
প্রেমের বাজিমাত
লেখনিতে রোজ ও রুশা
পাঠ_১৭
দিন যায়, ভোর হয়। আকাশের রঙ বদলায়, কিন্তু মানুষের জীবন একই রকম দৌড়ে আটকে থাকে। কেউ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেয়, কেউ হারিয়ে ফেলে নিজের ইচ্ছেগুলো। শহর জেগে ওঠে কোলাহলে, আর সেই কোলাহলের ভিড়েই কিছু গল্প নীরবে জন্ম নেয়—অপূর্ণ ভালোবাসা, না-বলা অভিমান আর অদৃশ্য লড়াইয়ের গল্প।
এই গল্পও তেমনই এক ভোর থেকে শুরু, যেখানে সূর্য উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু সবার জীবনে আলো আসেনি এখনো।
নবীন বরণ অনুষ্ঠান। সকাল থেকেই সেজে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস—রঙে, হাসিতে আর উৎসবের কোলাহলে। চারদিকে বাসন্তি রঙের শাড়িতে মেয়েরা যেন বসন্তকেই সঙ্গে নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
আর ছেলেরা সাদা পায়জামা আর কালো,নিল পাঞ্জাবিতে আলাদা এক গাম্ভীর্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হেরা আজ প্রথমবার শাড়ি পরেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বারবার দেখছে ।নিজেকেই চিনতে পারছিল না সে। রুশা আর তার —দুজনেরই অবস্থা প্রায় একই। শাড়িতে তারা অভ্যস্ত নয়, তবে রোজ মাঝেমধ্যে পরার অভ্যাস থাকায় তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। রোজ সহ তিনজন আজ লেহেঙ্গা-স্টাইলে শাড়িটা সামলে নিয়েছে । কুঁচি ঠিকমতো ধরা তাদের পক্ষে কঠিন, তাই সহজ করে পরেছে। চুলে, কানে ফুল গুঁজে লাজুক হাসিতে তারা যেন নতুন এক বয়সে পা রাখল।
চারপাশে গান বাজছে, বন্ধুরা ছবি তুলছে, হাসির শব্দে ভরে আছে ক্যাম্পাস—আর এই ভিড়ের মাঝেই অজান্তে শুরু হতে যাচ্ছে তাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
রোজ আর রুশা চুলে গাঁদা ফুলের মালা জড়িয়ে নিয়েছে—হালকা দোল খাওয়া ফুলগুলো তাদের হাসির সঙ্গে যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আর হেরা… সে আজ আলাদা। লম্বা চুলগুলো খোলা, তার ওপর বেলিফুলের মালা এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন সুবাস ছড়িয়ে চারপাশ থমকে দিতে চায়। আজ তাকে দেখলে মনে হয়, ক্যাম্পাসের অর্ধেক ছেলেরই দৃষ্টি এসে আটকে যাবে তার চুলের ঢেউয়ে। গাঢ় কাজল চোখ দুটোকে আরও গভীর করে তুলেছে,ছোট কানের দুল আর দু’হাতভরা চুড়ির টুংটাং শব্দে তার হাঁটা যেন আলাদা এক ছন্দ তৈরি করছে।
হেরাদের গ্রুপের থিম লাল-কালো। তাই হেরা লাল-কালো কম্বিনেশনে লেহেঙ্গা-স্টাইল শাড়ি পরেছে। খুব বেশি সাজ নয়, তবু তার দিক থেকে চোখ ফেরানো দায়। কেউ সরাসরি তাকাচ্ছে, কেউ আড়চোখে—কিন্তু সবাই একবার না একবার তাকাচ্ছেই। রোজ আর রুশাকেও কম সুন্দর লাগছে না,তিনজন একসঙ্গে দাঁড়ালে যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে ওঠছে ।
নিলয় দূর থেকে হেরাকে দেখেই থমকে যায়। এতদিন যাকে চুপচাপ ভালোবেসেছে, আজ তাকে যেন নতুন করে দেখছে সে। বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা নিজের কাছেই অচেনা লাগে।
আর নাভান… ভিড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে, মুখে স্বাভাবিক উদাসীনতা। হেরার সঙ্গে তার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা ব্যথা ওঠে। চোখ একবার তার দিকে যেতে চায়, কিন্তু সে নিজেকেই থামিয়ে নেয়। না, সে তাকাবে না। এই সুন্দরী মেয়েটার দিকে তাকানোর অধিকার যেন তার নেই—অথবা সে নিজেই সেই অধিকার স্বীকার করতে চায় না।
তবু অদ্ভুতভাবে, যতবার সে চোখ সরিয়ে নেয়, ততবারই ভিড়ের মাঝে লাল-কালো রঙটা আবার তার চোখে এসে পড়ে… আর অজান্তেই শুরু হয়ে যায় এক অস্বীকার করা অনুভূতির গল্প।
দূর থেকে সবটা দেখছিল নাভান। নিলয় হঠাৎ ভিড় ঠেলে হেরার দিকে এগিয়ে আসছে—তার চোখের সেই অস্থিরতা, মুখের লুকানো উচ্ছ্বাস নাভানের চোখ এড়ায় না। অকারণে বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে আসে তার। এক মুহূর্তের জন্য চোখ থেমে যায় হেরার ওপর, তারপরই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ভিড়ের মাঝেই ধীরে ধীরে সরে যায় অন্য দিকে, যেন কিছুই দেখেনি, কিছুই অনুভব করেনি।
এদিকে নিলয় প্রায় দৌড়েই এসে থামে হেরার সামনে। হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই থাকে, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিতে পারছে না। তারপর হালকা হেসে বলে—
হেরা, ফুল, সত্যি তোমায় আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে। কে বলেছে এই রূপে এসে ছেলেদের হার্টের রোগের কারণ হতে? তার কি খুব দরকার ছিল?
হেরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে চুড়ি নাড়াতে থাকে। নিলয় আবার বলে ওঠে,
— এই রঙটা যেন তোমার জন্য বানানো হয়েছে। জানো, ছেলেরা কেমন হা করে দেখছিল তোমায়।
রোজ আর রুশা পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে। হেরা লজ্জা লুকাতে অন্যদিকে তাকায়, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি চলে আসে।
নিলয়ের চোখে তখন শুধু মুগ্ধতা। এতদিনের চেনা মেয়েটাকে আজ নতুন করে আবিষ্কার করার বিস্ময় মিশে আছে সেখানে। আর ঠিক সেই সময়, দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে না থেকেও নাভানের না-তাকানো দৃষ্টিটা যেন অদৃশ্যভাবে এই মুহূর্তের ভেতরেই রয়ে যায়।
এদিকে নিলয় রোজ আর রুশার উদ্দেশে বলে—
“প্লিজ, বোনটি,একটু নিয়ে যাই তোমাদের ফ্রেন্ডকে। আবার সহিসালামতে দিয়ে যাবো। জাস্ট ৫ মিনিট।
— ওকে, তার জন্য কিন্তু ট্রিট চাই। (রুশা)
— এই নাও, ক্রেডিট কার্ড। যত লাগে খাও। (নিলয়)
রোজ গভীর শ্বাস ফেলে বলল—
— দোস্ত, এমন একটা ছেলে কই পাবো, কথায় কথায় ক্রেডিট কার্ড বের করে বলবে, “যা ভালো লাগে, নিয়ে নাও”?
রুশা মলিন মুখ করে বলে,
— আর শপিংয়ে গেলে একটা ড্রেস পছন্দ হলে বলবে, “এইটা না, পুরো দোকানটাই প্যাক করে দেন, আমার ভালোবাসার জন্য।”
রোজের মুখেও আফসোসের সুর।
— হ্যাঁ, আর মাঝে মাঝে কোলে তুলে বলবে, “চলো, হাঁটতে হবে না।”
রুশা কপালে হাত রেখে ভাবুক ভঙ্গিমা করে বলে,
— দোস্ত, এগুলা তো উপন্যাসে থাকে। বাস্তবে ছেলেরা আগে জিজ্ঞেস করে, “ডিসকাউন্ট আছে তো, ভাই?”
রোজ মাথা নেড়ে বলল,
— তাইলে বাস্তব প্রেমে কি এগুলা নাই?
রুশা একটু মুচকি হেসে বলল,
— বাস্তবের প্রেমে ক্রেডিট কার্ড নাই, বিকাশ ব্যালেন্স চেক করা হয়। আর কোলে তোলার বদলে দুজনেই এক ছাতার নিচে ভিজে ফেরে।
রোজ হেসে বলল,
— মানে রাজকুমার নাই তাহলে, বান্ধবী?
রুশা মাথা নেড়ে মলিন মুখ করে বলে,
— আছে, কিন্তু মাসের শেষে বেতন শেষ হলে রাজত্বও শেষ হয়ে যায় তাদের।
রোজ চুপ করে ভাবল, আসলে কি টাকাই সব এই লাইফে? তাহলে বড়লোকদের মধ্যে কেন বিচ্ছেদ হয়?
— জানিস, রসুন রানী, তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, কেউ থাকুক, যে না বললেও বুঝবে… মনের সব কথা!
রুশাও যেন বোঝল রোজের কথা, সেও সহমত দেয়।
ওইটাই আসল গোলাপ ফুল—যে ১০০টা জিনিস কিনে দেয় কিন্তু পাশে থাকে না, যে একটা জিনিস কিনতে না পারলেও পাশে বসে বলে, “মন খারাপ কইরো না”… ওইটাই বাস্তবের হিরো রে “গোলাপ ফুল।
রোজ এবার বাস্তবতায় ফিরে আসে। লাইক তারা ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিলো ।এমন ভন্ডদের মুখে ইমোশনাল কথা যে মানায় না। রোজ রুসুনরানীর দিকে তাকিয়ে বললো—
— মানে উপন্যাসের ভালোবাসা চোখে লাগে, আর বাস্তবের প্রেম মনে লাগে? উপন্যাসের ভালোবাসা আমাদের আকৃষ্ট করে, তাদের অনুভূতির প্রেমে ফেলে। কিন্তু আসলে বাস্তবতার সঙ্গে তখনই মিল পাই, যখন মানুষ দুটির মেন্টালিটি এক হয় বুঝলি রসুনরানী?
রুশা বলল,
— একদম। উপন্যাসে নায়করা কোলে তুলে নেয়, বাস্তবে হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে। এই ধরার মাঝেও সুখ পাওয়া যায়, যদি ভালোবাসা থাকে, অনুভূতি থাকে।
— চাইলে কিন্তু আমিও কোলে নিতে পারি, লাল গোলাপি। (অধীর)
পিছন থেকে কারও এমন কথায় ঘুরে তাকায় দুই রমণী। ঘুরে দেখে, নীল পাঞ্জাবি পরিহিত দুই সুদর্শন পুরুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। রুশা অধীরের কথার জবাব দেয়—
— আপনার কোলে ওঠার কোনো শখ নেই।
পাশ থেকে সৃজন বলে ওঠে—
— উফ, শালিকা! একবার কোলে উঠে দেখো, আর নামতে চাইবে না। আর এই যে দেড় ব্যাটারি গোলাপ ফুল , চাইলেও আমিও উপন্যাসের নায়কদের মতো হুটহাট কোলে তুলে ঘুরাতে পারব। ক্রেডিট কার্ডও দিতে পারব। আমরাও কিন্তু কম না, বুঝলে—তোমাদের উপন্যাসের নায়কদের থেকে।
সৃজন রোজ এর সামনে এসে হিরো ভাব নিয়ে বলে কথাটা! তাদের আজ নিয়ত দুই বন্ধু যেভাবেই হোক এই রমণীদের পটাবে। তাদের ক্লাসের একজনের কাছ থেকে শুনেছে, মেয়ে দুটো উপন্যাসের ভক্ত—অধীর আর সৃজন আজ নিজেদের এমনভাবে ফিট রেখেছে, একদম উপন্যাসের নায়ক টাইপ। চুলে একটু বাতাস লাগলেই দুল খাচ্ছে, আর মনে হয় ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে, আর হাঁটলেই যেন স্লো মোশন চলছে। ইসস পুরাই সুপারস্টার।
কাল রাত থেকে দুজনেরই সিদ্ধান্ত—আজ প্রেমিকাদের সামনে নিজেদের “উপন্যাসের ছেলেদের মতো” প্রমাণ করবে। কিন্তু প্রেমিকাদের এমন রূপ দেখেই সব উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। সৃজনের কানে অধীর শুধায়—
— “দেখিস, আজ এমন কথা বলব, রুশা একদম মুগ্ধ হয়ে যাবে।
সৃজন বুক ফুলিয়ে বলল__
— আর রোজ ভাববে, আমি নিশ্চয়ই কোনো বই থেকে বের হয়ে এসেছি!
তাদের ফিসফিস করতে দেখে রোজ আর রুশা চলে যায় মঞ্চের সামনে। অধীর আর সৃজনও তাদের পিছু নেয়।
“রসুন রানী ” আজ চুইংগাম হিরোকে যা লাগছে পুরাই রকস্টার।
“হুম ” ওই যে দেখ চকলেট হিরোকেও কিন্তু পুরাই হট লাগছে দেখ “
নিলয় আর নাভান এর কথা বলতে থাকে। কাকে বেশি সুন্দর লাগছে আজ।
কিছুক্ষণ পর রোজ আর রুশা এসে বসল তাদের সিটে। রোজ আর রুশা বুঝতে পারছে, আজ অধীর আর সৃজন এদের মধ্যে অস্বাভাবিক শান্ত ভাব। সাধারণত এরা এত ভদ্র না। বদের হাড্ডি!
অধীর আর সৃজন তাদের পেছনের চেয়ারে বসে। অধীর গভীর গলায় বলল—
” তুমি জানো, লাল গোলাপি, তোমার চোখে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি…
রুশা এক সেকেন্ড চুপ থেকে পেছনে তাকিয়ে বলল—
” চোখে ভবিষ্যৎ দেখো? আগে নিজের সিস্টেমের রেজাল্টটা দেখো। তারপর ভবিষ্যতে দেইখো।
অধীরের মুখটা দেখার মতো হয়েছিল । এই মেয়ে বারবার তার মূল্যবান জিনিসের কথা বলে। একটা ভুলের জন্য তাকে বারবার হার মানতে হচ্ছে এই লাল গোলাপির কাছে।
সৃজন হার না মেনে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“রোজ, তুমি না থাকলে আমার পৃথিবী থেমে যাবে।
রোজ হেসে বলল,
“তাই নাকি? থামলে থামুক, তাতে আমার কী? পনারটা থামবে, আর কারওটা না—ওকে?
অধীর সৃজনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
” দোস্ত, উপন্যাসে মেয়েরা এমন উত্তর দেয় না।
সৃজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
” উপন্যাসে লেখক নায়কদের বাঁচায়, এখানে কেউ বাঁচাচ্ছে না আমাদের!
রোজ আর রুশা তখন হেসে কুটিকুটি।
রুশা বলল,
“তোমরা উপন্যাসের নায়ক না, তোমরা কমেডি ভার্সন।
অধীর গম্ভীর হয়ে বলল,
“নায়ক না হই, কিন্তু তোমাদের হাসাতে পারি—এটাও তো একটা ট্যালেন্ট। বুঝতে পেরেছো, লাল গোলাপি?
রুশা মুচকি হেসে বলল!
” এই জন্যই তো এখনো সহ্য করছি।
রোজ আর রুশার পেছনে দুইজন পড়ে আছে।
এদিকে নিলয় হেরাকে একটা ফুলের দোকানে নিয়ে গিয়ে বেলিফুলের হাতের বালা বানাচ্ছে নিজ হাতে। হেরা শুধু নিলয়ের পাগলামি দেখছে। তিতির আজ কালো শাড়ি পরেছে মোটামুটি মার্জিতভাবে, কারণ নাভান এত উশৃঙ্খল মেয়ে পছন্দ করে না। তিতিরকেও আজ অনেক সুন্দর লাগছে। সে সারাক্ষণ নাভানের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে।তিতির নাভানের হাত ধরে নিয়ে আসে ফুলের দোকানে। মূলত তিতির চাচ্ছে, নাভান তাকে ফুলের মালা কিনে মাথায় গুঁজে দিক। তিতির হেরাকে পাশ কাটিয়ে দোকানে লোককে বলে—
“মামা বেলি ফুলের গাজড়া বানিয়ে দেন তো।
ফুলের দোকানের ভেতরটা তখন বেলিফুলের গন্ধে ভরে আছে। বাইরে থেকে দেখলে সব স্বাভাবিক,হাসি, গল্প, সাজগোজ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কারও কারও মনে কেমন তীব্র ঝড়।
নিলয় মালা গাঁথছে। হেরা তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুল ছুঁয়ে দিচ্ছে। ওদের এই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটা নাভানের চোখে কাঁটার মতো বিঁধছে। সে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে,কিন্তু ফোনে কী আছে, সে নিজেও জানে না। তার মন আটকে আছে হেরার আঙুলে ছোঁয়া সাদা ফুলগুলোর দিকে… আর নিলয়ের ঝুঁকে পড়া মুখে।
তিতির তখন ইচ্ছে করেই নাভানের হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে দোকানের একপাশে।
তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ছিলো । সে চায় নাভান তাকাক শুধু তার দিকে।
নাভান মাথা নাড়ে। ঠোঁটে হালকা হাসি আনে। যেন কিছুই হয়নি, কিছুই যায় আসে না হেরা আর নিলয় কে এখানে দেখে!!
ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটে।
নিলয় মালা গাঁথতে গাঁথতে হেরাকে বলে—
” কোন ফুল পছন্দ “গোলাপ? ” নিয়ে আসো “
“
হেরা একটু এগিয়ে গিয়ে গোলাপ ফুল গুলো নিতে যায়,ফুলগুলো অসম্ভব সুন্দর।
নাভানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ শক্ত হয়ে যায়। সে এগিয়ে আসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। মুখে নির্লিপ্ত ভাব।
“এই ফুলটা এভাবে ধরতে হয় না!
বলতে বলতেই সে হেরার কব্জিটা নিজের আঙুলে চেপে ধরে। চাপটা একটু বেশি পড়ে যায়। না, ভুল করে নয়। ইচ্ছে করেও নয়, অন্তত বাইরে থেকে তা-ই মনে হবে।
হেরা চমকে ওঠে। একটা ধারালো তার বা কাঁটা কব্জির গায়ে ঘষে যায়।
” আহহহ”
মুখ দিয়ে আহ শব্দ বের হয় হেরার, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয় হাত থেকে।
এক সেকেন্ড। শুধু এক সেকেন্ডের জন্য নাভানের চোখ বদলে যায়। আতঙ্ক, অনুশোচনা, অপরাধবোধ,সব একসঙ্গে ঝলসে ওঠে।
কিন্তু মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলায়। ফোনটা আবার হাতে নেয়। গলা ঠাণ্ডা করে বলে,
“ফুলে কাঁটা থাকবেই। সাবধানে ধরতে হয়।”এটাও শিখেন নি?
নিলয় দৌড়ে আসে।
“হেরা! কি হলো!?
সে হাত চেপে ধরে। নাভানের দিকে একবার তাকায়,কিন্তু কিছু বোঝে না।
নাভান পকেট থেকে রুমাল বের করে এগিয়ে দেয়।
আমি বাধা দেয়ার আগেই অঘটন ঘটলো!! যাই হোক “এইটা দিয়ে বেঁধে দে। সময় নেই এখন।
তার কণ্ঠে বিরক্তি, যেন ঘটনাটা খুবই সাধারণ। যেন রক্ত দেখা তার জন্য নতুন কিছু না।
কিন্তু রুমালটা এগিয়ে দেওয়ার সময় তার আঙুল কাঁপছিল,খুব সূক্ষ্মভাবে। কেউ খেয়াল করে না।
হেরা তাকায় না তার দিকে। সে শুধু বুঝতে পারে নাভান ইচ্ছে করে হয়তো দিয়েছে । হাতের চাপটা একটু বেশি ছিল। এতটা অসাবধান সে না।
তিতির সব দেখছে। তার ভেতরটা কেমন অদ্ভুত শান্তিতে ভরে ওঠে। হেরার রক্ত দেখে না, দেখে নাভানের ঠাণ্ডা মুখ। সে ভাবে,নাভানের কিছুই যায় আসে না।
আর নাভান?
তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। সে নিজেই বুঝতে পারে না,ওটা রাগ ছিল, না হিংসা। হেরাকে অন্য কারও এত কাছে দেখে তার ভেতরে যে দহন উঠেছিল। সেটারই একটা ঝলক কি বেরিয়ে এলো ওই চাপে?
কিন্তু সে কিছুই প্রকাশ করবে না। তার চোখে থাকবে দূরত্ব। তার কথায় থাকবে কাঁটা।
নিলয় রুমাল দিয়ে হেরার হাত বেঁধে দেয় খুব যত্ন করে। তার চোখে স্পষ্ট ভালোবাসা কোনো লুকোচুরি নেই। নাভান পকেট থেকে টাকা বের করে তিতির কে দেয়।
তিতির তখন ৫০০ টাকার নোট হাতে পেয়ে খুশিতে ঝলমল করছে।
“হাতে গলায়,মাথায় সব জায়গায় বেলিফুল পরবে।
নাভান বলে। তার গলায় হালকা হাসি।
তিতির ভাবে,সে জিতে গেছে।
কিন্তু কেউ জানে না,নাভান নিজের ভেতরের যুদ্ধটা হেরে গেছে সেই মুহূর্তেই, যখন তার আঙুলের চাপে হেরার কব্জিতে রক্ত বের হয়েছিল।
সে ভালোবাসে কি হেরাকে নাকি অন্যকিছু । কিন্তু সে স্বীকার করবে না।
সে কষ্ট পায়। কিন্তু দেখাবে না।
আর আজ, হিংসেটা সে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তবু অজান্তেই তার একটা আঁচড় পড়ে গেছে হেরার গায়ে।
শুধু কাঁটার দাগ না, অভিমান আর না বলা ভালোবাসার দাগ। নিলয় নিরুপায় হয়ে রুমালটা নেয় নাভান এর থেকে । কারণ তার কাছে রুমাল নেই। এদিকে মাইকে অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে,তাদের সেখানে যেতে হবে।
হেরার কষ্ট হবে বা সে হারবে,তা নিলয় মানতে পারবে না। দরকার পড়লে সে সবার কাছে ছোট হবে, কিন্তু হেরাকে ছোট হতে দেবে না।
নিলয় রুমাল দিয়ে হেরার হাত বেঁধে দেয়। তার পায়েও যখম। তিতির যেন এই সামান্য জিনিসটুকুও সহ্য করতে পারল না,কেন নাভান তার ইউজ করা রুমাল ওই মেয়েটাকে দেবে?
মাইকে নাভানের নাম অ্যানাউন্সমেন্ট হতে সে চলে যায়। সঙ্গে নিলয় আর হেরাও।
” ব্যাপার কী তোমাদের? তোমরা রাজি হচ্ছো না কেন আমাদের প্রেমের প্রস্তাবে? সৃজন বলল ।
রোজ গম্ভীর মুখে বলল,
“আমরা উপন্যাস পড়ি। সেখানে নায়করা কবিতা বলে, ফুল দেয়… কানে ধরে উঠবস করায় না। আপনাদের মতো?
রুশা মাথা নেড়ে যোগ করল,
“হিরো মানে সম্মান, স্টাইল, রহস্য… আপনারা তো পিটি ক্লাসের ছাত্র! তাই মানছি না!!
অধীর বিরক্তিকর মুখে “চ” উচ্চারণ করে কিছু বলতে যাবে কিন্তু সৃজন থামিয়ে দেয় । উলটা পালটা কিছু বললে যে এই রমনিরা তাদের মানবে না। সৃজন এর ইশারা বুঝতে পেরে অধীর বললো!
” উপন্যাসে লেখক থাকে, এখানে তো তোমরাই আছো! মিলিয়ে দাও না আমাদের!
সৃজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ বলল,
“দেখো, উপন্যাসের নায়করা ভুল করলে ক্ষমা পায়। তো আমাদেরও করে দাও,একটা মাত্র ভুল করেছি জীবনে।
রোজ হাসি চাপতে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
রুশা বলল,
” সমস্যা জানো কী? আমরা উপন্যাসের মতো প্রেম চাই।
অধীর চোখ বড় করে, মানে কি উপন্যাস এর মতো নায়ক চায় মানে কি? এটা হয় নাকি,উপন্যাসে লেখক যেমন ভাবে সাজাবে নায়ককে নায়ক ঠিক সেরকম হবে কিন্তু বাস্তবতা যে ভিন্ন।অধীর ঠাট্টা সুরে বললো—
” উপন্যাসে নায়ক বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি দাঁড়াব, কিন্তু সর্দি হলে ওষুধ কে দেবে?
সৃজন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“উপন্যাসের নায়ক নায়িকার জন্য মারামারি করে। আমি করব না, কারণ পরে তোমরাই বলবা—ঝামেলাবাজ!
“তোমরা হিরো না, তোমরা সমস্যা।
এদের নাটক দেখে, রোজ দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে বলল কথাটা। মুখে কড়া ভাব, কিন্তু চোখে একটু দুষ্টু ঝিলিক।
অধীর এক সেকেন্ডও সময় নিল না। বুক ফুলিয়ে, চুলটা হাতে ঝাঁকিয়ে বলল—
” সমস্যা না, রেগুলার আপডেট হওয়া হিরো,বাস্তব ভার্সন, ভাবি। আমরা প্রবলেম ফিক্স করি, ইমোশন হ্যান্ডেল করি, মাঝে মাঝে সার্ভার ডাউনও হয়ে যাই… কিন্তু কাজ করি ঠিকই!
রুশা হেসে ফেলল। সৃজন ফিসফিস করে বলল—
“তুই চুপ কর, আগুনে ঘি ঢালিস না।”ভাব নিস না আর!
রোজ ভ্রু তোলে বলল—
“ও আচ্ছা? তাহলে কয়েকদিন আগে স্যার এর কেবিনের ভেতর তোমাকে দাঁড়িয়ে কাঁপতে দেখলাম, সেটা কি ‘সিস্টেম আপডেট’ ছিল?”
অধীর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল
” আমি কাঁপছিলাম না,আমি ভেতরে ভেতরে প্ল্যান করছিলাম, কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবো সেটা ভাবছিলাম।
সৃজন পাশে থেকে ধাক্কা দিল!
“স্ট্র্যাটেজি না, স্ট্যাচু হয়ে গেছিলি!”সালা আবাল! চুপ আর একটা কথাও বলবি না তুই।
তারপর শুরু হলো তাদের “রাজি করানোর মিশন”।
সৃজন সাহস করে সামনে এগিয়ে গেল। বুক সোজা, চোখে আত্মবিশ্বাস আনার চেষ্টা,যদিও হাঁটু দুটো কাঁপছে।
সে গম্ভীর গলায় বলল!
“রোজ… তোমার জন্য একটা কবিতা লিখেছি।
অধীর পাশে থেকে ফিসফিস করল!!
“ভাই, আগে রিভিউ করাইছিস?”
সৃজন চোখ রাঙালো। তারপর শুরু করল”
” তুমি গোলাপ না… কারণ গোলাপে কাঁটা থাকে…
এই পর্যন্ত ঠিক ছিল।
তারপর বেচারার কি হলো কে যানে! হাত দিয়ে নাকে জমে থাকা ঘাম মুছে বলে!!
“তুমি সরাসরি খোঁচা মারো। ইয়ে মানে… খোঁচা মানে কাটা, কাটা ভালো খোঁচা… মানে… গোলাপ কাটা ইয়ে… আ… তো… ইয়ে…
রোজ মুখ ঘুরিয়ে হাসি আড়াল করতে লাগল । আর রুশা তো খিলখিল করে হেসেই যাচ্ছে । আর অধীর মুগ্ধ হয়ে তার লাল গোলাপিকে দেখছে । সৃজন এর কথায় অধীর দুই হাত দিয়ে মাথা চাপড়াল”এতো বার মুখস্থ করার পড়েও ভুল করছে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট সৃজন।
রোজ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল
” কি বললেন ? আমি কাঁটা? আমি সরাসরি খোচা মারি?”
সৃজন তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল
“না না না! এই মুখের যত দোষ! আমি বলতে চেয়েছিলাম তুমি স্পেশাল… ইউনিক… মানে গোলাপের মতো সুন্দর, কিন্তু কাঁটার মতো স্ট্রং না… মানে… আরে না! উল্টা হয়ে গেল!
মুখটা মলিন করে বললো সৃজন, অধীর পাশ থেকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল!
” ভাই, গোলাপকে গোলাপ বলতে গিয়ে কাঁটা বললি কেন? তুই প্রেম করবি নাকি প্রেমের আগে ব্রেকাপ করা শিখাবি আমাদের ? এর মধ্যে হেরা ও নাভান তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে! নাভান আজ না চাইতেও মুচকি হাসছে ভাই রুপি বন্ধুদের প্রোপোজ করা দেখে।এমনি এমনি তো নাম দেই নি ভন্ড!
সৃজন নাভান এর দিকে তাকায় নাভান ভাবলেশহীন বুকে হাত গুজে মিটি মিটি হাসছে নাকি ঠিক বুঝা গেলো না। সৃজন লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল”
“আমি আসলে বলতে চেয়েছিলাম, তুমি কাঁটার মতো খোঁচা মারলেও সেই খোঁচা ভালোবাসার… মানে… আরে ধুর!
হেরা এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি লুকাতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।বলেই ফেললো! “
” ঠিক আছে, কবি ভাই সাহেব। আজ থেকে কবিতা মুখস্থ করা বন্ধ করে রিয়েল লাইফে ফিরে আসুন। এটাতে মুখস্থ করা লাগে না।ভালোবাসলে মন থেকে এমনি মুখ দিয়ে ভালোবাসার ছন্দ এসে পরে!
বেচারা সৃজন এর কাহিনি দেখে অধীর সব ভুলে গেছে মাথা চুলকিয়ে অধীর সঙ্গে সঙ্গে বলল—
“হ্যাঁ, ওর কবিতা শুনে আমি পর্যন্ত সিঙ্গেল হয়ে যাচ্ছি।প্রোপোজ না করার আগেই রিজেক্ট এর দলে পরতে যাচ্ছি!
সৃজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল!
” দূর তোদের মতো আমি না ” কবিতা উপন্যাস এগুলো আমার ধারা হবে না! আমি হাত ধরবো আর সরাসরি পালিয়ে যাবো!
অধীর গম্ভীর হয়ে বলল!
“পালানো আমার ডিপার্টমেন্ট। প্রেমের ডিপার্টমেন্ট তোদের । আমিও এসব পারবো না।
কথাটা যদিও ফিসফিস করে বলেছে অধীর । প্রপোজ তো করতে হবে তা না হলে প্রেম করবে কিভাবে।সৃজন আপাতত চুপ সে তার গোলাপ ফুলের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছে এটাই অনেক। মুগ্ধ চোখে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে দেখছে রোজকে সৃজন। এবার অধীর রুশাকে ইমপ্রেস করতে গিয়ে সিনেমার ডায়লগ বলতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল!বেচারার এমনি মাথা ভড়া উলু মাটি ভরা সৃজন তো তাও ভুল বাল বলে রোজ কে হাসাতে পেরেছে কিন্তু সে কি করবে ? সৃজন এর কবিতা শুনে সব যে গুলিয়ে ফেলেছে সে। তাও একটু ভাব নিয়ে বলতে লাগলো!
“তুমি আমার পাকস্থলী… মানে… ওয়াইফাই! হুম… কারেন্ট থাকলে কানেকশন, না থাকলে কানেকশন নাই।
রোজ আর রুশা একে অপরের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকায়। নাভান এবার কপাল কুচকে বলে—
জান,কলিজা এতো কিছু থাকতে পাকস্থলী যেখানে ” ছি! ” ইডিয়েট এমনি এমনি তোদের ভন্ড বলি!ছি পাকস্থলী!!
না আর ভাবতে পারলো না রুশার রাগে তার গাল আরো লাল গোলাপি আকার ধারন করেছে।
সৃজন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
“ভাই, পাকস্থলী থেকে ওয়াইফাইতে কীভাবে গেলি?
সৃজন গম্ভীর মুখে বলল,
“আধুনিক ভালোবাসা, ও সব তরা বুঝবি না!! ঝিনুক পাশ থেকে বললো।
” এমন প্রোপোজ আমার জীবনে দেখি নি, এটা তোদের দ্বারা সম্ভব! আমাদের মান ইজ্জত শেষ করলি রে! এতো শিখিয়ে দেয়ার পরো টেকনাফ টু তেতুলিয়ায় চলে গেলি!!
এরপর মাইক হাতে নেয় নাভান। পুরো অডিটোরিয়াম যেন একটু চুপ হয়ে যায়। ব্ল্যাক পাঞ্জাবিতে তাকে আজ আলাদা রকম লাগছে। মাইকটা হাতে নিয়ে প্রথমে হালকা কেশে নেয়, তারপর শুরু করে—
ছাত্র হিসেবে তার অনুভূতির কথা বলে, নতুনদের স্বাগত জানায়। সিনিয়রদের সম্মান দেয়। আবার মায়ের পক্ষে অতিথি হিসেবেও দু’কথা বলে। কথার মাঝে মাঝে কোমরে হাত রাখা, কপাল চুলকানো, চুলগুলো পেছনে ঠেলে দেওয়া, হালকা মুচকি হাসি—সব মিলিয়ে স্টেজে তাকে একদম মারাত্মক লাগছে।
সামনের সারিতে বসা অনেকেই হা করে তাকিয়ে আছে। কেউ ভিডিও করছে, কেউ ছবি তুলছে। রোজ নিচু গলায় রুশাকে বলল,
“এই চকলেট হিরো এত ভালো কথা বলতে পারে কবে থেকে? ভাই আমি তো ক্রাস খাইতেছি!!
রুশা মুচকি হেসে বলল,
এর নাম এমনি এমনি চকলেট দি নাই বেটার শরীরে কারেন্ট আছে তো, কানেকশন ফুল স্পিডে এখন তাই এতো কিউট লাগছে। হেরা তাদের কথা শুনে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সুন্দর লাগছে ঠিক আছে এভাবে বলতে হবে কেনো? যতোসব ডং “
নিলয় আজ কালো পাঞ্জাবি পরে এসেছে—গম্ভীর, কিন্তু চোখে দুষ্টু ঝিলিক। নেন্সি আর সিয়ামও তাদের দলের নির্ধারিত থিম অনুযায়ী সাজিয়েছে নিজেদের। কারও পরনে নীল-সাদা, কারও গাঢ় লাল-কালো—সব মিলিয়ে রঙের মেলায় ভরে উঠেছে চারদিক। সবাইকে আজ সত্যিই মনোমুগ্ধকর লাগছে, যেন প্রত্যেকে নিজের সেরা রূপটা নিয়ে হাজির হয়েছে।
মঞ্চের সামনে চেয়ারগুলো সারি সারি সাজানো। মাইকে একেক করে ফুলের তোড়া দিয়ে নবীনদের বরণ করা হচ্ছে। ফুলের গন্ধ, করতালির শব্দ আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠেছে স্মরণীয়।
স্যার-ম্যাডামরা একে একে বক্তব্য রাখছেন—কেউ বলছেন নতুন পথচলার সাহসের কথা, কেউ বলছেন স্বপ্ন দেখার গুরুত্ব নিয়ে। নবীনদের চোখে তখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলো।
এরপর ঘোষণা এলো”
“এবার শুরু হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর্ব!”
প্রথমে একদল মঞ্চে উঠল। তাদের প্রাণবন্ত নাচে পুরো হল কেঁপে উঠল করতালিতে।
তারপর দ্বিতীয় দল—তাদের উপস্থাপনায় ছিল আবেগ আর তাল-লয়ের নিখুঁত মিশেল।
তৃতীয় দল মঞ্চে আসতেই আলো-ছায়ার খেলায় যেন অন্য এক জগৎ তৈরি হলো।
হঠাৎ মাইকে ভেসে এলো
“পরবর্তী পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছে রোজ, রুশা, অধীর, সৃজন, নেন্সি, সিয়াম এবং আরও একটি জুটি…”
নাম শুনেই সবার বুকের ভেতর ধকধক শুরু। কেউ শেষবারের মতো শাড়ির আচল ঠিক করছে, কেউ হাতের ঘাম মুছে নিচ্ছে। অধীর হালকা হেসে সৃজনকে কিছু বলল, আর সৃজন চোখ টিপে উত্তর দিল—যেন আজও কিছু দুষ্টুমি বাকি আছে।
প্রথম জুটি—রোজ আর সৃজন।
সৃজন আলতো করে রোজের হাত ধরতেই রোজের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত কাঁপন। চারপাশে এত মানুষ, তবুও সেই মুহূর্তে যেন শুধু দু’জনই আছে। সৃজন চোখে চোখ রেখে ধীরে ঘুরিয়ে নেয় তাকে। রোজের ওড়না বাতাসে উড়ে এসে ছুঁয়ে যায় সৃজনের কাঁধ।
একটা স্টেপে রোজ হোঁচট খাওয়ার ভান করতেই সৃজন তাকে টেনে নেয় কাছে—মুহূর্তটা এতটাই স্বাভাবিক, এতটাই নিখুঁত যে দর্শকরা হাততালি দিয়ে ওঠে। রোজের গাল লাল হয়ে যায়, আর সৃজনের ঠোঁটে নরম হাসি—রুমান্স যেন নাচের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে কথা বলছে।
তারপর তাল বদলায়।
রুশা আর অধীর একসাথে পজিশনে আসে।
অধীরের চোখে চিরচেনা দুষ্টুমি, কিন্তু আজ সেই দুষ্টুমির ভেতরেও আলাদা কোমলতা। রুশা প্রথমে চোখ ঘুরিয়ে নেয়, কিন্তু সুর যখন ধীরে ধীরে গভীর হয়, অধীর আলতো করে তার হাত ধরে কাছে টানে।
একটা স্টেপে অধীর রুশার চারপাশে ঘুরে এসে তার সামনে দাঁড়ায়—চোখে চোখ আটকে যায়। রুশার মুখে লাজুক হাসি, আর অধীর ফিসফিস করে বলে,
— “রাগ করলেও তুমি সুন্দরই থাকো।”
সিয়ামের চোখে আজ নেন্সি অন্য রকম কিছু দেখেছে কিন্তু তা সে পাত্তা দেয় নি।তার ভালোবাসা সব নিলয় এর জন্য। গান বাজছে বক্সে-
ফাগুনের মোহনায়
ফাগুনের মোহনায় মন মাতানো মহুয়ায়
রঙ্গীন এ বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়।।
ও মোর মন হারিয়ে যায়, মোর মন হারিয়ে যায়,
কন্যেরে তোর ভাবনা ঝিলমিলিয়ে যায়রে, ঝিলমিলিয়ে যায়
কোন অচেনা দেশান্তরে, তোর সাথে এই তেপান্তরে
মোর মনের প্রজাপতি নাচি নাচি ঘুরি ঘুরি উড়ি উড়ি উড়ে যায়
মন হারানোর ঠিকানায় ।।
রিং রাঙ্গা মোর কবিতা সূরের অন্তরে
ঝির ঝিরি ঝর্না ধারায় নতুন রঙ ঝরে
সবুজ সবুজে হৃদয় কেমন করে
ও মোর দিন উড়িয়া যায়রে, দিন উড়িয়া যায়
কন্যেরে তোর ভাবনা গুনগুনিয়ে যায়রে, গুনগুনিয়ে যায়
তোর স্বপ্নের ভ্রমরি, মোর প্রেমেরই প্রহরী
হৃদয়ের ও বাগিচাই নাচি নাচি ঘুরি ঘুরি উড়ি উড়ি উড়ে যায়
মন হারানোর ঠিকানায়
গানের মাঝপথে জুটি বদল হয়।
রোজ হঠাৎ অধীরের সঙ্গে, রুশা সৃজনের সঙ্গে—সবাই মিলে ঘূর্ণির মতো ঘুরছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রত্যেকে বুঝে যায় কার চোখ কাকে খুঁজছে।
সৃজনের চোখ আবারও রোজের দিকে, অধীরের দৃষ্টি বারবার রুশার দিকে ফিরে আসে।
তাল দ্রুত হয়, বিট জোরালো হয়—কিন্তু তাদের চোখের ভাষা বদলায় না।
গান শেষকড়া, তালিতে চারদিক হই হই পড়ে যায়। একে একে সবার গ্রুপের ডান্স শেষ হয়। এখন সবশেষ—হেরা ও নাভানের পালা।
স্যারের অ্যানাউন্সমেন্ট শেষ হতেই চারিদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তে হেরা গুটি পায়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়।
গান ধীরে ধীরে প্লে হতে থাকে। আলোটা একটু নরম হয়ে আসে। হেরা আর নাভান এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের দিকে তাকায়। সময়টা যেন থমকে দাঁড়ায়।
কিন্তু নাভান হঠাৎ করেই চোখ ফিরিয়ে নেয়।
ঠিক সেই ক্ষণেই হেরার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। তার মনে হয়—নাভান কি ইচ্ছে করেই চোখ সরিয়ে নিল? সে কি এতটাই অপ্রিয়? এতটাই অদেখা থাকার মতো?
মুহূর্তের মধ্যে হেরার ভেতরে একটা অপমানবোধ দানা বাঁধে। মনে হয়, যেন সে খুবই অগোছালো, খুবই অযোগ্য—দেখার মতো নয়।
আর ঠিক তখনই গানের সুরটা একটু জোরে ভেসে ওঠে… যেন তার না বলা কষ্টটুকুকে ঢেকে দিতে চায়।
Maya Maya Hoge Maya…
Maya Ma Mola Faans Daare Re…
Ho Hoge Mola Jodi Maya…
Maya Ma Mola Faans Daare Na
নাচটা তারা এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল সবাই হা করে তাকিয়ে ছিল। নাভান যখন হেরাকে নিজের দিকে টেনে ঘুরিয়ে নিল, তখন দুজনের চোখে চোখ—ঠিক যেন কোনো সিনেমার স্লো-মোশন দৃশ্য। মুহূর্তটা এতটাই সুন্দর ছিল যে কারও পলক ফেলতেও ইচ্ছে করছিল না।
আজ পাঞ্জাবি পরায় নাভানকে অন্যরকম লাগছে—একটু বেশি পরিণত, একটু বেশি আকর্ষণীয়। হলের মেয়েরা যেন চোখ দিয়েই তাকে গিলে খাচ্ছে। আর হেরা? সে তো আজ এই অহংকারী গিটারওয়ালার দিক থেকে চোখই সরাতে পারছে না।
নাচের এক পর্যায়ে নাভানের হাত হেরার কোমরে ছুঁতেই হেরা হালকা চোখ বন্ধ করে ফেলে। সেটা লজ্জা, না কি অনুভূতির ঢেউ—বোঝা মুশকিল। নাভান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসে, কিন্তু সেটা কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
হঠাৎ গানের সুর বদলে যায়। দুজন ঘূর্ণির মাঝ থেকে বের হয়ে আসে। ঠিক তখনই পর্দার মতো কিছু সামনে নেমে আসে, আর তার আড়াল ভেঙে নিলয় এসে দাঁড়ায় হেরার সামনে।
সে মুচকি হেসে বলে,
— গান চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন এই গানে নাচতে হবে। না হলে কিন্তু তুমি জিততে পারবে না, হেরা ফুল।
পর্দা সরতেই সবাই নিলয়কে দেখে চিৎকার করে ওঠে। এখন মঞ্চে তিনজন—দুই পাশে নাভান আর নিলয়, মাঝখানে হেরা।
হেরা হিন্দি গানে দারুণ নাচতে পারে, কিন্তু বাংলা গানে একটু হিমশিম খায়। তবে আজ তার ভেতরে অন্যরকম আত্মবিশ্বাস। আর নাভানের জন্য এসব তো বাঁ হাতের খেলা।
নিলয় কাটা পা নিয়েও দাঁতে দাঁত চেপে নাচের সিদ্ধান্ত নেয়। কষ্টটা বোঝা যায়, তবু সে থামে না। কারণ সে জানে—সে না নামলে হেরা সবার কাছে হেরে যাবে। শেহতাজ খানের বিষাক্ত মন্তব্য যেন তার কানে বাজছে। তাই ব্যথা ভুলে, সবকিছু উপেক্ষা করে সে নাচতে থাকে।
বক্সে গান বাজতে শুরু করে—
আর মঞ্চের বাতাস যেন হঠাৎ আরও গরম হয়ে ওঠে।
তিনজনের চোখে প্রতিযোগিতা, আবেগ আর অদৃশ্য এক টান—যা দর্শকদের নিঃশ্বাস আটকে রাখে।
Let’s have some raunak shaunak
Let’s have some party now
Let’s have some rola rappa
Run the track and never look back … let me say
Let’s have some dhol dhamaka
Let’s call the dholi now
Let’s have some matti tappa
Chalo chalo ji lak lachka lo
Chalo chalo ji nach lo gaa lo
Pakad kisi ki wrist
And we twist, we twist, we twist, we twist
And we twist, we twist, we twist, we twist
And we twist, we twist, we twist, we twist
And we twist, we twist, we twist, we twist
চলবে …….
কি মনে হয়, গান কে পাল্টে দিয়েছে?🤔🤔