রেড জোন পর্ব-২ | Red Zone Part-2

বিপদের সীমানায় দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন এক লড়াই, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই হতে পারে জীবন বদলে দেওয়ার মতো।

রেড জোন

ইশরাতজাহান জেরিন

তামান্নাইসলাম শিমলা

পর্ব_২

তিমিরে ঢাকা আকাশ। ধরণীর বুকে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে প্রতিটি শব্দ ভুলে যাচ্ছে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব, হারিয়ে ফেলছে স্বকীয়তা। আকাশে বাঁকানো চাঁদ, কিন্তু আলো ছড়ানোর দায় আজ সে নেয়নি। বাতাস স্থির, গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত যেন শ্বাস আটকে রেখেছে কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে। হঠাৎ করে অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে আসে একটি অবয়ব। কালো হুডিতে ঢাকা মানুষটি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছে না। সে কিছু একটা টেনে টেনে নিজেকে সামনে নিয়ে আসছে। তার চলনে কোনো স্বাভাবিকতা নেই। কখনো হঠাৎ থেমে যাচ্ছে, কখনো মাথা কাত করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসছে। আবার কখনো নিজের হাতের আঙুলগুলোকে ভাঙছে এমনভাবে যেন শরীরটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সত্যি হয়তো নেই, এখন হয়তো ব্যক্তিটির নিজস্ব সত্তা বিলীন হয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করছে এক ভয়ংকর সত্তা। ব্যক্তিটির হাতে ধরা একটি বড় আকারের হাতুড়ি। সেটাকে মাটির সঙ্গে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের গন্তব্যে। কানে হেড ফোন। তাতে ধীর স্থির বাজছে একটি গান, স্লো থ্রিলের লিরিক্স। ব্যক্তিটি নিজেও ঠোঁট নাড়িয়ে তাল মিলিয়ে উচ্চারণ করে গাইল গানের একটা অংশ।

Falling in the dark
Light begins to fade
All alone at last
I forget my name

বাড়ির পেছনের অন্ধকার অংশে এসে থামল কালো হুডিতে আবৃত ব্যক্তিটি। তার সামনেই মাটির ওপর পড়ে আছে দুটো শরীর। হাত-পা বাঁধা, মুখ কাপড়ে আটকানো। লোক দুটো আর কেউ না, বরং এলিজা ও লুকাস। দুজনেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। দুজনের নিঃশ্বাস চলছে, কিন্তু উপস্থিতি নেই। কালো হুডি পরা লোকটি ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে বসে পড়ল। হাতে থাকা হাতুড়িটা পাশে রেখে দিল সে। আপাতত এই হাতুড়িটা তার দরকার নেই। আঁধারে গানের লাইন গুনগুনিয়ে ব্যক্তিটি বাঁকা হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, কোনো উষ্ণতা নেই। সেটা ভাঙা আয়নার হাসি, যা টুকরো টুকরো করে দিতে সক্ষম কোনো ভয়ংকর পরিস্থিতিকে। “তোমরা জানো আমি সবচেয়ে বেশি কী ঘৃণা করি?”


ব্যক্তিটি জবাবের অপেক্ষায় রইল৷ তবে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা এলিজা ও লুকাসের থেকে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া এলো না। এতে হুডি পরা ব্যক্তিটির খানিক রাগ হলো। কপালে দেখা দিল ভাজের। এলিসার গাল হতে গলা পর্যন্ত ছুড়ি দিয়ে ছুঁয়ে দিল। বিড়বিড় করে বলল, “না, জানো না। জানলে তো চুপ করে থাকতে না।”

আরো পড়ুন
বিরক্ত বাড়ল লোকটির। নিজের মাথা এক পাশে হেলিয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকাল। ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করছে সে, খুঁজছে এলিজা ও লুকাসের মুখভঙ্গির প্রতিক্রিয়া। তবে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়ার দেখা না পেয়ে তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে উঠল। এলিজা চোখ টিপটিপ করছে। জ্ঞান ফিরছে বোধহয়। এলিজার হুঁশ ফিরতেই চোখে চোখ পড়ল সামনে বসা থাকা ব্যক্তিটির চোখে। তা দেখে হাসির রেখা গাঢ় হলো লোকটির। হিসহিসিয়ে বলল, “এভাবে তাকিয়ে থাকা খুব অসভ্যতা। উত্তর দিতে হয়। কথা বললে কথা ফিরিয়ে দিতে হয়।”


এলিজার মুখ বাঁধা। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না সে। কেবল ছটফট করছে। লোকটির কণ্ঠস্বর হঠাৎ চড়ে যায়। সে ঘাড় বাকাল। নিজমনে অগোছালো, এলোমেলো ভঙ্গিতে আওড়াল অসংখ্য বাক্য। যেন নিজের ভেতরের কোনো গোপন কণ্ঠের সঙ্গে লড়াই করতে নেমেছে সে। হুট করেই হো হো শব্দে হেসে উঠল লোকটি। এলিজা ভরকাল। হাত পা হিম হয়ে আসছে তার। শরীর কাঁপছে অনবরত। এলিজার ছটফটানো বৃদ্ধি পেল। লুকাসের জ্ঞান ফেরেনি এখনো। লোকটি বাম হাত উঠিয়ে নিজের সরু নাক ঘষে উঠে দাঁড়াল। হাতুড়িটা হাতে তুলে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিল সে। অতঃপর হাসির শব্দ বৃদ্ধি পেল। উচ্চশব্দে হিংস্র আওয়াজ তুলে হাসছে লোকটা। হুট করেই কোনো প্রকার সতর্কতা ছাড়াই হাতুড়িটা তুলে সে আঘাত করে বসল লুকাসের মাথায়। মুহূর্তের মাঝেই মাথার একপাশ থেঁতলে গেল। গলগল করে বেরিয়ে এলো রক্তস্রোত। এলিজা চিৎকার করে উঠল নিজের চোখের সামনে নিজের স্বামীর এহেন অবস্থা দেখে। লোকটা ইচ্ছে মতো আঘাত করছে লুকাসকে। হাঁটু গেড়ে বসে ছুড়ির আঘাতও করল গোটা শরীরে। জখম করে ছাড়ল শরীরের প্রতিটি অংশ। বিড়বিড় করে আওড়াল, “আমি তা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি, যা আমার প্রিয়তমা ঘৃণা করে।”
অতঃপর পরবর্তী আঘাতটা পড়ে এলিজার চোখে। হিংস্রতম এক মৃত্যু উপহার দেয় লোকটি। একের পর এক আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করে তোলে দুটো শরীর। আর বারবার আওড়ায় একটি মাত্র বাক্য, “মাই হার্ট, আই লাভ ইউ সো মাচ।”
শেষ বারের মতো হাতুড়ি তুলে মুখ বরাবর আঘাত করল সে। স্নিগ্ধ হাসিতে অধর বাকিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল, “স্বর্গযাত্রা সুখের হোক।”
হাতুড়িটা ফের কাঁধে তুলে নিল লোকটি। পা বাড়াল নিজের পথে। যেতে যেতে বাঁকা হেসে গুনগুনিয়ে ফের গাইতে লাগল,

“In my lonely life I feel alone

I feel alone in my life, in my home, in my life”

নিশীথ রজনী। বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে আছে অর্কিড। বারবার কানে ভেসে আসছে কুকুরের ডাক। বুকের ধুকপুকুনি বাড়ছে। মনে হচ্ছে চার্লি নামক কুকুরটাই ডাকছে। খুব কাছ থেকে ডাকছে। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে চার্লির রক্তমাখা থেঁতলে যাওয়া শরীরটা। হাত পা কেঁপে উঠছে বারবার। গলা শুকিয়ে আসছে। ঘুমাতে চেয়েও ব্যর্থ হচ্ছে মেয়েটা। এ পর্যায়ে না পেরে বিছানায় উঠে বসল সে। পরনে তার টি শার্ট আর পাজামা। এই বাড়িতে সে একাই থাকে। বলতে গেলে তার জীবনে সে একা, পুরোপুরি একা। মা বাবার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে সে ছোট থাকতেই। মায়ের কাছেই অর্কিডের বেড়ে ওঠা। বাবা তো খোঁজও নেয়নি কখনো, এখন সে কোথায় আছে সে খবরও জানা নেই অর্কিডের। আর নিজের মা-ও গত হয়েছে এক দশক আগে।

আরো পড়ুন

সবে হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়েছিল সে। সেই থেকে এই পর্যন্ত তার পথচলা একাকী। বিছানার পাশের কেবিনেটের উপর থাকা গ্লাসটা হাতে নিতেই দেখতে পেল গ্লাসে পানি নেই। অথচ গলা শুকিয়ে তার চৌচির। লম্বা শ্বাস টেনে অর্কিড উঠে দাঁড়াল। গ্লাসটা আগের জায়গায় রেখে সে পা বাড়াল নিচে। ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়াল অর্কিড। একপাশের পুরো দেওয়ালটা কাঁচের। তবে আজ পর্দা লাগানো হয়নি। খেয়ালই ছিল না। ছোট্ট শ্বাস ফেলে পানি পান করে অর্কিড এগিয়ে গেল পর্দা লাগাতে। এমন সময় চোখ পড়ল সামনের দিকে। এলিজা আর লুকাসের বাড়ির পেছন দিক থেকে কালো হুডি পরা এক ব্যক্তি এগিয়ে আসছে রাস্তার দিকে। কপালে ভাজের সৃষ্টি হলে অর্কিডের। সোডিয়ামের ক্ষীণ আলোয় লোকটার হাতে ভারি হাতুড়ি দেখে চোয়াল ঝুলে গেল তার। ঠোঁট নাড়িয়ে অজান্তেই বিড়বিড় করে আওড়াল, “ল লোকটা কে?”


ইতোমধ্যে ছেলেটা বেড়িয়ে এসেছে। এলিজা এবং তার বাড়ি মুখোমুখি। সরু রাস্তার এপার ওপার। লোকটা বর্তমানে সেই রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে আছে তার বাড়ির দিকেই। বলতে গেলে অর্কিড যেখানো দাঁড়ানো সেখানেই ব্যক্তিটির দৃষ্টি। অর্কিড হকচকাল৷ পরমুহূর্তেই মনে পড়ল বাইরে থেকে কেউ কিছু দেখতে পারবে না। তাহলে কেন লোকটা এভাবে তাকয়ে আছে? বুকের ভেতর চলা দাবানল বৃদ্ধি পেল অর্কিডের। সে পর্দার আড়াল হয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর আঁড়চোখে তাকাতেই দেখতে পেল লোকটি চলে যাচ্ছে। কৌতুহল বাসা বাঁধল অর্কিডের মনে। দৌড়ে গিয়ে নিজের রুমে এসে ফোনটা নিয়ে এলো। টর্চ জ্বালিয়ে বের হলো নিজের বাড়ি থেকে। এগিয়ে গেল এলিজা ও লুকাসের বাড়ির দিকে।

এসে থামল বাড়ির সামনে। সদর দরজা খোলা। কিন্তু কেন? কৌতুহল, ভয় দুটো নিয়েই অর্কিড পা বাড়াল বাড়ির পেছনের দিকে। পায়ে ভেজা কিছু অনুভব করতেই ফোনটা নিচের দিকে ঘোরাল। ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় সামনে থাকা দৃশ্যখানা চোখে পড়তেই ছিঁটকে পড়ল সে। রক্তের ঢল বয়ে যাচ্ছে পুরো পাকা ফ্লোরে৷ সেই রক্ত লেগে গেলে অর্কিডের শরীরেও। হাত পা কাঁপছে তার, হীম হয়ে আসছে গোটা শরীর। ফ্লোরে রাখা রক্ততরলে হাত ভিজে গেছে অর্কিডের। সেই রক্তেভেজা হাত দিয়েই সে নিজের মুখ চেপে ধরল। কিছু তো একটা হচ্ছে। এটা কী সপ্ন? নাকি সত্যি? যদি সত্যি হয় তাহলে তো সে বাজে ভাবে ফেঁসে যাবে। যেখানে একটা কুকুরের জন্যই তাকে ফেঁসে যেতে হয়েছে সেখানে মানুষ! শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে অর্কিডের। এই মুহূর্তে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিছু মাথায় আসছে না। কী করবে না করবে কিছুই সে বুঝতে পারছে না।
“গড, এ কোথায় ফেঁসে গেলাম। এই খুনের দায় না আমার ঘাড়ে এসে পড়ে! এখন কী করব? কী করব? কী করা উচিত? পালিয়ে যাব?”


হুট করেই উঠে দাঁড়াল অর্কিড। ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। পুরো শরীরে তার রক্ত। কোনো দিক না পেয়ে সে ছুটল। ছুটতে ছুটতে কোনো পথে এলো তাও তার জানা নেই। কেবল ছুটছে। এই মুহূর্তে তার মন মস্তিষ্কে কেবল একটাই বাক্য, “তাকে পালাতে হবে।” আর সেই উদ্দেশ্যেই সে পালাচ্ছে। ঘন্টা খানিক দৌঁড়ানোর পর সে উপলব্ধি করল সে কোনো এক জঙ্গলে চলে এসেছে। আশেপাশে সব ধু ধু অন্ধকার। ফোনটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আশে পাশে কিচ্ছুটি দেখা জোঁ নেই। বারবার সেই বিভৎস দৃশ্যটা সামনে চলে আসছে। অর্কিড এবার চিৎকার করে উঠল, কেঁদে ফেলল। সে কী করবে? চিন্তা শক্তিও শূন্য হয়ে আসছে। গোটা পৃথিবীটা ঘুরছে চোখের সামনে। অচল হয়ে এলো তার পা। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। দূর থেকে কেবল শোনা যাচ্ছে হিংস্র প্রাণীদের ডাক। যেন জানান দিচ্ছে কোনো এক অশুভ ছায়ার। যে ছায়ার রঙ সবসময় কালো হয় না,বরং হয় রক্তিম লাল। আর সেই রঙের প্রতীক হিসেবেই ভেসে বেরায় একটি মাত্র শব্দ, “রেড জোন”।

চলবে?

রেড জোন পর্ব-৩ আসিতেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *