চন্দ্রবালা পর্ব-১ | Chandbala Part-1

‎চন্দ্রবালা

‎পাঠ:১

‎লেখনি রোজ রুশা

‎নবাব জান,নবাব জান,জান!


‎রাজবীর নবাব কমোল কন্ঠে তার প্রিয় নাতী কে ডাকে।


‎”ছোট নবাব উঠুন,কয়টা বাজে দেখেছেন?


‎পালঙ্কের পাশে বসে দাদীজান স্নেহভরে তার মাথায় হাত রাখেন। আদরের নাতির চুলগুলো যেন পশমের সুতোর মতো নরম ও সিল্কি—স্পর্শ করলেই ভালো লাগে। অথচ আরজান নবাব তার চুলে কারও হাত পড়া একদমই সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তিন বেক্তি ছাড়া তার চুলে হাত কেউ দেয় নি আজ অব্দি ,তার দাদীজান,আম্মিজান,আর নানীজান।আরজান ঘুমু ঘুমু চোখে দুই হাত দিয়ে দুইজনকে আকড়ে ধরে।রাজবীর নবাব ও তার সহর্ধমীনি মুচকি হাসে,রাজবীর নবাব বলে উঠে।


‎“রাজ্যের শেষ উত্তরাধিকারী যদি বারোটা পর্যন্ত ঘুমায়, তবে রাজ্যের ভার কে নেবে, ছোট নবাব?”

‎“আজ থেকেই শুরু হচ্ছে আপনার যাত্রা। সব দায়িত্ব আপনার হাতে তুলে দেওয়ার প্রশিক্ষণ আজ থেকেই শুরু হবে।”

‎নাতি তার প্রাণের থেকেও প্রিয়—এই নাতির জন্য তিনি সব করতে প্রস্তুত।


‎পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠলেই সোনালি আলোয় ঝলমল করে ওঠে মেহেরানগর রাজ্যে । চারদিকে উঁচু প্রাচীর, তার বাইরে গভীর পরিখা, আর তারও বাইরে বিস্তীর্ণ সবুজ শস্যক্ষেত। উত্তরে নীলাভ পাহাড়, দক্ষিণে সুবিশাল নদী, পশ্চিমে বাণিজ্যপথ আর পূর্বে চন্দনবন—এই চার প্রহরী যেন রাজ্যটাকে রক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে

‎মেহেরানগরের চারদিকে চার রঙের সৌন্দর্য—উত্তরের নীলশৈল পাহাড় থেকে নেমে আসে ঝরনা। দক্ষিণের সুর্বণা নদী দিয়ে ভেসে আসে নৌবহর, মশলা আর রেশম। পশ্চিমের মরু-সীমানা ধরে উটের কাফেলা আসে দূর দেশের বণিক নিয়ে। পূর্বের বনভূমিতে চন্দন, আগর আর বিরল ফুলের সুবাস।

‎রাতে প্রাসাদের মিনারে জ্বলে ওঠে হাজার প্রদীপ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশের তারা নেমে এসেছে।

‎মেহের নগরে ২০টি মহল আছে, সূর্যমহল

‎রাজসিংহাসনের দরবার হল। এখানেই রাজ্যের বিচার, যুদ্ধ ঘোষণা, চুক্তি সব হয়,  চন্দ্রমহল

‎রানিদের অন্দরমহল। সাদা পাথরের দেয়াল, রুপালি ঝাড়বাতি, আর ফোয়ারার মৃদু শব্দ। রংমহল নাচ-গান, উৎসব, কূটনৈতিক ভোজসভা। দেয়ালে কাঁচের কারুকাজ, মেঝেতে মখমল। শয়নমহল

‎রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বিশ্রামকক্ষ,  অস্ত্রাগার মহল

‎দশ হাজার সৈন্যের অস্ত্র সংরক্ষিত। তলোয়ার, ধনুক, কামান সব সারি সারি সাজানো। বাগানমহল

‎ফোয়ারা, গোলাপবাগান, ময়ূরের নাচ—রাজ্যের প্রাণ।

‎গ্রন্থাগার মহল

‎প্রাচীন পুঁথি, মানচিত্র, যুদ্ধকৌশল, চিকিৎসাবিদ্যার বই। অতিথি মহল বিদেশি দূত ও বণিকদের থাকার জন্য।  গোপন সুড়ঙ্গ মহল

‎শুধু রাজা আর প্রধান সেনাপতি জানে—যুদ্ধের সময় পালানোর গোপন পথ।মানুষ ও জনসংখ্যা মায়ানগরে প্রায় দুই লাক্ষ প্রজা বাস করে।কৃষক, কারিগর, তাঁতী,মৃৎশিল্পী,সৈন্যব্যবসায়ী

‎সৈনিক এর সংখ্যা ১০,০০০ পদাতিক ৩,০০০ অশ্বারোহী ৫০০ হাতির বাহিনী, ২০০ কামান

‎আয়নার কক্ষ,চাঁদের বারান্দা

‎মহলের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা—বারান্দা।

‎সাদা মার্বেলের তৈরি, চারদিকে খোলা আকাশ।

‎রাতে চাঁদের আলো এসে সরাসরি এই মহলের উপর পড়ে।


‎এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো রাজ্য দেখা যায়,এটা কেবল এই রাজ্যের উত্তরঅধীকারিরা তার সহর্ধমীনি নিয়ে প্রবেশ করতে পারে।


‎মিরাজ মহল


‎এই মহলে কেউ সহজে যায় না। অনেক রহস্য লুকানো।

‎রাত-ই-আরশ মহল

‎শুধু রাতেই খোলা হয়।

‎নিষিদ্ধ মহল

‎এখানে প্রবেশ করা নিষেধ। বিশ্বাসঘাতকদের ইতিহাস এখানে বন্দি।

‎আরজান মহল


‎রাজপুত্রের ব্যক্তিগত মহল। সৈন্য পাহারা দেয় সবসময়।


‎শাহবাজ মহল


‎রাজপুত্রের যুদ্ধ পরিকল্পনার স্থান।


‎ফখর মহল,

‎রাজপুত্রের সম্মান ও পুরস্কার রাখার কক্ষ। এখানে আরো অনেক মহল আছে কিন্তু তা সবার অজানা,শুধু আরজান এর বাব,চাচা আর দাদা ছাড়া কেউ জানে না।


‎মেহেরানগর শুধু একটি রাজ্য ছিল না, ছিল এক অনুভূতি। ভোরের প্রথম আলো যখন প্রাসাদের সাদা গম্বুজে এসে পড়ে, তখন মনে হতো যেন আকাশ নিজেই এই রাজ্যকে আশীর্বাদ করছে। চন্দন আর শিউলির গন্ধে ভরা বাতাস, দূর থেকে ভেসে আসে নদীর কলতান, আর রাজপথ জুড়ে মানুষের ব্যস্ত চলাচল—সব মিলিয়ে রাজ্যটি যেন প্রাণময় এক কবিতা হয়ে ওঠে।

‎রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধীকারী আরজান নবাব,আরজান নবাব এর দাদার পাঁচ ছেলে আর এক মেয়ে ছিল। বড় চার ছেলের ঘর ভরা ছিল কন্যাসন্তানে। রাজপরিবারে আনন্দ ছিল, কিন্তু উত্তরাধিকারীর অভাব নিয়ে ফিসফাস চলত। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য যেন অন্যরকম গল্প লিখল—সবচেয়ে ছোট ছেলের ঘরে জন্ম নিল এক ছেলে। তার নাম রাখা হলো আরজান সে গর্ভে আসার পর থেকে রাজ্যের এক এক সুনাম আসতে থাকে চারিদিকে, গর্ভে থাকা অবস্থায় যেনো সবার ভালোবাসার একটা অংশ হয়ে উঠেছিলো তাই সবাই   আদুরেরর নাম রেখেছে আরজান, সে সবার জানবাচ্চা ছিলো । আরজান ভূমিষ্ঠ হবার সেই দিন থেকে রাজপ্রাসাদের বাতাস বদলে গেল। সবার এতো হাশিখুশি দেখতে দেখতে , শিশু আরজান বড় হতে থাকল অদ্ভুত এক শান্ত সৌন্দর্য নিয়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে এমন এক মায়া জন্ম নিল, যা মানুষকে অকারণই টেনে নিত। সে রাজপুত্র হয়েও অহংকার জানত না। প্রজাদের মাঝে হাঁটত, অসুস্থদের খোঁজ নিত, শিশুদের মাথায় হাত রেখে হাসত। কেউ সাহায্য চাইলে ফিরিয়ে দিত না।

‎যৌবনে পৌঁছাতেই সে হয়ে উঠল রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু—সব চোখ যেন তার দিকেই নিবদ্ধ।

‎সাদা পাঞ্জাবি পরা আরজানকে যখন সকালে প্রাসাদের বাগান দিয়ে হাঁটতে দেখা যেত, সূর্যের আলো তার কাঁধে এসে পড়ত—মনে হতো যেন আলো নিজেই তাকে অনুসরণ করছে। তার চোখে ছিল কোমল দৃঢ়তা, শেওলা কালার  পড়া চোখের মনিতে ছিলো মায়ার ভরপুর, কথায় ছিল শান্তি। সৈন্যরা তাকে দেখে সাহস পেত, বৃদ্ধরা আশীর্বাদ করত, আর সাধারণ মানুষ মনে মনে বলত—“


‎এই ছেলেই একদিন আমাদের রাজা হবে।”


‎আরজান জানত না, সবাই তাকে কতটা ভালোবাসে। সে ভাবত, সে শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করছে।আর সামনে করবে!

‎দাদা তাকে খুব স্নেহ দেখাতেন। দরবারে সবার  সামনে বলতেন,


‎“এই ছেলে আমার গর্ব।”


‎আরজান বিশ্বাস করত সেই কথা। সে বুঝতে পারত না, দাদার দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত হিসাব লুকিয়ে থাকে—যেন ভালোবাসার আড়ালে অন্য কোনো চিন্তা কাজ করছে।

‎রাজ্যের মানুষ আরজানের মধ্যে ভবিষ্যৎ দেখত। বাজারে বণিকরা বলত, তার শাসনে বাণিজ্য আরও বাড়বে। কৃষকরা ভাবত, এই রাজপুত্র তাদের কষ্ট বুঝবে। সৈন্যরা বিশ্বাস করত, সে যুদ্ধের আগে মানুষের জীবনকে মূল্য দেবে।

‎রাতে প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরজান যখন দূরের আলোভরা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকত, তার মনে হতো—এই রাজ্য তার পরিবার। সে প্রতিজ্ঞা করত, কখনো কাউকে কষ্ট দেবে না।

‎সে জানত না, রাজ্যের সৌন্দর্য যত উজ্জ্বল, তার ছায়া ততই গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকে।

‎দরবারের হাসির আড়ালে, অন্দরমহলের নীরবতায়, আর ক্ষমতার অদৃশ্য খেলায়—একটি ঝড় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল। আরজান তখনও সেই ঝড়ের শব্দ শুনতে পায়নি।

‎সে শুধু জানত—এই রাজ্যকে ভালোবাসতে হয়। আর ভালোবাসার মানুষরা কখনো বুঝতে পারে না, কখন তাদের ভালোবাসাই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে ওঠে।


‎আরজান দাদাজান এর হাতে চুমু খেয়ে বলে।


‎”দাদাজান তুমি আছো বলেই আমি একটু রিলেক্স থাকি এতো তারাতারি দায়িত্ব চাপিয়ে দিও না।


‎“এভাবে তো আর চলতে পারে না। আপনার বয়স হয়েছে, নবাব।”


‎”দাদাজান তুমি আমায় আবার আপনি বলছো? “তুমি যদি তোমার ফরমালিটি বজায় রাখো, আমি তোমার রাজ্যে তো দূরের কথা, আরজান মহলের বাইরে পর্যন্তও যাব না।”


‎” আমি তোমায় সম্মান করি আরজান তুমি এই রাজ্যের শেষ নবাব তাই তোমার সম্মান আমার কাছে অনেক। আর জানো আমরা সম্মান করি  যাদের,তাদের  কিন্তু আপনি করে বলি এটা  এই রাজ্যের একটি রীতি।


‎“দাদাজান… আমি আপনার এসব মানি না।



‎আরজানের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, আর তার চোখে লুকিয়ে ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা এক নীরব ক্লান্তি। কিন্তু রাজবীর নবাব এর চোখ, মুখ কেমন শুখিয়ে যায় এক। মুহুর্তে আরজান এর কথা শুনে।

‎“আমি সাধারণ মানুষের মতো হতে চাই। যেখানে মানুষ আমার কাছে আসবে ভালোবাসা নিয়ে… আমার নামের ভারে নয়, আমার বংশের অহংকারে নয়। আমি চাই, তারা আমাকে ভালোবাসুক আমার জন্য—আরজান হিসেবে, কোনো নবাব হিসেবে নয়।”

‎সে এক মুহূর্ত থামল। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল।

‎“এই অতিরিক্ত মর্যাদা, এই দূরত্ব… আমাকে আনন্দ দেয় না, দাদাজান। বরং একা করে ফেলে। আমি চাই, সাধারণ মানুষের মতো সম্মান, যেখানে থাকবে আন্তরিক ভালোবাসা, যেখানে থাকবে আপন করে নেওয়ার স্পর্শ।”কোনো ভয়ের দেয়াল থাকবে না আমাদের মাঝে।”

‎তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল।

‎দাদাজান ও প্রিয় দাদীজানের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে, আরজান নবাব নিঃশব্দে উঠে বসে। চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি, তবুও ঠোঁটে আনল এক শান্ত হাসি।

‎“আচ্ছা, দাদাজান… আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি। আপনারা যান, আমি একটু পরে যোগ দেব।”

‎এই বলে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, যেন রাজপ্রাসাদের উঁচু দেয়ালের ভেতর থেকেও নিজের জন্য এক সাধারণ জীবনের মুক্ত আকাশ খুঁজে ফিরছে।

‎প্রিয় নাতির কথায় দু’জন বের হয়ে এলেন আরজান মহল থেকে। আরজান মহলের ভিতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ—যা বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছে আরজান নবাবের জন্য। রাজবীর নবাব ও তাঁর সহধর্মিণী বাইরে পা রাখতেই, আরজান নবাবের চোখ হঠাৎ আটকে গেল বালিশের নিচে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো স্মৃতির ওপর।

‎সিদুর-রঙা, টুকটুকে লাল এক জামদানী ওড়না… প্রায় পাঁচ হাত লম্বা।

‎আরজান নবাব ধীরে ধীরে ওড়নাটি তুলে নিলেন হাতে। আঙুলের স্পর্শে নরম কাপড় যেন কেঁপে উঠল, ঠিক তার নিজের হৃদয়ের মতো। তিনি ওড়নাটি মুখের কাছে নিয়ে গভীর করে শ্বাস নিলেন। সুগন্ধটা, পরিচিত সেই মায়া… যেন তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।

‎চোখ বুজে তিনি বিরবির করে বলতে লাগলেন—

‎“চন্দ্রবালা…
‎তোমার এই ওড়নায় এখনও তোমার স্পর্শ রয়ে গেছে।
‎এই কাপড়ের প্রতিটি সুতোর মাঝে লুকিয়ে আছে তোমার নিঃশ্বাস, তোমার লজ্জা, “তোমার মায়া জানো, এই ওড়নাটা শুধু কাপড় নয়—এটা আমার জন্য একটুকরো সুখ। যেদিন তুমি আমার সামনে থাকবে, সেদিন আমি নিজ হাতে তোমার মাথায় এটি পরিয়ে দেব।”
‎কারণ এই  লাল রং আমার ভালোবাসার প্রতিক  আমার অধিকারীর, আমার চন্দ্রবালার!

‎আরজান ওড়নাটি বুকে চেপে ধরলেন। তার কঠিন নবাবি চোখেও তখন নরম এক আলো।
‎রাজ্যের নবাব হয়েও, এই মুহূর্তে তিনি শুধু একজন প্রেমিক,হুম পাগল প্রেমিক যে কি না ১৪  বছর  এর এক কিশোরী মেয়ের প্রেমে পরেছে।  কিশোরী প্রিয়তমাকে কাছে না পেয়ে তার শরীরের ওরনা লুকিয়ে নিয়ে এসেছে, যাতে মনে পরলে এই ওরনার সাথে  কথা বলতে পারে। আর   এখন প্রিয়তমার একটি ওড়নায় খুঁজে পেয়েছে নিজের সমগ্র পৃথিবী এই মূহুর্তে আরজান নবাব।

পর্ব-২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *