিরক্ত লাগছে তার। ইতোমধ্যে আলো ফুটেছে। চারদিকে ব্যস্ত পরিবেশ। রাস্তাঘাটে গাড়ি ছুটছে আপন গতিতে। নিরিবিলি রাস্তা ধরে হাঁটছে । হুট করেই মনে হলো তার পেছনে কেউ একজন আছে। তবে রাস্তাটা ফাঁকা। তাহলে? অর্কিড পেছনে ফিরে তাকাল, না কেউ নেই। মনের ভুল ভেবে অর্কিড ফের হাঁটা ধরল। এমন সময় দেওয়ালের পেছন থেকে বেরিয়ে এলো এক কালো হুডি পরা ব্যক্তি। তার অধর ঘেষে বিরাজ করছে বাঁকা হাসি। অর্কিডের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড়াল, “এই পৃথিবীতে বিদ্যমান তোমার যত ঘৃণিত বস্তু বিরাজমান, সব কিছু ধ্বংস করার জন্য আমি আছি। আই’ম হেয়ার ফর ইউ মাই হার্ট।”

রেড জোন

পর্ব ১

ইশরাতজাহান জেরিন

তামান্নাইসলাম শিমলা

চলবে?

রেড জোন – পর্ব ২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *