প্রেম আসবে এভাবে | Prem Ashbe Evabe


প্রেম আসবে এভাবে পর্ব–১: হৃদয়ের নতুন গল্প শুরু

রাত প্রায় একটা। নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে ব্যাগে ভরলাম। এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সৎ মা আর বাবা পারিবারিক ঋণের ভার বইতে না পেরে এলাকার মেম্বারের নেশাগ্রস্ত ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। দু’দিন আগেই পালিয়ে এসেছি। বিয়ের আগের রাতে তো কেউই ঘুমায় না।  সবাই জেগে থাকে। তখন কি আর পালানো যেত?

‎প্রথমেই বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখান থেকে ঢাকার বাস ধরি। ঢাকায় আমার বন্ধু প্রিয়ার বাড়ি। আগেই ওর সঙ্গে সব কথা বলা ছিল। ও আমার জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকায় পৌঁছে যাই। প্রিয়া বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি পাঠিয়েছিল। সেখান থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই ওদের বাড়িতে পৌঁছাই। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যাই। এটা বাড়ি, না প্রাসাদ? বিশাল গেটের সামনে বড় করে লেখা, “শালিককুঞ্জ”

‎এই বাড়িগুলো দিনে আমার কাছে বেশ সুন্দরই লাগে, কিন্তু রাতে কেন জানি ভুতুড়ে মনে হয়। ভেতরে ঢুকতেই দেখি প্রিয়া আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ওকে জড়িয়ে ধরেই বলে উঠলাম, ‘ওমা— বড়লোকরা এত সকালেও ঘুম থেকে উঠতে পারে নাকি? তুই এত সকালে শুধু আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস?”

‎প্রিয়া হেসে বলে, “না রে, প্রেমিক পালিয়ে আসবে বলেছিল, তাই না ঘুমিয়ে সাতসকালে দাঁড়িয়ে আছি তার জন্য”

‎আরো পড়ুন

‎”আজকাল প্রেমিকরাও বাড়ি ছেড়ে পালায় নাকি? বাহ! তোর প্রেমিককে তো অস্কার দেওয়া উচিত। যাই হোক, এখানে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি বাড়ির ভেতরে আসতে বলবি?”

‎ভেতরে আয়, অনুজা। তোর ঘর রেডি আছে। আগে ফ্রেশ হয়ে নে, তারপর খেয়ে একটু বিশ্রাম নিস।”

‎”না রে, আগে ঘুমাবো। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।”

‎”ঠিক আছে।” বলেই  প্রিয়া আমাকে রুমে পৌঁছে দিয়ে চলে যায়। রুমটা একবার ভালো করে দেখি। সত্যিই সুন্দর। বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই মনটা আরও ভালো হয়ে যায়। চারপাশের দৃশ্যটা মনোরম। হঠাৎ চোখ পড়ে পাশের রুমের বেলকনিতে, যেটা আমার রুমের ঠিক পাশেই। তবে এসব ভাবনার তোয়াক্কা না করে কখন যে বিছানায় এসে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই, তা নিজেও বুঝিনি। ঘুম ভাঙতেই দেখি “ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই। আমি চমকে উঠে বসলাম—‘এমা!’ এত দেরি করে তো কখনো ঘুম থেকে উঠিনি। তাও আবার আজ প্রথম দিন এই বাড়িতে।” দ্রুত তৈরি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামি। নিচে কয়েকজন সার্ভেন্ট কাজ করছিল। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানায় এই মুহূর্তে প্রিয়া ম্যাডাম ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। আমাকে বসতে বলে খাবার দেওয়ার কথা জানায়।

‎”“না, এখন খাব না। আমি প্রিয়ার কাছে যাব। ওর ঘরটা কোথায়, জানালে ভালো হয়।”

‎আরো পড়ুন

‎লোকটি আমাকে প্রিয়ার রুম পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু দরজার সামনে এসেই ফিরে আসতে হয়। ভেতর থেকে লক করা। হয়তো ঘুমাচ্ছে ভেবে আর বিরক্ত করিনি।

‎নিজের রুমে ফিরে বসে বাড়ির কথা ভাবতে থাকি। এখন ওখানে কী হচ্ছে কে জানে! সেই নেশাখোর নরখাদকটা কি আমাকে খুঁজছে? না কি নেশা করে কোথাও পড়ে আছে? তার নাম নাভিদ ইলমাজ এলাকার ছাত্রলীগের সভাপতি। তার বাবা শেখ আজগর ইলমাজ, নামকরা মেম্বার। লোকমুখে শোনা যায়, ষোলো বছর বয়সে নাভিদ নাকি  তার নিজের মাকেই মেরে ফেলেছিল। এক সপ্তাহ হাসপাতালে থেকে সেই মহিলা মারা যান। একটা মানুষ কতটা ভয়ংকর হলে নিজের মাকেও হত্যা করতে পারে? তার বাবা ছেলের সব অপরাধ আড়াল করে এসেছে। মেম্বার সাহেবের কাছে আমার বাবার অনেক টাকা পাওনা। একদিন সকালে কলেজে যাওয়ার সময় দেখি, রিফাত তার বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির। রিফাত বাবাকে হুমকি দিতে এসেই আমাকে দেখে ফেলল। আমি বেরোতে চাইলে সে সামনে এসে দাঁড়ালো। গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এলো তার, “এই মেয়ে! কোথায় পালাচ্ছো?”

‎”আমি পাত্তা না দিয়ে নিজের রুমে যেতে চাইলে সে হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে বলল, “ডাক দিয়েছি, শুনতে পাওনি?”

‎আমি শান্ত গলায় জবাব  দেই, “ক্ষমা করবেন, আমি কানে একটু কম শুনি। তাই আপনার ডাক শুনতে পাইনি।”

‎ভাবছিলাম, এবার নিশ্চয়ই গালে চড় বসাবে। কিন্তু সে উল্টো মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”

‎”আমার নাম অনুজা শেখ।”

‎”চমৎকার নাম। যাও, নিজের রুমে যাও।”

‎লোকগুলো চলে যেতেই বাবা আর সৎ মা আমার রুমে আসে। সঙ্গে সৎ বোন ওয়াসফিয়া নেহা। সোজাসাপ্টা বলে দেয়, “তোমার বিয়ে আমরা মেম্বারের ছেলের সঙ্গে ঠিক করেছি। ওরাই প্রস্তাব দিয়েছে।” সব শুনে বুঝে যাই-এই ষড়যন্ত্রে ওদের হাত আছে। নিজেদের ঝামেলা মেটাতেই আমাকে বলি দিতে চায়। আমি মানতে রাজি হইনি। যতই চাপ দিক, মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরছিল “যত যাই হোক, একটা নরখাদককে বিয়ে করা যায় না। বিয়ের রাতেই যদি আমাকেও মেরে ফেলে?”

‎অথচ সত্যিটা এটাও, নাভিদ দেখতে ভয়ংকর রকম সুদর্শন। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, সুঠাম দেহ, চওড়া কাঁধ আর মাতাল করা চোখ। যদি সে এমন অমানুষ না হতো, হয়তো এই বিয়েতে আমি আপত্তি করতাম না।

‎এইসব ভাবনার মাঝেই কখন যে প্রিয়া রুমে ঢুকে পড়েছে, খেয়ালই করিনি। “কী রে? বাড়ির কথা মনে পড়ছে নাকি?”

‎”না… আচ্ছা, এই বাড়িটা এত ফাঁকা কেন? সবাই কোথায়?”

‎প্রিয়া একটু থেমে  একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,”কারণ এখানে জীবিত মানুষের থেকে মৃতের সংখ্যা বেশি।”

‎চলবে?

প্রেম_আসবে_এভাবে

‎ইশরাত_জাহান_জেরিন

‎সূচনা_পর্ব

২য় পর্ব কামিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *