
চন্দ্রবালা
লেখনিতেরোজও_রুশা
পাঠ_২
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। পূর্ব আকাশে লাজুক সূর্য ভোরের সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। গ্রামের মাটির ঘরটার ছোট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে ষোলো বছরের চন্দ্রবালা। পরনে তার হালকা নীল রঙের লম্বা থ্রিপিস, মাথায় সযত্নে টানা ঘোমটা। চুলের কয়েকটি গোছা কপালের পাশে নেমে এসেছে, কিন্তু সে তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ করছে না। তার ছোট্ট হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।
“দাদাভাই, চা নিয়ে আসছি,
মৃদু স্বরে বলল চন্দ্রবালা।
রাজ্যের মানচিত্রে রূপনগর জায়গাটার কোনো নাম ছিল না। পাহাড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই উপত্যকায় পৌঁছাতে হলে তিন দিন পথ হাঁটতে হতো, তারও অর্ধেক পথ ছিল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। দিনের বেলায় সেখানে সূর্যের আলো পুরোপুরি মাটিতে পৌঁছাত না, আর রাতে আকাশ এত পরিষ্কার থাকত যে মনে হতো তারাগুলো হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
সেই নির্জন জায়গাতেই বড় হচ্ছিল চন্দ্রবালা। গ্রামের মানুষ তাকে প্রথম দেখেই মনে রাখত, কারণ এমন সৌন্দর্য তারা আগে দেখেনি। তার গায়ের রং ছিল মেঘলা সকালের মতো কোমল, চোখ দুটো গভীর,যেন ভেতরে অনেক কথা লুকানো আছে। সে যখন হাসত, মনে হতো চারপাশের নির্জনতাও একটু নরম হয়ে যায়।
কিন্তু চন্দ্রবালা নিজের কাছে একেবারেই সাধারণ। তার ছোট্ট পৃথিবী ছিল পাহাড়, নদী আর দুজন মানুষকে ঘিরে।
এই গ্রামে যারা বাস করে তারা নিজেরাই চাষাবাদ করে খায়। তাতি থেকে শুরু করে সব রকম পেশার মানুষ আছে। যদিও মানুষের সংখ্যা খুব কম,প্রায় ৫০০ পরিবার। রূপনগরের চারপাশে বনফুল, কুয়াশায় ঢাকা সকাল, আর সন্ধ্যা নামলেই ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ।
চন্দ্রবালা জানত না সে কে এবং তার পরিচয় কী। সে শুধু জানত, এই পৃথিবীতে তার আপন বলতে দুজন আছে, আরমান শাহ, তার দাদাভাই, আর দাদার একমাত্র ছেলে অরুন শাহ।
মামাজান অরুন শাহ আর চন্দ্রবালার বয়সের তফাৎ ছিল প্রায় ছয়-সাত বছর। আরমান শাহের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার একমাত্র পুত্র অরুন শাহকে নিয়েই তার দুনিয়া ছিল। অরুন শাহ যখন সাত-আট বছরের, তখন তাদের কাছে আসে ফুলের মতো একটি মেয়ে,নাম চন্দ্রবালা।
আরমান শাহ একসময় রাজ্যের সৈনিক ছিলেন। যুদ্ধ, বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তের স্মৃতি ছেড়ে বহু বছর আগে তিনি এই নির্জনে চলে এসেছেন। এখন তার সবকিছুই এই ছোট্ট মেয়েটা ও তার ছেলে অরুন শাহকে ঘিরে।
আরমান শাহ চন্দ্রবালাকে শুধু পড়াশোনা শেখাতেন না, পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়া, তীর ধরা, বিপদ বুঝে নীরব থাকা এবং সবচেয়ে বড় কথা,কাউকে সহজে বিশ্বাস না করা শেখাতেন।
কখনো কখনো চন্দ্রবালা জিজ্ঞেস করত,
“আমার মা-বাবা কোথায়, দাদাভাই?
আরমান শাহ একটু থেমে যেতেন। তারপর শুধু বলতেন,
“তোমার মা দূরে আছে… খুব দূরে, যেখানে মানুষ গেলে আর ফিরে আসে না। সময় হলে সব জানবে।
চন্দ্রবালা বুঝত না, কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করত না। ঘুরে ঘুরে তার দাদাভাইয়ের এক কথা মনে হতো,
“অনেক দূরে, যেখানে যাওয়া তোমার-আমার সাধ্যের বাইরে। যদি তাদের পরিচয় জানতে চাও, তবে প্রস্তুত হও।
অন্যদিকে, রাজ্য থেকে বহু দূরে হলেও অজান্তেই তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য_যা দুজন ছাড়া কেউ জানে না,আরমান শাহ ও তার পুত্র। তার পুত্র এখন মায়া নগরের একজন সৈনিক, যার দায়িত্বে রয়েছে বাগান মহল, গ্রন্থনাগার ও আরজান মহলের দেখভাল। আরজান নবাবের প্রিয় মানুষ হলো অরুন শাহ।
“দাদাভাই, চা কেমন হয়েছে?”
আরমান শাহ হেসে বললেন,
“তুই যেমন চা বানাস, তেমনই মিষ্টি, চন্দ্রবালা। ঠিক তোর মতো।
চন্দ্রবালা হেসে তার দাদাভাইয়ের দিকে তাকাল। তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য বন্ধন ছিল,শুধু রক্তের নয়, বিশ্বাসের, স্নেহের ও ভালোবাসার। দাদাভাই চোখে চোখ রাখলে মনে হতো, এই নির্জন পৃথিবীতে চন্দ্রবালার রক্ষাকবচ তার দাদাভাই ও মামাজান।
চন্দ্রবালার ছোট্ট হাতের ধরা চায়ের কাপ আর আরমান শাহের ধীর স্বরে বলা প্রশান্তিময় কথা এই মুহূর্তে তাদের সম্পর্ককে গভির করে তুলে!!
ভোরের কুয়াশা এখনো বনভূমির মাঝে মিশে আছে। আরমান শাহ চন্দ্রবালাকে নিয়ে বের হয়েছেন গ্রামের পেছনের জঙ্গলে, যেখান দিয়ে অরুন শাহ আসবে আজ । চন্দ্রবালার অজান্তে,আজ প্রায় তিন মাস পর বাবার মতো স্নেহ করা মানুষটিকে দেখবে সে। চন্দ্রবালা ধীরে ধীরে দাদাভাইয়ের পেছনে পা মিলিয়ে হাঁটছে।
দাদা আরমান শাহের বয়স ৫৬। তার মাথায় ছোট পাঁচ কুলি টুপি, চোখে সুরমা,যা তাকে শুধু আল্লাহভক্তই দেখায় না, বরং এক বিশেষ ধরনের ভাবমূর্তি যোগ করে। হাতে তিনি সর্বদা সেই মোটা বেতের লাঠি নিয়ে হাঁটেন, যেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে শক্তি আর স্থিরতার ছাপ থাকে। লম্বা সাদা দাড়ি তার বয়সের চিহ্ন হলেও ব্যক্তিত্বকে আরও বিশিষ্ট করে তোলে। হাটে বা মাঠে,সবার মাঝে তিনি স্বাভাবিক কর্তৃত্বের ছাপ রেখে যান।
চন্দ্রবালা দাদার দিকে তাকালে মনে হয় যেন সে এক নিরাপদ ঠিকানায় আছে। ছোটবেলা থেকে দাদা-নাতনির সম্পর্ক তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দাদার হাত ধরে মক্তবে যাওয়া, বাজারে-হাটে ঘোরা,প্রতিটি মুহূর্তে সে ভরসা খুঁজে পায়। দাদা শুধু শাসন বা রক্ষার প্রতীক নন, তিনি সাহসের উৎস।
“দাদাভাই, আমরা কি এত গভীরে যাব?
চন্দ্রবালা প্রশ্ন করল, কণ্ঠে অল্প ভয়ের গুঞ্জন।
আরমান শাহ হেসে বললেন,
“চন্দ্রবালা, ভয় আর সতর্কতা আলাদা। ভয়কে বন্ধু বানাতে শিখ, তবেই তুই শক্ত হবি।”
চন্দ্রবালা তার দাদাভাই-এর কথাগুলো ঠান্ডা মাথায় চালান করে । ছোট্ট হাত দিয়ে সে তার ঘোমটা সামলাতে সামলাতে এগোচ্ছে। হঠাৎ বনভূমির মধ্যে ছোট্ট নদীর ধারে তারা দাঁড়াল। আরমান শাহ এক বাঁক দেখা স্থান থেকে একটি গোপন পথের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
“এ পথটা খুব কম মানুষই জানে, শুধু আমরা তিনজন।
আজ আমি তোমাকে শিখাব কিভাবে নিঃশব্দে চলতে হয়, কিভাবে ঝোপঝাড়ের শব্দ শুনে বিপদ বুঝতে হয়।
” চন্দ্রবালা কণ্ঠহীনভাবে মাথা নিল। আরমান শাহ একে একে দেখাল কিভাবে পা ফেলতে হবে, কিভাবে বাতাসের দিক বুঝে এগোতে হবে। তার চোখে একরাশ ধৈর্য আর মায়া। চন্দ্রবালার চোখে ভর করল সেই বিশ্বাস, যে দাদাভাই সবসময় তার নিরাপত্তা দেখবেন। নদীর পাড়ের এক বাঁক ঘুরতেই হঠাৎ একটি ছোট্ট সাপ তাদের পথের মাঝখানে ঢুকল। চন্দ্রবালা চমকে উঠল। আরমান শাহ ধীরে হাত বাড়িয়ে বললেন,
“চন্দ্রবালা, ভয় পেলে হাড় কাঁপে। কিন্তু শান্ত থাকলে তুমি বিপদকে বন্ধু বানাতে পারবে!
“চন্দ্রবালা শ্বাস আটকিয়ে সাপের দিকে তাকাল। আরমান শাহ নিঃশব্দে সাপটি দূরে সরিয়ে দিলেন। চন্দ্রবালা তখন বুঝল, শুধু কৌশল নয়, ধৈর্য আর দাদাভাই-এর শান্ত শক্তিই সবচেয়ে বড় অস্র, যখন তারা নদীর পাড় থেকে নৌকায় উঠলো , চন্দ্রবালা ছোট্ট গলার কণ্ঠে বলল,
“দাদাভাই… আমি চাই, সবসময় তুমি পাশে থাকো ।” তাহলে আমি সব জয় করতে পারবো। আরমান শাহ তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললেন,
“আমি জানি, চন্দ্রবালা। তুই যেমন সাহসী হবি একদিন তেমন বিচক্ষন হবি।
“চন্দ্রবালা দাদাভাই-এর হাতে হাত রেখে হেসে বলল!
“তোমার জন্য আমি সব কিছু করবো , দাদাভাই।
নদীর উপর ভোরের আলো তখন রূপালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। কুয়াশার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো জলে পড়ে চিকচিক করছে। সেই শান্ত সকালের বুক চিরে আচমকা ছলকে উঠল পানি,একটি ছায়ামূর্তি ঝাঁপিয়ে পড়ল মালবাহী ট্রলার থেকে পালতোলা নৌকার দিকে।
চন্দ্রবালা এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করল না। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। নৌকার নিচে লুকানো তলোয়ারটি সে এমন দ্রুততায় তুলে নিল, যেন বহুবার অনুশীলন করা এক অভ্যাস। এক লাফে সামনে গিয়ে মুখোশধারী লোকটির গলায় ঠেকিয়ে দিল তলোয়ারের ধার।
তার কণ্ঠ কাঁপেনি
“কে তুমি?”
লোকটি হাত তুলে থেমে গেল। তারপর পরিচিত কণ্ঠে হেসে উঠল!!
“আরে আম্মাজান! নিজের মামাজানকেই এভাবে বিদায় করে দেবেন নাকি?
চন্দ্রবালার বুকের ভেতর জমে থাকা উত্তেজনা হঠাৎ নরম হয়ে এল। সে কণ্ঠস্বর চিনে তলোয়ার সরিয়ে নিল। মুখোশ খুলতেই দেখা গেল অরুন শাহের সেই চেনা মুখ,ক্লান্ত কিন্তু উজ্জ্বল।
চন্দ্রবালা দ্রুত মাথা নত করে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, মামাজান।” কেমন আছো তুমি?
অরুনশাহ হেসে বলল,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আম্মাজান। আল্লাহ পাক ভালো রেখেছেন। কিন্তু তুমি আর একটু হলেই আমার নামে ইন্নালিল্লাহ পড়ে ফেলতে !
চন্দ্রবালা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল
“তুমি এভাবে ঝাঁপ দিলে আমি কী ভাবব? শত্রু না ডাকাত!”
দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন আরমান শাহ। তার চোখে গর্বের দীপ্তি। মৃদু হেসে বললেন
“পুত্রবধূ ঘরে তোলার আগেই তাকে বিধবা বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিলি নাকি, চন্দ্রবালা,
অরুন মজা করে বলল,
“বাবাজান, আপনি তো দেখি আম্মাজানকে বেশ তৈরি করে ফেলেছেন! তলোয়ার ধরার ভঙ্গিটা দেখে তো আমারই ভয় লাগল।”
চন্দ্রবালা লজ্জায় হেসে বলল,
“মামাজান, দাদাভাই শিখিয়েছেন,শত্রু চিনতে দেরি করা যাবে না।”
অরুন তার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সেই দৃষ্টিতে ছিল স্নেহ, ছিল অদ্ভুত মায়া। বয়সের ব্যবধান খুব বেশি নয়, তবু সে তাকে ‘আম্মাজান’ বলেই ডাকে—মায়ের জায়গার সম্মান দিয়ে।
“তোমার তো আরও এক মাস পর আসার কথা ছিল,
” চন্দ্রবালা জিজ্ঞেস করল।
অরুন নদীর জলে চোখ রাখল, তারপর ধীরে বলল,
“একজন এর খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল… ইয়ে মানে, আমার আম্মাজানকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো তো । তাই সব কাজ ফেলে চলে এলাম। আমার আম্মাজানের চন্দ্রমাখা মুখ খানা দেখার জন্য।
এই কথায় চন্দ্রবালার বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। মামাজানকে সে ভিষণ ভালোবাসে।আজ সে খুব খুশি মামাজান কে পেয়ে। বাবার আদর সে ভুলে যায় এই মানুষকে কাছে পেলে।
“সহি” সালামতে এসেছো আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া মামাজান। তুমি এবার অনেক দিন থাকবে মামাজান, এবার তোমায় যেতে দিবো না আমি।
“অরুন শাহ জবাবে হাসে।
” আম্মাজান “আমার আজই চলে যেতে হবে।শুধু আজ রাত্রি প্রহর সময় আছে আমার কাছে। আমায় যে খবর পাঠাতে হবে একজন যে আপনার জন্য আকুল হয়ে বসে আছে খবর শুনার জন্য।
প্রথমের কথাগুলো জোরে বললে ও শেষ এর কথা গুলো মনে মনে বলে অরুনশাহ।
চলবে………
পর্ব-৩ আসিতেছে