
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
ইশরাত জাহান জেরিন
পর্ব-২
সকাল পেরিয়ে বেলা গড়িয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা ঠিক দশটায় থেমে নেই, কিন্তু রোদ জানান দিচ্ছে দিন এখন নিজের দখলে। সূর্য মাথার ওপর একটু উঁচুতে উঠে গেছে, আলো জানালা ভেদ করে ঘরে ঢুকে পড়ছে সোজাসুজি, স্পষ্ট আর উজ্জ্বল হয়ে। সেই আলো সাঁঝের মুখের ওপর পড়তেই নড়ে-চড়ে উঠল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কে যেন রুমে এসে ফ্যানটা বন্ধ করে দেয়। সাঁঝ তখনো হাত পা ছড়িয়ে ঘুম দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কে যেন এসে ডেকে গেল। তাতেও কাজ হলো না। নড়ে-চড়ে আবার শুয়ে পড়ল। শেষে কে যেন পা ধরে একেবারে টেনে বিছানা থেকে নামাতেই ভয়ে এক ঝটকায় বসে পড়ল সাঁঝ। চোখ কচলে চেঁচিয়ে উঠল, “ওমা কোথায় ভূমিকম্প হলো? আরে আমার তো এখনো চুমুই খাওয়া হলো না। এত জলদি বাড়ির নিচে চাপা পড়ে পটল তুলতে চাই না।” ঠিক তখনই চোখ আঁটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মীর আরযান শানের দিকে। হঠাৎ রাতের কথা তার মনে পড়ে গেল। রাতে কী হয়েছিল তার সাথে? আরযান ভাই ঠোঁটে মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে দিয়েছিল। তারপর আর কী,পাগলের মতো কেঁদেছে কিছুক্ষণ, কাঁদতে কাঁদতে কখন যে চোখটা লেগে এলো। এখন দেখছে সে বিছানায়। সাঁঝ ঠোঁটে হাত দিলো? ওমা মরিচের গুঁড়ো কোথায়? ওইসব কী তাহলে স্বপ্ন ছিল? মাগোমা, কত ভয়ানক স্বপ্ন, এই স্বপ্নকে সে অভিশাপ দিলো। স্বপ্নের কোনো দিন ভালো হবে না। স্বপ্ন ব্যাটাকে অকালে সিঙ্গেল থেকে চুমুরোগের কারনে মরতে হবে।
”ঘুম কী এখনো ভাঙেনি? নাকি শরীরে আগুন লাগালেই তোর ঘুম ভাঙবে?
”আপনি অফিসে যাননি?”
”তুই কলেজ যাসনি?”
”গেলে তো দেখতেই পারতেন।”
”আমিও তো তাই বলি। যাই হোক কলেজ যাসনি কেন? টাকা কি গাছে ধরে? তুই কি জানিস, তোর পেছনে ইনভেস্ট করলে কোনো প্রোফিট আসবে না? তুই একটা লস প্রোজেক্ট।”
”আপনার কী? আমি আমার বাপেরটা খাই।”
আরযানের রাগ উঠে গেল। সে চড় দিতে গিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। সকাল সকাল সে আর ঝামেলা চায় না। তবে সে যাওয়ার আগে সাঁঝের থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,”তুই যেই কোম্পানির টাকা উড়াচ্ছিস তার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার কিন্তু এই মীর আরযান শান। জাস্ট এটা তোর ব্রেনলেস ব্রেনে ঢুকিয়ে রাখ।” সাঁঝ মুখ ভেংচি কেটে উঠে পড়ল। কত্ত লজিক ছাড়া কথা এই লোকের৷ বাপ-চাচারা খুঁজে খুঁজে এই নিমপাতাকেই পেল এত বড় পদে বসানোর জন্য? এর থেকে কত্ত যোগ্য এই সাঁঝ। বয়স তার একত্রিশ হয়ে গেল এখনো করতে পারল না একটা প্রেম, খেতে পারল না একটা চুমু সে হয়েছে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার! ওর জায়গায় এই সাঁঝ থাকলে এতদিনে অফিসের সব হ্যান্ডসাম কর্মচারীকে চুমু খেত। কোম্পানি থেকে সব মেয়েদের বের করে, কেবল হ্যান্ডসাম পুরুষগণ আর সাঁঝের রাজত্ব চলত।
আরযান রুম থেকে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে পুনরায় বলল,”সিদ্ধ ডিম দু’টো পুরো শেষ করবি।”
”কারো নিচ থেকে বের হওয়া খাবার খাওয়া তো দূরে থাক, কোনো কিছুই সহ্য করতে পারিনা আমি।”
আরযান গলার টাইটা ঠিক করে পকেটে হাত রাখল এবং বলল, “তুই তো নর্মাল ডেলিভারিতে জন্মেছিলি না কি? তাহলে বুঝ তোকে ১৮ বছর ধরে কেমন করে সহ্য করছি।” বলেই সে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলতে বলতে গেল, “ডিমটা ভালোয় ভালোয় শেষ করিস। বাসায় এসে জিজ্ঞেস করব কিন্তু। ভাবিস না তোকে কেয়ার করছি, তুই অপুষ্টিহীনতায় ভুগলে তোকে বিয়ে দিতে সেই আমাদেরই কষ্ট করতে হবে। এমনিতেও ব্রেন নেই, বুদ্ধি নেই। ভেতর তো পাইপের নলের মতো ফাঁপা।”
যাহ শালা দিনটাই আজকে খারাপ যাবে। ওই নিমপাতা আরযান শানের মুখ দেখেছে না। তবুও চুপ করে রইল সাঁঝ। কারণ তর্ক করে সকাল সকাল বানরের পেছনের মতো গাল লাল করার কোনো ইচ্ছে তার আপাতত নেই।
তার চোখে তখনও ঘুম। তার আরো ঘুমের প্রয়োজন। অন্তত বেলা বারোটা। হঠাৎ সে ঘড়ির দিকে তাকালো। ওমা ১০টা বেজে গিয়েছে? আজকে তো তার রাজার সঙ্গে আইসক্রিম ডেটে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ডেটের কথা তুলা থাক, ছেলেটা যে কাল ওমন ভয়ে পালালো সে কী আর আসবে? বিচ্ছেদ করে, ছ্যাকা দিয়ে চলে যাবে না তো?
সাঁঝদের বাড়িটা রাজকীয়। সাঁঝের বাপ-চাচারা চার ভাই এক বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে সিলেটে। সে থাকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে লন্ডনে। তবে জলদি বাংলাদেশে ফিরবে। তাঁদের রেগুলার বাংলাদেশে আসা-যাওয়া হয়। বলতে গেলে মাসে কখনো একের অধিক। সাঁঝের বড় চাচাকে সে বড় আব্বু বলেই ডাকে।এই ভালো মানুষটার বড় ছেলেই মীর আরযান শান। হাজির ঘরে যে পাঁজি হয় তার এক নাম্বার প্রমাণ ওই মিস্টার নিমপাতা। সাঁঝের ভালো সহ্যই করতে পারে না। ভাবা যায় একটা লোক কত হিংসুটে হতে পারে? তবে হিংসুটে লোক ব্যাতিত এই বাড়িতে আরো ছয়জন সুপুত্র আছে। এইবাড়িতে বাপ-চাচাদের সিরিয়াল থাকলেও তাদের ছেলেদের কোনো সিরিয়াল নেই। এই যেমন বড় চাচার ছোট ছেলে প্রাণ ভাইয়ের যেখানে আগে হওয়ার কথা ছিল সেখানে বড় আব্বুর পরপরই তার সেজো বিয়ে করে নিয়েছিল বলেই সেজো আব্বু আর বড় আব্বুর বড় ছেলে কেবল মাত্র তিন মাস গ্যাপ দিয়ে পৃথিবীতে আসে। এত কাছাকাছি জন্ম হওয়ার কারণেই বুঝি অনেকটা আরযান ভাইয়ের মতোই পাইলট আব্রাহাম হয়েছে। যদিও আরযান ভাইয়ের মতো বকা দেয় না, তবে তাদের পছন্দ-অপছন্দে বেশ মিল।
সাঁঝেদের ডাইনিং টেবিলটা এই মাথা থেকে শুরু করে ওই মাথা পর্যন্ত। একই সঙ্গে বিশজন মানুষ বসতে পারে এখানে। এই মাথায় একজন বসলে ওইমাথায় চশমা লাগিয়ে দেখতে হয়। সাঁঝ তার চেয়ারে এসে বসেছে। এই বাড়িতে সব কাজের জন্যই কাজের বুয়া রাখা আছে। বাড়ির বউয়েরা চুলার কাছে শেষ কখন গিয়েছিল কে জানে। তবে বড়মা, সবসময় জান। সাঁঝের দাদি এখনো রান্নাঘর পরিচালনা করেন। হাঁটতে চলতে কষ্ট হয় তো কী হয়েছে? এত বিলাসিতা তার সহ্য হয়না। সাঁঝ টেবিলে বসতেই কাজের মেয়ে এসে তাকে গরম গরম নাস্তা দিয়ে যায়। সাঝঁকে দেখে তার দাদা এসে তার পাশেই বসলেন। দাদার দাঁত নেই, সাদা ইয়া লম্বা দাঁড়ি। চুল গুলোও সাদা। ভালো স্বাস্থ্য তার, পেটটা একেবারে গোপাল ভাড়ের মতো, পেটের ওপর তবলা বাজিয়ে দাদা সাঁঝকে হরেক রকম গান শোনান। মীর মোহাম্মদ আলী চেয়ারে বসতেই সাঁঝকে দেখে বলল,”কিগো বউ, খাওন কী পেটে ঢুকে না?”
সাঁঝ মুখ কুঁচকে বলল, “এমন নাতিরা কতজন থাকলে খাবার পেট ভরে যাবে?
”কেন আমার নাতি তোমারে কী করছে?”
”করার বাকি রাখল কই।” বলেই দাদাকে মুখ ভেংচি কেটে আবারও ষাঁড়ের মতো গিলায় ব্যস্ত হলো। হঠাৎ তার পাশের টেবিলে মীর আব্রাজ রোদ এসে বসল। পেশায় এই মহান ব্যক্তি মন্ত্রী মশাই। সারাদিন তার রাজনীতি আর ভাষণ দিতে দিতেই চলে যায়। শখ আবার প্রেম করার। এমন কাজকর্ম করে প্রেম হয়? টাকা আর রূপ থাকলেই যে সব হয়না এটা আব্রাজ ভাইকে না দেখলে সাঁঝের জানাই হতো না। আব্রাজ আসতে দেরি হলো অথচ তার নাস্তা আসতে দেরি হলো না। সে সাঁঝকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, “কিরে ঢেঁড়স, কলেজ যাসনি?”
গেলে তো দেখতেই পারতেন মন্ত্রীমশাই।”
আব্রাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বলল,” মুখে মুখে কথা ছাড়া তুমি বাল কিছু পারো না। দেব লাগিয়ে এক চটকানা তখন বুঝবা বাল।”
বাল না, আমার নাম সাঁঝ। নেতা সাহেব, দেখছি বাংলা ব্যাকরণে কিছুটা কাঁচা।”
কত বড় বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছিস তুই, সাঁঝ! দেশের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে এভাবে মুখে মুখে কথা বলে তুই দেশকেই অপমান করছিস। তোর মতো অর্ধেক মনোভাবের লোকজনের জন্যই দেশটা ধীরে ধীরে তলানিতে যাচ্ছে।”
ভাষণ কমিয়ে যদি দেশের কাজে মন দিতেন, তাহলে দেশ কখনো রসাতলে যেত না। আপনি দেশের ক্ষতি করছেন।
”কেমন করে? এই মনে হলো তোর? “আয়হায়! এই মুহূর্ত দেখার জন্যই তো সেদিন চকলেটটা তোমাকে দিয়েছিলাম।”
”তাও কাজের খালার তিন বছরের নাতির মুখের চকলেট কেড়ে এনে দিয়েছেন আমায়।”
একভাবে দিলেই চলে, তবে তাই বলে আমি ভাবতেই পারছি না… আব্রাজ পুরোটা শেষ করতে পারল না।
”পারছেন না যেহেতু, সেহেতু ভাবা ছেড়ে দেন।”
”আরে শালী কথা শেষ করতে দে।”
”চালিয়ে চান।”
” আমার দুধ কলা খাইয়ে আমি তোর মতো গাদ্দার হাফ পাকিস্তানি কাল নাগিনীকে পুষেছি, হায় এই আফসোস আমার শেষ হবেনা। শেষে কিনা আমাকে বলছিস আমি দেশের ক্ষতি করছি?
”আপনার ওইসব আমি কেন খেতে যাব? আর আমাকে কাল নাগিনী বলবেন না একেবারে। আমার গায়ের রঙ কী কালো নাকি? আমি সুন্দরী নাগিনী।”
চামড়া ফর্সা হলে কী হবে? মনের রঙ তো আমার ফোনের ডার্ক মোড থেকেও কালো।” আব্রাজ আবার সাঁঝের হাত ধরে বলল, কিরে, বল না তো, আমি দেশের ক্ষতি কিভাবে করেছি?
কেমন করে করেছেন এটা আবার জিজ্ঞেস করছেন? তওবা! এত বড় দামড়া মন্ত্রী হয়ে একটা প্রেম করতে পারেননি, বিয়ে করতে পারেননি। দেশকে দেশের আগামী প্রজন্ম উপহার দিতে পারেননি,আপনার তো কলসি গলায় বেঁধে জলে ডুব দেওয়া উচিত। অপদার্থ মন্ত্রী একপিস।
আব্রাজের গায়ে লাগল। সাঁঝের ফাঁকা মাথার এই কথা এভাবে ফেলে দেওয়া যায় না। আসলেই তো এসব কী হচ্ছে, দেশকে সে একটা নাগরিকই উপহার দিতে পারছে না, আর দেশের কল্যাণ করা তো বিলাসিতা। ক্রীয়া মন্ত্রী সে, অথচ না করতে পারছে কারো সাথে ক্রীয়া আর না বিক্রিয়া। ধ্যাৎ খাওয়ার মুডটাই মরে গেল বাল।
-
তখন বিকেল। সাঁঝের বান্ধবী রিংকি প্রাইভেটের জন্য ফোন করেছিল। সাঁঝের যেতে ইচ্ছে করল না। এসব পড়ালেখা করে পাপি, খবিশরা। সে এত নোংরা, নিচু মাইন্ডের পাবলিক না যে পড়ালেখার মতো ভ্যালুলেস কাজকর্ম করে নিজের সময় নষ্ট করবে। বিকেলে ছাদে উঠে। মীর এই বাড়ির বংশের নাম হলেও বাড়ির নাম ক্ষণিকালয়। এমন নামের পেছনে দারুন এক লজিক পেয়েছে সাঁঝ। আসলে সাঁঝ মানেই সকল কিছুর লজিক। মীর বাড়ির পূর্ব পুরুষগন হয়তো জানতে পেরে গিয়েছিলেন, একসময় এই বাড়িতে ৭ ছেলে জন্মাবে যাদের জীবনে প্রেম আর চুমু নামক চ্যাপ্টরে অন্ধকারে থাকবে। যার প্রভাব গোটা জীবনে পড়ে জীবনের আলো অল্প করে দিবে। তাই বাড়ির নাম রাখা হয়, ক্ষণিকালয় মানে হয়তো ক্ষণিক আলো। সাঁঝেদের ছাদে একটা সুইমিং পুল আছে। বড়লোক হলে এমন মাত্রায় হওয়া উচিত, যেমন মাত্রায় হলে মাথার ওপর মানুষ নেংটা হয়ে ব্যাঙের মতো সাঁতার কাটতে পারবে। আইমিন বাড়ির ছাদের সুইমিং পুলে। সাঁঝ ভাবনায় চলে গেল। আচ্ছা একজন মানুষ নেচে নেচে আপনার মাথার ওপর হাফ নেংটু হয়ে ঘষেমেজে গোসল করছে, তখন আপনার কেমন ফিলিংস হবে? ভাবনায় ফাটল ধরল মুখে পানির ছিটা পড়তেই। সাঁঝ মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল, “কোন বাঙ্গির ঘরের বাঙ্গি পানি মারে রে? তার নানির খালি ঘর।”
”তাই নাকি?”
সাঁঝ সামনের দিকে তাকাতেই দেখল কচ্ছপের মতো সুইমিং পুল থেকে বের হচ্ছে মীর আরবিন প্রাণ ভাই। প্রাণ ভাই একটু ইদানীং বেশি ভাব ধরছে। এই কারণেই তার প্রেম হচ্ছে না। আজকে আবার সাঁঝের গায়ে পানি মারা? নিমপাতা আরযান ভাইয়ের কাছে এর নামে পাড়ার কাকিমার মতো কানপড়া দিতে হবে। কি বলবে না বলবে অলরেডি ঠিক করাও হয়ে গেছে। তার বান্ধবী ডায়রিয়ার সঙ্গে এই প্রাণের ছবি এডিট করে লাগিয়ে দিবে। কোনো ভাবে দুটোর ঠোঁট লাগিয়ে দিতে পারলেই হয়েছে। আরযান ভাই তখন ইয়া লম্বা কচুটা যখন জায়গা মতো পিষে দিবে তখন নায়ক গিরি বের হবে। এই প্রাণের দেহে তখন আর প্রাণ থাকবে না। একটু বেশি সুন্দর, ধূসর চোখ বলে, মেয়েরা একটু বেশি পাত্তা দেয় বলে কী সাঁঝের ওপর পানি মেরে তাকে হেনস্তা করতে পারে সে?
সাঁঝের তখন দৃষ্টি অন্যদিকে। হঠাৎ আবারও মুখে পানি মারতেই সাঁঝ ক্ষেপে গিয়ে বলল,” এই ভাই ভালো হবে না কিন্তু বলে দিচ্ছি।”
”তুই চোখের সামনে থাকলে একটা মানুষের ভালো হওয়ার চান্স কোথায়?”
”আবার অপমান!” এইবার বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।
তুই এখানে কেন? আচ্ছা যা আমার জন্য কমলার জুস নিয়ে আয় তো। সাঁতার কাটার সময় জুস না খেলে এনার্জি পাই না।”
বাড়িতে মানুষের অভাব আছে নাকি? আমি কেন আনতে যাব? দেখতে পারছ না কি, আমি এই বাড়ির মেয়ে, সাঁঝ? কত্তবড় সাহস আমায় কাজের হুকুম করো?”
”ওহহহহ তুই সাঁঝ নাকি? আমি তো চেহারা দেখে কাজের বুয়া মনে করেছিলাম। থাক বোন ভুল হয়ে গেছে। তুই একটু কাউকে পাঠিয়ে জুস এনে দিতে বল।”
বুদ্ধিহীন সাঁঝের মাথায় তৎক্ষণাৎ একটা বুদ্ধি চলে এলো। সে তার কেরামতি বুদ্ধি নিয়ে প্রাণের দিকে হেসে বলল, “না আমিই আনছি।”
প্রাণ একটু অবাক হলো। এই মেয়ের তাহলে সুবুদ্ধি হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাঁঝ চলে এলো। তাদের দোতলা বাড়ি তবুও বাড়ির মধ্যে লিফট আছে। সরাসরি সেই লিফট দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডেও যাওয়া যায়। সেখানে গোডাউন আছে। ইয়ে মানে কালকে যেখানে সাঁঝকে মরিচ থেরাপি দেওয়া হয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জুস হাতে সাঁঝ ফিরে আসতেই প্রাণ সেই জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল, “গরম গরম মনে হচ্ছে?” সাঁঝ এক মুহূর্তে ভয়ভীত হয়ে দাঁড়াল। “ডিরেক্টর সাহেব কি আবার সবটা ধরেই ফেললেন না তো? বুঝার তো কথা না যে সাঁঝ কাজের বুয়া জোনাকির ২ মাসের ছেলেটার হিশু গ্লাসে করে নিয়ে এসেছে। রঙ ভালো দেখানোর জন্য হলুদের গুঁড়া, স্বাদের জন্য তো চিনিও দিয়েছিল। টেস্ট তো ভালোই আসার কথা। “আরে না খেলে বুঝবে কেমন করে?প্রাণ ফিরে এলো। ভেজা শরীর চেপে ধরে, সাঁঝের কাঁধে হাত রেখে সে বলল, “ভাই, তোকে একটু বকা দিয়েছি তাই না? সাঁঝের মন গলে গেল। ভাই তার ভুল বুঝতে পরেছে এটাই অনেক। যাহ, সাঁঝ তাকে মাফ করে দিলো। ঠিক তখনই প্রাণ তাকে বলল, “এই নে এই জুস তুই খা। শরীরটার কী হাল করেছিস। নে খা, খা এসব হেলডি খাবার তোর শরীরের জন্য খুব দরকারি। নইলে নায়িকাদের মতো সুন্দরী কি করে হবি?”
সাঁঝের মাথায় বাঁশ। এই কোন জ্বালায় পড়েছে? সে বাঁচার জন্য দৌড় দিতেই প্রাণের গা থেকে পড়তে থাকা জলে স্লিপ কেটে সুইমিং পুলে ধপাস করে পড়ে গেল।
তা দেখে প্রাণ জুসের গ্লাসই ঢিল মেরে পুলে ফেলে তোয়ালে হাতে ধরে নিয়ে বলল, “এবার মুতুর জলে বসে গোসল কর, বজ্জাত মেয়ে। জুস চাইলে কার না কার মুতু আনবেই?
দেখিস, বাথরুমে বসে যখন তুই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবি, আর পানির সমস্যা হবে, তখন আমি তোর জন্য টিস্যু আর পানির বদলে হলুদ পানি সাপ্লাই করব।
আর শুনে রাখ ফাউল মেয়ে, আমার
তোর মতো ধার করা লাগবে না, নিজের কাছেই নোনতাপানির ফ্যাক্টরী আছে। ওগুলোর টেস্ট তোর রুচির থেকেও ভালো।”
-
“মীর আবরিত রাজ স্যারের চেম্বারটা কোথায়?” নার্স হাত তুলে দেখিয়ে দিতেই প্রায় ষাট বছরের মানুষটি তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ পেছন থেকে একজন তাদের থামিয়ে দিল।
“আপনাদের সিরিয়াল নাম্বার কত? অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে?” লোকটি বয়সে প্রবীণ।
কথা বলতে গিয়ে জড়িয়ে গেল। “আসলে স্যার… আমরা তো গ্রাম থাইকা আইছি। আমার এক পরিচিত ভাই কইছিল আজ আসলে স্যারের দেখা পাওয়া যাবে।
লোকটির কণ্ঠে সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তি চেপে বসে। “এইটা কি মগের মুল্লুক নাকি? আসলেন আর স্যার পেয়ে গেলেন! জানেন ওনার ভিজিট কত? আর ঘড়িতে দেখছেন কয়টা বাজে? সব ছুটি। এইসব অশিক্ষিত বাল কোথা থেকে আসে কে জানে! কাল গুনে গুনে চার হাজার দুইশো টাকা রেডি করে আসবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব। এখন দূর হন।”
লোকটি কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আসার সময়ও তো এত টাকা সঙ্গে ছিল না।
কাল ধান বিক্রি করে যা পেয়েছিল, তাই নিয়েই আজ মেয়েকে সঙ্গে করে ঢাকায় এসেছে। এত পথ, এত কষ্টের পরে কি শেষমেষ খালি হাতেই ফিরতে হবে? তার পাশে মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল।
পুতুলের মতো দেখতে। বয়স কতই বা হবে? উনিশ-বিশ। এই বয়সেই এই নিষ্পাপ ফুলের গায়ে কত আঘাত লেগে। মেয়েটা কাঠের পুতুল হয়ে গেছে। চোখ দুটো এক বিন্দুতে স্থির, সেই দৃষ্টিই এখনো বদলায়নি।
ওয়ার্ডবয় আবার রুক্ষ কণ্ঠে বলল, “কিরে বাপ, বাংলা বুঝেন না? যান না কেন?” ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ভেসে এল একটি গম্ভীর কণ্ঠ, “কী হচ্ছে এখানে?”
ওয়ার্ডবয় চমকে উঠল। “স… স্যার! আপনি? আ… আপনি যাবেন না।” আবরিতের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মেয়েটি আর তার বাবার ওপর। “কোনো সমস্যা হয়েছে?”
লোকটি ঢোক গিলে বলল, “মীর আবরিত স্যারের কাছে আসছিলাম।” আবরিত এক মুহূর্তও দেরি করল না।
ভেতরে আসুন। আমিই মীর আবরিত।” এই কথা বলেই সে চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে ওয়ার্ডবয়ের দিকে একবার তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলল,
“চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর যেন আর কোনো দিন তোমার মুখ আমি না দেখি। জাস্ট গেট আউট।”
সন্ধ্যার সময় সাঁঝের এই বাড়িতে সবচেয়ে ভালো সময় কাটে। কাটবে না কেন? এই সময় যে বাড়ির সব পুরুষ জাতি বাইরে থাকে। মা-চাচিদের ফাঁকি দেওয়া সাঁঝের কাছে নয়-ছয় বিষয়। ওইটা কোনো ব্যাপার হলো নাকি?
বিকেলে ঠান্ডা জলে পড়ায় সাঁঝের অবস্থা খানিকটা নাজেহাল আজ। যদিও খুব একটা সমস্যা হয়নি। গরমের দিনে এমনিতেই বিকেলেই গোসল সারে সে। বরং ভালোই হয়েছে। এই অজুহাতে পুরো সপ্তাহ জ্বরের অভিনয় করে বাড়িতেই থাকা যাবে। আর শরীর কীভাবে গরম করতে হয় সেই বিদ্যেটুকুও সাঁঝের অজানা নয়। তার জন্য দরকার হবে মাত্র এক কোয়া রসুন। সাঁঝ রুমে যেতেই হঠাৎ তার বান্ধবী ডালিয়ার কল আসে ফোনে। নাম তার ডালিয়া হলেও সাঁঝ তাকে ভালোবেসে ডায়রিয়া বলে ডাকে। ভালোই যায় ওই মেয়ের সাথে এই নাম। ডালিয়া সাঁঝের পার্সোনাল ঘটক। একটা প্রেমের লাইন কেটে গেলে ডালিয়া আরেকটা ধরিয়ে দেয়। সকালে উঠেই ডালিয়াকে সে রাজার কথা জানালো। রাজাকে কলও করেছিল। ওই হারামজাদা তাকে ব্লক করে দিয়েছে। যাক আরো কত ভালো আসবে জীবনে। এমনিতেও ওই শালার মুখে, গায়ে গন্ধ ছিল। ভালোই হয়েছে নর্দমাটা কেটে পড়েছে। ডালিয়ার ফোন রিসিভ করতেই সে বলল, “দোস্ত তুই তোর বাড়ির নিচে আয়। ওই যে স্বাধীন নামের ছেলেটা আছে না? সে তো অনেকদিন ধরেই আমার কাছে তোর কথা বলে রেখেছিল। ওটাকে আজকে তোর কথা বলেছি।”
”পরে?”
“রাজি হয়ে গেলি তো? তোর বাড়ির নিচে নাম। ওই ঝোলাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, তোর সঙ্গে দেখা করবে। আর ভাই, এই ছেলে দেখতে একেবারে শাহরুখ খানের ফেইল!
তোদের বাচ্চা হলে তো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বাচ্চা হবে। আয় মা জলদি নিচে আয়। ছেলেটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কোমর ধরে গেছে। তোকে একবার দেখেই চলে যাবে।”
”আরে বাল, আমায় না জানিয়ে আনলি কেন? কালকে রাতেই আরযান ভাইয়ের কাছে রাজাকে চুমু খেতে গিয়ে হাতে না হাতে ধরা পড়েছি। তুই চাস আমি মরি না কেন তাই না?”
”আরে বোকা, কিচ্ছু হবেনা। কেউ দেখলে বলবি, আমি তোকে আজকের নোটস দিতে এসেছিলাম। আর এই ছেলে আমার নানানো ভাই।”
”নানাতো ভাই?”
”একটা হলেই হলো। এইবার আয়।”
সাঁঝের ডিল আবারও গার্ডেন গার্ডেন। সে একেবারে তৈরি হয়ে, ফিটফাট হয়ে পারফিউম লাগিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আসার সময় সায়রা শেখকে জানায়, নিচে ডালিয়া নোট নিয়ে অপেক্ষা করছে। সায়রা সেই কথা শুনে বলে, “মেয়েটাকে ঘরে আসতে না বলে বাইরে থেকে বিদায় করবি? তুই কী সাঁঝ আমার পেটেই জন্মেছিস? মনে তো হয় না।”
সাঁঝ পাত্তা না দিয়ে নিচে চলে গেল। মায়ের ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। গেইট থেকে বের হয়ে পিলারের ওইদিকে দেখল সে। ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে ডালিয়া আর স্বাধীন। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো ছেলেটার মুখে পড়ছে। আহা এত্ত হ্যান্ডসাম একটা ছেলে কী করে হতে পারে? এই ছেলে তো তার কলেজের সকলের ক্রাশ। এমনকি সাঁঝেরও। তবে শুরুর দিকে তাকে পাত্তাই দেয়নি। যাক এখন এটাকে প্রেমে ফেলে শোধ তুলবে সে। সাঁঝ ছেলেটার সামনে যেতেই বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। “এই সাঁঝ, আমাদের দুলাভাই কিন্তু তোকে একটা জিনিস দিতেই এই সময় এত রিক্স নিয়ে এসেছে। এই স্বাধীন ভাই, বের করেন না।”
স্বাধীনেরও অস্থিরতা লাগছে। সে পকেট থেকে একটা বাক্স বের করল। সেটা সাঁঝের হাতে তুলে দিতেই ডালিয়া পুনরায় বলল, “উঁহু ভাই, এমনে দিলে তো হবে না। একটু পড়িয়ে দেন। “না পড়িয়ে দিলে তো প্রেমের শুরুই নিরামিষ হয়ে যাবে।” স্বাধীনের অদ্ভুত কিছু ফিলিংস মনে হচ্ছিল। সে বক্স খুলে সাঁঝকে বলল, “হাত দাও।” সাঁঝ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সেটা দেখে ডালিয়া হেসে বলল, “ওই হইরে।
কী লজ্জা, কী লজ্জা। সাঁঝ হাত বাড়ালেই স্বাধীন যত্ন নিয়ে ঘড়িটা পড়িয়ে দিল। লজ্জায় সাঁঝ মুখে হাত দিয়ে হাসি দিল।
এইটুকু দৃশ্য দেখামাত্রই আরযান শব্দ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। এতক্ষণ ধরে অফিসে বসে সে সাঁঝের ড্রামা দেখছিল। এক মুহূর্ত থেমে আবার ল্যাপটপ খুলল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পেছনে টেনে নিল। তার মুখ ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে। ঘন শ্বাস ফেলে সে ফুটেজটা রিভার্সে চালিয়ে ঘড়ি পড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটা মনোযোগ দিয়ে দেখল। ঠিক এক জায়গায় এসে জুম করল। আবার দেখল। আরেকবার। শেষ পর্যন্ত আর সহ্য হলো না। ল্যাপটপটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিল।
চেয়ারের পেছনে ঘাড় হেলিয়ে চোখ বন্ধ করল সে। এক হাত নিজের ঘাড়ে বুলিয়ে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু কাজ হলো না। বরং ভেতরের আগুনটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। ঠিক তখনই তার পিএ ফাইল হাতে নিয়ে রুমে ঢুকতেই আরযান ধমকে উঠল। মেয়েটা ভয়ে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল। আরযান উঠে দাঁড়াল। কাঁচে ঘেরা বাইশ তলা উঁচু ভবনের বারান্দার দরজায় এসে জোরে একটা আঘাত করে বাইরে তাকাল। “তুই আসলেই বোকা, সাঁঝ। যেখানে পুরো মীর ইন্ডাস্ট্রিজ একটা আইটি কোম্পানি। যারা সাইবার সিকিউরিটি দেয়৷ সেখানে তুই কীভাবে ভাবলি, ওই বাড়ির মেয়ে হয়ে, ওই বাড়িতেই ক্রাইম করবি আর ধরা খাবি না? হ্যাকারের বাড়িতে চুরি… বিষয়টা কেমন হয়ে গেল, বল তো?” সে ঠোঁট চেপে হাসল। “কাঁদতে হবে তোকে, সাঁঝ। খুব কাঁদতে হবে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।
আমি আসছি।”
চলবে…