
আবিরের স্প্যারো (ই-বুক ভার্সন)
লেখনীতে সালমা চৌধুরী
পর্ব:০১
নিস্তব্ধ নিশি। এক অদ্ভুত নীরবতায় চারপাশ ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে বাতাসও যেন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক নিস্তব্ধতার মাঝে আরও গভীরতা এনে দিচ্ছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো মাটিতে রূপালি পর্দা বিছিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে ঘাসের ফাঁক দিয়ে শিশিরের ফোঁটা গড়িয়ে মাটির বুকে নির্দ্বিধায় মিশে যাচ্ছে।
এই নিস্তব্ধতায় শহরের কোলাহলও দূরে সরে গেছে। গাছের ডালপালাও নিশ্চুপ, যেন তাঁরাও ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল কারো হৃদয়ের ভেতরকার অনুভূতিই সেই নিস্তব্ধতার সঙ্গী হয়ে ওঠেছে।
“অজানা স্বপ্নে বিভোর কেউ একজন স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে।”
নিশ্চুপ রাতের আবেশ দুচোখে ভেসে ওঠছে। অদৃশ্য এক মায়ার সুর বাজছে হৃদয়ে। চাঁদের আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে নীরবতায় হাঁটছে সে। ভাবনার আকাশ জুড়ে শুধু একটা নামই শুনা যাচ্ছে,
” মাহদিবা খান মেঘ।”
হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে যাঁর অবস্থান। যাঁর ভাবনায় অবেলায় হৃদয় আঙিনায় বিদ্যুৎ চমকায়। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো সতেজ হয়ে ওঠে। বারংবার হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা অনুভব হয়। সেই মাহদিবা খান মেঘ, আবির নামক এক যুবকের বুকের বাঁ পাশটায় বাসা বাঁধা ছোট্ট একটা পাখি। সে তার নাম দিয়েছে,
” আবিরের স্প্যারো।”
স্প্যারোকে নিজের করে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল তাঁকে। দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। মনের ভেতর যে শূন্যতার পাহাড় গড়তে শুরু করেছে, সে পাহাড়ের একাকীত্বের অবসান হওয়া খুব দরকার। তাই একতরফা ভালোবাসার সমাপ্তি টেনে স্প্যারোর মন আঙিনায় নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে এসেছে আবির।
শুন-শান রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। দোকানে দুই একজন লোক চা খাচ্ছেন। পাশে দুই-তিনটা ব্রেঞ্চ ফাঁকা পড়ে আছে। আবির একটা ব্রেঞ্চে বসল। মামাকে চা দিতে বলে পকেট থেকে ফোন বের করল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠল এক হাস্যোজ্জ্বল ছবি। আবির ছবির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
মাই ডিয়ার স্প্যারো,
“তোমার শান্ত মন এবার অশান্ত হবে,
আমায় নিয়ে ভাবতে তুমি বাধ্য হবে।”
আবির ধীরস্থির ভাবে নিঃশ্বাস ছাড়ল। চারপাশের নীরবতায় যেন হৃদয়ের কম্পন না শোনা যায়। কল লিস্ট থেকে নাম্বার বের করে কল করল।
কয়েক সেকেন্ড পর কল রিসিভ হলো। ফোনের অপর পাশ থেকে ঘুম ঘুম কণ্ঠে এক যুবক বলল,
” হ্যালো।”
“এই শালা, ঘুম থেকে উঠ।”
” শালা কে?”
” তুই।”
“আপনি কে?”
“তোর বোনের জামাই।”
” মানে? কি সব বলছেন?”
আবির মোলায়েম কণ্ঠে ডাকল,
” তানভীর, ভাই আমার। মঙ্গলগ্রহ থেকে ফিরে এসো এবার।”
তানভীর ঝটপট করে শুয়া থেকে ওঠে বসল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নাম্বার টা দেখল একবার। অপরিচিত নাম্বার কিন্তু মানুষটা যে তাঁর বড্ড পরিচিত। তানভীর উত্তেজিত কণ্ঠে ডাকল,
” ভাইয়া…”
আবির কিছু বলার আগেই তানভীর আবারও শুধাল,
” কেমন আছো, ভাইয়া?”
” আলহামদুলিল্লাহ। তুই কেমন আছিস?”
” আলহামদুলিল্লাহ খুব ভাল।”
“বের হতে পারবি?”
তানভীর খানিকটা চমকে ওঠল। প্রশ্ন করল,
” কোথায় তুমি?”
” তোদের বাসার কাছেই। চায়ের দোকানে৷”
” তুমি চায়ের দোকানে কি কর? আর কখন এসেছো তুমি? আমাদের বাসায় আসো।”
আবির শান্ত গলায় বলল,
” এসেছি অনেকক্ষণ। কিছু কাজ ছিল। আজ বাসায় যাব না। তুই আসবি?”
“এক্ষুনি আসছি ভাইয়া। তুমি একটু অপেক্ষা করো।”
তানভীর ওয়াশরুমে গিয়ে কোনোরকমে ফ্রেশ হয়ে নিল। তাড়াহুড়োতে টিশার্ট আর টাউজার পড়েই ছুটল। হালিমা বেগম ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। তানভীরের ছুটাছুটি দেখে আতঙ্কিত গলায় শুধালেন,
” কি হলো তানভীর? এভাবে ছুটছিস কেন?”
তানভীর একবার বলতে নিল,
” ভাইয়া এসেছে।”
পরমুহূর্তেই কিছু একটা ভেবে থেমে গেল। ঢোক গিলে ধীর কণ্ঠে বলল,
” একটা জরুরি কাজ আছে আম্মু।”
” ফিরবি কখন?”
” ঠিক নেই। একটু সময় লাগবে।”
হালিমা বেগম ফের বললেন,
” তোর আব্বু সজাগ হলে কি বলব?”
” কিছু একটা বলে ম্যানেজ দিও, প্লিজ।”
তানভীর লম্বাচওড়া, খানিকটা গুলুমুলু দেখতে। সম্পর্কে আবিরের চাচাতো ভাই হলেও দু’জনের বন্ধুত্বের গভীরতা খুব প্রখর। হাজারো মানুষের ভিড়ে তাঁদের মধ্যেকার বন্ধন অন্যরকমভাবে সবার নজর কাঁড়তে সক্ষম।
দূর থেকে আবিরকে এক পলক দেখেই ছুটল তানভীর। এক দৌঁড়ে আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তানভীরের নিঃশ্বাস এলোমেলো। আবির চোখ তুলে চাইল। ছোটবেলার মতোই আবেগে ভেসে গেল দু’জন। তানভীর ভেজা চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। কতগুলো দিন পর একসাথে হলো দু’জন। আবির ওঠে দাঁড়াতেই জড়িয়ে ধরল তানভীর। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের সামনে সুদীর্ঘ সময়ের দূরত্ব কিছুই না। সময় যেন তাদের একটুও আলাদা করতে পারেনি। বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসা এক মুহূর্তেই উথলে ওঠছে। আবিরও শক্ত হাতের বাঁধনে আঁকড়ে ধরল তানভীরকে। আবিরের দু-চোখ সিক্ত অথচ ঠোঁটে অকৃপণ হাসি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু আলিঙ্গনের ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে উঠল হাজারো না বলা কথা। অপেক্ষার ব্যথা, মনের টান আর বন্ধুর মতো খুনসুটিতে ভরা সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগল। এর আগেও এয়ারপোর্টে দেখা হয়েছিল দু’জনের। তবে সেই দেখা ছিল ক্ষণিকের। কথা হয়েছিল খুব অল্প। দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ভেঙে আবির জানতে চাইল,
” কাঁদছিস কেন? তোর সঙ্গে কান্না মানায় না, ভাই।”
তানভীর উত্তর দিচ্ছে না। তানভীরের মাথায় হাত বুলিয়ে আবির মৃদুস্বরে বলল,
” অনেকদিন একসাথে চা খাওয়া হয় না। একসঙ্গে হাঁটা হয় না। “
তানভীর মলিন গলায় বলল,
“তুমিই তো আমাকে ফেলে বহুদূরে চলে গেলে। “
“মেয়েদের মতো অভিমান করছিস কেন? এই অভিমান শুধু তোর বোনকে মানায়।”
” বনু এখন আর আগের মতো অভিমান করে না। অনেক ম্যাচিউর হয়ে গেছে।”
” কিভাবে বুঝলি?”
তানভীর সরল মনে জবাব দিল,
” তুমি দেখলেই বুঝতে পারবে।”
আবির মৃদুস্বরে বলল,
” তাঁকে দেখতেই তো এসেছি।”
“তাহলে বাসায় যাও নি কেন? বাসায় গেলে সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত।”
“যাব। কিছুদিন পর।”
তানভীর চিন্তিত কণ্ঠে শুধাল,
” তার আগ পর্যন্ত কোথায় থাকবে?”
” রাকিবের বাসায় থাকব।”
তানভীর চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
” ওই বাসায় থাকাটা কি খুব দরকার? তুমিতো আমার সাথেই থাকতে পারতে। বড়ো আব্বু জানতে পারলে মন খারাপ করবেন না?”
” সমস্যা নেই। আব্বু জিজ্ঞেস করলে সত্যিটায় বলব। রাকিব খুব করে চাচ্ছিল তাঁকে যেন কিছুদিন সময় দেই। তাছাড়া অফিসের কিছু কাজ আছে৷ একসাথে থাকলে টুকটাক কিছু প্ল্যানিংও করা যাবে।”
” তোমার যা ভালো মনে হয়।”
আবির আর তানভীর চা খেতে খেতে গল্প করতে লাগল। কত শত না বলা কথা জমে আছে মনের কোনে। জোয়ারভাটায় কাটানো দিনগুলো এখন কেবল স্মৃতির পাতায়। গল্পের এক পর্যায়ে আবির জিজ্ঞেস করল,
” মেঘ কেমন আছে?”
তানভীর মুচকি হেসে জবাব দিল,
” সে খবর আমার থেকে নেবে কেন? নিজেই না হয় নিও।”
” ও কি আমার কথা মনে করে?”
” তুমি কে? তোমার কথা মনে করবে কোন দুঃখে!”
আবির কিছুটা ক্ষিপ্ত হলো। রাগী স্বরে বলল,
” তোর বোনকে বিয়ে করব আমি। তারপর বলিস, আমি কে!”
তানভীর আনমনে হাসল। আড়চোখে আবিরকে এক নজর দেখে শান্ত কণ্ঠে বলল,
” আমার বোনের জন্য এরকম বিয়ের অফার প্রতিদিনই আসে। লিস্ট চেক করে বলতে হবে তোমার সিরিয়াল কত!”
আবির রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
” সিরিয়াল! তোর সিরিয়ালের তা-না নানা করে ফেলব। সব সিরিয়াল ব্রেক করে তোর বোনকে আমার করে নিব, দেখে নিস।”
“ও তাই?”
তানভীরের কণ্ঠস্বর ভারী। গম্ভীর গলায় ফের বলল,
” এই তোমার যোগ্যতা! খুব তো বলেছিলে, পড়াশোনা করব, যোগ্যতা অর্জন করব। তোর বোনকে সসম্মানে আমার বউ বানাবো। এই তার নমুনা?”
আবির ভ্রু কুঁচকাল। বক্রদৃষ্টিতে তানভীরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তানভীরের গুরুগম্ভীর হাবভাব কিছুক্ষণ পরখ করে মৃদুস্বরে বলতে শুরু করল,
” ওহ আচ্ছা। আপনি তাহলে সম্বোধির মুডে আছেন। সরি, ভুলেই গিয়েছিলাম। ভাইজান আপনি বিশ্বাস করুন, আমি ভালো হয়ে গিয়েছি। বস্তা ভরে সার্টিফিকেট অর্জন করে নিয়ে এসেছি। আপনি আর আপনার আব্বাজান মিলে সারাদিনেও আমার এচিভমেন্ট দেখে শেষ করতে পারবেন না, ইনশাআল্লাহ। এখন আমার একটায় লক্ষ্য।”
তানভীর মৃদু হেসে আবিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” সেটা কি?”
“আপনার বোনকে বিয়ে করে আমার নামের পাশে বিবাহিত ট্যাগ লাগানো। তারপর আপনাদের সামনে বিয়ের সার্টিফিকেট রেখে বলল,
‘ আলহামদুলিল্লাহ! আমি আমার জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ করেছি। আমার সাফল্যের খাতা আজ পরিপূর্ণ হলো।’
যদিও অলিখিতভাবে সাফল্যের খাতায় একটা শূন্যস্থান তখনও রয়ে যাবে।”
তানভীর ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” কি?”
আবির মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে লাজুক ভাব নিয়ে বলল,
” আমার বাবা হওয়া।”